ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

প্রশ্নোত্তর - লিখেছেন - কুশিও নবাব প্রিন্স


এক.

সেদিন সকালে। স্কুলে যাবার জন্য নাস্তার টেবিলে বসে পড়লো সীমান্ত। সে জানে প্রতিদিনের মতোই আজও খাবার টেবিলে বসা মাত্রই সব দুঃখের সংবাদ তার মায়ের মুখ থেকে শুনতে হবে। তাই আজ পরয়া না করে খাবার টেবিলে বসে পড়লো অবশেষে। রুটি টোস্ট, মাখন, জেলি, ডিম পোচ, দুধ, এবং কলা সাজিয়ে রাখা আছে ডাইনিং টেবিলে। তার পাশে মগে রয়েছে কফি। সীমান্ত কফি খায় না, খায় তার বাবা । সীমান্তের এক চাচা তার বাবাকে এই বদ অভ্যাসটা ছাড়তে বলেছিলেন। কারন সকালে উঠেই চা কিংবা কফি পান করা উচিত না। তিনি আরও দু-তিন লাইনের জ্ঞান বাবাকে দিয়েছেন। কিন্তু বাবাও কম না, তিনি কথা তো মানলেন না বরং আরও বেশি করে খাওয়া শুরু করলেন। সকাল এবং রাত। চা কফির বিষয়টা এখানেই সমাপ্তি ঘটলো। গল্পের মাঝে চা কিংবা কফি নিয়ে আর কোন আলোচনা নেই।


সীমান্তের মা আফরিন চৌধুরি৷ তিনি আসল মা নন।তিনি পরিচয়ে সৎ মা হলেও তিনি সীমান্তকে খুব আগলে রাখেন। ঠিক নিজের ছেলের মতো।
সীমান্তের এই বিষয় নিয়ে কোন ধরনের মাথা ব্যাথা নেই।
খাবার টেবিলের পাশের সোফায় বসে পেপারের মধ্যে মুখ লুকিয়ে রেখেছেন তার বাবা। তার বাবার সম্পর্কে কিছু বলা যাক। তার বাবার নাম মোহাম্মদ রফিকুল আলম। বিশেষ পরিচয় হলো, তিনি একজন ব্যাবসায়ী। টুকটাক অফিসে যান আর বিভিন্ন পেপারে সাইন করেন। শুধু তাতেই কাজ শেষ হয়ে যায় না, তিনি ঘরে বসে সারাদিন বকবক করেন। এতে তার মায়ের বিরক্তিকর দৃষ্টি রয়েছে।

এতক্ষনে কফি এবং মগ দুটোই ঠান্ডা হয়ে ঝিম ধরে বসে থাকার কথা।
-আচ্ছা আমার কফিটা দিয়েছিলে? বাবা মুখ খুললেন।
-দেখো যে, কন্ডিশনারের বাতাসে ঠান্ডা হয়ে বরফ হয়ে গিয়েছে কিনা। আফরিন চৌধুরীর প্রথম উক্তি।
-হুম। সীমান্ত তোমার হাবিলদার চাচা কোথায়?
- তা জানি না বাবা। সময় হলে তিনি দরজায় ঠকঠক করবেন। সীমান্তের সূক্ষ ধারনা৷
সীমান্তকে স্কুলে নিয়ে যান হাবিলদার চাচা। পরিচয়ে বাসার পুরোন আমলের দারোয়ান। খাকি ড্রেস বাদ দিয়ে নীল রঙের নেভি ব্লু পড়তে হয়৷ দিন বদলে গিয়েছে সেটা বলতেই হয়৷
সীমান্তের মাথায় একটা লথা ঘুরপাক খায়। হাবিলদার চাচার কি কোন নাম নেই? সবাই হাবিলদার ডাকেও বা কেন?
হঠাৎ দরজায় কলিং বেল বেজে উঠলো। নিশ্চয়ই হাবিলদার চাচা এসে পড়েছেন৷
-চাচা চলুন কিছুটা দেরি হয়ে গিয়েছে।
-হ ভাতিজা পা চালাও।
ধানমন্ডির এই বিশাল বাসার একটি ফ্লাটে সীমান্ত তার পরিবার নিয়ে থাকে। তাদের কোন গাড়ি নেই! কিন্তু কেন নেই সেটা বাবাকে জিজ্ঞেস করা যদিও দোষের কিছু না। সে ছোট মানুষ সেজে বসে আছে সেটাই বরং বুদ্ধিমানের কাজ।

হাবিলদার চাচা মানুষ ভালো। কিন্তু কথা বলেন বেশি। যেটা ভালোই লাগে না সীমান্তের। আর কথায় কথায় ত্রিশটা দাঁত বের করে শুধু হাসেন। তার আর দুটি দাঁত কোথায়! পান আর সিগারেট খাওয়া হাবিলদার চাচার নিয়মিত কুখাদ্য। এর জন্যই ডাক্তার দেখাতেও হয়েছে মারাত্মক আকার ধারন করার ফলে। কিভাবে যেন তার দুটো দাঁত ভেঙ্গে গেছে। সেটা নাকি ছোটকালের ঘটনা।
রিক্সার হুড নামিয়ে বসে আছে হাবিলদার চাচা এবং সীমান্ত। তারা স্কুলে যাচ্ছে। সীমান্তের ডিজিটাল ঘড়িতে তখন সকাল ৭.৩৬। ক্লাস শুরু ৮ টায়
-ভাতিজা তোমার আইজকা ইস্কুল ছুটি হইবো কহন?
-কেন আপনি জানেন না?
-জানি। কিন্তু মানে.. ভুইলা যাই। হাবিলদার চাচা আমতা আমতা করতে লাগলেন।
-আপনি কেন ভুলে যান?
- বয়স হইছে না। কিছুই মনে রাখবার পারি না।
-আপনি সিগারেট খাওয়ার কথা ভুলেন না কেন তাহলে?
হাবিলদার চাচা কি উত্তর দিবেন ভেবে পাচ্ছেন না।
-কি জানি গো ভাতিজা।

হাবিলদার চাচা ত্রিশটা দাঁত বের করে সীমান্তের দিকে তাকিয়ে আছেন।
সবাই বলে সীমান্ত নাকি তার মায়ের মতো দেখতে হয়েছে। ফর্সা, দুধের মতো সাধা। তার মা খুব কৌতুহলি ছিলেন। কঠিন ক্যান্সারে আক্রান্ত হবার কারনে ডাক্তার আর বাচাতে পারে নি। তারপর আরেকটি বিয়ে করেন তার বাবা।
সীমান্ত ইংরেজি মিডিয়ামের ছাত্র। ফাইভ গ্রেড। উদ্ভট ধরনের ইংরেজি পড়াশোনা একটুও ভালো লাগে না সীমান্তের। তার ভালো লাগে খেলাধুলা কররে আর কম্পিউটারে গেমস খেলতে।

দুই.
শারমিন ম্যাডাম। সীমান্তদের ক্লাস টিচার। ইংরেজি তে বি.বি এ. পড়েছেন ঢাকা ভার্সিটি থেকে। এরকম ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে এরকম চাকরি পাওয়ার চেয়ে, সরকারি স্কুলের চাকরিটাও খারাপ হতো না। ইংরেজি স্যার অথবা ম্যাডাম তারা খুব শান্ত মেজাজের মানুষ হয়৷ সীমান্ত এটি লক্ষ করেছে। আর রেগে গেলে ইংরেজিতেই কয়েক লাইন বকা ছেড়ে দেন ছাত্র-ছাত্রী দের মাঝে। কিন্তু আজ পর্যন্ত সীমান্ত একবারও বকা খায় নি। সে মোটেই বকা খাওয়ার পাত্র না অবশ্য। কিন্তু ক্লাসে কেউ পড়া পারলে যে, কাউকেই বকা খেতে হয় না সেটা সবাই ভালো করেই জানে।

ছেলেদের ফার্স্ট ব্যাঞ্চ সীমান্ত আর নাবিলের দখলে। নাবিল তার বেস্ট ফ্রেন্ড। গণিতে খুব কাচা৷ কিন্তু সীমান্ত ইংরেজিতে খুব ভালো। এটাই বন্ধুদের মধ্যে পরিচিত ধারনা বিশেষ। এই গণিত এবং ইংরেজি নিয়ে এত ভয় পাওয়ার কিছু নেই৷ দুজনই ছাত্র ভালো।
শারমিন ম্যাডাম রোল ডাকার পর ইংরেজি রচনা নিয়ে আলোচনা করতে আরম্ভ করলেন। একটা সময় এসে সীমান্তের মনে একটা খটকা লাগলো আজ ম্যাডাম ইংরেজি পড়া বাদ দিয়ে বিজ্ঞান পড়াচ্ছেন কেন? নাকি ইংরেজির মধ্যে বিজ্ঞান? বিষয়টা আসলেই খুব যটিল হতে শুরু করল। আলোচনা যটিল করে তুলেছে ক্লাসের চুপচাপ মেয়ে নাফিসা। যে কিনা বড় হয়ে হতে চায় বিজ্ঞানি। তাই ম্যাডামও তার কথার সাথে একটু তাল মেলাচ্ছেন। সব ছাত্র-ছাত্রী এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ঠিকই । কেউ বুঝছে আবার কেউ না বুঝে মাথা নাড়ায় আবার কেউ ফিক ফিক করে হাসে।
ম্যাডাম হঠাৎ মহাকাশ নিয়ে কথা বলতে শুরু করে দিয়েছেন।

