ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

ল্যাপ্টিস: রোমান সাম্রাজ্যের এক অক্ষত নগরী - লিখেছেন - আনাস রোহান

 



আপনাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় আপনি যেখানে বসবাস করছেন, সেখানে আজ থেকে ২০০ বছর আগে কারা বসবাস করত, তাদের জীবনযাপনের ধরনই বা কেমন ছিল, খুবই কি ভিন্ন ছিল তাদের জীবনযাপন?

আপনি যদি সেসব নিয়ে মাথা না ঘামান তাহলে উত্তর দিবেন "সেসব জেনে আমি কি করব?", অথবা আপনার যদি একটু বেশি চিন্তাভাবনা করতে ভালো লাগে বা নিজেকে বৃহত্তর মানব সভ্যতার অংশরুপে ভাবেন তাহলে বলবেন, এইযে আমার বাসার পাশে এই পুরনো স্থাপনা রয়েছে, তা দেখে কিছুটা আঁচ করা যায় কেমন ছিল পূর্বে বসবাসরত মানুষের জীবন। আপনি হয়তোবা মাঝে মাঝে সেই স্থাপনাগুলো দেখে চিন্তা করেন একদিন তো এই জায়গাগুলো মানুষে পরিপূর্ন ছিল, কর্মব্যস্ততায় মুখর ছিলো! হয়তোবা ভাবতে ভাবতে আপনি গম্ভীর হয়ে পড়েন, আজ থেকে পরবর্তী ২০০ বছরের কথা ভেবে, আপনার কথা ভেবে।


যাই হোক ধান ভানতে শিবের গীত গাইলাম এই জন্য যে, আমরা মানুষরা সবসময়ই কৌতুহলী, আমরা অতীতের পাতায় পদচারনা করতে চাই, অতীতের মানুষগুলোর পদচিহ্ন দেখে তাদের সম্পর্কে জানতে চাই। আর আমাদেরকে এসব তথ্য জানায় ঐতিহ্যকে বহন করে চলা পুরাকীর্তিগুলো।


আমাদের প্রায় সবারই জানা রোমান সাম্রাজ্য, মোটামুটি খ্রিস্টের জন্মের ২৭ বছর পূর্বে শুরু হয় এবং ১৪৫৩ সালের দিকে শেষ হয় বর্তমান পৃথিবীতে রোমান সাম্রাজ্যের ইতিহাসের সবচেয়ে সমৃদ্ধ যে চিহ্ন রয়েছে তা হলো ল্যাপ্টিস ম্যাগনা বা ল্যাপ্সিস ম্যাগনা। এটি ছিল ট্রিপোলিটানিয়ার সবচেয়ে বড় শহর, যা বর্তমান লিবিয়া হতে ১০০ কিঃমিঃ দক্ষিনপূর্বে অবস্থিত। লিবিয়ার শহর আল খুমস হতে ২ কিঃমিঃ পূর্বে এবং ট্রিপলি হতে ৮১ মাইল পূর্বে অবস্থিত।


ল্যাপ্টিস ম্যাগনা রোমান স্থাপত্যের সবচেয়ে বেশি পরিমানে অক্ষত নিদর্শন ধারন করে রেখেছে।

মনে করা হয়, খ্রিস্টের জন্মের পূর্বে ৭ম শতাব্দীতে টাইর বা সিডন এর ফিনিশীয়রা শহরটির উত্থান ঘটায়। পরবর্তীতে ষষ্ট শতাব্দী তে কার্থিজিনিয়ানরা ল্যাপ্টিস এর মধ্যে বসবাস শুরু করে। এটি খুবই অল্প সময়ের মধ্যে ভূমধ্যসাগর অঞ্চল এবং সাহারান অঞ্চলের কৃষিজ উৎপাদন ও বিপনন এর একটি কেন্দ্রস্থলে পরিনত হয়। কিন্তু পরবর্তীতে খ্রিস্টপূর্ব ১৪৬ সালে তৃতীয় পিউনিক যুদ্ধে যখন কার্থিজিনিয়ানরা রোমানদের কাছে হেরে যায় তখন শহরটি রোমের নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।


