ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

শহরে আবারো অতিথি - লিখেছেন - কুশিও নবাব প্রিন্স



রাতে কখন ঘুমিয়েছি ঠিক নিজেও জানি না। আগের রাতের ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছিলো জানালা খুলে রেখে ঠান্ডা শীতল বাতাসে আমার ঘুমটা বেশ গভীর হলো।সকালে ঘুমটা ভাঙলো একটা ফোন কলের জন্য। ফোন কলটা ছিলো আমার বন্ধু রুহানের। কিন্তু সে এতদিন পর আমার খোজ কেনো করছে সেটা বুঝতে পারছি না। আমাকে কল দিয়ে বলল আজ সন্ধ্যায় তার সাথে আমার দেখা করতে হবে। সন্ধ্যায় আমার বাসার নিচে তার গাড়ি আসবে আমাকে নিয়ে যাবার জন্য। কিন্তু এতদিন পর আমাকে তার এত কিসের দরকার সেটাই বুঝতে পারছি না। গত পাচঁ বা চার বছর আগে রুহান ছিলো অতি দরিদ্র পরিবারের কিন্তু এখন সে লাখোপতি। কিন্ত কিভাবে হয়েছে সেটা আজ সন্ধ্যায় হয়তো বিষয়টা খুলে জানতে পারব। যতটুকু জানি সে অবৈধ্য কাজে জরিত ছিলো অনেকদিন। তারপরও পরিবারের অবস্থা সে সামলাতে পারে নি বলে তার এখন কেউই নেই আজ। কিন্তু হঠাৎ রুহান যে কোথায় হারিয়ে গেল ঠিক জানিও না। 
কিন্তু আমি আজও বেকার রয়ে গেলাম।  রুহানের মতো লাখপতি আর হওয়া হলো না। সবাই এখনো আমাকে অপমান করে আমার নিজের তিনতলা বাড়িকে, ' বাপের জন্মে তিনতলা বাড়ি ছাড়া আর কিছু দেখেছিস বলে মনে হয় না'! আমি বেকার হওয়া সত্ত্বেও আমি খুবই ব্যাস্ত একজন মানুষ। মানুষ অবাক হয়ে ভাবতে পারে যে বেকার মানুষের আবার ব্যাস্ততা কিসের? কিন্তু কেউ আজ পর্যন্ত এটা ভেবে আমাকে বলে নি বলেই এখনো দুটো কানকে সামলিয়ে রাখতে পেরেছি।  না হলে কবেই সমাজে মুখ বআ দেখানোর পাশাপাশি দুটো কান পচে মরতো। 
দেখা করবার কথা সন্ধ্যা সাতটায়। কোথায় যেতে হবে সেটা রুহানের ড্রাইভার ভালো জানে। এখন বাজে সন্ধ্যা ছ'টা বাজতে আরও দশমিনিট বাকি। এরকমই এক সময় বাসার নিচে সাদা ধবধবে এক ব্র‍্যান্ডের গাড়ি পার্ক করে রাখা আর সেখান থেকে হর্ণ বাজছে। বুঝতে আর বাকি রইলো না এটা রুহানের নিজস্ব গাড়ি। সে এই গাড়িতে চড়ে পুরো ঢাকাশহর ঘুরে বেড়ায়? ধারণাটা বেশ ভালো লাগছে না। কারণ লাখোপতিরাও ভাঙা রঙ ঝলসানো বাসে ঝুলে ঝুলেও যাতায়াত করে! রুহান আগে এরকমই এক ছেলে ছিলো। 
আমি বেশ সাদাসিধা পোশাক পরিধান করে বাসার নিচে নামলাম। গাড়িতে উঠতেই এলাকার মানুষ আমার দিকে যেভাবে তাকিয়ে আছে দেখে মনেই হবে আমি হয়তো বড়সড় কেউ। অবশ্য রুহানের মতো অবৈধ্য টাকা পয়সা না থাকতে পারে! কিন্তু বাবার তিনতলা পাকা বিন্ডিং আর এই বেকার জীবন যেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত রয়ে যাবে। তবুও লাখোপতি হবার স্বপ্ন দেখছি না।