-আজকের বিজ্ঞান ক্লাসে নাক ডেকে ঘুমানো ছাড়া গতি নেই। সীমান্তের কানে ফিসফিস ক্ক্রে বলল নাবিল।
সীমান্ত "হুম "বলে মাথা নাড়ালো।ম্যাডাম গ্রহ নক্ষত্র এবং সুর্যের আলোচনার মাঝে চলে গেলেন রোবট কিংবা এলিয়েন দের মধ্যে। ক্লাসে পুরোটা জুড়ে আলোচনা হচ্ছে ইংরেজিতে। যে কারোর মনে হবে এশিয়ার কোন এক দেশের স্কুলে ক্লাস চলছে। কিন্তু ইংরেজি ক্লাস নাকি বিজ্ঞান সেটাই মুলত বিভ্রান্ত সৃষ্টি করা আরকি।

সীমান্ত হঠাৎ ক্লাসের সবার হাসির শব্দ শুনে যেন জ্ঞান ফিরে পেল। নাবিলের দিকে তাকাতেই দেখল সেও হাসছে খিলখিল করে।
-কি হয়েছে?
-জানিস না?
- না।
- তুই তো ক্লাসেই ছিলি। তাহলে শুনিস নি ম্যাডাম এর কথা?
- না। আমি কিছু ভাবছিলাম।
-তাহলে এবারে মনযোগ দে। বুঝতে পারবি ম্যাডাম কি বলেছিলেন।

ম্যাডাম যা বলেছিলেন তা আসলেই খুব মজার। এলিয়েনদের নাকি অনেক গুলো চোখ থাকে। তারা দেখতে কুৎসিত বর্ণের। হাত পা সব আছে৷ আরও বলেছেন চোখ গুলো " ইয়া বড় বড়! " ম্যাডাম এটা অভিনয় করে দেখিয়েছিলেন। সেটা সীমান্ত দেখতে পেলে হয়তো মজাই পেত।
সীমান্ত কিছু প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবার জন্য হাত উচু করল। ম্যাডাম তাকে বলতেও বললেন।
প্রথমে সীমান্ত একটু কেশে গলা পরিষ্কার করে নিলো।
-আচ্ছা ম্যাডাম তারা কি খায়? সীমান্ত একটু মুখ বাকালো।
-না বাবা। এলিয়েনরা খাদ্য খায় না। তারা এমনিতেই জীবিত থাকতে পারে।
-আচ্ছা ম্যাডাম, তারা কি খুব মিশুক? ফ্রেন্ডলি?
ম্যাডাম হাসবেন কিনা বুঝতে পারছেন না। তার ছাত্র যে এরকম সেটা আজ নতুন কিছু না।
-সীমান্ত বাবা! তুমি চুপ করে আমার কথা শুনো কেমন?
-আমাকে বাবা কেন বলছেন? আমি কি বাবা হয়েছি? সীমান্ত নরম গলায় বলল।
এবারে ক্লাসে হাসির শব্দ তীব্র হয়ে উঠেছে। ম্যাডামও হাসি থামাতে পারছেন না। এভাবেই প্রথম ক্লাসের সমাপ্তি ঘটল।

টিফিনের ছুটিতে কেউ খেলাধুলা করছে, কেউবা ছোটাছুটি। সীমান্ত দাড়িয়ে তাদের খেলা দেখছে। হঠাৎ তার মনে হলো পিছন থেকে কেউ তার নাম ধরে ডাকছে অনেক্ষন ধরে। সীমান্ত পিছনে ঘুরে তাকালো। একটি মেয়ে। সীমান্ত দেখা মাত্রই চিনেও ফেলেছে ইতিমধ্যে। মেয়েটির নাম সামিহা। মেয়েদের মধ্যে টপার স্টুডেন্ট। গত বছর স্কুলে অনুষ্ঠিত ছোট এক গণিত অলিম্পিয়াড হয়েছিল। যেখানে সামিহা পুরষ্কার পেয়েছিল। সামিহা তার দিকে সুন্দর একটা মুচকি হাসি দিয়ে এগিয়ে আসে।

মেয়েটি দেখতে ভারি সুন্দর৷ গোল চশমা পড়া। মাথার দুই পাশে দুটি ঝুটি, ফিতে দিয়ে বাধা।
সামিহা কাছে এসেই একটু উচু গলায় বলল "এতক্ষন ধরে ডাকছি শুনছো না? "
সীমান্ত মাথা নেড়ে জবাব দিলো সে শুনে নি।
সামিহা বলল " তোমাকে তারা খেলায় নেয় নি? "
সীমান্ত আবারও মাথা নেড়ে জবাব দিলো তাকে খেলায় নেয় নি।
সামিহা এবারে উচু গলায় বলল " হ্যা বা না কিছু একটা বলো– "
সীমান্ত গম্ভীর হয়ে বলল " না নেয় নি"
"টিফিন খেয়েছ"
" হু " সীমান্ত উত্তর দিলো।

সীমান্ত বুঝতে পারছে আর বেশিক্ষন এখানে দাড়িয়ে থাকলে সামিহা আরও কথা বলতে আরম্ভ করবে। তাই পিছনে ঘুরে ক্লাস রুমে বেঞ্চে এসে বসলো।
সীমান্ত পিছনে ঘুরে ক্লাস রুমে এসে পড়ার সাথে সাথে রুমে চলে এসেছে সামিহা। সীমান্ত ভুরু কুচকে তার দিকে তাকায়৷ কিছুটা গাম্ভীর্যের চোখে।
সামিহা তার বেঞ্চে এসে বসলো। ক্লাসে কেউ নেই। সবাই এখনো বাহিরের প্লে গ্রাউন্ডে।
সামিহা সীমান্তের দিকে তাকিয়ে বলল " সীমান্ত আমি সরি। আমি চাই নি তোমাকে বিরক্ত করতে– আমি এমনি তোমার সাথে কথা বলতে চেয়েছিলাম–"

হঠাৎ টিফিনের শেষ ঘন্টা বেজে উঠলো। একজন একজন করে সবাই ক্লাসে আসতে শুরু করেছে।
সামিহা শুধু ক্লাসের টপার তাতেই তার নিজস্ব পরিচয় শেষ হয়ে যায় না। সে এক বড় ব্যাবসায়ীর একমাত্র মেয়ে। তার বাবার অনেক টাকা। এত টাকা যে শুধু সীমান্ত না, কেউই গুনে শেষ করতে পারবে কিনা সন্দেহ। সামিহা মেয়েটা খুব ভালো মনের মানুষ হলেও তার অনেক কিছুই বিরক্তিকর লাগার মতো। অযথা কথা বলা অথবা দ্রুততার সাথে বিভিন্ন প্রশ্ন করা সীমান্তের খুব রাগ হয়। গত বছরের শেষ ক্লাস পার্টিতে সামিহা সীমান্তের মুখে কেক লাগিয়ে দিয়েছিলো। তখনকার সীমান্তের রাগটা ছিলো দেখবার মতো। গুনে গুনে দশবারের বেশি সরি বলতে হয়েছে সামিহা কে। সেই দিনটির কথা সীমান্ত আজও ভুলে নি।
কিন্তু সামিহার একটা দিক আছে। যেটা খুব ভালো লাগার মতো। সেটা হলো সামিহার মুচকি হাসিটা। তার হাসির মধ্যে যেন কিছু একটা লুকিয়ে আছে।
টিফিনের পরের ক্লাস ছিলো ধর্ম। সীমান্ত স্যারের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেও তার মাথার মধ্যে অনেক কিছুই ঘুরপাক খাচ্ছিলো। কখন যে ধর্ম ক্লাস শেষ হয়ে গণিত ক্লাস আরম্ভ হয়েছে টের পায় নি সীমান্ত। গণিত স্যার খুব কঠিন একজন মানুষ। সুষ্ঠু বিচার করেন তারপর শাস্তি দেন৷
স্যারের নাম খালেকুজ্জামান। ছোট নামে খালেক স্যার৷ সব সময় বিভিন্ন রঙের পাঞ্জাবি পড়ে ক্লাস করাতে আসেন৷

স্যার তখন বোর্ডে অংক করছেন সীমান্তের চোখ পড়লো সামিহার উপর। মাথা বাম পাশে ঘুরিয়ে তাকাতেই সামিহাও তার দিকে তাকালো। এবারে সামিহার মুখে উদ্ভট এক ধরনের ফিকফিকে হাসি। সেটা দেখেই সীমান্তের খুব হাসি পেল।
খালেক স্যার ব্যাপারটি লক্ষ করলেন। কিন্তু প্রথমে কিছু বলেন নি। দ্বিতীয় বার যখন সীমান্ত তাকালো স্যার সামিহা কে বকা দিলেন সীমান্ত কে না দিয়ে৷ খুব খারাপ লেগেছিলো সীমান্তের তখন।

