সাহিত্য সন্দর্শন আয়োজিত- ২য় সাহিত্য উৎসব ''ধ্রুপদ''- এর গল্প লেখা প্রতিযোগিতায় জুনিয়র ক্যাটেগরীতে ১ম পুরস্কার বিজয়ী গল্প, "বাবা দেখো", লিখেছেন - সামিয়া আজাদ প্রীতি


বাবা দেখো 


কাল বিকেল বারোটায় ম্যাচ আছে, তারপর বন্ধুদের সাথে গুটি খেলব আর তারপর……কিরে সাজিদ! আবার কি ছাইপাশ ভাবছিস শুনি? পরার তো কোনো নামগন্দ নেই।
উফফ মা। পড়তে দাও, ঘ্যন ঘ্যন করোনা।
পড়বি বলে ত মনে হয় না। তোর তো কাল পরীক্ষার পর কি করবি সেই চিন্তা।
তখনই সাজিদের মেজাজ গরম হয়ে গেল। আসলে তার মেজাজ ইদানিং ভালো নেই। কারণ তার পরীক্ষা চলছে যে। তার তার পড়ালেখার প্রতি কোন আগ্রহ নেই। ইস যদি লেখাপড়া না থাকতো, কি ভালোই না হতো।
সন্ধ্যায় যখন খেলাধুলা করে বাসায় আসলো তখনই মা জিজ্ঞেস করল"কিরে পরীক্ষা শেষের কতদিন হল? লেখাপড়া কিছু করবি নাকি? ভালো জায়গায় পড়তে হবে না? হ্যাঁ, তোর রেজাল্ট কবে দেবে রে?
ক...ক….কাল
পাস করতে পারবি?
সাজিদ কিছু বললো না।
আজ রেজাল্টের দিন যা সাজিদের জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিনগুলোর মধ্যে একটা। রেজাল্ট কার্ড সাজিদের হাতে। ও সেটা বাবাকে দেখাতে ভয় পাচ্ছে। কেননা রেজাল দেখলে বা বাজে ভিষন পেটাবে। পাস করেছে, কিন্তু দেখানোর মত কোন রেজাল্ট হয়, কেননা দেখেই বোঝা যাচ্ছে, কানের গোড়া দিয়ে বেঁচে গেছে। রেজাল্ট কার্ড দেখার পরেই বাবা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সাজিদ লক্ষ্য করলো তার বাবার চোখ দিয়ে পানি পরছে। পানি? সাজিদ সত্যিই বিশ্বাস করতে পারছে না। কেননা সে বাবাকে কাঁদতে আগে কখনো দেখেনি। বাবা কিছু না বলে চলে গেলেন।
রাতে বাবা বসে আছেন। কি যেন ভাবছেন। সাজিদ সাহস করে বলল বাবা ভুল হয়ে গেছে বিশ্বাস করো, আর খারাপ করব না। সত্যি বলছি!
বাবা মুচকি হাসলেন। বললেন বস সাজিদ বাবার পাশে গিয়ে বসল। সাজিব আজ তোকে একটা গল্প শোনাই যার স্বপ্ন ছিল আকাশছোঁয়া। অনেক স্বপ্ন নিয়ে সে ঢাকায় আসে। কলেজে পরীক্ষা দিয়ে প্রথম স্থান নিয়ে কলেজে ভর্তি হয় তখন সেই কলেজটা ছিল ঢাকার শ্রেষ্ঠ কলেজ এবং দ্বিতীয় স্থান অধিকার করা ছেলেটির সাথে বন্ধুত্ব হয়। তারা আস্তে আস্তে এতটাই ভাল বন্ধু হয়ে যায় যা অনেক সুন্দর একটা সম্পর্কে পরিণত হয়। তারা পরস্পর ভাই হয়ে ওঠে এইচএসসি পরীক্ষার প্রথম দিন বরাবরের মত তার বন্ধু তার সাথেই ছিল একই বাসে। হঠাৎ করে বাসের পেছনের সিটে একজন লোক চিল্লানো শুরু করলো। কারণ তার সতেরো লক্ষ টাকা হারিয়ে গেছে। ছেলেটা ওখানে কান না দিয়ে পড়া শুরু করল। পাশের বন্ধু চাচাটাকে বলল সবার ব্যাগ চেক করা হোক। সবার ব্যাগ চেক করা হলো। ছেলেটা তার ব্যাক দিয়ে আবার পড়া শুরু করল। ও খেয়াল করলো হঠাৎ সবাই চুপ।তখন তাকিয়ে দেখল তা ব্যাগ থেকে টাকাটা পাওয়া গেল। যখন তার বন্ধুর মুখের দিকে তাকালো তখন তার বন্ধুর একটা মুচকি হাসি দিলো। সেটা ছিল খুবই ভয়ংকর। তার পা থেকে মাটি সরে গেল কারণ সে যে এমন কাজ করেনি সে ছাড়া আর কেউ বিশ্বাস করবে না। যেদিন সে জেল থেকে বের হল তার বন্ধু এসেছিল এবং বলেছিল আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছি তখন ছেলেটা বলল অভিনন্দন, তারপর জিজ্ঞেস করল তোর না লক্ষ্য ছিল বুয়েট? হ্যাঁ আসলে আমি তোকে তোর ভবিষ্যত দেখাতে চেয়েছিলাম। তখন ছেলেটা আর কিছু বলতে পারল না।  

