১২০১ থেকে ১৩৫০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কে বাংলা সাহিত্যের 'অন্ধকার যুগ' বলে গতানুগতিক শিক্ষাধারায় একটি মিথ প্রচলিত রয়েছে।বলা হয়ে থাকে, বখতিয়ার খলজি কর্তৃক বাংলা জয়ের (১২০০-১২০৭) পর মুসলমানেরা এতো অত্যাচার উৎপীড়ন চালিয়েছিল যে, কারো মনে সাহিত্যের কথা জাগে নি। সৃজনশীল মানুষ দেশত্যাগেই ছিলেন ব্যস্ত, সাহিত্য রচিত হবে কি! [১]

তাই এসময়ে বাংলাভাষা সাহিত্যহীন মরুভূমি।

কিন্ত প্রকৃতপক্ষে এটি অত্যন্ত স্থুল ও অসম্পূর্ণ একটি কথা।


সাহিত্য হলো না কেন? কেন আমরা পাইনা একটিও কবিতা? একটিও কাহিনী কাব্য? এ-প্রশ্নের উত্তরে ভাষাবিজ্ঞানী হুমায়ুন আজাদের বক্তব্যটি এখানে প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেন -

"আগে সাহিত্য লিখিত হতো না। মুখে মুখে গাওয়া হতো।তখন ছাপাখানা ছিলো না, পুথি লিখিয়ে নেওয়ায় ছিল অনেক অসুবিধা। তাই কবিরা মুখে মুখে রচনা করতেন তাদের কবিতা। কখনো তা হয়তো হতো ছোটো আয়তনের, কখনো বা হতো বিরাট আকারের।

রচনা করে তা স্মরণে রেখে দিতেন, নানা জায়গায় গাইতেন। কবিতা যারা ভালোবাসতো তারাও মুখস্ত করে রাখত কবিতা। এভাবে কবিতা বেঁচে থাকত মানুষের স্মৃতিতে, কন্ঠে। আজকের মত ছাপাখানার সাহায্য সেই কালের কবিরা লাভ করেন নি। তাই যে কবিতা একদিন মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে যেত, সে- কবিতা হারিয়ে যেত চিরকালের জন্য।

...তাই অন্ধকার সময়ের রচনা সম্বন্ধে আমরা অনুমান করতে পারি যে, এ-সময়ে যা রচিত হয়েছিল তা কেউ লিখে রাখি নি। তাই এতোদিনে তা মানুষের স্মৃতি থেকে মুছে গেছে।" [২]


ওয়াকিল আহমদ তার ‘বাংলা সাহিত্যের পুরাবৃত্ত’- বইটিতে লিখেছেন-


“বাংলা সাহিত্যের কথিত ‘অন্ধকার যুগ’ মোটেই সাংস্কৃতিক বন্ধ্যাত্বের যুগ ছিল না। ধর্মশিক্ষা, শিল্পচর্চার দায়িত্ব যাদের উপর ন্যস্ত ছিল, তারা সীমিত আকারে হলেও শিক্ষা-সাহিত্য চর্চায় নিয়োজিত ছিলেন। তবে, হিন্দু কি মুসলমান, কেউ লোকভাষা বাংলাকে গ্রহণ করেননি। বাংলা সাহিত্যের নিদর্শন না থাকার এটাই মুখ্য কারণ।” [৩]


মাহবুবুল আলম তার 'বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস' গ্রন্থে বলেন-


"বাংলা ভাষার প্রাথমিক অবস্থার অপূর্ণতার জন্য সকলের কাছে তা গৃহীত হতে পারেনি। প্রাকৃতজনের মুখে তখন বাংলায় গান, গাথা,  ছড়া প্রভৃতি রচিত হচ্ছিল; কোন উচ্চবিত্তের লোক বাংলা সাহিত্য রচনায় আগ্রহ দেখায়নি। তের চৌদ্দ  শতকে বাংলা ভাষার গঠন যুগ চলছিল।" [৪]  


অভিন্ন মতামত ব্যক্ত করেছেন ড. আহমদ শরীফ। তিনি বলেন-

"বাংলা বারো, তের, চৌদ্দ শতকের মধ্যভাগ অবধি লেখ্য ভাষার স্থরে উন্নত হয়নি। এটি হচ্ছে বাংলার স্বাকার (নিজস্ব আকৃতি) প্রাপ্তির কাল ও মৌখিক রচনার কাল। [৫]  