জায়গাটা বেশ তেমন চিনি না ।তবে ধানমন্ডির কিছুটা ভিতরের এলাকা হবে হয়তো। রুহানের সাথে দেখা করার জন্য সে নিজে থেকেই তার প্রাইভেট কার পাঠিয়ে দিবে তা কল্পনাও করতে পারি নি,আমার বন্ধু এত ধনী ! গাড়ির ভিতর এয়ারকন্ডিশনার লাগানো। বেশ আরাম লাগছে আমার । বসার সিট কভার গুলোও যেন কেমন তুলোর মতো নরম। ইচ্ছে করছে হাত পা ছড়িয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে আমি সত্যিকারের স্বর্গে আছি। গাড়ি চলছে তার মতো করে অনেক গতিতে। জানালার বাহিরে তাকাতেই আমি অবাক। বিশাল বিশাল দালান ঘরবাড়ি অফিস আর রেস্তোরায় ভরপুর! সব কিছু মিলিয়ে নিজেকেও রাজ দরবারের রাজা হতে না পারলেও একজন সদস্য বলে মনে হচ্ছে। ইতিমধ্যে আমার তিন তলা বাড়ির কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। সন্ধ্যা হলে ছাদের পাখিগুলোদের ঘরে ঢোকাতে হত এখন সেটা আর করা হলো না আজ। তারপর সিড়িটা একটু ঝাড় দেয়া। সন্ধ্যে হলে নিজের হাতে পানি গরম করে কাপে চা ঢালা, আজ আর কিছুই হবে না। আমি আছি এখন সুখের এক দুনিয়ায়।
বসে থাকতে থাকতে ঝিম ধরে গেল । গাড়ীর ড্রাইভারকে দেখে আমার রোবটের কথা মনে পড়লো। ঠিক রোবটের মতো চুপচাপ কেমন বসে আছে গাড়ির হুইল ধরে। এদিক ওদিক গাড়ি বাক করলেও আমি নরে যাই কিন্তু সে নড়ে না। কি অদ্ভুত রে বাবা! 
"  এই ড্রাইভার তোমার নাম কি ? "
" কোন নামটা শুনতে চান ? স্যারের দেয়া নাম নাকি জন্মগত নাম? "
" তুমি মানুষটা যেমন অদ্ভুত তোমার নামের মধ্যেও কেমন একটা ছিনিমিনি ভাব আছে! জন্মগত নামটাই বলো শুনি। "
" আমার আম্মায় রাখছিলো জীবন আর স্যার রাখছে কার্ডি "
" তার মানে ? আর কোনো নাম পেল না? কার্ডি কেন রাখলো? "
" তা বলতে পারব না স্যার। র‍্যান্ডী স্যারের কোনো কাজের অর্থই আমি বুঝি না"
" এই র‍্যান্ডীটা আবার কে ? "
" স্যারের নকল নাম ।"
" বুঝতে পেরেছি তার মানে। রুহান থেকে র‍্যান্ডী আর তুই গাড়ি চালাস বলে গাড়ীর ইংরেজি অর্থ কার 'Car' সাথে ড্রাইভার এর 'D' মিলিয়ে তোর নাম রেখেছে।
ড্রাইভার ছেলেটা মাথা পিছনে হালকা করে ঘুরিয়ে বলল, স্যার আপনি কি মহাপুরুষ?
" কেনো ছোকড়া আমাকে দেখে তা মনে হয়? "
" না স্যার এমনি। আপনেরে প্রত্তম বার দেখলাম ।"
" বুঝেছি। আচ্ছা একটা সিগারেট হবে ? "
" আছে স্যার কিন্তু গাড়ির ভিতর খাওয়া নিষেধ । র‍্যান্ডী স্যারের নিজস্ব  সিগারেট একদম মেড ইন মালোশিয়া।"
" তাই নাকি ? আচ্ছা দাও আমাকে পরে খাবো।"
গাড়ি থেকে নেমেই আমি বোধ হয় রুহানকে দেখতে পেলাম। সে  এখন রুহান রুপে নেই। সে রুপ বদল করে নিজেকে বানিয়েছে র‍্যান্ডী! তার বেশভুষা দেখে পরিষ্কার বুঝা যায় সে আসলেই ধনী। রাস্তার রোড সাইডের একটি কন্ট্রকাশনের বিল্ডিংয়ের নিচের চায়ের দোকানে র‍্যান্ডী সহ আরো অনেকে তাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। সব ছেলেরাই আমারই বয়সী কিন্তু বেশভূষায় ঠিক রুহানের মতোই।
রাস্তায় তাদের পার্ক করা দামী ব্র‍্যান্ডের বাইক। কারোর গলায় সোনার রঙের চেইনের ঘড়ি, গলায় রোকেট, রাতের এই অন্ধকারেও চোখে কালো চশমা, আবার কয়েকজনের চশমা খোলা শার্টের বোতামে ঝোলানো। 
