ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

লাইক - লিখেছেন - আশরাফুল আলম প্রান্ত



নিজের প্রতি প্রচন্ড ঘৃনা জন্মেছে রাকিনের। আজকাল নিজের অপ্রাপ্তবয়সের ক্ষয়িষ্ণু প্রেমটার কথা মনে হলেই, তলপেটের আশেপাশে কামড় দেয় কেনজানি। তারউপর প্রতিদিনই কলে বলে ছলে কৌশলে রাকিনের অপ্রয়োজনীয়তা ঘোষণা করছে প্রিয়া। ডুবন্ত মানুষের শেষ ভরসার মতো রাকিন মন জয় করতে চায় প্রিয়ার। অধিকাংশ দিন হারতে হারতে সেই আশাটিরও সলিল সমাধি হয়ে যাচ্ছে।

রাকিন এবং প্রিয়ার প্রেমে পড়ার গল্পটা দূর্বল। স্কুল জীবনে অনলাইনে পরিচয়। একদিন রাস্তায় দেখা। কলেজ জীবনের প্রথম দিকে মুখবইয়ে মন দেয়া নেয়া। অলস মানুষদের গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরণের অধিকাংশ সম্পর্কই পরিণতি পায়না। সদ্য যৌবনে পা দিয়ে প্রিয়ার মনে হলো পরিণতি পাওয়াও উচিত নয়। ছেলেমানুষী সম্পর্কটা জিইয়ে রাখার বিরুদ্ধে জৈবনিক আবেগ অনুভব করতে লাগলো সে। বিশেষত আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে রাকিনকে নিজের পাশে কল্পনা করতে কষ্ট হয় তার। বেচারা মাঠে ময়দানে ব্যাটবল পিটিয়ে, চেহারার যত্ন নেয়নি সেভাবে।

রাকিন মনে মনে প্রচন্ড প্রিয়া ভক্ত। দুজনের বিশ্ববিদ্যালয় দুইদিকে হওয়ায়, সঠিক সময়েও সেভাবে দেখা সাক্ষাত করতে না পারার দুঃখটা পোষণ করে সে। আর সেদিকে প্রিয়া দেখা না করার নানা উপলক্ষ্য খুঁজে বেড়ায়। শেষমেশ সম্পর্কটা গিয়ে ঠেকেছে নেটে অ্যাক্টিভ থাকা না থাকার উপর। এমন করে কয়দিন চলে বলুন? প্রিয়াই অবশেষে পথ পরিস্কারের পরিকল্পনা করে।

ইদানিং বাজারের নতুন নিয়ম, চ্যাট করার সময় "লাইক" দেয়াটা ছোটখাট অপরাধ। কেননা, এতে করে অন্যকে "অপমান" এবং কালেভদ্রে "অবহেলা" করা বোঝায়! সুতরাং প্রিয়া উঠতে বসতে চ্যাটিং করার সময় লাইক দেয়া শুরু করলো! রাকিন শুরুতে বেশ বিব্রত এবং পরে অস্বস্তি অনুভব করতে লাগে। মৌখিকভাবে প্রিয়াকে কয়েকদিন সতর্ক করছে সে। কিন্তু সেসবের জবাবেও লাইক দিয়ে যাচ্ছে প্রিয়া। রাকিন আঁচ করতে পারে, প্রিয়া এই সম্পর্কের অবসান চায়। নাহলে লেখা দেখেও কেউ আধ ঘন্টা পরে জবাব দেয়?!  


আর পাঁচজন বোকা মানুষের মতো রাকিনের মাথায় একটা বিপদজনক বুদ্ধি কামড় দেয়।
সে একরাতে হুট বলে বসে, "আর যদি কথার মাঝে একটা লাইকও দাও, তাহলে আমি ২৪ ঘন্টার মধ্যে মারা যাবো!''
পরিচিত যে কেউই এমন কিছু শুনে চমকে যাবে। এদিকে রাকিন বিশ্ব জয়ের আনন্দ নিয়ে রঙিন স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। তার বদ্ধমূল ধারণা, প্রিয়া তাকে ভীষণ ভালোবেসে বসে আছে।
প্রিয়ার পুরো ব্যপারটা সামলে নিতে ৫০ সেকেন্ড লাগলো। এমন ডিজিটাল জুতোপেটা করার সুযোগ কিভাবে কেউ হারাতে পারে!
একদমে অনেকগুলো লাইক চেপে দিলো প্রিয়া।    


২.  


