ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

কৃষ্ণাঙ্গ ইহুদিদের রক্ষায় মোসাদের গোপন অভিযান - লিখেছেন - আসাদুজ্জামান খান জিশান


আপনি যদি একজন ইহুদী হয়ে থাকেন তাহলে পৃথিবীর কোথাও আপনার আশ্রয় না হলেও ঈসরায়েলে হবে। কারণ বিতর্কিত দেশ ঈসরায়েল; ঐতিহাসিক ভাবেই ইহুদী জনগোষ্ঠীর মানুষদের অধিকার এবং নিরাপত্তার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আজকের আর্টিকেলে আমরা আপনাদের জানাবো কিভাবে ঈসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের নেতৃত্বে আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ ইহুদীরা সুদূর ইথিওপিয়া থেকে লোহিত সাগর পাড়ি দিয়ে এসেছিলেন আজকের ঈসরায়েলে।
সুতরাং চলুন পাঠক দেরি না করে শুরু করি আমাদের আজকের আলোচনা।


ইসলাম এবং ক্রিচিয়ানিটিরও আগে পৃথিবীতে গোড়াপত্তন ঘটে ইহুদী ধর্মের। তাই ইহুদী ধর্মেরও বহু অনুসারী রয়েছে আমাদের পৃথিবীতে এবং এদের অধিকাংশই শেতাঙ্গ। কিন্তু অবাক হলেও সত্যি যে, ২০০০ বছরেরও বেশি সময় মানুষ জানতো না আফ্রিকা মহাদেশে অবস্থিত এক বিশাল ইহুদী জনগোষ্ঠীর কথা। এমনকি আফ্রিকার ইহুদীরাও একসময় ভাবতেন, তারাই হয়তো পৃথিবীর শেষ ইহুদী সম্প্রদায়! আফ্রিকা অঞ্চলের ইহুদীরের নৃতাত্তিক পরিচয় নিয়ে যথেষ্ঠ মত পার্থক্য আছে। তবে এই অঞ্চলে তাদের আগমন যে অনেক অনেক দিন আগে তা নিয়ে কোন বিতর্ক নেই। 


১৯৭৭ সালে আফ্রিকার ইথিওপিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হলে অনেক ইহুদী জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসেন সুদানে। সেখান থেকে ইসরায়েল এবং বর্হিবিশ্ব জানতে পারে আফ্রিকার মানবেতর জীবন যাপন করা ইহুদীদের কথা। তখনকার ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী মেনাচেম বেগিন, গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদকে আদেশ দেয়, ইথিওপিয়ার ইহুদিদের ইসরায়েলে নিয়ে আসার সমস্ত ব্যবস্থা করতে। বিভিন্ন নথিপত্র থেকে জানা যায় যে, সেই সময়ে প্রায় ৪০০০০ ইহুদী আফ্রিকা থেকে পাড়ি জমান ইসরায়েলে। তবে এর পেছনেও রয়েছে একটি রোমহর্ষক গল্প। 
 


সুদানের শরনার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়া ইহুদীরা, ইথিওপিয়ায় অবস্থানরত ইহুদীদের জানান ইসরায়েল রাষ্টের প্রস্তাবের কথা। আফ্রিকার অধিকাংশ ইহুদীই নিজেদের পবিত্রভূমিতে ফিরে যাবার সুবর্ণ সুযোগটি গ্রহণ করেন। আফ্রিকার ইহুদীদের ঈসরায়েলে ফেরত পাঠাতে গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ গ্রহণ করে এক অভূতপূর্ব ট্যাকটিক, যা বিশ্ব ইতিহাসে অত্যন্ত নজির বিহীন।
 
সুদানের মরুভূমিতে লোহিত সাগরের তীরের একটি ছোট্ট পর্যটন গ্রাম অ্যারোস। মোসাদের কয়েকজন স্পেশাল এজেন্ট ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে এখানে গড়ে তোলেন বিশ্বমানের এক রিসোর্ট। অথচ পুরো পৃথিবীর কাছে ঐ সময়ে বিখ্যাত এই রিসোর্টটি ছিলো সুদানে আশ্রয়রত ইহুদীদের ইসরায়েলে পৌছে দেয়ার প্রক্রিয়ার অংশবিশেষ। বিশ্বের অনেক নামিদামি ব্যক্তিবর্গরা বিলাশ বহুল এই রিসোর্টে  প্রমোদভ্রমনে আসলেও জানতে পারেননি মোসাদের সম্পৃক্তার বিষয়টি।
   