আমি রুহানের কাছে যাবার সময় বাইক গুলোর পাশ দিয়ে হেটে গেলাম ইচ্ছে করে। যাবার সময় বাইকের পার্টসগুলোর দিকে চোখ আমার কেড়ে নিতে বাধ্য করলো।
পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি কম দামী বাইকের মধ্যে কম দামি পার্টস বসানো হয়েছে। কিন্ত স্টিকার গুলো দেখে মনেই হবে এটা অবশ্যই অনেক টাকার বাইক হতে পারে, কিন্তু না।
 প্রথম সন্দেহটা এখানেই শুরু হলো কিন্তু  এর পরের সন্দেহটা এতই সুক্ষ ছিলো যে আমি নিজেই ভ্যাবাচেকা খেতে লাগলাম।
আসলে তাদের হাতে বা গলায় যে রোকেট বা সোনার চেইন, বা ঘড়ি ঝুলছিলো কোনটাই সোনার আশে পাশে ঘেঁষে যেতে পারবে না। কারণ সব গুলোই সোনার রঙের প্রলেপ প্রেরণ করা। যদি আরো সুক্ষ ভাবে দেখতে চাইলে দেখা যাবে চেইনের ভাজ গুলোয় রঙ এখনো পুরোপুরি লেগে নেই উঠে গিয়ে আসল রুপ বেড়িয়ে আসছে। 
রুহানকে দেখার জন্য আমিও ছেলেদের ভীরে ঢুকে গিয়ে একটু ভিতরে এগিয়ে গেলাম। ভিতরে যাবার সাথে সাথে আমি আসলেই অবাক! এ আমার সেই দশবছির আগের রুহান হতেই পারে না এতই পরিবর্তন? আমি কোন ভাবেই মেনে নিতে পারছি না।
“ রুহান! তুই ”
আশে পাশের মানুষগুলো দৃষ্টি ভঙ্গি থমকে গিয়ে সবাই আমার দিকে তাকিয়ে আছে তার সাথে রুহানও।
“ কেমন আসিস?”
আমি একটু হেসে বললাম, “রুহান থেকে র‍্যান্ডি! বেশ ভালো বানিয়েছিস। ”
শার্টের বোতাম খোলা এক ছেলে এসে আমাকে এক চেয়ার দিয়ে তাতে বসতে দিলো। আমি এবারে একটু শান্ত হয়ে বসে রইলাম আর তাকিয়ে থাকলাম নতুন রুহানের দিকে।
“ নামের ব্যাপারে পরে বলা যাবে। আগে বল আমাত গাড়ি,  আমার ড্রাইভারকে কেমন লাগলো?”
আমি উত্তেজিত হয়ে বললাম, “ অসাধারণ! ড্রাইভার তো নয় যেন রোবট। সে একটা সিগারেট গিফট দিয়েছে।”
 রুহান একটু হেসে বলল, “ হ্যা ছেলেটা একটু এমনই। এক কথায় হাস্যকর বা ভদ্র।” 
রুহান একটা সিগারেট বের করে পকেট থেকে এক দামী দিয়াশলাই বের করে কিভাবে যেন আগুন ধরালো। সিগারেটটা না হয় বিদেশী তার মানে দিয়াশলাইটাও বিদেশী হতেই হবে।
আমি বললাম “ এখন বল কেন ডেকেছিস?”
“জীবনে ভালো কাজের যেমন কমতি নাই তেমনি খারাপ কাজেরও না! তোর জন্য আজ একটা জরুরি মিটিং বাদ দিতে হয়েছে। আসলে ব্যাপারটা হয়েছে কি—” 
আমি রুহানের কথার মাঝখানে বললাম, “ বুঝতে পেরেছি তোমার কিসের মিটিং। দুই নাম্বারী ব্যাবসার মিটিং বাদ দিয়েছ আমার জন্যে এতেই আমি খুশি। ”
রুহান মুখ থেকে ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, “ আহা আমাকে বলতে দে আগে। মিটিং বাদ দেয়ার পিছনে অনেক কারণ আছে।”
“ কি কারন? ”
“ আমি আজ তোর সাথে পুরো শহর ঘুরব। হাটব আর সুখ খুজে বেড়াব। ঠিক যেন প্রকৃত সুখ! ”
আমি একটু বিগড়ে গিয়ে বললাম, “ পাগল হয়েছিস? এক কাজ কর পাগলের ডাক্তারের কাছে চল সব সমাধান হয়ে যাবে। নয়তো আরেকটা উপায় আছে।”
“ কি উপায়?”