অবশেষে স্কুল ছুটি হয়৷ সীমান্ত স্কুলের মেইন গেটের দিকে এগিয়ে আসছে। হাবিলদার চাচা প্রতিদিনের মতো আজও নিতে এসেছেন। গায়ে নেভী ব্লু শার্ট পড়া৷ তাকে দেখলেই বুঝতে পারা যায় তিনি কোন এক বাসার দারোয়ান। সীমান্ত কে দেখার সাথে সাথে আধা খাওয়া সিগারেটটা ফেলে দেন হাবিলদার চাচা। ফেলে দিয়েছেন ঠিকই কিন্তু পা দিয়ে পিষে ফেলতেও হলো তাকে।
কালো চেহারার মানুষদের নাকি দাঁত প্রাকৃতিক ভাবেই সাদা থাকে। সীমান্তকে এই কথা ক্লাসের এক ত্যাদড় প্রকারের এক ছেলে বলেছে। হাবিলদার চাচার ত্রিশটা দাঁত বের করা হাসি দেখলে মনে হয় সোনার খনি। কিন্তু সেটার রং প্রাকৃতিক ভাবেই সাদা।

সীমান্তের কাধ থেকে ব্যাগ নিজের কাধে নিয়ে রিক্সা খুজতে রাস্তায় এগিয়ে গেলেন তিনি। সীমান্তের চোখ পড়লো স্কুলের বাইরের গেটের সামনে আইস্ক্রিম মামার ভ্যানের দিকে।
সামিহা দুটি আইস্ক্রিম কিনেছে। কিন্তু কেনো কিনেছে সেটা একটু পরই বুঝতে পারলো সীমান্ত। সামিহা সীমান্তের সামনে এগিয়ে এসে একটি আইস্ক্রিম দিতে চাইলো। সীমান্ত অবাক চোখে কিছুক্ষন তাকিয়ে ভাবছিলো। নিবে নাকি না নিয়ে ফেরত দিয়ে দিবে!
সামিহা একটি মুচকি হাসি দিয়ে বলল "নাও এটা তোমার জন্য ”
সীমান্ত কিছুটা ভয়ে ভয়ে বলল " আমার জন্য?–”
" হু ”
সীমান্ত আর না করতে পারে নি। নিতেই হলো।
সামিহা হাত নেড়ে বিদায় জানিয়ে একটি সাদা গাড়িতে চেপে বসলো। একদিন একেকটা গাড়িতে চড়ে বসে সামিহা। একদিন কালো অথবা চকলেট। আজ আবার সাদা।
হাবিলদার চাচা হুড তোলা রিক্সায় বসে ডাক দিচ্ছেন। জানতে পারা গেলো রিক্সা ভাড়া ৪০ টাকায় খুব দাম কশা কশি করে ঠিক করা হয়েছে।
আজ অনেক রোদ আকাশে।খুব গরমও পড়েছে বেশ। আইস্ক্রিমে কামড় দেয়া মাত্রই, রিক্সার ব্রেকের ধাক্কায় হাত থেকে আইস্ক্রিম মাটিতে পড়ে যায়৷
সীমান্ত মুখ লাল করে বসে আছে। কেউ কোন কথা বলছে না। হুট করে হাবিলদার চাচা নতুন একটা সিগারেটে আগুন ধরাতে যাচ্ছিলেন কিন্তু সেটা আর ধরাতে দিলো না সীমান্ত।

হাবিলদার চাচা একটু কাশি কেশে বললেন "মাইয়াডা কেডা? ”
সীমান্ত উত্তর দিলো " আমার বন্ধু ”
হাবিলদার চাচা দীর্ঘ নিশ্বাস নিয়ে বললেন " আমি যখন ছোড বেলায় এক স্কুলে পড়তাম। তখন এক মাইয়া আমারে একটা গোলাপ ফুল দিছিলো। তারপর কি জানি কইছিলো কিন্তু আমি বুঝ-পার পারি নাই। এহন বুঝি। ”
সীমান্ত শান্ত গলায় বললেন " কি বলেছিলো চাচা? ”
" কইছিলো আমি তোমারে ভালোবাসি! ” আরও কিছু বলবার আগেই সীমান্ত থামিয়ে দিলেন হাবিলদার চাচাকে।
রিক্সা বাসার সামনে থামিয়ে দিয়ে গেলো।বাসায় ঢুকেই জামা কাপড় ছেড়ে এক ঘুম দিলো সীমান্ত।

তিন.
এতক্ষনে বিকেল পেরিয়ে গিয়েছে। সন্ধ্যা হতে চলল। সীমান্তের ঘুম ভাঙলো সালমা চাচীর ডাকে। ইতি মধ্যে সালমা চাচীকে নিয়ে কিছু বলা হয় নি। কারন তিনি মুল চরিত্র মোটেই না। তবুও তার পরিচয় সে সীমান্তদের বাসায় কাজ করেন। প্রায় কয়েক বছর সময় ধরে।
সীমান্তের বাবা গ্রাম থেকে এনেছিলেন বাসায়। তার স্বামী মারা গিয়েছে। সন্তান নেই কোন। সীমান্ত যেদিন এই কথা গুলো জানতে পারে সেদিন তার খুব খারাপ লাগে।
সালমা চাচী রুমে ঢুকেই বলল "সীমান্ত বাজান উইঠা পড়ো। তুমার টিচার আইসে”
ঘুম ঘুম চোখ নিয়ে সালমা চাচীর দিকে তাকিয়ে বলল" জি আচ্ছা "
সালমা চাচী বললেন "পড়ার পর তোমার আম্মাজান নালিশ বসবেন কইছে ”
সীমান্ত একটু চিন্তিত মুখে বলল " কিসের নালিশ?”
সালমা চাচী এবারে মুখ বেকিয়ে বলল " তা জানি না–”
সীমান্তের অনেক গুলো প্রাইভেট টিউটর। কেউ পড়ায় বিজ্ঞান কিংবা গণিত কেউবা ইংরেজি।
এত পড়ালেখা কারোরই ভালো লাগে না। যদি হয় ইংরেজিতে মিডিয়াম কোন স্কুল। ছাত্র জীবনের কোন অংশে বাংলা সাহিত্য শিখবার প্রকল্প নেই বলা চলে৷
সীমান্ত ঘুম থেকে উঠে রুমের এয়ারকন্ডিশনার বন্ধ করে বাথরুমে চলে যায়।

প্রাইভেট পড়ার পর সীমান্ত ড্রইং রুমে ঢুকতেই তার মাকে দেখল সোফায় বসে আছে।
কাছে গিয়ে বসার পর তার মা আফরিন চৌধুরি রিমট চেপে টিভি বন্ধ করে দেন।
"মা টিভি বন্ধ করলে কেন? "
" আচ্ছা শোন তোর সাথে আমার কিছু কথা আছে"
সীমান্ত এবারে নড়ে চড়ে বসলো।
" তুই নাকি আজকে স্কুলে এক মেয়ে তোকে আইস্ক্রিম খেতে দিয়েছে? "
"হুম৷ তোমাকে নিশ্চয়ই হাবিলদার চাচা বলেছে?
" বলেছে কেউ একজন। ”
" আইস্ক্রিম পুরোটা খেয়েছিলে? ”
সীমান্ত মাথা নেড়ে বলল " না। রিক্সার ধাক্কায় মাটিতে পড়ে গিয়েছে "
" তাহলে ভালোই হয়েছে।”
সীমান্ত ভুরু কুঁচকে বলল " কেনো? "
" তোমার চাচা, ডক্টর তিনি কি বলেছে মনে নেই? "
সীমান্ত কিছুক্ষন ভেবে বলল " হু বলেছে। বলেছে যে ঠান্ডা কিছু না খেতে। রোদে বেশিক্ষন থাকা যাবে না। বৃষ্টিতে ভিজা যাবে না। তারপর..– ”

সীমান্ত ডান হাতের আঙুল গুনে গুনে তার মাকে হিসাব দিচ্ছিলো। হঠাৎ দরজায় কলিং বেল বেজে উঠে। তার বাবা এসেছে। সালমা চাচী রান্নাঘর থেকে দৌড়ে এসে এতক্ষনে দরজা খুলে দিয়েছেন। মা ছেলের সুষ্ঠ বিচার এখানেই শেষ হলো।

