ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

পুরস্কার বিজয়ী গল্প: বিদ্রোহীর রক্ত

 



সাহিত্য সন্দর্শন আয়োজিত- ২য় সাহিত্য উৎসব ''ধ্রুপদ''- এর গল্প লেখা প্রতিযোগিতায় জুনিয়র ক্যাটেগরীতে ৩য় পুরস্কার বিজয়ী গল্প, "বিদ্রোহীর রক্ত", লিখেছেন- আলী হোসেন মোঃ অংকন

বিদ্রোহীর রক্ত

[শত শত বছর আগে পূর্বপুরুষদের ইতিহাস, ধনরত্ন সহ বিশাল এক তথ্যভান্ডারের খোঁজ পায় বিপর্যস্ত নিপীড়িত শ্রমিকরা। গোলকটি পাওয়ার জন্য নিপীড়ক রাজা আর তার সাগরেদরা হামলে পড়ে। দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিদ্রোহে বিশাল প্রভাব বিস্তার শুরু করলো গোলকটি। শত সংগ্রামের পরে একসময় রাজার হাতে ধরা পড়ে যায় লু বিদ্রোহীদের একজন। গোলকটি তাদের জীবনের প্রতিচ্ছবি, দীর্ঘদিন ধরে চলমান বিদ্রোহে জয় আর স্বাধীনতা পাওয়ার এক বড় সুযোগ! তার থেকেই শুরু নিষ্ঠুরতম এক পথচলা!]

রক্তের বন্যায় ভেসে যাচ্ছে দেয়ালের ছোট্ট গর্ত। প্রাসাদের পেছনের দিকে লুক্কায়িত স্থান এটি। বলা হয়, সমুদ্র দেব- দেবী ফোর্সিস এবং কেটোর সন্তান দানবী মেডুসার আর্শীবাদে এই বধ্যভূমি তৈরী হয়েছে বহুকাল আগে, যারাই এই বধ্যভূমিতে পা দিয়েছে, মেডুসাসের অনুগত কারো করুণা ছাড়া নিজেকে অক্ষত রেখে ফিরতে পারেনি।

সামনের দিকে যাওয়ার সময় দুটি সাপ চোখে পড়ল,পুঁটলি বেঁধে ঘুমিয়ে আছে তারা। সামনে তাকাতেই তীব্র আলো ঝলকানি চোখকে ধাঁধিয়ে দিলো। ঘৃণা ফুটে উঠল ৪-৫টা জল্লাদের চেহারা দেখে। মুহূর্তের মধ্যে আমার মধ্যে ভয়ের উদ্রেক হলো, জল্লাদগুলোর পাশেই আমার সন্তান হুই হাত বাঁধা অবস্থায় কাতরে যাচ্ছে!

সহ্য করতে না পেরে চিৎকার দিয়ে হাতের বাঁধন ছোটানোর ব্যর্থ চেষ্টা করলাম। জল্লাদগুলোর একটি বলে উঠল,
-"নিজের ছেলেকে রক্ষা করতে হলে "গোলক" এর সংকেত বলে দাও!"
আমি বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে আমার ছেলের দিকে তাকালাম, তার চোখে ভয়ের স্ফুরণ। ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি ওরা আমার গোপন আস্তানা, যেখানে আমার পরিবারকে লুকিয়ে রেখেচিলাম, তার খোঁজ পেয়ে যাবে।
কোনো উত্তর না পেয়ে একটা জল্লাদ আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো, আমি ব্যাথায় কঁকিয়ে উঠলাম, হুই চিৎকার করে আমার দিকে দৌড়ে আসলো। জল্লাদগুলো অট্টহাসি হেসে কক্ষে দুজন প্রহরী রেখে চলে গেলো।
হুই আমার দিকে তাকিয়ে বলল,-"বাবা,ওদের ‘গোলক’ এর সংকেত বলে দিচ্ছো না কেন? ওদের বলে দিলে আমরা বেঁচে যাবো!"

আমি আস্তে করে হুইয়ের হাত বুলিয়ে বললাম,"ওদের বলে দিলে আমরা আর স্বাধীনতা পাবো না। হুই,অনেকসময় জীবনে বেঁচে থাকার চেয়ে আত্মসম্মান রক্ষা, নিজের সত্তাকে লালন করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়। এই গোলক আমাদের স্বাধীনতার আশা, আমি এর বিরোধিতা করতে পারি না!
হুই আমার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে থাকলো, এদিক ওদিক তাকিয়ে বলল,-"প্রহরীগুলো পাথরের উপর বসে আছে, পাশে থাকা ছুরি দিয়ে তোমার হাতের বাঁধন কেটে দিতে পারি আমি।"
আমি কঁকিয়ে উঠে বললাম,"না হুই, তুমি মারা যাবে!"

হুই আমার চোখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে পাথরের দিকে নিঃশব্দে যেতে লাগলো,তারপর দুই প্রহরীকে ফাঁকি দিয়ে ছুরি নিয়ে আসল। আবার আমার কাছে এসে ছুরি দিয়ে হাতের বাঁধন খুলতে লাগলো, আর তখনই দরজায় প্রবেশ করলো জল্লাদগুলো!

হুইয়ের দিকে চোখ পড়তেই তারা তলোয়ার বের করলো,যেগুলোকে Sword Of Wisdom বলে। তিনজন জল্লাদ একসাথে হুইয়ের হাত বেঁধে ফেলল,আমাকেও দুজন প্রহরী হাত টানটান করে ধরে রাখল।
হঠাৎ এক জল্লাদ এসে হুইয়ের গলায় তলোয়ার ধরল। প্রচন্ড আক্রোশে জল্লাদকে মারার জন্য পাশে পড়ে থাকা ছুরি নিয়ে এগিয়ে যেতেই আরেকটা জল্লাদ আমার হাত চেপে ধরল,ফিসফিস করে বলল,
-"বিদ্রোহীরা কখনো জয়ী হতে পারে না রাজার সাথে!"

মাত্র কয়েক মুহূর্তের ব্যবধানে সে আমাকে ছেড়ে দিলো, আর গতিপথ বদলে জল্লাদের বদলে আমার সন্তানের বুকে আমি ছুরি বসিয়ে দিলাম, ঠিক বুকের মাঝ বরাবর!
হুইয়ের রক্তপাতে সারা ঘর ভেসে যেতে লাগলো,আমি হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম, মাথার রক্ত চেপে বসল, ঘুরে দাঁড়াতেই একটা জল্লাদ মাথায় তলোয়ারের বাটঁ দিয়ে আঘাত করে বসল, আমি লুটিয়ে পড়ে গেলাম।

স্বাধীনতা অর্জন করে নিতে হয়, ত্যাগ আর দৃঢ়তার মিশ্রণ থাকা লাগে। বিদ্রোহীর রক্তে রঞ্জিত হয়েছিলো রাজপ্রাসাদ, বিদ্রোহীরাই তার প্রতিশোধ নিবে!