সুদানে আসা শরনার্থী ইহুদীদের, রাতের আধারে ট্রাকে উঠিয়ে এই রিসোর্টের উত্তর প্রান্তে নিয়ে আসতো মোসাদের এজেন্টরা। পরে ইসরায়েলি নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী আর নেভী সীল সদস্যরা ছোট ছোট নৌকায় করে দেড় ঘণ্টা দূরের জাহাজে তাদের নিয়ে যেতেন। সেখান থেকে লোহিত সাগরের মাঝ দিয়ে ইসরায়েলে পৌঁছে যেত সেই জাহাজ।

১৯৮২ সালের মার্চ মাসে ইসরায়েলের তৃতীয় অভিযানটি ধরে ফেলে সুদানের সেনা সদস্যরা। ইসরায়েলি বাহিনির সঙ্গে গোলাগুলিও হয়। কিন্তু এতে কেউ হতাহত হয়নি। তারপর থেকে সাগর পাড়ি দেয়ার পরিকল্পনাটি স্থগিত করে দেয়া হয়।
 


এইবার মরুভূমির মাঝে একটি সুবিধাজনক বিমান অবতরণ ক্ষেত্র খুঁজে বের করে মোসাদ এজেন্টরা। সেখান থেকে বিশেষ হারকিউলিস বিমানে করে শরণার্থীদের ইসরায়েলে নিয়ে আসা হতো। তবে এতকিছুর পরেও ওই রিসোর্টটি পরিচালনা অব্যাহত রাখে মোসাদ এজেন্টরা।

পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ এবং বড় অংকের অর্থ লেনদেনের বিনিময়ে সুদানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল জাফর নিমেইরি সরাসরি খার্তুম থেকেই ইহুদিদের ইউরোপ হয়ে ইসরায়েলে যাবার অনুমতি দেন। কিন্তু আরব বিশ্বের কেউ এ কথা জানতো না। তবে সুদান থেকে শরণার্থীদের বিমানে করে বের করে আনার এই খবরটি ১৯৮৫ সালের ৫ই জানুয়ারি বিশ্বের সংবাদপত্রগুলোয় প্রকাশিত হয়। এরপর সুদানিজ সরকার এই অভিযান বন্ধ করে দেয়।
   


১৯৮৫ সালের ৫ই এপ্রিল সুদানে সামরিক অভ্যুত্থানের আগ পর্যন্ত রিসোর্টটি চালায় মোসাদ এজেন্টরা। নতুন সামরিক সরকার এই রিসোর্ট আর মোসাদ এজেন্টদের নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করেছিলো বলে এক রাতের ব্যবধানে সকল এজেন্ট চলে যান রিসোর্টটি ছেড়ে। 

এই রুদ্ধশ্বাস গল্প এখানে শেষ হলেই ভালো হতো পাঠক। কিন্তু মানুষে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াইয়ে মানুষের পরাজয় হবে এটাই সুনিশ্চিত। ইসরায়েল পাড়ি জমানো অধিকাংশ কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান ভালো নেই। ধর্মকে ছাপিয়ে গায়ের বর্ণ মূখ্য হয়ে উঠায়, আফ্রিকার ইহুদীরা প্রতিনিয়ত বর্ণবৈষ্যমের শিকার হন ইসরায়েলে। প্রায়শই শোনা যায় সহিংসতার খবর।  

.....................................................................................................................................................................

এই আর্টিকেলটি আমাদের ইউটিউব চ্যানলের একটি ভিডিও ডকুমেন্টারির স্ক্রিপ্ট। আপনি চাইলে ইউটিউবে এই ডকুমেন্টারিটি দেখে আসতে পারেন প্রিয় পাঠক! সাবস্ক্রাইব করে ইতিহাসনামা পরিবারের পাশে থাকার নিমন্ত্রণ রইলো!



লিংক: কৃষ্ণাঙ্গ ইহুদিদের রক্ষায় মোসাদের গোপন অভিযান