সীমান্ত সোফা থেকে উঠে তার রুমের দিকে যাচ্ছিলো। সে দেখলো সালমা চাচী শাড়ীর আচল মুখে নিয়ে হাসছেন। নিঃশব্দ হাসি। সীমান্ত কিছুটা রেগেমেগে বলল " সালমা চাচী আপনাকে আমি অনেকটা শ্রদ্ধা করি। তাই বলছি, এভাবে হাসবেন না। আপনার এ ধরনের হাসি দেখলে বিরক্ত লাগে খুব
সীমান্ত চলে যায়। চলে। চলে যাওয়ার পর সালমা চাচী আবারও একই ভাবে হাসছেন একা-একা। সেটা হয়তো তিনি নিজেই উপভোগ করেছেন।
রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে আছে সীমান্ত। যথারীতির মতো সে একাই ঘুমাচ্ছে। তার মনে আছে যখন তার বয়স ৪ কিংবা ৫ তখন তার মা মারা যায়। তারপর থেকে সে কিছুটা দিন বাবার সাথেই ঘুমাতো। কিন্তু বাবা বিয়ে করেন এবং সীমান্তও বড় হয়েছে বেশ। তাই বাবা বলেছিল এখন থেকে সে একাই ঘুমাবে।

তার বয়স যখন ৪ কিংবা ৫ তখন এক রাতে বাবার সাথে অনেক রাত জেগে গল্প করেছিল তারা। ভুতের গল্প! অথবা রাজা রানীর। কিন্তু এখনকার ছোট বাচ্চারা জানে রাজা রানীর গল্প এখন পুরনো হয়ে গিয়েছে। শুধু ভুতের গল্পটাই পুরনো হয় নি!
যদি কেউ একা ঘুমায় তবে ভুত নাকি ঘরে এসে ঘাড় মটকিয়ে চলে যায়। এছাড়া তাদের শরীর থেকে বিদঘুটে গন্ধ বের হয় যা খুবই ভয়ংকর। তার বাবা আরও বলেছে, মেয়ে ভুতেরা খুব মজার হয়। বাচ্চাদের সাথে দুস্টামি করতে তারা পছন্দ করে খুব। বাবার কথা গুলো মনে হয়া মাত্রই মুখে অজানা হাসি চলে আসে সীমান্তের৷

সীমান্তদের বাসার পিছনে একটি বিড়ালদের বাসা রয়েছে৷ মেয়ে বিড়ালটি খুব সুন্দর৷ তার দুটো বাচ্চা আছে তারাও খুব সুন্দর৷ বাচ্চা গুলো দেখতে ঠিক তার মায়ের মতো সাদা দুধের মতো হয়েছে। তাদের বাবা বিড়ালটা খুব রাগি। প্রত্যেকদিন রাতে মেয়ে বিড়ালটার সাথে ঝগড়া করে। মাঝে মাঝে মেয়ে বিড়ালটি কেদেও দেয় আর বাচ্ছা গুলো খুব ভয় পায় এবং চেচামেচি করে।

একদিন সীমান্ত বিড়ালের বাচ্চা বাসায় এনেছিলো কিন্তু মা বলেছে রেখে দিয়ে আসতে। কারন তার মা বাবা বাচ্চার জন্য দুঃখ পাবে। কথা গুলো খুব খারাপ লাগে সীমান্তের, তাই বাচ্চা গুলো রেখে আসে।


চার.
তারপরের দিন সকালে খুব দ্রুততার সাথে সকালের নাস্তা করছে সীমান্ত। ঘুম থেকে কিছুটা দেরি হবার ফলে স্কুলে যেতে আজ দেরি হতেও পারে। আজকাল সীমান্ত স্কুলে যাবার জন্য দেরি করবার ছেলেই নয়। রাতে ঘুমানোর আগে ভাবনা চিন্তায় মগ্ন থাকায় ঘুম আসতে দেরি হয়। যদিও রীতিমতো প্রত্যেকদিন একাই ঘুমায়। কিন্ত কাল সে মোটেই ভয় পায় নি।
হাবিলদার চাচা আজ একটু আগেই এসেছেন। সোফায় বসে চা নাস্তা খেয়ে নিলেন একটু।
সীমান্তের ঘড়িতে তখন বাজে ৮.১০। হাবিলদার চাচা রিক্সা খুজছেন ঠিকই কিন্ত রিক্সাই খুজে পাওয়া মুশকিল হয়ে পড়ছে। এদিকে ক্লাস শুরু হতে বিশ মিনিটের মতো বাকি৷ ম্যাডাম কিছু বলবেন না তাতে কেননা ম্যাডমের প্রিয় ছাত্র সীমান্ত!

হাবিলদার চাচা রিক্সা পেলেন অবশেষে। সীমান্তকে টেনে তুলে নিলেন রিক্সায়৷
হাবিলদার চাচা হাসি হাসি মুখে বললেন " ভাতিজা কালকে রাতে ঘুম হয় নাই বুজি "
" হুম। কথা সত্য ”
“আমগো বাসার পিছনে বিড়ালের বাচ্চা হইছে জানো নি? ”
সীমান্ত মাথা নেড়ে বলল " হ্যা জানি ”।
" কত্ত সুন্দর! ঠিক পরীর লাহান সুন্দর ”।
সীমান্ত এবারে একটু ধমকের কন্ঠে বলল " হাবিলদার চাচা। বিড়ালরা পরী হয় না৷ পরী হয় মানুষ জীন মেয়েরা। ”
হাবিলদার চাচা স্বীকারের কন্ঠে মাথা নেড়ে বললেন "হুম"।

রিক্সা প্রায় স্কুলের কাছাকাছি৷ রিক্সাটি বামে মোড় নিয়ে সোজা পথ ধরে গেলেই স্কুল।
সীমান্ত হাবিলদার চাচাকে বলল " আচ্ছা চাচা আমি কি একা একা স্কুলে যেতে পারি না? ”
হাবিলদার চাচা একটু নিশ্বাস ছেড়ে বললেন " না রর ভাতিজা। তোমার আম্মা আব্বার হুকুম। তোমারে চোখে চোখে
রাখতে হইবো। তুমি হইলা একমাত্র পোলা–..”
সীমান্ত কিছুটা রেগে গিয়ে বলে " একমাত্র ছেলে! তাতে কি হয়েছে?
হাবিলদার চাচা কিছুটা নরম গলায় বললেন " বুঝবা। বুঝবা বড় হলে বুঝবা ভাতিজা– ”৷

রিক্সাওয়ালা স্কুলের সামনে নামিয়ে দিয়ে গেলো। ক্লাস এতক্ষনে শুরু হয়ে গিয়েছে তাই আশে পাশেত পরিবেশ কিছুটা খালি
ক্লাসের সব কিছুই ঠিক মতো হলো৷ শুধু একটাই সমস্যা হয়েছে। সেটা হলো ক্লাসের এক মেয়ের ব্যাগ থেকে হুট করে চকলেট চুরি হয়৷ কিন্ত কে নিয়েছে তা নিয়ে বিচার করতে চাইনি মেয়েটি৷ এরকম মাঝে মধ্যে হতেই পারে৷

সীমান্ত এবং কিছু বন্ধুরা মিলে খেলছিলো ছোট মাঠটিতে৷ হঠাৎ সীমান্ত অনুভব করে কেউ তার ঘাড়ে স্পর্শ করেছে৷ খুব ভয়ে ঘাড় ফিরিয়ে তাকিয়ে দেখে সেই সামিহা মেয়েটি৷

সামিহা কিছুটা হাসি মুখে বলল " ভয় পেয়েচ? "
সীমান্ত উত্তর দিলো না। চুপকরে দাঁড়িয়ে থেকে সামনে এগিয়ে খেলায় মন দিলো।
পিছন থেকে সামিহা ডাক দিয়েছে৷ হাত নেড়ে কাছে আস মতে বলায় কাছে গিয়ে এগিয়ে গেলো সীমান্ত।
সামিহা কিছুটা আর্তনাদ কন্ঠে বলল " আচ্ছা তুমি আমার সাথে কথা বলতে চাও না কেন–? "
সীমান্ত কিছুক্ষন ভেবে জবাব দিলো " কথা বলতে ভালো লাগে না। "
সামিহা ভুরু কুঁচকে বলল " কেন জানতে পারি? "
" জানি না। " গম্ভির গলায় বলল সীমান্ত।

সামিহা জানে সীমান্ত ছেলেটা এরকমই৷ কিন্ত খুব ভালো একটা ছেলে। সে কিছুই বলতে চায় না ঠিক মতো। এটাকে লুকিয়ে রাখা বলা হয় কিনা সেটা বুঝতে পারছে না সামিহা৷ কিন্তু সে উত্তর দিতে না চাওয়াটা কিছুটা বিরক্তিকর লাগে সামিহার৷
ঘন্টা বেজে উঠল। টিফিনের সময় শেষ। একটু পর ড্রইং ক্লাস৷ বারান্দা দিয়ে ম্যাডাম হেটে হেটে ক্লাসে আসলেন।
সীমান্ত খুব ভালো ছবি আকতে পারে৷ প্রতিবছর ড্রইং প্রতিযোগিতায় প্রথম হবেই৷ কেউ তাকে হারাতে পারে না৷
ক্লাসে বসে সীমান্ত এক ধরনের রোবট আকছে৷ মাথা বড়,দেহ বড়৷ ছবি আকা যখন শেষ পর্যায় তখন সামিহা তার টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ায়৷

