ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

জ্যঁ কুয়ে, একজন বিমান হাইজ্যাকারঃ বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু - লিখেছেন - মোঃ মোস্তফা জামান




জ্যঁ ক্যুয়ে (জন্ম: ১৯৪২ – ২০১২) পুরো নাম জ্যঁ ইউজিন পল ক্যুয়ে, জন্ম হয় মিলিয়ানা, আলজেরিয়াতে। পেশায় লেখক, একজন ফরাসী নাগরিক ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন সুহৃদ। তিনি এদেশের নিপীড়িত জনতাকে সাহায্য করার জন্য ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর তারিখে ফ্রান্স থেকে বাংলাদেশের জন্য পাকিস্তানের পিআইএ-৭২০ যাত্রী সহ বিমান হাইজ্যাক করেছিলেন। দাবী ছিলো কি জানেন?

পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতাকামী মানুষের জন্যে বিশ টন ঔষধ বিমানে তুলে দিতে হবে,আজ বাংলাদেশ স্বাধীন কিন্তু এই স্বাধীনতার পিছনে যে কত মানুষের অবদান রয়েছে তা এই প্রজন্মের কাছে অনেকটাই অজানা । 
অর্লি বিমান বন্দর,ফ্রান্স, ১৯৭১ । উজ্জ্বল সকাল ।এয়ারপোর্ট জুড়ে একটা সাজ সাজ রব । কারন আর কিছুই নয় রাষ্ট্রীয় সফরে ফ্রান্স এ আসছেন জার্মান চ্যানসেলর । এর মধ্যেই বিমানবন্দরের বাইরে ট্যাক্সি থেকে দীর্ঘকায় এক যুবক এসে নামলেন । ইমিগ্রেশনে প্রবেশ পথে সিকিউরিটি চেকিং এর মেটাল ডিটেক্টরে ধরা পড়ল না জ্যা কুয়ে নামের সেই যুবকের কোমর,অন্তরবাস আর মোজার ভিতরে গুঁজে রাখা রিভলভারের আলাদা আলাদা অংশগুলোর কিছুই । রানওয়েতে দাঁড়ানো পাকিস্তান ইনটারন্যাশনাল এয়ারওয়েজের একটা বোয়িং ৭২০ বিমান । যাত্রীরা ধীরে ধীরে উঠে বসছেন বিমানে । সময় তখন সকাল ১১ টা । সিঁড়ি বেয়ে বিমানে উঠলেন জ্যা কুয়েও । আর তার কিছুক্ষণ পরেই অর্লি এয়ারপোর্টের রেডিও তারবার্তায় একটা মেসেজ এলো আর সেটা খুলেই চোখ কপালে উঠে গেল অপারেটরের । মেসেজ এসেছে পিআইএ ৭২০ বিমান থেকে । সেখানে লেখা "এই বিমানটি আমি ছিনতাই করেছি। আমার কথা না শুনলে পুরো বিমান উড়িয়ে দেওয়া হবে । আমার ব্যাগে শক্তিশালী বোমা রয়েছে । তৎক্ষনাৎ রেড এলার্ট জারি করা হলো অর্লি এয়ারপোর্টে । নিরাপত্তা কর্মীরা দ্রুত যোগাযোগ করলেন হাইজ্যাকার জ্যা কুয়ের সঙ্গে । জানতে চাইলেন কি চায় সে ,কেনো বোমা নিয়ে বিমানে উঠেছে, কি তাঁর উদ্দেশ্য? ওপাশ থেকে জবাব এলো পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতাকামী মানুষের জন্য ২০ টন ঔষধ বিমানে তুলে দিতে হবে । তাহলেই কেবল মুক্তি পাবে বিমানের নিরীহ যাত্রীরা " । 

উত্তাল ৭১ । পাক বাহিনীর আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়ছে বীর বাঙালি আর তখন জ্যা কুয়ে নামের অচেনা এক যুবক পাকিস্তানের একটা বিমান ছিনতাই করে বসেছিলেন ,শুধু মাত্র কোনভাবে বাংলাদেশের মানুষকে সাহায্য করবেন বলে । কিন্তু কে এই জ্যা কুয়ে? কি তাঁর পরিচয়? প্রাথমিক জীবনে ফরাসি সেনাবাহিনীতে ছিলেন জ্যা কুয়ে । কিন্তু সেনাবাহিনীর ধরা বাঁধা নিয়ম কানুন ভালো না লাগায় সেখান থেকে সেচছা অবসর নেন । সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার পরে জ্যা কুয়ে জড়িয়ে পড়েন ওএসএ নামে একটা কট্টরপন্থী সংগঠনের সাথে । এর মধ্যেই কুয়ে জানতে পারলেন ফরাসি দার্শনিক আদ্রে মারলো সম্পর্কে । এতোদিন ধরে কট্টরপন্থী মনোভাব পোষন করে আসা কুয়ে হুট করেই উদারপন্থী হয়ে উঠলেন  মারলোর লেখা বই আর কলাম পড়ে । মারলোকে তিনি বেশ ভক্তি করতেন । ১৯৭১ সালে কুয়ে পূর্ব পাকিস্তান নামে একটা জায়গার নাম শুনলেন যেখানকার অধিবাসীরা আর পাকিস্তানের সঙ্গে থাকতে চাইছে না । 
স্বাধীনতা ঘোষণা করা হয়েছে, চলছে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ । জ্যা কুয়ের আদর্শ আদ্রে মারলো সেইসব সবাধীনতাকামী মানুষের পক্ষ নিয়েছেন তাই জ্যা কুয়েও ভাবতে লাগলেন কি করা যায় । সেই ভাবনা থেকেই এক পর্যায়ে বিমান ছিনতাইয়ের চিন্তা মাথায় আসে ।
জ্যা কুয়ে কোন প্রফেশনাল হাইজ্যাকার নন, বিপদে পড়া মানুষগুলোকে সাহায্য করার আর কোন উপায় না পেয়েই কাজটা করেছেন তিনি। কোন যাত্রীর সঙ্গে দুর্ব্যবহারও করেননি তিনি, সে পাকিস্তানী হলেও না। যদিও অফিসারদের চালাকি ধরতে না পেরে আটক হয়েছিলেন, কিন্তু ২০ টন ঔষধ কিন্তু ঠিকই বাংলাদেশে এসেছিলো।

ধরা পরার পর ৫ বছর জেল হয়েছিলো, অনেক বড়ো বড়ো আইনজীবীরা তার পক্ষে লড়েছেন। দুই বছর জেল খাটার পর মুক্তি পেলেও কোনদিন বাংলাদেশে আসেননি তিনি।
যে দেশের জন্য এতো কিছু করেছেন সে দেশটা দেখতে না আসলেও মানবতার ডাকে ঠিকই সাড়া দিয়েছিলেন ১৯৭১ এ।

তথ্য ও ছবিঃ উইকিপিডিয়, গুগল ও ফেইসবুক থেকে সংগৃহীত ও সংকলিত  


 

মোঃ মোস্তফা জামান
Teacher