একদশ শতাব্দীতে মোঙ্গল ও ক্রুসেড আক্রমণে মুসলিম উম্মাহ ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়েছিল। বিশেষত মোঙ্গলদের প্রবল দাপটে একের পর এক জনপদ তাদের হস্তগত হয়ে পড়ছিল। খিলাফত অবকাঠমো ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এমন কেউ ছিলেন না যিনি সামনে থেকে দাড়িয়ে সমগ্র মুসলিম জাহানের নেতৃত্ব দিবেন। এমতাবস্থায় একজন ওর্ঘুজ বংশোদ্ভূত চৌকস মুসলিম কমান্ডার স্বপ্ন দেখেন একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যের। জাতিতে ওর্ঘুজ খানের উত্তরসূরী। নাম তাঁর তুঘরুল বেগ। সেই সূত্রপাতে ১০৩৭ সালে ইরানের নিশাপুর থেকে তুঘরুল বেগ প্রতিষ্ঠা করেন সেলজুক সালতানাতের। এই সালতানাত এর নামকরণ করেন তাঁর দাদা সেলজুক বেগের নাম অনুসারে। কথিত আছে রাষ্ট্রদ্রোহীতার অপরাধে গজনবীর শাসক সেলজুককে কারাগারে বন্দি করেন। তুঘরুল বেগ সেই সময় সৈন্য সামন্ত যোগার করে গজনবীর কারাগার থেকে দাদা সেলজুককে উদ্ধার করেন। এতে করে গজনবী ও সেলজুকদের মধ্যে শত্রুতা তৈরি হয়। ফলে তাদের মধ্যে অনেকগুলো যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এই যুদ্ধে বেশিরভাগ গজনবী জিতলেও একদম শেষের দিকের যুদ্ধগুলোতে বাজি পাল্টে যেতে থাকে।অবশেষে গজনবীকে হটিয়ে সেলজুক সালতানাতের উত্থান ঘটে।


প্রথম সেলজুক সালতানাত এতটা বিস্তৃত ছিল না। তুঘরুল বেগ প্রথম দফায় খোরাসান ও আজারবাইজান দখল করেন। তাঁর মৃত্যুর পর ১০৬৩ সালে সালতানাতের দায়িত্ব নেন সুলতান আল্প আরসালান। তাঁকে সেলজুক সালতানাতের অন্যতম সেরা শাসক হিসেবে গণ্য করা হয়। যাকে কেন্দ্র করে সেলজুক সাম্রাজ্যের এতো সুখ্যাতি তিনি সুলতান আল্প আরসালান বেগ। তাঁর অদম্য সাহসিকতা ও নেতৃত্বে সেলজুকরা একের পর এক আক্রমণ প্রতিহত করে। তিনি আর্মেনিয়া ও জর্জিয়া দখল করে সেলজুক সাম্রাজ্য আরো বিস্তৃত করেন। তিনি মোঙ্গলদের বিপক্ষে অনেকগুলো যুদ্ধে জয়লাভ করেন এমনকি শক্তিশালী বাইজেন্টাইনদের বিভিন্ন ষড়যন্ত্রকে প্রতিহত করেন।

মাত্র ৪২ বছর বয়সে সুলতান আল্প আরসালান এর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র মালিক শাহ মসনদে আসীন হন। তাঁর সময়ে সেলজুক সাম্রাজ্য সবচেয়ে বেশি ভুখন্ড পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। তাঁর সময়ে সেলজুক সাম্রাজ্য মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য‌ এশিয়া ছাপিয়ে চীন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। ১০৯২ সালে সুলতান মালিক শাহ এর মৃত্যুবরণ করার পরে সেলজুক সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা হয় এবং সেই বিশাল ভূখন্ডগুলো ভেঙ্গে বিভিন্ন রাষ্ট্রে বিভক্ত হয়।  




মালিক শাহ সেলজুকদের সর্বশেষ শক্তিশালী সুলতান ছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর সেলজুক শাসকগণ ক্ষমতার দ্বন্দে অভ্যন্তরীণ কলহে জড়িয়ে পড়েন। তাঁদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ক্রুসেডার ও মোঙ্গলরা অতর্কিত আক্রমন চালিয়ে সেলজুকদের ছত্রভঙ্গ করে ফেলে। তাঁদের অধিকৃত অধিকাংশ এলাকা দখল করতে করতে সেলজুক ছোট ছোট বিছিন্ন ভূখণ্ডে সাম্রাজ্য পতিত হয়। সর্বশেষ আজকের তুরস্ক ছিল সেলজুকদের সর্বশেষ অধিকৃত রাষ্ট্র। সেখানে শাসন চালান সুলতান আলাউদ্দিন কায়কোবাদ। তাঁর মৃত্যুর পর পুত্র গিয়াসউদ্দীন সুলতান হন এবং সর্বশেষ সুলতান হন সুলতান দ্বিতীয় আলাউদ্দিন কায়কোবাদ। ইতিহাস বলে যে, তাদের দুইজনের কেউই সুযোগ্য শাসক ছিলেন না এমনকি তাঁদের বহিরাগত শক্তি প্রতিহত করার ক্ষমতা পর্যন্ত ছিল না। ক্ষমতা ও নেতৃত্বহীনতার অভাবে তারা বাইজেন্টাইন ও মঙ্গোলদের পুতুলে পরিণত হন। ফলশ্রুতিতে সবশেষে চতুর্দশ শতাব্দীতে সেলজুক সাম্রাজ্যের পতন ঘটে।




বহিরাগত আক্রমণ ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলের মুখেও সেলজুকরা একাদশ শতাব্দী থেকে চতুর্দশ শতাব্দী পর্যন্ত প্রায় চারশত বছর শাসন ক্ষমতায় ছিল। তাঁদের পতনের সবচেয়ে বড় কারণ ছিল অভ্যন্তরীণ প্রাসাদ ষড়যন্ত্র। সেই ষড়যন্ত্রকে মোকাবেলা করতে না পেরে পতন ঘটে সেলজুকদের। ফলশ্রুতিতে সেলজুকদের অনুগত পশ্চিম আনাতোলিয়ায় বসবাসরত একটি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী কায়ি বসতির প্রতিনিধি ও বীরযোদ্ধা আরতুগল গাজীর নেতৃত্বে ওসমানী সালতানাতের সূচনা আরো নিকটবর্তী হয় যা আজকের সেই অটোম্যান সাম্রাজ্য হয়ে তিনটি মহাদেশের বিভিন্ন রাষ্ট্র শাসন করেছিলো প্রায় সাড়ে আটশত বছর।