" এটা কি এঁকেছ?"
সীমান্ত মাথা উচু করে তার দিকে তাকায়৷
" রোবট। "
সামিহা একটু অবাক হয়ে বলে " এটা কি ধরনের রোবট? "
সামিহার কথায় যুক্তি ছিলো বেশ৷ তাই সীমান্ত একটু ভেবে উত্তর দেয়৷
" এটাকে তুমি তোমার নিজের মতো কন্ট্রোল করতে পারবে। কিন্ত মানুষের মতো বুদ্ধি নেই৷ "
সামিহা একটা মুচকি হাসি দিয়ে চলে যায়।

ছুটির শেষ মুহুর্তে সীমান্ত কিছু একটা খুজে পাচ্ছে না৷ সেটা হলো ড্রইং খাতা৷ হতে পারে তার বন্ধু নাবিল ভুল করে নিয়ে চলে গিয়েছে৷
ক্লাস খালি হতে শুরু করেছে৷ সীমান্ত কিছুটা মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে আছে। সামিহা ধীরে ধীরে ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছে। সামিহা যাওয়ার সময় তার চোখ দুটো সামিহার দিকে তাকানোই ছিলো।



পাঁচ.
সামিহা স্কুলে অনুপস্থিত চারদিন ধরে। আজ সে উপস্থিত। এতদিন কেউই তার খোজ খবর বলতেও পারছে না৷ এর মধ্যে কার মুখ থেকে শোনা গেলো তার নাকি জ্বর হয়েছে। এটা সীমান্ত জানার পর কিছুটা বিস্মিত হয়েছিল।

চারদিনের অসুস্থতায় সামিহা কে অন্যরকম দেখাচ্ছিল। স্কুলে তার মা নিয়ে এসেছেন। ম্যাডাম কে জানালেন সে এতদিন খুব জ্বরে ভুগেছে। আপাতত সুস্থ তাই আসতে পেরেছে স্কুলে।
ক্লাসে সামিহা মুখ গম্ভীর করে বসে ছিল।শারমিন ম্যাডাম ক্লাসে প্রবেশের আগে সীমান্ত তার টেবিলে সেই হারিয়ে যাওয়া খাতাটি দেখতে পায়৷ অবাক হয়েছে বেশ। এত দিন খাতাটি কথা থেকেই বা আসলো? তার কোন বন্ধু নিলে হয়তো তারপরের দিন দিয়েই দিতো।
টিফিনের সেই সময়টি। সামিহা সীমান্ত কে জানিয়ে দেয় সে খাতাটি ইচ্ছা করে নিয়েছিল। কিন্ত সে এতদিন অসুস্থ থাকার কারনে খাতাটি তার কাছেই পরে থাকে। এই কারন বসত সামিহা ক্ষমাও চেয়েছে।

টিফিনের পরের ক্লাসে একটা নোটিস আসে। নোটিসটা আসলে বার্ষিক পরীক্ষার দিনতারিখ ঠিক করা হয়েছে৷ স্যার ঘোষণা করে জানিয়ে দেয় কয়েকদিন পর তাদের পরিক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। তাই স্কুল বন্ধ থাকবে সপ্তাহখানেকের মতো।

সমান্ত ধারনা করেছে তিনি একজন কবিই হবেন হয়তো। কথাবার্তায় সাহিত্যিক কিংবা সরল ভাব প্রকাশ পায়। বিশেষ পরিচয়ে তিনি বেকার এবং অবিবাহিত একজন পুরুষ। সীমান্তকে বিজ্ঞান পড়ান প্রায় চার-পাঁচ মাস হবে। খুব ভালোই পড়ান তিনি। সীমান্তের মন্তব্য অনুযায়ী তার শিক্ষকের পড়া নাকি, শরবত বানিয়ে খেয়ে ফেলবার মতো। তাই তার মা তার বিজ্ঞান শিক্ষকের প্রতি খুব বিশ্বাসী।স্যার প্রত্যেকদিনেই একই ধরনের কার্যক্রম করেন। সেটা হলো দেরি করে আসা। সীমান্ত ভাবছে আজ স্যারকে ধমকেই দেবে একটু৷

অবশেষ স্যার আসলেন৷ চেয়ারে কিছুক্ষন জিরিয়ে নিলেন। সীমান্ত এবারে সুযোগ বুঝে কথা বলা শুরু করে দিলো।
" আচ্ছা স্যার আপনি প্রত্যেকদিন দেরি করেন কেন? "
একটু চিন্তা পড়ে গেলেন বিজ্ঞান স্যার। তবুও বললেন " আমার বাসা একটু দূরে। কিন্ত আমি হেটেই তোমার বাসায় আসি তাই একটু দেরি হয় অবশ্য। "
সীমান্ত স্যারের কথা কথা শুনে মাথা নাড়িয়ে জানালো কথাটি বুঝেছে।
সীমান্ত কিছুক্ষন চুপ থেকে আবার বলল " আচ্ছা স্যার আপনাকে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করি?"
" হুম করো "
"আচ্ছা আপনি কি কবি? "
" হুম "
" তাহলে আমাকে বিজ্ঞান পড়াচ্ছেন কেন? বাংলা পড়াতেন? "
সীমান্তের বিজ্ঞান স্যার হাহা করে হাসল। বলল " আমি সাইন্সের ছাত্র। কিন্ত কবি। সুতরাং আমি বাংলাও পারি এমনকি তোমার এই বিজ্ঞানও! "

সীমান্ত আবারো মাথা নাড়ল। সে নিশ্চয়ই বুঝেছে আসল বিষয়টা।পড়াশেষে স্যার সীমান্তের মা কে একটু ডেকে দিতে বললেন সালমা চাচী কে৷ সালমা চাচী সীমান্তের মা কে ডেকে পাঠালেন ড্রইং রুমে। যে রুমে ড্রইং করা হয় না, সে রুমের নান ড্রইং রুম কেন সেটা অবশ্য জানা নেই সীমান্তের। সীমান্তের মা এসে পাশের সোফায় বসে পড়লেন৷ তারা কিছুক্ষন আলাপ আলোচনা করলেন। কিন্ত পরে সীমান্ত জানতে পারল, তার বিজ্ঞান স্যার আর পড়াবেন না৷ উনার চাকরি হয়েছে এক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। তাই তিনি প্রাইভেট পড়া বাদ দিতে চান।

কয়েকদিন পর সীমান্তের পরিক্ষা। পড়ালেখার চাপ কোন এক বছরের শেষের দিকে হলে সেই বছরের পরিক্ষা খারাপই যায়! পরিক্ষার আগে সপ্তাহখানেক বন্ধ। তাই সীমান্ত রাতে ঘুমানোর আগে পরবর্তী সপ্তাহের একটা কাজের রুটিন সাজিয়ে টেবিলের সামনে সাজিয়ে দিল। কাগজ মটির ঠিক উপরে তারিখ বার এবং একটা টাইটেল রয়েছে। নামটা এরকম ' My daily routine for next week. '

ছয়
টেবিলের এলার্ম ঘড়ির শব্দে ঘুম ভেঙেছে সীমান্তের৷ ঘুমটা ফিরিয়ে আনবার জন্য বিছানায় কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করল। কোন লাভ হলো না। এমনিতেই রাতে বিড়ালগুলোর চেচামেচি আর মেয়ে বিড়ালটার কান্নার শব্দ শুনে জানালা দিয়ে তাকিয়ে ছিলো এক নজরে৷ এতে কখন যে বেশি রাত জেগে ফেলেছে তার ঠিক হিসাব রাখতে পারে নি সীমান্ত৷ সীমান্ত পুরোপুরি জেগে উঠলো।

ঘুম থেকে উঠেই ঝাপসা চোখে সালমা চাচীকে টাড় বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো সীমান্ত৷ সাধারণত তার রুমে কেউ নিজের ইচ্ছায় আসতে চায় না৷ কেউ আসলেও নক করে ঢুকে হয়। এই নিয়মটা নিজেই ভেবে চিন্তে সবাইকে জানিয়ে দিয়েছিল।
সীমান্ত কিছুটা বিরক্তি হয়ে বলল " আপনি এখানে কি করতে এসেছেন? "
সালমা চাচী দাঁত বের করে এক হাসি দিয়ে বলল " মুখ হাত ধুইয়া খাবার টেবিলে আইসা পড়েন। খালাম্মা অপেক্ষা করতাছে।"

সীমান্ত বলল " ঠিক আছে "।
" আজকে একটা সু খবর আছে৷ আচ্ছা তুমি খাইতে আসো জানতেই পারবা "।
সীমান্ত ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষন।
ঘুম থেকে উঠে এসব কি ঘটছে কিছুই বুঝতে পারছে না সীমান্ত। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই চোখ পুড়ে যাবার মতো অবস্থা। বাইরে অক্টোবর মাস ভ্যাপসা গরম। কিন্তু বেডরুমে একেবারর পৌষ মাসের শীত কাল!
বিছান থেকে উঠে রিমোট দিয়ে এয়ারকুলারের শো শো বাতাস বের করাকে বন্ধ করর দিলো।
ডাইনিং টেবিলে আজ বাবা মা দুজনেই বসে আছেন। আজ বাবার হাতে প্যাপার নেই দেখে কিছুটা বিস্মিত হলো সীমান্ত। সীমান্তের উপস্তিতি টের পেয়ে বাবা নরম গলায় বললেন " ঘুম ভেঙেছে? "
সীমান্ত ঠোটের কোণায় লুকনো হাসি দিয়ে মাথা নেড়ে বলল " হ্যা বাবা"।

