ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

Universe 25 এবং আমাদের আধুনিক সমাজ - লিখেছেন - রাইয়ান শাফিন


১৯৭২ সালে প্রাণী গবেষণাবিদ জন ক্যালহুন ৪ জোড়া ইঁদুর নিয়ে একটি পরীক্ষা করেন। প্রজননক্ষম এই আটটি ইঁদুরকে ২৫ বাই ১৭ এর একটি স্বর্গীয় সেল তৈরি করা হয়। এবং যেখানে তাদের কোনকিছুরই সমস্যা হবে না, অফুরন্ত খাবার থাকবে, থাকার জায়গাও বিশাল। সেলের মধ্যে আরো ছোট ছোট অনেকগুলো সেল বানানো হয় যাতে ইঁদুররা সেখানে তাদের প্রজনন ঘটাতে পারে। এক কথায়, সারভাইভালের সমগ্র ব্যাপারটাই একেবারে পূরণ করে দেয়া হয়। যাকে বলে "ইঁদুর-স্বর্গ" আরকি। প্রজেক্টটির নাম দেয়া হয় 'Universe 25'।

সবকিছু ঠিকঠাক মতো চলছিলো। দুই থেকে চার, চার থেকে আট এভাবে বাড়তে বাড়তে ৫৬০তম দিনে ইদুর সংখ্যা দাঁড়ালো ২২০০। তবে এরপর থেকেই একটা অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করা হয়। দুইটি ইঁদুর মারা যায়। একটির মৃত্যুর কারণ জীবনে উদ্দেশ্যহীনতা, যেহেতু খাবারের চিন্তা ছিল না, শত্রু থেকে পালানোর ও কাজ নেই, তাই হয়তো কোন উদ্দেশ্য না পেয়ে মারা যায় ইঁদুরটি। অপরটি মারা যায় অন্য ইঁদুরের  হত্যার শিকার হয়ে। এখান থেকেই যেন শুরু। নতুনভাবে অনেক ইঁদুর মরতে থাকে প্রতিদিন। যা এখানেই থেমে থাকেনি। দুই বছর পর সমগ্র ইঁদুর গোষ্ঠী মারা যায়, একটি ইঁদুর‌ও বাকি ছিল না!

ইঁদুরের জন্য আলাদা থাকার জায়গা ছিল, খাবার ছিল, সবকিছু যা প্রয়োজন তাও ছিল। শত্রুর আক্রমণও হবে না এমন নিশ্চয়তাও ছিল। তবুও একটিও ইঁদুর বেচে ছিল না। কেন? কারণ কী?
 
খোদ গবেষকের ভাষ্যমতে কারণ খানিকটা এমন,

"যখন জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি ছিল, বেশিরভাগ ইঁদুরই অন্যান্য অনেক ইঁদুরের সংস্পর্শে আসতো, মেলামেশা করতো। ব্যবহারে যে পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় তা হলো, যখন শত শত ইঁদুর এক হতো তখন তারা পরস্পরের সাথে মারামারি করতো, হত্যা করতো। মেয়ে ইঁদুররা তাদের বাচ্চা ইঁদুরদের লালন পালনের ব্যাপারে ভুলেই গিয়েছিল যেন। মাঝেমাঝে তাদের বাচ্চাকে মাঝরাস্তাতেই ফেলে নিয়ে যেতেও ভুলে যেত তারা।
এদের মধ্য আবার দুইটিভাগ সৃষ্টি হয়, একভাগ ছিল যারা নিজেদেরকে একেবারেই এককোণে করে ফেলেছিলো। তথাকথিত 'সুন্দর ইঁদুর গোষ্ঠী'। অন্যদিকে বাকি ইঁদুর গুলো। যার ফলে এদের মধ্যে মারামারি অনেক হতো, এরা নিজেদের সামাজিক গুণাবলি ভুলে গিয়েছিল, এবং স্বর্গে থাকার পরেও তারা তা শেষমেষ নরকে পরিণত করেছিল।"

অর্থাৎ সমস্যাহীনতাই ছিল একমাত্র সমস্যার কারণ!
এতক্ষণ ইঁদুরের আলাপ চললেও ঘটনাটি আমাদের মডার্ন সমাজকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। আজকে অবশ্যই কারোরই খাবারের জন্য শিকারে যেতে হয়নি, কেউ ২০ কিলোমিটার দূরে গিয়ে নদীর পানিও আনে নি। অর্থাৎ সেই ইঁদুরগুলোর মতো আমরাও তেমন তথাকথিত স্বর্গেই বাস করছি, কিন্তু আমাদের সমস্যা যেখানে কম হবার কথা, সেখানে সমস্যাগুলো যেন কয়েকগুন হয়ে দাঁড়িয়েছে, তাই নয় কী? যেসব সমস্যা আগে কখনোই ছিল না, সেসব যেন এখন দৈনন্দিন ব্যাপার। প্রযুক্তিগত উন্নয়ন যেখানে আমাদের জীবন সহজ করেছে, আমরা আমাদের জন্য তৈরি করেছি নতুন নতুন সমস্যা। আগে বিশ্বে ক্ষুধা ছিল বড় সমস্যা, এখন স্থুলতা আরো বিশাল সমস্যা হয়ে দাড়িয়েছে। মানসিক সমস্যার এক মহামারী পরিস্থিতি সর্বত্র। সামাজিকতার ব্যাপারে আর নাইবা বললাম। জন ক্যালহুনের পরীক্ষাটির ফলাফল যেন আবার সত্য হতে চলেছে।

"If we are overpopulated, and survival is taken care of. We will eventually create problems even if they don't exist."
         




ইঁদুরের জন্য স্বর্গ বানানো হয়েছিল, তারা নিজেরাই তা নরকে পরিণত করেছিল। কারণ সারভাইভাল ব্যাপারটা তাদের খুবই মৌলিক কিছু গুনাবলীর মূল। তবে এখানে আশার বাণী হলো মানুষ হিসেবে আমরা আরো জটিল মানসিক গঠনের অধিকারী এবং এসব বিষয় নিয়ে আরো ভালোভাবে কাজ করতে পারি। যদি এখন সেই হতভাগা ইদুরদের মত পরিণতি না হয় তাই আশা।
এখানে সবার সমস্যার প্রতি সম্মান দেখিয়েই লেখাটি লেখা। সমস্যা সবারই থাকে, হয়তোবা আমার কাছে যেটা কিছুই না, অন্যজনের কাছে সেটা পুরো পৃথিবী সমান। তারপরেও আমাদের আসলেই ভেবে দেখা কি উচিত না যে, আমাদের সমস্যাগুলো আমাদেরই তৈরি কি না? হয়তোবা এরচেয়েও অনেক বেশি সমস্যার মানুষ প্রতিদিন জীবন কাটায়।
পরবর্তীতে নিজের কোন সমস্যা মাথায় আসলে ভেবে দেখা উচিত সমস্যাটা কী আসলেই সমস্যা নাকি আমার নিজেরই তৈরি করা। পৃথিবীতে ৩০ শতাংশ যেমন স্থুলতার সমস্যা, তেমনি একই শতাংশে ক্ষুধারও সমস্যা রয়েছে। আমাদের সমস্যাগুলো আমরা যত বড় ভাবি, অনেক আসল সমস্যার তুলনায় সেসব কিছুই না।
আর ব্যাপারটা যে কতটা সমসাময়িক সেটা বলাই বাহুল্য।

 

রাইয়ান শাফিন
কিছু জানতে পারা যাবে না জেনেও জানার চেষ্টা চালাচ্ছি, অবসরে খই ভাজি। ধন্যবাদ।