সহজ কথায় 'বাংলা লেখ্য ভাষার স্থরে উন্নীত না হওয়া' বাংলা সাহিত্যের নিদর্শন না থাকার তৃতীয় প্রধান কারণ।


এসব কারণে পন্ডিতগণ মনে করেন তথাকথিত অন্ধকার যুগ চিহ্নিত করার কোন যৌক্তিকতা নেই। তাই ১২০০ সাল থেকেই বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ শুরু হয়েছে  মনে করাই সমীচীন।" [৬]


মধ্যযুগের সাহিত্যের অস্পষ্ট আঙ্গিনায় যথোপযুক্ত আলোকপাত না করেই সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক মনোবৃত্তি থেকে প্রণোদিত হয়ে অনেক পন্ডিত নিরর্থক বিতর্কের ধূম্রজাল সৃষ্টিতে স্বীয় মেধা ও সময়ের অপচয় করছেন।

অথচ, এই সংস্কৃত অনুরাগীরাই একদা "ভাষায়ং মানবঃ শ্রুত্বা রৌরবং নরকং ব্রজেৎ" - বলে ধর্মীয়  বিষয়য়াদি দেশীয় তথা বাংলা ভাষায় প্রচারের জন্য নিষেধ বাণী উচ্চারণ করেছিল। ফলে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ভবিষ্যৎ হয়ে পরে সম্ভাবনাহীন। মুসলিম শাসকেরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে সে দুর্দিন থেকে উদ্ধার করেছিলেন।  


"সুস্থিত আদি বাংলায় প্রথম রচনা বড়ু চন্ডিদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, যা রচিত হয়েছিলো চতুর্দশ থেকে পঞ্চদশ শতকে, বাংলায় মুসলিম শাসন তখন মধ্য গগনে।" [৭]

এরপর আমাদের সামনে আসছে একটির পর একটি মঙ্গলকাব্য, আসছে পদাবলির ধারা। হোসেন শাহী আমলকে বাংলা সাহিত্যের রেনেসাঁ বলা হয়।


"আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলে কবীন্দ্র পরমেশ্বর মহাভারতের বাংলা অনুবাদ করেন। এছাড়াও মানসা বিজয়, ও পদ্ম পুরাণ নামক আরো দুটি মৌলিক গ্রন্থ রচিত হয়। তাঁর রাজত্বকালে 'শ্রীমদ্ভগবদগীতা' বাংলা ভাষায় অনূদিত হয়। হোসেন শাহী আমলের সর্বশেষ কাব্যগ্রন্থ রচনা করেন একজন মুসলিম কবি, শাহ মুহাম্মদ সগীর। ইউসুফ জুলেখা কাব্যগ্রন্থের রচয়িতা।" [ ৮]


সুলতানি আমলের কবি মালাধর বসু 'শ্রীকৃষ্ণ বিজয়' কাব্য রচনা করেন। মুকুন্দরাম চক্রবর্তী 'চন্ডীমঙ্গল' কাব্য রচনা করেন। এছাড়া বিদ্যাপতি বাংলা ভাষায়ও সাহিত্য রচনা করবন। বৈষ্ণব কবি বৃন্দাবন দাস শ্রী চৈতন্যের জীবনি অবলম্বনে বিখ্যাত গ্রন্থ 'চৈতন্য ভগবত' রচনা করেন। চৈতন্যদেবের জীবনী এবং তার প্রবর্তিত ধর্ম সম্পর্কে 'বৈষ্ণব সাহিত্য' নামক এক বিশাল সাহিত্য ভান্ডার গড়ে ওঠে। [৯]


"ইলিয়াস শাহী বংশের সুলতান গিয়াস উদ দীন আযম শাহ কৃত্তিবাসকে বাংলায় রামায়ণ রচনার নির্দেশ দেন।" [১০]


অন্যদিকে মহাকবি আলাওলের হাত ধরে বাংলা মুলুক পাড়ি দিয়ে বাংলা সাহিত্য আছড়ে পড়ে আরকানের রাজসভায়।

মুসলিম সুলতানগণ কর্তৃক বাংলা সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনা করেই ডক্টর দীনেশচন্দ্র সেন 'বঙ্গভাষা ও সাহিত্য' গ্রন্থে মন্তব্য করেছিলেন- "আমার বিশ্বাস মুসলমান কর্তৃক বঙ্গ বিজয়ী বঙ্গভাষার সৌভাগ্যের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।" [১১]


