ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

শোষণ - লিখেছেন - কে.এম.সিয়াম


- "উঠেছিস ঘুম থেকে? আজ এত তাড়াতাড়ি?!"
-" হুম। চা দাও।"
- "রঙ চা?"
- "হুম।"
আবির দুধ চা খায় না। দুধ চা সিগারেটের সাথে ভালো লাগে। সিগারেট ছাড়া দুধ চা পানসে।
আবির চা খাচ্ছে আর ল্যাপটপে প্রেজেন্টেশন রেডি করছে।
সভ্য সমাজে চা-এর কাপে বিস্কুট ভিজিয়ে খাওয়াকে অভদ্রতা মনে করা হয়। আর ভেজানো বিস্কুট ভেঙ্গে চা-এর কাপে পড়ে যাবার পর সেটাকে আঙ্গুল দিয়ে উঠিয়ে খাওয়াকে চুড়ান্ত পর্যায়ের অভদ্রতা হিসেবে গণ্য করা হয়। আবির সেটাই করল।
সে 'তথাকথিত' সভ্য সমাজের সেট করা ভদ্রতা মানতে নারাজ। এই সমাজের নেতৃত্ব স্থানীয় মানুষেরা নিজেদেরকে ভদ্রতার মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। সেই ভদ্রতার কার্পেটে নিজেদেরকে মুড়িয়ে রেখে শোষণ করে যায় মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্ত শ্রেণিকে। আবিরের বাবাও এর শিকার। মিথ্যা মামলায় চাকরি হারিয়েছিলেন ৩ বছর আগে। ১ বছর আগে নির্দোষ প্রমাণিত হলেও চাকরি ফেরত পান নি।
৩ মাস হলো তার বাবা নেই। হার্ট অ্যাটাক! এর দায় কার-সে জানে নাহ!!

সকাল থেকেই গরম লাগছে আবিরের। পরিবেশে একটা থমথমে ভাব। আকাশ মেঘহীন আথচ ধোয়াটে।
পৃথিবীতে সবচেয়ে নাটকীয় ভাবে রঙ বদলায় পরিবেশ। কাঠফাটা রোদ থেকে ঝুম বৃষ্টিতে পরিণত হয় চোখের পলকে। খটখটে পরিবেশ নিমিষেই সজীব হয়ে ওঠে এক পশলা বৃষ্টিতে।
কিন্তু আজ তা নয়। রাস্তায় পিচ ঢালাইয়ের কাজ চলছে। একটা মাঝারি বয়সের ছেলের ওপর স্যুটেড-ব্যুটেড এক লোক চিৎকার করছে। ছেলেটা নতুন। কাজ ধরতে সমস্যা হচ্ছে তার। এর খেসারত শেষমেশ একটা চড়ের মাধ্যমে দিতে তাকে।
আবির পুরো বিষয়টা লক্ষ্য করল। অন্য সময় সে ঘটনাটা স্বাভাবিক ভাবেই নিত। এই ধরণের শারিরিক-মানসিক শোষণ মধ্যবিত্ত পরিবারের অতি পরিচিত। ছোটবেলা থেকে দেখতে থাকা শোষণের চিত্র তাদের সহ্য ক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেয়। মধ্যবিত্তরা সহজে চটে যায় না।
কিন্তু আজকের ঘটনা আবিরের মনকে বিষণ্ণ করে তুলেছে। আবিরকে ইনফিরিওর ফিল করাচ্ছে।
সে আরো কিছুক্ষণ বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকল।
- "আবির তোর ফোন বাজছে।"
- "আসছি মা।"
মায়ের মুখে মুচকি হাসি। রিমা ফোন দিয়েছে। আবিরের বান্ধবী। ঢাকা মেডিকেলে পড়ে। প্রচন্ড ভদ্র এবং মেধাবী। আবির মাকে কিছু বলে নি। কিন্তু কীভাবে যেনো মা বুঝে গেছে।
মায়েদের আশ্চর্য কিছু ক্ষমতা রয়েছে। তারা কীভাবে যেনো সবকিছু টের পেয়ে যায়!
আবির তাড়াহুড়ো করে বের হয়ে গেল ভার্সিটির উদ্দেশ্যে। প্রেজেন্টেশন জমা দিতে হবে। রিমার সাথে জমা দিতে হবে।
ঢাকা ভার্সিটির ফুটপাত গুলো অসাধারণ। নিবিড় শান্ত। গাছের মনোরম শোভা ফুটপাতকে সজীব করে তুলে। আশেপাশের হলগুলো এর সৌন্দর্য বাড়িয়ে দেয় কয়েক গুণ।
আবির হাঁটছে রিমার সাথে। কিন্তু আজ তার কথা বলার মুড নেই। তার মনে পড়ল সকালের ঘটনাটা। সেখানে কাজ করা প্রত্যেক শ্রমিকের শোষিত চেহারা।
চেহারাকে শরীরের রাজধানী বলা হয়। মানুষের সকল চিন্তা-ভাবনা রাগ ক্ষোভ ঘৃণা ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ ঘটে চেহারায়। আজ সে প্রতিটা শ্রমিকের চোখে ক্ষোভ দেখেছিল। জলন্ত উল্কা পিন্ডের ন্যায় আছড়ে পড়তে চেয়েছিল স্যুটেড-ব্যুটেড লোকটার ওপর। কিন্তু তারা দমে গিয়েছিল। তাদেরকে দমে এতে বাধ্য করা হয়েছিল।
আবির সকল্প করেছে- শোষণের বিরুদ্ধে কথা বলবার। সে হয়ত সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে যাওয়া শোষণকে মুছে দিতে পারবে না। কিন্তু সে শুরু করতে পারবে। শোষণের বিরুদ্ধে কথা বলার প্রয়োজনীয়তা সবাই উপলব্ধি করতে পারে। কিন্তু সবাই শুরু করতে পারে না। আবির শুরু করতে চায়।

আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে। আবির রিমেক নিয়ে গাছের  নিচে দাড়াল। মেঘলা হাওয়ায় রিমার সৌন্দর্য অনেক খানি বেড়ে গেল।
বৃষ্টি থেমেছে। রংধনু দেখা যাচ্ছে। আবির আর রিমা হাঁটছে। শোষিত মানুষের জীবনকে রাঙানোর শক্ত দায়িত্ব সে হাতে নিয়েছে। এ যুদ্ধে যে তাকে সফল হতেই হবে।

 

কে এম সিয়াম
সামাজিক হয়ে উঠার প্রধান শর্ত বিশ্বাস করতে পারা। লেখক বিশ্বাস করেন প্রগতিশীল বিশ্বাস দিয়ে পৃথিবী জয় করা সম্ভব।