নামকরনঃ

শহরটির পিউনিক নাম এলপিকিউ লেখা হতো, যার অর্থ স্থাপন করা বা গঠন করা এই নামটির হেলেনিয় নাম হয় ''ল্যাপ্তিস''। পরবর্তীতে ল্যাটিন নামে এটির নাম হয় ল্যাপ্টিস ম্যাগনা বা ল্যাপ্টিস (বৃহৎ ল্যাপ্টিস)। আরবদের কাছে এটি ''লাবধাহ'' নামে পরিচিত।


রোমানদের নিয়ন্ত্রণে আসার পরও ল্যাপ্টিস একটি মুক্ত শহর হিসেবে পরিচালিত হতো। ল্যাপ্টিসে প্রচুর পরিমান জলপাই উৎপাদন হতো। উৎপাদন এতই ছিলো যে কর হিসেবে শহরটি প্রতি বছর জুলিয়াস সিজারকে ৩ মিলিয়ন পাউন্ড জলপাই তেল সরবরাহ করতো। কিন্তু, রোমান সম্রাট টিবেরিয়াস এর সময় ল্যাপ্টিস কে তার আশেপাশের রাজ্যসহ আফ্রিকা এর অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বানিজ্যের কেন্দ্রস্থল হিসেবে রোমান আফ্রিকার একটি সর্ববৃহৎ শহর হিসেবে আবির্ভাব ঘটে ল্যাপ্টিসের।


ল্যাপ্টিস স্মরনকালের সবচেয়ে বেশি খ্যাতি লাভ করে ১৯৩ সালে যখন ল্যাপ্টিসেরই এক বার্বার সন্তান রাজা হয়, যার নাম লুসিয়াস সেভেরাস। সেভেরাস অন্যসব প্রদেশ হতে নিজের জন্মস্থলকে বেশি গুরুত্ব দেয় এবং ল্যাপ্টিস এর বন্দর, পোতাশ্রয় গুলোকে সংস্কার করে ও অনেক নতুন স্থাপনা তৈরি করে। ল্যাপ্টিসের এমন উত্থান এটিকে রোমান আফ্রিকার ৩য় গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসেবে খ্যাতি এনে দেয়। ১ম ও ২য় অবস্থানে থাকা কার্থিজ ও আলেকজান্দ্রিয়াকে সমানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে শহরটি।

এসময় সেভেরাস অনেক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা করেন। এর মধ্যে সুনিয়ন্ত্রিত গোসলখানা, প্রায় ৪৬০ মিটার লম্বা সার্কাস অন্যতম। শহরের কেন্দ্র হতে বন্দর পর্যন্ত সাড়ে ৪০০ মিটা লম্বা রাস্তা যার দুই মাথা গোলাকৃতির মুক্ত জায়গায় গিয়ে মিলেছে। এমনকি সমুদ্রের কাছাকাছি একটি বড় থিয়েটারও স্থাপন করেছিলেন সেভেরাস। এছাড়াও ল্যাপ্টিসে বানিজ্যের জন্য আসা বনিকদের জন্য থাকার স্থান, বাজার, পোতাশ্রয় সবই তৈরি করেন তিনি।

কিন্তু তৃতীয় শতকের অর্থনৈতিক সংকটের কারনে ল্যাপ্টিস এর গুরুত্ব সূচকীয় ভাবে কমে যায়। এছাড়াও ৩৬৫ সালের সুনামির কারনে শহরের বৃহৎ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায়, অনেকেই শহরটি ছেড়ে চলে যায়। ৪৩৯ সালের দিকে ট্রিপোলিটানিয়ার অন্যসব শহর সহ ল্যাপ্টিসও ভ্যান্ডাল রাজত্বের আওতায় এসে যায়। ভ্যান্ডাল রাজা গেইসরিক নির্দেশ দেন ল্যাপ্টিস এর সুরক্ষাপ্রাচীর গুলো ভেঙে ফেলতে যাতে শহরের লোকজন ভ্যান্ডালের বিরুদ্ধে যেতে না পারে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তটি ল্যাপ্টিসের জন্য ভয়াবহ হয়ে উঠে। ৫২৩ সালে একদল বার্বার লুটেরার দল পুরো শহরটি লুট করে ও ধ্বংস করে দেয় অধিকাংশ স্থাপনাগুলোকে।