দিনেশ চন্দ্র সেন তার 'History of Bengali language and Literature' গ্রন্থে লিখেছেন,

"যে কয়েকটি প্রভাবের কারণে বাংলা ভাষা উচ্চতর সাহিত্যের স্থরে উন্নীত হয়েছে,তার মধ্যে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো মুসলিম বিজয়। যদি হিন্দু রাজারা স্বাধীনভাবে রাজত্ব চালাতে পারতো, তবে বাংলা রাজদরবারে মোটেই প্রবেশের সুযোগ পেত না।" [১২]


প্রমথ চৌধুরী লিখেছেন-

"Bengali literature was born in Mohommaden age." অর্থাৎ  "বাংলা সাহিত্যের জন্ম মুসলিম যুগে।" [১৩]


চর্যাপদের আবিষ্কারক হরপ্রসাদ শাস্ত্রীও উল্লেখ করেছেন-

"আমরা কি করে ভুলে যাই চতুর্দশ শতাব্দীর মুসলমান সুলতান এবং রাজপুরুষদের কথা, যাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা সাহিত্যের এক গৌরবময় অধ্যায় রচিত হয়?" [১৪]


বাংলা ভাষা মুসলমানদের হাতে বিকশিত হয়েছে এটা আমার কথা নয়; দীনেশচন্দ্র সেনের কথা। তিনি কি লিখেছিলেন সেটা দেখুন-

"মুসলমান আগমনের পূর্বে বঙ্গভাষা কোন কৃষক রমণীর ন্যায় দীনহীন বেশে পল্লী কুটিরে বাস করিতেছিল। ...ইতরের ভাষা বলিয়া বঙ্গভাষাকে পন্ডিতমন্ডলী দূর দূর করিয়া তাড়াইয়া দিতেন। হাড়ি- ডোমের স্পর্শ হইতে ব্রাহ্মণেরা যেরূপ দূরে থাকেন বঙ্গভাষা তেমনই সুধী সমাজের কাছে অপাঙক্তেয় ছিল তেমনি ঘৃণা ও উপেক্ষার পাত্র ছিল।

কিন্তু হীরা কয়লার খনির মধ্যে তাকিয়া যেমন জোহুরীর অপেক্ষা করিয়া থাকে, বঙ্গভাষা  তেমনই কোন শুভদিন, শুভক্ষণের জন্য প্রতীক্ষা করিতেছিল। মুসলমান বিজয় বাঙ্গালা ভাষার সেই শুভদিন, শুভক্ষণের সুযোগ আনয়ন করিল। বঙ্গসাহিত্যেকে একরূপ মুসলমানের সৃষ্টি বলিলেও অত্যুক্তি হইবে না।" [১৫]


সংস্কৃত ভাষার অনুসারীদের বাংলার প্রতি অবজ্ঞার প্রেক্ষিতে মুসলিম শাসন বাংলার জন্য আশীর্বাদ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে একথা অনেক হিন্দু পন্ডিতও সমর্থন করেছেন। অন্যদিকে কেউ কেউ এত উদারতা তো দূরের কথা, নিরপেক্ষ দৃষ্টিতেও বিবেচনা করতে সক্ষম হননি। সেজন্য মধ্যযুগের শুরুতে একটি অবাস্তব অন্ধকার যুগের নিরর্থক বিতর্ক সৃষ্টি করা হয়েছে।  



~উৎস ও সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি~

[১]বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা, পৃঃ১৯৯

[২]লাল নীল দীপাবলি,হুমায়ুন আজাদ। পৃঃ২৬-২৭

[৩]বাংলা সাহিত্যের পুরাবৃত্ত,ওয়াকিল আহমদ। পৃঃ১০৫

[৪] [৫] পৃঃ৮৬, [৬] পৃঃ৮৮,[১১] পৃঃ৮১, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস, মাহবুবুল আলম।

[৮] পৃঃ ১৩৫-৩৬ [৯] পৃঃ২৫৬ [১০] পৃঃ৭৯, বাংলার ইতিহাস, আব্দুল করিম।

[৭][১২][১৩][১৪]১৫] পৃঃ ১১৯-১২১, ইতিহাসের ধুলোকালি।  


ইফতেখার সালাহীন
বিদ্যার্থী