ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

জাহাঙ্গীরের তরবারি - লিখেছেন - হরিপদ মাইতি



ষোড়শ- সপ্তদশ শতাব্দীর ভারতের অন্যতম শাসক ছিলেন মোগল সম্রাটরা। মোগল সাম্রাজ্যের নামজাদা সম্রাট আকবর, তাঁর পুত্র ছিলেন জাহাঙ্গীর। রাজা-বাদশার কথা বললে সুরম্য রাজপ্রাসাদ, বিলাসব্যসন, সুরা- নর্তকী, যুদ্ধবিগ্রহ, প্রসাশন, সাম্রাজ্য বিস্তার, লুন্ঠন-নির্যাতন, ইত্যাদি ব্যাপারগুলো তাঁদের জীবনের অঙ্গ হিসাবে আমাদের কাছে ধরা দেয়। সবক্ষেত্রে কিন্তু তা হয় না, অনেকের মধ্যে থাকে অপরাপর নেশা, একটা আলাদা ঐতিহ্য, ব্যক্তিত্ব ও প্রতিভা। আর এসবের খোঁজ-খবর আমরা কমই পাই। এমনই এক সম্রাট ছিলেন জাহাঙ্গীর।

অত্যধিক সুরাসক্তির জন্য দুর্ণাম ও বেগম নূরজাহানের প্রতি সীমাহীন আসক্তির জন্য অনেকে তাঁকে পছন্দ না করলেও কবিসুলভ মন, প্রকৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ- প্রেম, বিজ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা, অনুসন্ধিৎসা ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে নৈসর্গিক ঘটনা পর্যবেক্ষণে আগ্রহ তাঁর চরিত্র ও ব্যক্তিত্বকে একটা অসাধারণ মাত্রা দিয়েছিল। অদ্ভুত সব প্রাণী, নানারকম পাখি, গাছ-পালা ও ফুলের সৌন্দর্য, প্রকৃতি, স্বভাব ইত্যাদির এক উত্তম পর্যবেক্ষক ছিলেন তিনি, যার পরিচয় পাওয়া যায় স্বরচিত আত্মস্মৃতি 'তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরী'-তে।
তিনি জ্যোতিষে বিশ্বাসী ছিলেন, গ্রহের বিচরণ, রাশিচক্রে অবস্থান বুঝতেন ও আগ্রহী ছিলেন। তাঁর রাশি চিত্র সম্বলিত মুদ্রা এক অবিস্মরণীয় কীর্তি।
   
তুজুক ই জাহাঙ্গির

'তুজুক-ই-জাহাঙ্গীরী' -তে আকাশের কতকগুলি ঘটনার বর্ণনা পাওয়া যায়, যেগুলির মধ্যে অন্যতম- এক বিরল উল্কাপাতের ঘটনা। আর সে ঘটনায় তাঁর খেয়ালী মনের পরিচয়ও পাওয়া যায়। উল্কা পিন্ড দিয়ে তিনি উৎকৃষ্ট মানের ঐতিহাসিক তলোয়ার ও ছুরি তৈরি করিয়েছিলেন।

তাঁর নিজের কথায়
"তখনকার একটি অদ্ভূত ঘটনা হচ্ছে এই যে, সে বছরের (১৬২১খ্রি.) ৩০শে ফরওয়ার্দিন (সম্ভবতঃ ১০ই এপ্রিল) জলন্ধর পরগনার (পাঞ্জাবে) একটি গ্রামে প্রাতঃকালে পূর্ব দিক থেকে এক গোলমালের শব্দ শোনা যায়। শব্দ এমন যে তথাকার বাসিন্দারা সেই আতঙ্কসৃষ্টিকারী আওয়াজ শুনে প্রায় অচৈতন্য হয়ে পড়েছিল। শব্দ ও কোলাহলের মধ্যে হঠাৎ উপর থেকে মাটিতে একটি আলোর পিন্ড পড়লো। তা দেখে সকলে মনে করলো আকাশ থেকে অগ্নিবৃষ্টি হচ্ছে।
খানিকক্ষণ পরে গোলমাল বন্ধ হতে আতঙ্ক ও ভীত-বিহ্বলতার ভাব কেটে গেল এবং তখন তারা ওখানকার সমাহর্তা মহম্মদ সৈয়দের কাছে অতি দ্রুত ডাকহারকরা পাঠিয়ে ঘটনাটা জানালেন। তিনি তখুনি ঘোড়া ছুটিয়ে স্থানটি দেখতে গেলেন। লম্বায়- চওড়ায় দশ- বারো গজ জায়গা এমন পুড়ে গিয়েছিল যে সেখানে কোন সবুজ ঘাসের চিহ্ন ছিল না। তখনও আগুন ও উত্তাপ অনুভব করা গিয়েছিল। তিনি জায়গাটিকে খনন করার হুকুম দিলেন। যত খোড়া যাচ্ছে ততই বেশী তাপ অনুভূত হতে লাগলো। খুঁড়তে খুঁড়তে জায়গাটা আরও গভীর হলে এক জায়গাতে একখন্ড তপ্ত লৌহ পাওয়া গেল। তা এত গরম ছিল যে মনে হোল যে তখুনি বোধ হয় চুল্লি থেকে তোলা হয়েছে। কিছুক্ষন পরে তা ঠান্ডা হোল। তিনি সেটিকে স্বগৃহে নিয়ে একটি আবরণে মুড়ে সীল করে দরবারে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। আমার সামনেই ওটাকে ওজন করতে বললাম। ওজন হয়েছিল এক শত ষাট তোলা (প্রায় ২ কেজি)।    



আমি লোহার কারিগর ওস্তাদ দাউদকে হুকুম দিলাম তা দিয়ে একটি করে তলোয়ার, ছুরি ও ছোরা তৈরী করতে। অন্য লোহার সঙ্গে মিশিয়ে এর গুনাগুন পরীক্ষা করা হোল। ইয়ামানী ও দক্ষিণী চমৎকার সব তলোয়ারের মতো একে নোয়ানো চলে। আবার সোজাও করা যায়। আমি আমার সামনে ওটাকে নোয়াতে বললাম। উৎকৃষ্ট তলোয়ারের মতোই এটিকে দিয়ে ভালো কাটা যায়। আমি একটির নাম দিলাম 'সমসীর-ই-কাতি' (ধারালো তলোয়ার); আর দ্বিতীয়টির নাম দেওয়া হোল 'বর্ক- শিরিস্ত'( বিদ্যুতের মতো)।''

বিবাদল খান এদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে একটি চতুষ্পদী কবিতা রচনা করেন। তিনি সেটি আবৃত্তি করেছিলেনঃ-

''জাহাঙ্গীরশাহ দ্বারা পৃথিবী নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে,
তাঁর রাজত্বকালে কাঁচা লোহা বিদ্যুৎ থেকে
ভূপতিত হয়েছে।
তাঁর বিশ্ববন্দিত আদেশে সেই লৌহদ্বারা
নির্মিত হয়েছে
একটি ছোরা, ছুরিকা ও দুখানি খড়গ।
তাতে রাজকীয় বিদ্যুৎ যেন ঝলকায়।
তারিখ উৎকীর্ণ হয়েছিল হিজিরা ১০৩০ (১৬২০-২১ খ্রি.)।"  


জাহাঙ্গীর

 
জাহাঙ্গীরের ঐতিহাসিক ছোরাটি (dagger) স্মিথসোনিয়া ইনস্টিটিউট-এ সংরক্ষিত আছে।    


 

হরিপদ মাইতি