ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

ধর্ষিতা - লিখেছেন - হোসাইন মুনতাসির


আজ একদিন হলো মিতু নিখোঁজ। অন্তু আর তার বাবা পাগলের মতো খুজছে তাকে।কিন্তু এদেশে মেয়ে হারালে কি আর এতো সহজে পাওয়া যায়?পুলিশের খোঁজাখোঁজির মধ্যে আহামরি কিছু নেই।প্রতিদিন কতোজন হারায়।কতোজনকে খুঁজবে তারা?তাদের চাইতে বরং অন্তুই বেশি খুঁজেছে।হারানো বোনকে খোঁজার অস্পষ্ট যে বেদনা পুলিশ সেটা কি করে বুঝবে?

ছেলে হারলে ভয় থাকে একটা। কিন্তু মেয়ে হারালে ভয়টা দ্বিগুণ।হয় ফিরে পাবে না নতুবা ধর্ষিতাকে ফিরে পাবে।এবং আজীবন তাকে এই কুৎসিৎ শব্দটার সাথে যুদ্ধ করতে হবে।

থানা পুলিশ করেই দিনটা কাটিয়েছে জমিল উদ্দিন।অসহায় বাবা।কাকে সান্তনা দিবে? নিজেকে নাকি পরিবারকে??এইত গত জন্মদিনে মেয়েটা ফোন চেয়েছিল।দিতে পারলে আজ হয়ত তাকে খোঁজা সহজ হতো।
চার মাস ধরে টাকা জমাচ্ছেন জমিল সাহেব।

একদিন পরে এক সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।ছেলেটার নাম রাহুল।মিতুর স্কুলেই পড়ত।কলেজে উঠে ঢাকায় পাড়ি জমায়।সেদিন রাতের বিয়ের অনুষ্ঠানে সেও ছিল।মজার ব্যাপার হচ্ছে পুলিশের উত্তম মধ্যমে সে স্বীকারও করে নিয়েছে তার সাথে মিতুর চক্কর চলছিল।সবার সন্দেহ তার দিকে।নিজের গার্লফ্রেন্ডকে কেউ কেন লুকাবে??কিন্তু এই জগতে তো কাউকে বিশ্বাসও করা যায় না!
মিতুর তেমন কোন শত্রুও নেই।অবশ্য একটা মেয়ে নিখোঁজ হওয়ার জন্য শত্রুতার প্রয়োজনও নেই।

অবশেষে ৩য় দিন ভোরে নিজ বাসার গলিতেই অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায় মিতুকে।মেয়েকে ফিরে পেয়ে বিলাপ করে কান্না শুরু করে দিল মা আমেনা বেগম।জানি না সেটা কিসের কান্না।সুখের নাকি চাপা বেদনার।হাসি কান্নার এক অস্বস্থিকর পরিবেশে চোখ খুলে মিতু।বেঁচে গেছে সে।বেঁচে যাবে ভাবেনি।বেঁচে যাওয়াটা ভাগ্যের নাকি দূভার্গ্যের সেটা এখনো বুঝে নি সে।

ছেড়ে দেওয়া হলো রাহুলকে।কিন্তু জামার দাগ যত সহজে তোলা যায়।জীবনের দাগ তত সহজে তোলা যায় না।রাহুলের নামের পাশে এখনো কুৎসিত কিছু শব্দ ব্যবহৃত হয়।তবুও মিতুর সাথে দেখা করার খুব ইচ্ছে হলো তার। কিন্তু সুযোগ হয় নি।এ সমাজে প্রেমকদের পরিচয় নেই।পাছে লোকের ভয় কাটিয়ে সে চেষ্টাও করেছিল কিন্তু সম্ভব হয় নি।সে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে।কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।

মিতু বুঝতে পারে এই কয়েকদিনে তার চারপাশের পরিবেশটা অনেক বদলে গেছে।সে এখন আর মিতু নেই সে এখন ধর্ষিতা মিতু।প্রতিবাদের সুরেই হোক আর যেভাবেই হোক এই শব্দটা তাকে বার বার শুনতে হচ্ছে।তার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক প্রতিবাদ হচ্ছে।তবে সে জানে এই প্রতিবাদীদের অনেকেই হয়ত সুযোগ পেলে ধর্ষক উপাধিটা লুফে নিবে।

ওই তিন কাপুরুষের কথা সে ভাবতে চায় না।তাদের ধরতে পেরেছে পুলিশ।তাদের নিয়ে চিন্তা করবে  প্রশাসন।তবে সে হয়ত জানে না প্রশাসনের চিন্তা থাকলে নারীরা দিনে অন্তত নিরাপদে চলাফের করতে পারত।

এই কয়েকদিনে অনেককেই সে বলতে শুনেছে তার সাবধানে চলাফেরা করা উচিত।রাতে একা যাওয়া উচিত হয় নি।যদিও সে একা যায় নি।শাড়ি পরে বের হওয়া উচিত হয় নি।গাঢ় লিপিস্টিক দেওয়া তো একেবারেই উচিত হয় নি।আরো কতো কি।তাহলে কি সে অপরাধী ছিল? আর তার অপরাধের শাস্তি দিতেই এসেছিল ওই তিন সুযোগ্য বিচারক!
হঠাৎ তার রাহুলের কথা মনে পড়ে।রাহুল তাকে একবারো দেখতে এলো না?অথচ ওই সন্ধ্যায় তার সাথেই সে আবেগময় মুহূর্ত কাটিয়েছিল।আর সে তার একবারও খবর নিল না।আর কাউকে না হোক এই মুহূর্তে রাহুলকে সে আশা করেছিল পাশে।রাহুল কি তার থেকে নিস্তার পেতে চাইছে।সে কি সতিত্বের  সাথে রাহুলকেও হারালো। ধর্ষিতাকে কি ভালোবাসা যায় না?অনেক ভাবনা তার মনে।

গুরুজনেরা তো ব্যস্ত তার বিয়ে কিভাবে হবে এটা নিয়ে আলোচনায়।বেচে থাকার চাইতে বিয়ের প্রয়োজনীয়তা টাই বেশি মনে হয় তাদের কাছে।বান্ধবীরাও আসে সহমর্মিতা দেখাতে।কেউ আর আগের মতো নেই।অথচ এই মুহুর্তে সেটাই তার বেশি প্রয়োজন। তাদের প্রতিটি সান্তনার বুলি তাকে বার বার মনে করিয়ে দিচ্ছে বিভস্য ঘটনাগুলির। মিতু বাচতে চায়।ঘটনাগুলো ভুলতে চায়।সম্মান ফিরে পেতে চায়।যদিও সে জানে না তার সতিত্বে সম্মান রেখেছে কে।

সমাজ তাকে অনেকটাই ত্যাগ করেছে। তাই সেও কোন এক মধ্যরাতে সমাজকে ত্যাগ করার পদ্ধতি বেছে নেয়।
আবার দেখা হলে গল্প বলবে বলে অপেক্ষায় থাকে রাহুলেরা।

সমাজের সাথে যুদ্ধে টিকে যাক মিতুরা।হেরে যাক পোশাকে দোষ খোঁজা প্রানীরা।।


 

হোসাইন মুনতাসির
সাহায্য করতে ভালোবাসেন।জাতীয় রাজনীতিতে আগ্রহী।।