এর ১০ বছর পর সম্রাট বেলিসারিয়াস ভ্যান্ডালদের রাজত্ব ভেঙে দিয়ে ল্যাপ্টিসকে পুনরায় রোমান সাম্রাজ্যের আওতায় নিয়ে আসেন। কিন্তু বার্বারদের সেই ধ্বংসযজ্ঞ থেকে শহরটি আর মাথা তুলে দাড়াতে পারে নি। ৫৪৪ সালে পুনরায় বার্বাররা সব দিক থেকে আক্রমন করতে থাকে। তখন শহরের নেতা সার্জিয়াস পাল্টা আক্রমন করে বার্বারদের আক্রমন কিছুটা হ্রাস করেন। কিন্তু বার্বারদের আক্রমন আরো তীব্র হলে ল্যাপ্টিস দুর্বল হয়ে পড়ে।বার্বাররা সব দিক থেকে আক্রমন করলে সার্জিয়াস ল্যাপ্টিস ত্যাগ করে কার্থেজে চলে যায়। এবং ল্যাপ্টিস তখন জনমানবশূন্য হয়ে পড়ে।

ল্যাপ্টিসের বাসিন্দাদের প্রায় সবাই ছিলেন খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী। ৬৪৭ সালের দিকে যখন আরব বিজয় হয় তখন ল্যাপ্টিসে মাত্র ১০০০ এর মত অধিবাসী ছিল, যার মধ্যে বাইজান্টাইন সৈন্যদল ছিলো একটি।

১৮২৬ সালের দিকে এই ঐতিহাসিক শহরের প্রাচীন জাদুঘরের অংশটি ব্রিটিশ জাদুঘরে স্থানান্তর করা হয়। ২০ শতকে ইটালিয়ানরা যখন ইটালিয়ান লিবিয়া প্রতিষ্ঠা করে তখন ইটালিয়ান প্রত্নতত্ত্ববিদরা ল্যাপ্টিসে গবেষনা করতে শুরু করেন এবং প্রায় শহরটির অধিকাংশ স্থাপনাগুলোকে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন।

২০০৫ সালে প্রায় ৩০ ফুট লম্বা পাঁচটি রঙিন মোজাইকের চিত্র আবিষ্কৃত হয় যাতে অস্ত্রহাতে হরিন আরোহী যোদ্ধা এবং যুবকদের ভয়ানক ষাঁড়ের সাথে লড়াই করতে দেখা যায়। এগুলো প্রথম ও দ্বিতীয় শতকে তৈরি করা হয়েছিলো বলে ধারণা করা হয়। ১৯৮৩ সালে ইউনেস্কো ল্যাপ্টিসকে বিশ্ব ঐতিহ্য বলে স্বীকৃতি দেয়।


কিছু অপ্রমানিত তথ্য রয়েছে যে, ল্যাপ্টিসকে ২০১১ সালের লিবিয়ান গৃহযুদ্ধে গাদ্দাফির সশস্ত্র বাহিনী কতৃক মিলিটারি পরিবহনের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিলো। তবে গৃহযুদ্ধ চলাকালে ল্যাপ্টিস কোনো ক্ষতির সম্মুখীন হয় নি। রোমান সাম্রাজ্যের ঐতিহাসিক সকল স্থাপনা নিয়ে আজো ইতিহাসের সমৃদ্ধ স্বাক্ষর হয়ে রয়েছে ল্যাপ্টিস।


ধন্যবাদ পড়ার জন্য।    



আনাস রোহান
ইতিহাসনাম.কম এর তিনজন সহ-প্রতিষ্ঠাতার একজন।বিক্ষিপ্ত মনের অধিকারী।