ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

উইঘুর ইস্যুতে নিরব কেন এরদোয়ান? - শাকিল আহমেদ


রেচেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট। মুসলিম বিশ্বের নেতা বললেও বোধ হয় ভুল হবেনা। ফিলিস্তিন, কাশ্মীর, রোহিঙ্গা এবং সিরিয়া ইস্যুতে মুসলমানদের পক্ষে সোচ্চার এই ব্যক্তি নীরব কেন উইঘুর ইস্যুতে?


আধুনিক সভ্য দুনিয়ায় পূর্ব তুর্কিস্তানে উইঘুরদের উপর যেখানে অসভ্য, নৃশংস এবং বর্বরোচিত নির্যাতন চালাচ্ছে চীন, সেখানে এক রহস্যময় কারণে গোটা মানবজাতি আজ নিরব। চীনের বিশাল অর্থনীতি এবং সমরনীতির কাছে হেরে গেছে মানবতার ফেরিওয়ালা আর শান্তির দূতেরাও।

ওআইসির মত একটি ইসলামিক সংগঠন নির্যাতিত মুসলমানদের পক্ষে দাঁড়াতে পারেনি। এমনকি একটা শক্ত প্রতিবাদও করতে পারেনি চীনের বিরুদ্ধে। রহস্যময় কারণে নিরবতা নেমে এসেছে মিডিয়া পাড়া ও বিশ্ব সাহিত্যাঙ্গনেও।

ফিলিস্তিন ইস্যুতে তুর্কি প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বেশ সরগরম। ইসরায়েলের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখলেও ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইসরায়েলের কঠোর সমালোচনা করতে পিছপা হননি এই ব্যক্তি। ইসরায়েলকে 'খুনিদের রাষ্ট্র' বলেও আখ্যায়িত করেছেন তিনি। জন্ম দিয়েছেন ঐতিহাসিক 'ওয়ান মিনিট' এর মতো ঘটনার।

অটোম্যান সাম্রাজ্য ভেঙে যাওয়ার পর ইউরোপের 'রুগ্ন দেশ' দেশ তুরস্ককে দীর্ঘ দুই দশক ধরে বিশ্ব আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র, কৌশলী পররাষ্ট্রনীতি, বিশাল অর্থনীতি এবং জ্ঞান-বিজ্ঞান, কোনো ক্ষেত্রেই পিছিয়ে নেই অটোমান সাম্রাজ্যের উত্তরসূরীরা।

ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই পূর্বে অটোম্যান সাম্রাজ্যের অধিভুক্ত দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নে মনোযোগ দিয়েছেন তিনি। দেশে দেশে নির্যাতিত মুসলমানদের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেওয়ার কারণে অনেকেই তাকে মুসলিম বিশ্বের নেতা ভাবতে শুরু করেছেন। খেলাফত হারানোর এক শতাব্দী পর নতুন করে মুসলিমরা খেলাফতের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। 


এমন অবস্থানের কারণে মুসলিম বিশ্বে তিনি তুমুল জনপ্রিয়তা কুড়িয়েছেন। এমনকি যে আরব বিশ্ব তুর্কি সুফিবাদ এবং অটোম্যান সাম্রাজ্যকে দু-চোখে দেখতে পারত না, তারাও এখন এরদোয়ানের চরম ভক্ত।

কিন্তু স্বজাতি উইঘুর ইস্যুতে কেন নিরবতা পালন করছেন এরদোয়ান? এর প্রধানতম কারণ হতে পারে তুরস্কের কৌশলী পররাষ্ট্রনীতি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবেলায় চীনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখা।

চীন ভ্রমণে শি জিনপিং এর সঙ্গে সোহার্দ্য সাক্ষাৎ শেষে এরদোয়ান জানিয়েছেন তিনি অখণ্ড চীনে বিশ্বাস করেন। আর এর জন্য উইঘুরদের বিরুদ্ধে কসাই শি' এর কঠোর অবস্থানকেও তিনি সমর্থন করেন। চীনের ব্যবসায়ীদের তিনি তুরস্কে বিনিয়োগ করতে আহ্বান জানান এবং চীনের সাথে বাণিজ্য ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে উত্তীর্ণ করার ঘোষণা দেন।