সীমান্তের মা পাউরুটিতে জেলী মাখাতে মাখাতে বললেন " সীমান্ত আজ তোমার স্কুলে শেষ ক্লাস। আগামী দু সপ্তাহ বন্ধ পরিক্ষার জন্য৷ তাই তোমার জন্য একটা শিক্ষক ঠিক করেছি। দিনে দুবার করে পড়াতে আসবেন৷ "
সীমান্ত মুখ হা করে কথা গুলো কান দিয়ে মাথায় প্রবেশ করালো। এবারে সীমান্ত একটু নেড়ে চেড়ে বসলো। কিছুটা উচ্চ স্বরে বলল " মানে কি?" এমনিতেই দুজন টিউটর আছে, তবুও আরেকজন! "
সীমান্তের বাবা চশমাটি নাকের উপরে ঠেলে নিয়ে বললেন " শোনো সীমান্ত আমি একটু কাজের জন্য দেশের বাহিরে যাচ্ছি। তোমার সামনে পরিক্ষা না থাকলে তোমাকেও নতুন জায়গায়টি তে ঘুড়িয়ে নিয়ে আসতাম৷ কিন্ত তোমার যে পড়ালেখার অবনতি হবে। "
সীমান্ত তার বাবার কথা বুঝতে পেরেছে। কিন্ত রাগ উঠছে সালমা চাচীর উপর। ঘুম থেকে উঠে এইটা ভালো খবর বলে দাবি করেছেন!
খাবার খাওয়া প্রায় শেষের পর্যায়ে সীমান্ত তার মা কে বলল " আর কোন খারাপ খবর আছে মা? "
সীমান্তের মা কোন উত্তর না দিয়ে তার দিকে চোখ টানিয়ে তাকিয়ে থাকলেন শুধু।

সীমান্ত শেষ খাবার মুখে নিয়ে ভাবতে লাগলো খাওয়া শেষে তার বন্ধু নাবিলকে ফোন দিয়ে বাসায় ডেকে আনলে কেমন হয়। দুজনে গেমস খেলা যাবে। দ্রুততার সাথে খাবার খাওয়া শেষ করে সীমান্ত তার রুমে চলে যায়। টেলিফোনটি হাতে নিয়ে নম্বর টিপে ফোন দিলো নাবিলকে।
" হ্যালো নাবিল”
" হ্যা সীমান্ত বল।”
" বলছি আজ আমার বাসাতে আসবি জমিয়ে গেম খেলব।"
নাবিল শুকনো গলায় বলল " না রে মা আসতে দেবে না। কয়েকদিন বাদেই ফাইনাল পরিক্ষা। আর তুই তো আমার মাকে চিনিস”।
সীমান্ত কিছুটা মন খারাপ করে ফোন রেখে দিল।

বিছানার কোণা থেকে উঠে কম্পিউটারে বসা মাত্রই রুমে তার মা এসে হাজির। মা শান্ত গলায় বললেন " আমি একটু শপিংমলে যাচ্ছি। যাবি তুই? আর এই সকাল বেলায় কম্পিউটার নিয়ে না বসে একটু পড়তে বস– ”।
সীমান্ত বলল " না আমি যাবো না। গেলে তুমিই যাও। ”

সীমান্তের মা আর জোর করলেন না। তার মা এক কথার মানুষ অবশ্য তাই যা বলেন তাই করে থাকেন
কিছুক্ষনের মধ্যে পুরো বাসায় সীমান্ত একা। সালমা চাচীও নেই আজ। তিনি যদিও সারাদিন কাজ করেন না। শুধু সকাল এবং রাতের কিছু কাজ করেন। যাই হোক, সীমান্ত ভেবেছিলো কম্পিউটারে গেমস খেলে সারাটা দিন কাটিয়ে দিতে পারবে। কিন্ত কম্পিউটারের সামনে আর বড় স্ক্রিনে চোখ মন দুটোই আটকে রাখতে পারল না বেশিক্ষন৷
নিজের রুম থেকে হেটে গিয়ে বাবার রুমটায় গেলো সীমান্ত। বাবার রুমে একটা বই এর শেলফ আছে। অনেক বই তাতে। খ্রিষ্ঠাব্দ থেকে বর্তমান যুগের বিখ্যাত কবিদের লেখা বই রয়েছে। সীমান্ত বই গুলোর নাম গুলো পড়ছিল। নাম গুলোই যত অদ্ভুত তত অদ্ভুত সেই গল্প গুলো হবে কিনা সন্দেহ!

হঠাৎ চোখ পড়ল একটা বই এর উপর। বইটির নাম 'রাক্ষসের শহর' লেখক হবে একজন। বইটিতে বেশ ধুলো বালি পড়ে মলাট ঢেকে আছে। কয়বছর এই শেলফ এর কোন বই স্পর্শ করা হয় নি সেটা শুধু এই বইয়ের দিকে তাকালেই বুঝতে পারা যায়। সীমান্তের বাবা এক সময় অনেক বই পড়তেন। এখন আর সময় সুযোগ পান না৷

সীমান্ত বইটি হাতে নিয়ে ড্রইং রুমের সোফায় এসে হেলান দেয়া মাত্রই টেলিফোনে একটা ফোন আসলো।
" হ্যালো। আমি সীমান্ত বলছি।”
ওইপাশ থেকে বলল " আমি সামিহা বলছি। ”
সীমান্ত কিছুটা চমকে উঠলো। বলল" আমার বাসার টেলিফোন নম্বর কোথায় পেলে?”
" সেটা বলা যাবে না। তার আগে তুমি বলো আজ স্কুলের শেষ ক্লাসে আসো নি কেন? ”
" এমনি আসি নি। ”
" এমনি কেনো শরীর খারাপ? নাকি অন্য কিছু? ”
" না তেমন কিছুই না। প্রত্যেকদিন ঘুম থেকে উঠে স্কুলে যেতে আলসেমি লাগে। তাই ভাবলাম শেষ ক্লাসে গিয়ে কোন লাভ নেই। ”
ওইপাশ থেকে সামিহা বলল " আজ আসলে খুব মজা হতো। আমি তোমার জন্য একটা জিনিস এনেছিলাম। ”
সীমান্ত বলল " কি জিনিস? "
" সেটা বলা যাবে না। কিন্ত তুমি আর পাচ্ছ না সেটা।"
ওইপাশ থেকে হাহা করে হাসতে লাগলো সামিহা৷ সীমান্ত চুপচাপ তার হাসি শুনছে। সীমান্ত কিছুটা রেগে গিয়ে খটাস করে ফোন রেখে দেয়।
সীমান্ত ফোন রেখে দিয়ে বইটি খুলে পড়তে আরম্ভ করলো।

সীমান্ত বই পড়তে পড়তে
কখন ঘুমিয়ে পড়েছে সেটা বুঝতে পারেনি। বাসার দরজায় কলিং বেল বেজে উঠা মাত্রই হুড়মুড় করে উঠে পড়লো সীমান্ত৷ আরেকটু হলে মাটিতে পড়ে লুটেপুটে শুয়ে যেত৷সীমান্তের মা এসে পড়েছেন। সীমান্তের জন্য কিছু প্যান্ট শার্ট কিনে এনেছেন সেটা নিয়ে সীমান্ত তার রুমে চলে যায়।


দুপুরের খাবার টেবিলে সীমান্ত এবং তার মা বসে আছে৷ আজ সারাদিন কিভাবে কি করেছেন তার দুকথা চারকথা আলোচনা করতে লাগলেন সীমান্তের মা। এরকম এক সময় টেলিফোনে এক মটা ফোন আসলো। সীমান্তের মা উঠে গিয়ে ফোন ধরলেন।
সীমান্তের মা বলল " আসসালামু আলাইকুম।”
তারপর আবার বলল
" হ্যা চিন্তে পেরেছি। ”কেমন আসিস তুই?”
তার মা আবার বলল " আর খোজ খবর নেয়া হয় না কত ব্যাস্ততার মধ্যে থাকি–"

তাদের কিছুক্ষণ কথা হয়ার পর সীমান্তের মা খেতে আসলেন৷ তার মা বললেন " আজ আমাদের বাসায় তোমার এক আন্টি আসছে। ”
সীমান্ত খুব আগ্রহ নিয়ে বললেন " কোন আন্টি? ”
" সেটা তুই চিনবি না৷ আমার ভার্সিটি লাইফের বান্ধবী শায়লা। তোর আন্টিই হয়। তার দু ছেলে। একটা তোর ছোট আরেকটা হেটে বেড়াতে পারে হয়তো।