বুদ্ধিমান মানুষ ভাঙনের আগেই পালিয়ে যায়। রাকিন পালায়নি। তাই প্রিয়ার এমন আচরণে দেহের প্রতিটি অনু পরমাণুর শূন্যতা অনুভব করে সে। কিছু সময়ের ব্যবধানে নিজের জীবনের সমস্ত ব্যর্থতাকে নিখুঁতভাবে আলিঙ্গন করে ফেলে ছেলেটি। কিছুই নেই তার হাতে আর।
মনের মানুষকে নিয়ে ঘর সাজানোর স্বপ্নে বিভোর হওয়া ছেলেটির সামনে প্রমাণ হয়ে যায় যে; তার মৃত্যুদন্ড দিয়ে দিতেও মনের মানুষটি এক মিনিট সময় নেয় না।  
অনেক কিছু ভেবে ফোন অফ করে রাখে রাকিন।  


রাকিনের কাছ থেকে কোন জবাব না পাওয়ায় প্রিয়ার একটু দুশ্চিন্তা হয়। তবে জীবনের মতো জটিল বিষয়ে মানুষ প্রয়োজনে অনেক কিছুই করে থাকে। কাল সকালে রাকিন নিশ্চয়ই উদ্ভট কিছু করবে। মনকে শক্ত রেখে আশ্চর্য প্রশান্তিতে ঘুমিয়ে যায় প্রিয়া।


ফজরের পরপরই প্রিয়াদের বাসার কর্কশ কলিংবেলটা ডাক দিতে থাকে। প্রিয়ার বাবা দরজা খুলে আরেকজন পৌঢ় ভদ্রলোককে আবিস্কার করেন। প্রিয়া চুপিসারে উঁকি দিয়ে বুঝতে পারে ভদ্রলোক রাকিনের বাবা। চৌকাঠের বাইরে থেকেই ভদ্রলোক বিনয়ী সুরে প্রিয়ার কাছে রাকিনের খবর জানতে চান। সম্ভাব্য অঘটনের হাত থেকে রক্ষা পেতে প্রিয়া বলে ফেলে, অনেকদিন ধরেই নাকি রাকিনের সাথে তার যোগাযোগ নেই।
ভদ্রলোক ভয় মিশ্রিত ঠোঁটে গত রাত থেকে রাকিনের নিখোঁজ হওয়ার দুঃসংবাদটি জানিয়ে বিদায় নেন।
প্রিয়ার সারাদিন বেশ মনমরাই কাটে। সত্যি বলতে খারাপ লাগতে শুরু করে রাকিনের জন্য। রাকিনের মৃত্যু হোক, এমন কিছু তো সে চায়নি।

বিকেল বেলা রুপমের কল পায় প্রিয়া। অবাক হয়ে সে জানতে পারে যে, আজ সকালে রুপমদের বাসায় মদ্যপ অবস্থায় একটি ছেলে উত্ত্যক্ত করায় এলাকাবাসী ছেলেটিকে ভালোই জখম করেছে। এব্যপারে প্রিয়া কিছু বলতে চায় কিনা সেটাই রুপমের জিজ্ঞাসা। রুপমের মতো মেধাবী এবং হবু বিসিএস ক্যাডার একজন মানুষের সাথে রাকিন কোনদিন এমন কিছু করার সাহস পাবে সেটা ভাবতেই প্রিয়া আকাশ থেকে পড়লো। তাছাড়া রাকিন এত স্বল্প সময়ে রুপমের বিষয়টি জানলো কিভাবে? নিশ্চয়ই ক্যাম্পাসের কোন দুষ্টচক্রের কাজ! অনেক কিছুর হিসেব না মেলাতে পেরে হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিলো প্রিয়া। যা হয় হবে।  


৩.

প্রিয়ার ইচ্ছাই পূরণ হলো অবশেষে। রাকিন আর কোনদিনই প্রিয়াকে টেক্সট কিংবা কল দেয়নি। বরং প্রিয়াকেই ব্লক করে রেখেছে সবখানে। প্রিয়াও মানিয়ে নিলো। তবে অন্যায্য হলেও রাকিনের উপর একটা চাপা রাগ জমে রইলো প্রিয়ার।

সময় এগিয়ে চলে। যারা পেছনে পড়ে থাকার জন্য জন্মায়, তারা পেছনেই পড়ে থাকে। রাকিনের কি হলো সেটা প্রিয়া জানে না, জানতেও চায়নি কোনদিন। রুপমের দ্বিতীয় চেষ্টায় বিসিএস হয়ে যাওয়ায় প্রিয়ার অতীত ভুলে থাকতে বিশাল সুবিধা হয়েছে। খুব শীঘ্রই নতুন জীবনের স্বাদ নিবে এই যুগল।

এদিকে আমাদের রাকিনও কিন্তু জীবনের স্বাদ নিয়েছে।
তবে সেই স্বাদ মুখ থেকে মুছতে গিয়ে বিষ খেয়ে আত্নসমর্পন করে বোকা ছেলেটি।
অনেক অনেক গল্প, স্মৃতি এবং অনুভূতির সাথে- অন্ধকার কবরে লুকিয়ে পড়ে, সিফিলিসের গোপন ক্ষতগুলোও।


 

আশরাফুল আলম প্রান্ত
ইতিহাসনামা.কম এর তিনজন সহ-প্রতিষ্ঠাতার একজন। অতিরিক্ত স্বপ্ন দেখতে গিয়ে সময় অপচয় করা তার মুদ্রা দোষ।