“ সেটা হলো জেল হাজত! তোর যেই ধরনের অবৈধ্য ব্যাবসা তাতে করে হাজতে গিয়ে সুখ যদি খুজে পাস”
রাতের খাবারের মেনুটা রাজকীয় ছিল বলতে হবে। খাবার গুলো জীবনে প্রথমবার না দেখলেও এর আগে কখনো আঁচ চেটে দেখার সামর্থ্য হয় নি।
রুহান রাতের খাবারের জন্য আমাকে নিয়ে এক রেস্তোরাঁয় নিয়ে গিলো। খাবার গুলো দেখলেই বোঝা যায় অনেক স্বাদের। নামগুলো আমার চেনা। সেখানে ছিলো শাহী কাবাব, পোড়া এক মুরগি কিন্তু এটা যে এত স্বাদের হবে ভাবতে পারিনি। আর ছিলো নানান ধরনের পানীয়।
খাওয়া শেষে রুহান আর আমি বেরিয়ে পড়লাম। আমি দেখলাম রুহান হাতে করে কি যেন একটা নিয়ে এসেছে। একটা কাচের বোতল। এরকম বোতল সচরাচর মদের হয়ে থাকে। তবুও সন্দেহ কাটানোর জন্য রুহানকে জিজ্ঞেস করলাম।
“ রুহান এটা কি মদ নাকি অন্য কিছু?" 
“ জীবনে প্রথমবার দেখলি?”
“ না প্রথমবার নয় তবে জীবনে কখনো খাই নি।”
রুহান একটু রাগান্বিত হয়ে বলল,“ যখন খাস নি তখন আর খেয়ে দেখা লাগবে না। আর কথা না বাড়িয়ে রাস্তায় আমার সাথে হাটতে থাক চোখ যেদিকে যায়।" 
আমি আর রুহানের সাথে কোন কথায় গেলাম না। তার সাথেই হাটতে লাগলাম শহরটা। 
অজানা রাস্তা অজানা গন্তব্য। মানুষ একদিন হঠাৎ করে হারিয়ে যায়। আচ্ছা তারা কি এভাবেই চলতে চলতে হারিয়ে যায় বহুদূরে? নাকি মাঝখানে রয়ে যায় কিছু গল্প?
এখন কয়টা বাজে সেটা ঠিক অজানা। আমার হাতে ঘড়ি নেই। এখনো আমরা হাটছি। তবুও শহরে সুখ খুজে পেলাম না। সুখ মাত্রই যেন অজানা এক অদৃশ্য। যা খুজে পাওয়া খুব কঠিন।
আমাদের পাশ দিয়ে পুলিশের একটা গাড়ি চলে গেল কিন্তু একবারো আমাদের দিকে ফিরে তাকালো না। পুলিশের গাড়ি দেখার পর ভেবেছিলাম তারা আমাদের ধরে নিয়ে হাজতে ঢুকিয়ে দিলেও ভালো হতো। জেল হাজত একপ্রকার সুখের জায়গা। নতুন জায়গা। একটু কিছু উপলব্ধি পেতাম সেখান থেকে সেটা সত্য। কিন্তু জীবনে কখনো যাওয়া হয় নি জেলখানায়। আজ যদি যেতাম তবে আমি আমার বন্ধুকে ফাঁসিয়ে নিজে বেচে ফিরতাম কিনা সেটা অনেক অন্যায় হতো। তাই হয়তো সৃষ্টিকর্তা আমাদের দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছেন।
রাত আরো গভীর হতে চলল।হাটতে হাটতে আমার পা দুটো ভীষণ ব্যাথা করছে। আজ সারা রাত পুরো শহর ঘেটেও যখন সুখ বলতে কিছুই পেলাম না তাহলে আর শুধু শুধু এর পিছনে সময় ব্যায় করার কোনো মানে হয় না। আজ তো শহর ঘুরে সুখ খুজে পেলাম না। আমি মাথা ঘুরিয়ে রুহানকে জিজ্ঞেস করলাম, “ আচ্ছা কালকেও কি আমাদের আবার সুখ খুজতে বের হতে হবে।?”