সীমান্তের মা হাসি মুখে খাবার মুখে নিয়ে চাবাতে লাগলেন৷ আরও কত কথা যে সীমান্তের মা বললেন সেটা সীমান্তের কানের পাশ দিয়ে চলে গিয়েছে, আর প্রবেশ করতে পারেনি। কারন সীমান্ত ভাবছে বাচ্চা দুটো দুষ্টু হলে যে কি হবে!। দুষ্টু বাচ্চারা আসলেই খুব দুষ্টু এটা সেটা ধরে আর নষ্ট করে। একবার তাদের বাসায় এক আত্মীয় এর ছেলে কম্পিউটারে গেমস খেলবে বলে বায়না ধরলো। কিন্ত সে কি করলো কে জানে! কম্পিউটারটাই নষ্ট হতে গিয়ে আর হলো না।
দুষ্টু বাচ্চারা ত্যাদড় প্রকৃতির হলেও এদের কাজ কর্ম ভারী মজার হয় অবশ্য।

সেদিন বাসায় আন্টির দুই ছেলের কর্মকান্ড দেখে রীতিমতো অবাক সীমান্ত। বাচ্ছা গুলো স্ট্যাচু লিবার্টির মতো ঠিক যেখানে বসে ছিলো সারাক্ষন সেখানেই বসে থাকতে দেকা গেলো। ছোট বাচ্চাটা এদিক ওদিক তাকায় আর একটু একটু বিস্কিট কামড়ায়। আর ভড় ছেলেটা সীমান্তের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলো। আজ সীমান্ত বুঝে নিল এরকম শান্তশিষ্ট বাচ্চারাও আজকাল এদিক ওদিক তাদের দেখা মেলে।

সাত.
এতদিনের বার্ষিক পরিক্ষার বিভিন্ন আলোচনা গল্পে পেচিয়ে লাভ নেই৷ সীমান্তের মুখের কথা অনুযায়ী পরিক্ষা বেশ ভালো হয়েছে। কিন্তু গণিত নিয়ে কিছুটা চিন্তা রয়েছে। যদিও সে ক্লাসের ফার্স্ট বয়। তাই গণিতের মতো সাব্জেক্ট নিয়ে মাথা ঘামাতে চায় না কেউ তার বিরুদ্ধে
সীমান্তের এক ডক্টর চাচার সাথে গল্পের একভাগে আলোচনা হয়েছে। যিনি কিনা বলেছিলেন সকালে চা খাওয়া স্বাস্থের পক্ষে ক্ষতিকর বা খেলেও ক্ষতি বেশি কিছুই হয় না৷তিনি আরো বলেছেন চায়ে চিনি যেন বেশি দেয়া না হয়৷ দুই থেকে তিন চামচের বেশি খেলে ডায়বেটিস হতে পারে। চায়ের সাথে লেবু কিংবা আদা খেলে শরীরের জন্য ভারি উপকার এটাও বলেছিলেন। এমন কি সীমান্তের বাবার বিভিন্ন অসুখের যত্রতত্র ঔষধের তালিকা দিয়ে থাকেন।

তিনি গত তিনদিন হলো বাংলাদেশে এসেছেন কানাডা থেকে। সীমান্তের বাবা মাকে তার বাসায় আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সীমান্তের বাবা আমন্ত্রণের উত্তরে বলেছেন সীমান্তের মা কিছুটা অসুস্থ হবায় কারোরই আসা হচ্ছে না৷ তাই সীমান্তের চাচা এক কফির দোকানে ডেকেছেন সীমান্ত এবং তার বাবাকে।
সীমান্ত কি খাবে সেটা বুঝে উঠতে পারছে না। খাবারের তালিকা দেখলে যেন তার মাথা ঘোরায়। তাই তোয়াক্কা না করে গরম কফির অর্ডার দিয়ে দিল। তার দেখাদেখি সীমান্তের ডক্টর চাচা এবং বাবাও গরম কফির অর্ডার দিলেন
সীমান্তের চাচা কফিতে প্রথম চুমুক দিয়ে বললেন " তো সীমান্ত তোমার ফাইনাল পরিক্ষা কেমন হলো?"
সীমান্ত কিছুটা কেশে বলল " জ্বি চাচাজান ভালো। ”
" রেজাল্ট দিবে কবে? ”
" এইতো আর দুদিন পরই। "

সীমান্তের চাচা কফিতে দ্বিতীয় চুমুক শেষ করে বললেন " বাহ্ বেশ। এসব ইংরেজি স্কুল গুলোতে সবার আগে পরিক্ষা রেজাল্ট দিয়ে ছাত্রদের বাকি দিন গুলো ঘুম পাড়িয়ে রাখে৷ আর মাসে বেতন গুনবে হাজারখানেকের মোটা অংকের টাকা৷ পড়লেখা আর হলো কই? সব বাংলা সংস্কৃতি শাক মাছে ঢাকা পড়ে রইলো।“
সীমান্তের বাবা চুপসে গেলেন মনে হচ্ছিলো। কিছুক্ষণ পর তিনিও বললেন " ঠিকই বলেছ। ”
সীমান্তের চাচা মুচকি হেসে বললেন " আচ্ছা শুনেছি সীমান্ত নাকি চা কফি দুটো মিশিয়ে খায়? কি সীমান্ত কথা সত্য! "
সীমান্ত শুকনো গলায় বলল " জ্বি চাচাজান যা শুনেছেন তা সত্য৷ কিন্তু চিনি কম খাই৷ আবার ডাইবেটিস হয়ে গেলে আবার বিপদ হবে "।
সীমান্তের বাবা এবং চাচা দুজনি হাহা করে কিছুক্ষণের জন্য হেসে নিলেন৷
সীমান্তের বাবা বললেন " হ্যাঁ সীমান্তের কথায় যুক্তি আছে বলতে হবে। ডাক্তারের ভাতিজা বলে কথা। যুক্তি অবশ্যই জানতে হবে। কিন্তু একটা কথা বলতে হয়, যে ছেলে কিনা এক সময় চা কফি ছুয়ে দেখতে চাইতো না সে আজ দুটো মিশিয়ে খায়।

সীমান্তের বাবা হাহা করে হাসতে হাসতে টেবিলে একটা কিল বসিয়ে দিলেন। সবার মধ্যেই হাসিঠাট্টার উত্তেজিত ভাব, এদিকে সীমান্তের চোখে মুখে আত্মশক্তির ভাব ফুটে উঠছে।


আট.
আজ স্কুলে ফাইনাল পরিক্ষার রেজাল্ট দিবে। আকাশ জুড়ে কুয়াশার সকালে ঘুম থেকে উঠতেই চায় না কেউ। তেমনি সীমান্ত একই রকম৷
কাথা কম্বল ছড়িয়ে হুড়মুড় করে ঘুম থেকে উঠে পড়ে সীমান্ত। যদিও তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে আজ তার ফাইনাল পরিক্ষার রেজাল্ট দিবে। ঘুম ভেঙে যাবারই কথা। প্রত্যেকদিনের মতো আজো খাবার টেবিলে শুনতে হলো নানান কথা৷ সবই সীমান্তের পরিক্ষার রেজাল্ট সাপেক্ষে আলোচনা।
তার বাবা ইতিমধ্যে ঢাকায় এসে পড়েছেন। ব্যাবসার কাজে বাসায় বাবার উপস্থিতির কারনে কিছুটা হেলেদুলে কাটিয়ে পার পেয়ে গিয়েছে সীমান্ত৷

খাবার খাওয়া শেষে স্কুলে যাবার জন্য তৈরি হয়ে নিল সীমান্ত৷হাবিলদার চাচা রিক্সা ঠিকঠাক করলেন। রিক্সায় উঠে বসা মাত্রই সীমান্ত চিন্তিত গলায় বলল " আচ্ছা চাচাজান আজ ভাড়া বেশি চাচ্ছে কেন সবাই? ”
সীমান্তের এই প্রশ্ন শুনে কিছুটা চিন্তিত ভাব ফুটে উঠলো, হাবিলদার চাচার মুখে৷
মুখের খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি চুল্কাতে বললেন " তা কি জানি, গরিব মানুষের দেমাগ বেশি৷ তাই দামও বাড়াইয়া দিছে মন মতো। কিন্ত তাগে মতো গরিব মানুষরা যে রিক্সায় উঠে সেটার চিন্তা করা লাগে না! "

রিক্সা রাস্তার বায়ে মোড় নেবার সময় আরেকটা রিক্সার সাথে ধাক্কা লেগে যায়৷ ওমনি শুরু হয় দুই রিক্সাওয়ালার মধ্যে তুমুল ঝগড়া খারাপ অশুদ্ধ ভাষায় গালমন্দ তো অবশ্যই আছে৷
স্কুলের গেটের সামনে রিক্সা এসে থামলো। হাবিলদার চাচা ভাড়া দেবার সময় হাসি মুখে রিক্সাওয়ালাকে বললেন " সাবধানে ড্রাইভিং করবেন"।

সীমান্তের রেজাল্ট দিয়েই দিলো অবশেষে। অতিবাহিত সময় ফাইনাল পরিক্ষার রেজাল্ট সীটটি হয়তো ধরে রাখতে পারল না।
ছেলেদের মধ্যে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে সীমান্ত৷ আর অন্যদিকে সামিহা তার প্রথম স্থানেই রয়েছে!।
ছেলেদের মধ্যে যে প্রথম হয়েছে সে খুবই শান্তশিষ্ট ছেলে৷ কারোর সাথে টু কথা টুকুও বলে না। তার অবস্থান ছিলো চতুর্থ। সেখান থেকে প্রথম!