সাজিদ বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, "এটা তোমার গল্প, তাই না বাবা?" বাবা বলল," বুঝলি কিভাবে"? কারণ বাবা আমি তোমার গল্প শোনার সময় তোমার সেই স্বপ্ন গুলোকে অনুভব করতে পেরেছিলাম যেগুলো তোমার চোখে ফুটে উঠেছিল। ৬ মাস হয়ে গেছে। গত ছয় মাসে যে সাজিদ কতক্ষণ ঘুমিয়ে আছে তা সে জানে না, জানে না সে কি খেয়েছে বা না খেয়েছে, এটাও জানেনা খেলতে গিয়েছে কিনা এমন কি এটা জানে না যে সে আদৌ বাসা থেকে বের হয়েছে কিনা! কারণ তার আজ মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা। আকাশের দিকে তাকিয়ে কি যেন ভাবছে। পরীক্ষা কেমন হল সাজিদ জানে না। আজ তৃতীয় দিন অর্থাৎ এক্সাম রেজাল্টের  দিন। রেজাল্ট দিবে ১২ টায়। সাজিদ মেসেজ পেল। রেজাল্টের পাওয়ার সাথে সাথে ও যেন আরও শান্ত হয়ে গেল। বাবাকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করল বাবা তুমি কোথায়?. বাবা বলল এইতো কাজ করছি দোকানে। তাড়াতাড়ি বাসায় আসো আজকে আমি তোমাকে তোমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত উপহার দিতে চলেছি। বাবা হেসে বলল এত সুখ আছে নাকি আমার কপালে, পাগলা? তারপর বলল আচ্ছা আমি আসছি। ফোন রাখার ৫ মিনিটের মধ্যেই মা টিভির রুম  থেকে চিৎকার দিয়ে উঠলেন। সাজিদ এসে বলল কি হয়েছে মা? মা টিভির দিকে ইশারা করলেন। দেখলাম আগুন লেগে ধ্বংস হয়ে গেছে সব! না বুঝতে পেরে হেড লাইনের দিকে তাকালো ও যা দেখল তা দেখার জন্য কখনোই প্রস্তুত ছিলনা। চকবাজারের তার বাবার দোকানের ওখানেই আগুন লেগে সব শেষ হয়ে গেছে।
তখন সাজিদ খেয়াল করলো তার পা থেকে মাটি সরে গেছে। এই ভয়ঙ্কর অনুভূতিটা অনুভব করল তখন মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল মা বাবার লাশটা কি পাওয়া যাবে? তাহলে বাবার লাশ কেই বলতাম আমি ঢাকা মেডিকেলে প্রথম স্থান অধিকার করেছি।