“ না। আমি জানি আমি এই শহরে জীবনে সুখ খুজে পাবো না। সুখ শুধুই মাত্র মনের এক ভালো লাগার অংশ। আমি আমার জায়গায় মদ খেয়ে, দামি সিগারেট খেয়ে বেশ সুখি। আর তুই কোথায় সুখি জানিস?” 
আমি নিঃসন্দেহে বললাম, “ না জানি না।”
রুহান বলল,“তুই তোর তিন তলা বাসায় থেকে খেয়ে সারাদিন ঘুমিয়ে সুখি। তোর জায়গায় তুই সুখি। ” 
আমি উত্তরে বললাম,“ আর আমি না হয় আমার জায়গা তে সুখি। আর তুই শুধু মদ খেয়ে মাতলামো করে বয় বরং তোর যেসব অবৈধ্য ব্যবসার ডিলারগুলোর সাথে মিটিং করে সুখি।”
রুহান একটু হাসার চেষ্টা করে বলল, “ আচ্ছা বুঝেছি। সামনে একটা পুকুরপাড় আছে। জায়গাটা আমার চেনা। আমার মতো অনেক লোক পুকুরপাড়ের ঘাসে শুয়ে রাত পার করে দিলো”
আমিও রুহানের সাথে কথা না বাড়িয়ে আরেকটু হেটে গিয়ে পুকুরপাড়ে চলে এলাম। ঘাসে বসা মাত্রই শরীরের যতটুকু বল ছিলো সবটুকুই হঠাৎ করে নিমিষেই হারিয়ে গেলো। পা দুটো আর নড়াতে পারছি না। অবশ হয়ে আসছে যেন। আশেপাশে ঝিঝি পোকা গুলোর আওয়াজ তীব্র হচ্ছে তেমনি রাতের পুকুরপাড়ের জলের পাশে বসে মশার কামড় খাওয়া শুরু করে দিয়েছি। রুহানের গায়ে একটা মশাও লাগছে না।কেমন আরামে ঘাসে শুয়ে পড়লো। তাকে দেখে সুখি মানুষ মনে হচ্ছে।
এই মুহুর্তে একটা সিগারেট খেতে ইচ্ছে করলো। আমি পকেটে হাত দিতেই কিছুটা থতমত খেলাম। তার কারণ হলো সিগারেটটা নেই। কিন্তু গাড়ির ড্রাইভার আমাকে তো একটা বিদেশী সিগারেট দিয়েছিলো কিন্তু সেটা গেলো কোথায়?
হঠাৎ রুহান পাশ থেকে বলল, “ কি খুজছিস সিগারেট? ”
“ হ্যা কেনো? তুই বুঝলি কি করে?” 
“ আগে বল যখন সিগারেটটা পকেটে নিয়েছিলি ড্রাইভারের কাছ থেকে। এরপর আমার কাছে এলে আমি একটা সিগারেট ধরালাম মনে আছে?” 
“ হ্যা মনে আছে। কিন্তু সেই সিগারেট এর সাথে আমার সিগারেটের সম্পর্ক কি?” 
রুহান বলল, “ কে দিয়েছিল সেটা মনে আছে?”
“ আমি? আ-আমি দিয়েছিলাম?”
রুহান ফিকফিক করে হেসে বলল, “ হ্যা রে বন্ধু। এক কাজ কর পাসেই দেখ তাকিয়ে এক পাগল মতোন লোক মনের সুখের ধোয়া টানছে। তার কাছে হাত জোর করে বল ' আমাকে একটা সিগারেট দেবেন?আমি বাপের জন্মে এই প্রথমবার খাবো।” 
রুহান কথা  শেষ করতে না করতেই গলা ফাটিয়ে হাসতে শুরু করেছে। ছেলেটা এখনো আমাকে এভাবেই অপমান করে গেলো আর আমি তাকে প্রশ্রয় দিয়ে তার বিরুদ্ধে কিছুই বলি না। যতই হোক বন্ধু তো আমারই! হোক সে খুনি বা চোর ডাকাত! আমার পাশের বেশ বৃদ্ধ পাগল লোকটাও একজন মানুষ। তার কাছে যদি সুখ মানে মনের সুখে সিগারেট খাওয়া হয়! আমার কাছে সুখ মানে এই মুহুর্তে পুকুরপাড়ের এই ঘাসের মধ্যে হাত পা ছড়িয়ে এই জোৎস্না রাত পার করে দেয়া।


কুশিও নবাব প্রিন্স
ঢাকার এক সরকারি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছি। দর্শন এবং টুকরো টুকরো গল্প উপন্যাসের প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে তুলছি।