কখনো কখনো বলা হতো মুঘল ই আযমের গল্প যেন দিলীপ কুমারের দেবদাস সিনেমাকেও হার মানায়। জানিনা কতটুকু সত্য তবে নিঃসন্দেহে "মুঘল ই আযম" ভারতীয় চলচ্চিত্রের শ্রেষ্ঠতম নির্মাণগুলোর একটি। কিন্তু মুঘল ই আযমের যাত্রাপথ মোটেও সহজ ছিল না।একটি সিনেমার খায়িশকে পূরণ করতে নির্মাতা আসিফকে গুণতে হয়েছিল দীর্ঘ চৌদ্দ বছরের পরিক্রমা।

মুঘল ই আযমের গল্প মূলত আনারকলি ও শাহজাদা সেলিমের প্রণয়কেন্দ্রিক। যা ফলশ্রুতিতে আনারকলিকে কেন্দ্র করে শাহজাদা সেলিম ও পিতা সম্রাট আকবরের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয় এবং যুদ্ধে পরাজিত হয়ে সেলিম রাজবন্দি হয়। ১৯২২ সালে আনারকলি- সেলিমের গল্প অবলম্বনে প্রথম নাটক রচনা করেন উর্দু নাট্যকার ইমতিয়াজ আলী তাজ। ১৯২৮ সালে বিখ্যাত ইরানী পরিচালক আন্দেশির ইরানী এক‌ই গল্পের প্লটে নির্মাণ করেন নির্বাক চলচ্চিত্র "আনারকলি" যা পরবর্তীতে ১৯৩৫ সালে আবার শব্দ সংযোজন করে পুনরায় মুক্তি দেয়া হয়।

আন্দেসির ইরানীর পরিচালনায় "আনারকলি" চলচ্চিত্র তরুণ পরিচালক আসিফকে (১৯২২- ১৯৭১) অনুপ্রাণিত করে আরো বড় পরিসরে চলচ্চিত্র নির্মাণে। বেশ কিছু বছর যেতেই সেই সুযোগ আসে তাঁর। ১৯৪৬ সালে আনারকলির গল্প অবলম্বনে সিনেমার শ্যুটিং ও শুরু করেন। সিনেমায় আকবর, সেলিম ‌ও আনাকলির চরিত্রে অভিষিক্ত হন তৎকালীন সবচেয়ে জনপ্রিয় তারকা চন্দ্রমোহন (১৯০৪-১৯৪৯), ডি কে সপ্রু (১৯১৬-১৯৭৯) ও নার্গিস (১৯২৯-১৯৮১)। কিন্তু নানা ইস্যুকে কেন্দ্র করে বারবার সিনেমার কাজ ভন্ডুল হতে থাকে।  

রাজনৈতিক দাঙ্গা, স্বাধীনতা আন্দোলন, দেশভাগের দরুন সিনেমার কাজ মাঝ পথেই থেমে যায়। সিনেমার প্রযোজক দেশভাগের দরুন পাকিস্তানে চলে যান। সবচেয়ে বড় আঘাতটা আসে ১৯৪৯ সালে অভিনেতা চন্দ্রমোহনের অকাল মৃত্যুতে। কেননা আকবর চরিত্রে তাঁর সবচেয়ে পছন্দ ছিল অভিনেতা চন্দ্রমোহনকে। সিনেমার পথ বন্ধ হয়ে গেলেও কে.আসিফ তাঁর সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন।
   

পঞ্চাশের দশকে শেষার্ধে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। সিনেমার জন্য আসিফ প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করেন দিলীপ কুমার(১৯২২-২০২১), পৃথ্বিরাজ কাপুর (১৯০৬-১৯৭২) ও মধুবালাকে (১৯৩৩-১৯৬৯)। কিন্তু সেখানেও প্রতিকূলতার শেষ ছিল না। প্রথমত দিলীপ কুমার শাহজাদা সেলিমের চরিত্র করতে রাজি ছিলেন না। তাঁর মতে এমন শক্তিশালী একটি চরিত্র তাঁর দ্বারা আদৌ সম্ভব হবে কিনা এই নিয়ে দ্বিধায় ছিলেন। তাছাড়া তখন বেশ কিছুকাল আগে "নয়া দর" সিনেমার শ্যুটিং সেটে দিলীপ কুমার আর মধুবালার মধ্যকার প্রেমঘটিত দ্বন্দ‌ও ছিল অন্যতম কারণ। যার ফলে তখন দুজনের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় এবং একসাথে আর কোন সিনেমায় অভিনয় না করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু কে.আসিফ একটুও দমলেন না। তিনি দিলীপ কুমারকে বললেন তুমিই এই চরিত্র করবে এবং তুমি তা পারবে। একটা সমঝোতার মধ্য দিয়ে অবশেষে দিলীপ কুমার ও মধুবালা শেষবারের মতো অন স্ক্রিনে আসতে রাজি হন।