শুধু পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে স্বজাতি মুসলিমদের একুশ শতকের সবচেয়ে নৃশংস গণহত্যার প্রতিবাদে নীরব ভূমিকা পালন করছে তুরস্ক। শুধু তাই নয় প্রায় ৫০ হাজার উইঘুর শিনজিয়াং থেকে পালিয়ে নিরাপত্তার জন্য আশ্রয় নিয়েছিল তুরস্কে। কিন্তু সেখানেও তারা নিরাপদ নয়। তুরস্ক সরকার এক ভিন্ন কৌশলে উইঘুরদের তুলে দিচ্ছে নতুন যুগের নরখাদক শি জিনপিং সরকারের হাতে।

তুর্কি পার্লামেন্টে পূর্ব তুর্কিস্তানে তুরস্কের অনুসন্ধানকারী দল পাঠানোর প্রস্তাব দেওয়া হলে এরদোয়ানের একে পার্টি এর বিপক্ষে ভোট দিয়ে তা বানচাল করে দেয়। কেন চীনের মন জুগিয়ে চলছে এরদোয়ান? বাণিজ্যিক এবং কূটনৈতিক সফলতা কি স্বজাতি মুসলমানদের নিরাপত্তা চেয়ে বড় ইস্যু? তাই যদি হয় তাহলে রোহিঙ্গা, ফিলিস্তিন, কাশ্মীরসহ অন্যান্য ইস্যুতে মানবদরদি কার্যক্রম কি শুধুই লোক দেখানো?

এদিকে কাশ্মীরকে আজাদ করতে সোচ্চার ইমরান খান উইঘুর ইস্যুতে রহস্যজনকভাবে নিরব। যেন কুখ্যাত নরপিশাচ চীন সরকারের মন জুগিয়ে চলায় তাদের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি। মিশর, সৌদি আরব, পাকিস্তানসহ মুসলিম বিশ্বের মোড়লগণই আজ চীনের পক্ষে সাফাই গাচ্ছে।

এমনকি এই মোড়লরা নিরপত্তার জন্য আশ্রয় নেওয়া উইঘুরদের জোরপূর্বক পিশাচদের হাতে তুলে দিতেও দ্বিধা করছে না। মুসলিমরা আশায় বুক বেঁধেছিল, এরদোয়ান হয়ত আর কিছুদিন পরই খেলাফতের ঘোষণা দিতে যাচ্ছে, সেই এরদোয়ানও আজ সুবিধাজনক পথে হাঁটছে।

যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বে চীনের বিরুদ্ধে নিন্দা জ্ঞাপন করে জাতিসংঘে চিঠি লেখে ২২টি দেশ। লজ্জাজনক বিষয় হচ্ছে, এইটা ২২টি দেশের মধ্যে একটাও মুসলিম দেশ নেই। নব্য ক্রুসেডার বাহিনী ন্যাটোভুক্ত অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্স আছে; কিন্তু একটাও মুসলিম দেশ নেই, একটাও না!

এর ঠিক কয়েকদিন পরেই আরেকটা চিঠি পৌঁছায় জাতিসংঘে। রাশিয়া, ভেনিজুয়েলা, মিয়ানমারসহ ৩৭টা দেশ চীনের সমর্থনে চিঠি পাঠায়। চীনাব্লক বা আমেরিকা-বিরোধী ব্লকের দেশগুলো চীনকে সমর্থন দিতেই পারে। কিন্তু আশ্চার্যজনক ব্যাপার হচ্ছে ওই ৩৭টা দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটা মুসলিমপ্রধান দেশও আছে। তাদের মধ্যে আছে সৌদি আরব, পাকিস্তান, আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন ও ওমান। 


নতুন যুগের মুসলিম পরাশক্তি তুরস্ক তাদের রাজনৈতিক আর কূটনীতিক দৌড়ঝাঁপ নিয়েই ব্যস্ত। স্বজাতির দূর্দশা দেখার সময় তাদের নেই। এই ক্ষমতা নেই স্বয়ং মুসলিম 'বিশ্বের নেতা' খ্যাত এরদোয়ানেরও। 

শাকিল আহমেদ
লেখালেখি আমার পেশা নয় তবে নেশা। জ্ঞানার্জনের তীব্র পিপাসা থেকেই লেখনীর সূচনা।