সীমান্ত তার রেজাল্ট সীটে লক্ষ করে দেখল তার গণিত এবং ইংরেজিতে মোটামুটি নম্বর এসেছে৷ তার কারনেই সে তার অবস্থান থেকে কিছুটা দূরে সরে গিয়েছে।
স্কুল বিল্ডিংয়ের শেষ মাথায় কে যেন একা একা বসে আছে। জায়গায়টা নির্জন, কয়েকটা আম গাছ আর কাঠাল গাছ ছাড়া বেশি কিছুই নেই আশে পাশে৷ সাধারণত ওইখানের বসার জায়গায় কেউ নিজের ইচ্ছায় একাকি বসে না৷ কেউ ওজায়গায় ঘুরতে, খেলতে বসে আড্ডা দিতে যায়৷ মানুষটা কে হতে পারে সেয়াতা দেখবার জন্যে কৌতুহল বসত সে এগিয়ে যায়৷ একটু কাছে যেতেই দেখল সীমান্ত বসে আছে, এক পানে আকাশের দিকে তাকিয়ে৷ ছেলেটা কি কাঁদছে নাকি?

সামিহার মনে কিছুটা খটকা লাগল।
"সীমান্ত! তুমি এখানে। "
সীমান্ত কোন উত্তর না দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে৷
" মন খারাপ সে জন্যে? পরিক্ষায় খারাপ করেছ তাই?” সামিহা শান্ত গলায় বলল।
সীমান্ত বলল " আজকের আকাশটা খুব সুন্দর৷ কোন রোদ নেই। মেঘও নেই! ”।
সামিহা বলল " কি হয়েছে তোমার? আমাকে বলবে? ”

সীমান্ত দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল " আমার মায়ের কথা খুব মনে পড়ছে৷ আমার মা নাকি খুব মেধাবী ছিলেন বাবা বলেছিল৷ আমার মা মারা যাওয়ার সময় আমি যদিও মাকে দেখেছি, কিন্তু মুখ ফুটে কথা বলতে পারি নি৷ মানুষ মারা গেলে নাকি আকাশের তারা হয়ে যায় শুনেছি। কিন্তু দিনের বেলায় তারা কোথায় পাই?–"
সীমান্ত কথার মাঝে একটু মুচকি হাসি হাসলো।
সামিহা বুঝতে পেরেছে আসল ঘটনাটা কি। সামিহা ভাবলো এই সময়টিতে সীমান্ত কে বিরক্ত করা একদম ঠিক হবে না।
" সীমান্ত, বাসায় যাবে না? সবাই চলে গিয়েছে। ”
সীমান্ত মাথা নেড়ে বলল " হুম। যাবো পড়ে। ভাবছি আজ একাই বাসায় যাবো৷ স্কুলের দারোয়ান মামাকে বলব হাবিলদার চাচা এসে খুজলে যেন বলে দেয়, সীমান্ত চলে গিয়েছে। ”
" ওহ আচ্ছা।"

সামিহা কিছু বলবে বলে ভাবছিলো কিছুক্ষণ ধরে। কিন্তু বলাটা কি ঠিক হবে কিনা সেটার জন্য মাথা চুল্কাচ্ছে৷
সীমান্ত মাথা নামিয়ে বলল " কিছু বলবে? ”
সামিহা আমতা আমতা করে বলল " আসলে সীমান্ত। আমার বাবা বিজনেস এর কাজে আমেরিকার চলে যাচ্ছেন..– ”
কথা শেষ না হতেই সীমান্ত বলল " বাহ্ বেশ ভালো। ”
সামিহা ধমকের কন্ঠে বলল " আরে মুল কথাটা তো বলি নি। ”
" হুম বলো "।
" এর জন্য আমাদের পুরো ফেমিলি আমেরিকার চলে যাচ্ছে, তার সাথে আমিও "।
সীমান্ত বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়লো। অনেক্ষন চুপ করে তাকিয়ে ছিলো সামিহার দিকে৷
" ওহ আচ্ছা৷ ”
সামিহা বলল " তোমার সাথে যোগাযোগ থাকবে নিশ্চয়ই, যদি তুমি চাও তাহলে হবে হয়তো। ”
" ঠিক আছে৷ ”
" ভালো থেকো সীমান্ত। আসি তাহলে "। সামিহার সব কথা শুনবার পর সীমান্তের মুখটা চুপসে গিয়েছিল। সে হয়তো চেয়েছিল কিছু বলতে, কিন্তু সেটা আর বলা হয় নি।
সামিহা চলে যাবার সময় তার চোখ থেকে কয়েক ফোটা জল পড়েছিল কিন্তু সেই দৃশ্য কেউই দেখতে পায়
নি।


নয়.
খুব সকালে ঘুম ভাঙে সীমান্তের৷ বিছানার পাশে শুয়ে আছে তার স্ত্রী সামিহা আহমেদ। তাকে দেখেই বোঝা যায় সে গভীর ঘুমে মগ্ন।
ঘুম থেকে উঠে জানালার পর্দা সরাতেই তীব্র রোদের আলোর ঝলকানিতে সীমান্তের মুখ চোখ জ্বলে উঠে৷ সাথে সাথে জানালা লাগিয়ে, ঘুম চলে যাবার অদ্ভুত রহস্য বুঝতে পারে। সীমান্তের চার কোণা রুমে পৌষ মাসের আমেজ, এবং বাহিরে খাটি গ্রীষ্মের স্বচ্ছ সকাল!
কিছুক্ষণ পর অফিসে যেতে হবে৷ হাত মুখ ধুয়েমুছে নেবার জন্য বাথরুমের দিকে পা এগিয়ে যায় সীমান্ত৷

সামিহা তখনও গভীর ঘুমে রয়েছে৷ ড্রাইনিং টেবিল যেন মানুষশুন্য এবং নিঃস্তব্ধ। টেবিলে থাকা কলার সারি এবং আগের দিনের কিছুটা শক্ত পাউরুটি নিয়ে খেতে বসলো সীমান্ত৷
সাদা রঙের চকচকে গাড়ি৷ নতুন অবশ্য৷ গাড়ির মধ্যেও শীতকাল স্বাভাবিক! যাইহোক। সীমান্তকে এখন আর বাচ্চাকালের মতো কেউ নাম ভেংচি কেটে ডাকে না। সবাই স্যার বলে,
সীমান্তকে সম্মানের চোখে দেখে। স্যার সীমান্ত আহমেদ অথবা 'জনাব' যেটা নামের শুরুতে ব্যাবহার হয় মাঝে মধ্যেই৷

সীমান্তের বাবার ছোটবড় সেই বেসরকারি অফিস কিংবা প্রতিষ্ঠানের বর্তমান মালিক সীমান্ত আহমেদ। নতুন গাড়ি এবং নতুন দাম্পত্য জীবন! সেটা অবশ্য রয়েছে। যেটার কথা কোন ভাবেই বাদ দেবার মতো বিষয় নয়৷
অফিসের মধ্যে প্রবেশের সময় কয়েকটা সালাম প্রত্যেকদিনই হজম করাটা, নতুন কিছু নয়। তার নিজের রুমে ঢুকে চেয়ারে নেড়েচেড়ে বসে পড়লো সীমান্ত আহমেদ৷ তার টেবিকলের সামনে অনেক ফাইল এমনকি কাগজ পত্র নোটিশ এবং পত্রিকা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে৷
পত্রিকা তবুও দুই দিনের,আজ এবং গতকালের৷ টেবিলের পাশের ডেস্কে কিছু গিফট পেপারে মোড়ানো বস্ত গুলোতেও ধুলো জমে আছে কিছু৷ চোখ বুলিয়ে দেখতেই সীমান্ত দেখলো, গত এক সপ্তাহ আগের বিয়ে উপলক্ষে অফিসের কিছু মানুষ গিফট পাঠিয়েছিলেন৷ জিনিস গুলো নিজের ব্যাগে ঢুকিয়ে কাজে মন দিবেন বলে ভাবছেন৷
কিন্তু কাজ শুরু করবার আগে, টেবিলে গরম (চা কিংবা কফি) না খেলে, কাজে মন কোনভাবেই বসবে না৷

হয়তো প্রত্যেক চুমুকের সাথে অতীতের স্মৃতি গুলো নেড়েচেড়ে দেখা যেতেই পারে, মন্দ হয় না।
কুশিও নবাব প্রিন্স
ঢাকার এক সরকারি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছি। দর্শন এবং টুকরো টুকরো গল্প উপন্যাসের প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে তুলছি।