অবশেষে শুরু হলো বহুল প্রতীক্ষিত কে.আসিফের ড্রীম প্রজেক্ট মুঘল ই আযমের শ্যুটিং। তৎকালীন ভারতের সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্মাণ ছিল এই চলচ্চিত্র। সে সময় কোন উন্নত প্রযুক্তি ও ভিজুয়ালিটি না থাকায় সিনেমার সম্পূর্ণ শ্যুটিং হয়েছিল উত্তপ্ত মরুভূমিতে। দিলীপ কুমার সিনেমার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন সে সময় উত্তপ্ত গরমে লোহার বর্ম পড়ে শুটিং করা তাঁর জন্য অস্বস্তিকর ছিল। তাছাড়া অভিনেত্রী মধুবালা হার্টে ছিদ্র থাকায় শ্যুটিং সেটে প্রখর গরমে প্রায়‌ই অসুস্থ হয়ে পড়তেন। বর্ষীয়ান গুণী অভিনেতা পৃথ্বিরাজ কাপুরের জন্য শ্যুটিং সেটের মুহুর্তেগুলো ছিল আরো কষ্টদায়ক। মরুভূমির উত্তপ্ত বালির শ্যুটের সময় হাটতে হাটতে তাঁর পায়ে ফোস্কা পড়ে গিয়েছিল। এছাড়া তাঁর কন্ঠে জড়তার সমস্যা থাকায় ডায়লগ ডেলিভারীতে কিছুটা বেগ পেতে হয়েছিল। তিনি মাঝেমধ্যে তাঁর সংলাপগুলো ভুলে যেতেন এমন‌ও হয়েছে একটি দৃশ্যের শ্যুটে তাঁকে উনিশবার রিটেক নিতে হয়েছিল। তিনি আকবর চরিত্রে পুরোপুরি ডুবে গিয়েছিলেন।
মুঘল ই আযমের আরেকটি চমৎকার বিষয় ছিল এর সঙ্গীত। সিনেমার সংগীত পরিচালনায় ছিলেন ন‌ওশাদ। বলা হতে থাকে সিনেমার প্রতিটা গান নির্মাণে যে অর্থ ব্যয় হতো তা দিয়ে একটা সিনেমা বানানো সম্ভব ছিল।
 


হাজারো প্রতিকূলতার অবসান ঘটিয়ে ১৯৬০ সালের ৫ আগস্ট মুক্তি পায় দশকের সবচেয়ে বড় জুবলী মুঘল ই আযম। ১২ মিলিয়ন রূপি ব্যয়ে নির্মিত এই চলচ্চিত্র ৫৫ মিলিয়ন রূপি আয় করে তৎসময়ের সকল অতীত রেকর্ড ভেঙে ফেলে অল টাইম ব্লকবাস্টার হিট হয়। পরবর্তী পনের বছর মুঘল ই আযম ছিল সবচেয়ে বেশি আয় করা চলচ্চিত্র। এটিকে শ্রেষ্ঠ ২৫ ভারতীয় ধ্রুপদী চলচ্চিত্রের অন্যতম। ২০০৪ সালে প্রথম ভারতীয় চলচ্চিত্র হিসেবে মুঘল ই আযমের রঙিন সংস্করণ করে পুনরায় মুক্তি দেয়া হয় এবং ব্যবসাসফল হয়। 

মাশফিকুর রহমান হিমেল 
এইচএসসি পরীক্ষার্থী, বিএএফ শাহীন কলেজ, কুর্মিটোলা।