ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

দুই টাকা - লিখেছেন - শোভন আহমেদ



ছয় বছরের ছোট্ট সোনাই পলাশপুরে বাড়ি,
পাগলির ছেলে বলে তার সাথে কেউ খেলেনা;করে সবাই আড়ি।
ছোট্ট একটা মাটিময় প্যান্ট পরিধানে কেটে যায় দিন,
খালি শরীরে মাটির গন্ধে ওভাবেই থাকে দিনাদিন।
বাবা তার স্বর্গবাসি মা পাগলি বলে আখ্যায়িত,
ছোট্ট ছোপড়ির বাড়িটি পাগলির বলে সমাদিত।
সোনাইয়ের নাই বাঁধা বিপত্তি গায়ে গায়ে ঘোরে,
খাবার জন্য একেক দিন যায় একেক জনের দোরে।
প্যান্টের ভিতরে দুহাত পুরে মস্ত আইল ঘুরে,
গুলুম ফলের অমৃত স্বাদ কুড়ায় দুহাত পুড়ে।
কাকতাড়ুয়ার সঙ্গে কথা;বন্ধু ভাবে তাকে,
ছিপ দিয়ে মাছ ধরে ময়নাকাটার বাঁকে।
কাদা দিয়ে আট্ট চাট্টি খেলে
বাসন-কোসন বানায় কতো,
নাম বলে তার শেষ হবে না আছে ধরায় মতো।
এমনি করে যেতে থাকে দিনের পরে রাত,
দোরে দোরে ঘুড়ে বেড়ায় হবার আগেই প্রভাত।
হঠাৎ একদিন পথের ধারে দুটাকার নোট দেখে,
কুড়িয়ে নেয় সেটাকা আনন্দ ভরা মুখে।
একটা দোয়েল নোটের গায়েতে আরো আছে যেন কি!
লাল একটা বৃত্ত আছে যাই মাকে দেখাই দি।
ভোছুটেতে একদৌড়েতে পাগ‍লি মায়ের কোলে এসে,
হাসিমাখা মুখে পাগলি মায়ের কোলেতে এসে বসে।
ওমা,দেখ আমি টাকা পেয়েছি,
আর এখন আমি অনেক বড় রাজা হয়েছি।
এই টাকাতে তোরে কিনে দিবো সোনালী রঙের শাড়ি,
ফিন্নি-পায়েস খাবো রাতুলের মতো থাকবে সারি সারি।
তোর জন্য খোপা কিনবো অগোছালো তোর চু্ল,
রতনের মায়ের মতো কিনে দিবো রুপালি কানের দুল।
আমার জন্য প্যান্ট কিনবো জুতা কিনবো আরো,
জামার পরে জামা কিনবো তুমি গুনতে যাতে না পারো।
ইয়া বড় ঘর বানাব দোয়েল টাকা দিয়ে,
নোলকপড়া লাল ব‌উ আনবো পালকি দিয়ে।
সারা গায়ের লোককে খাওয়াব পোলাও মাংস খির,
আমাকে তখন দেখার জন্য করবে সবাই ভীর।
রতনকে তখন কিচ্ছু দিব না;ওদেয়না মোরে কিছু,
একটা লাড্ডু পাবার জন্য ঘুরি ওর পিছু পিছু।
তোর জন্য জুতা বানাব;তোর পা টা গেছে ফেটে,
হাত দুটো তোর একেবারে গিয়েছে মরার মরণ খেটে!
ওমা,বলতো এটা ক টাকা,
কেনা যাবে কি রসের গোল্লা?
সেদিন আমি চেয়েছিলাম দেয়নি দোকানি মোল্লা।
ওমা,বলতো ক টাকা এটা দোয়েল আছে একটা,
লালরঙের সূর্য‌ও যাচ্ছে এখানে দেখা।
দুর্বল শরীরে হাতে নেই পাগলিটার কোনো বল,
দুটাকার  নোট দেখে পাগলির চোখ গড়িয়ে এলো জল।
সোনাই আমার মানিক আমার তুই ই আমার ধন,
টাকা দিয়ে কি হবে,থাকবি তুই মোর কোলে সর্বক্ষণ।
স্বামী শোকে বেচারা দুখী আধ পাগলের সাজে,
পাড়ার বাড়িতে বাড়িতে দিন যায় গৃহস্থালি কালে।
সোনাই এদিকে কি কিনবে ভেবে পায়না কূল!
একটা মেয়ে আছে ওগায়েতে নাম তার বকুল।
তার জন্য নূপুর কিনবে চুড়ি সারি সারি,
ওধারেতেই থাকে সোনাই থাকে বকুলদের বাড়ি।
বকুলেই সোনাইয়ের একমাত্র সাথি আর কেউ নাই,
ওর জন্য এতো কিনবে ভাবছে সোনাই তাই।
দিনের পরে দিন কাটে ভেবে,
কেনার জন্য কাকে সঙ্গে নিবে,
নরম হয়ে গিয়েছে টাকা হাতের মধ্যে থেকে,
যায়না তো সোনাই কোথাও টাকাখানাকে রেখে।
একদিন হলো কি...
রাতে ঘুমাইতেছিলো সোনাই মাটির হাড়িতে টাকা রেখে,
সকাল বেলা চমকে উঠলো সেখানে টাকা না দেখে।
এধার খুজে ওধার খুজে টাকা নাহি পায়,
না পেয়ে অবশেষে সোনাই মাকে শুধায়।
ওমা,কোথায় গেলো মোর টাকা?
মাটির পাত্র ঢাকনা পড়া ভিতরটা পুরো ফাঁকা।
মায়ের তার জবাব নেই,
হারিয়ে ফেলেছে যে সব খেই!
সোনাই খুজে একা একা ঘরের পুরো কোণ,
খুজতে খুজতে সময় হয়ে গেছে যে কতক্ষন।
অবশেষে দুটাকার নোট ঘরের পাশে গর্তের মাঝে জুটলো,
নেংটি ইঁদুর টাকা তার করে ফেলেছে সাত টুকরো।
ও ইঁদুর ভাই,তুই কেনে করিলে এমন,
মাথায় আমার খেই আসে না করব এখন কেমন!
ওইঁদুর ভাই,দে না মোর টাকা ফিরিয়ে,
নোংরা দাঁত তোরে দিলে দেসতো নতুন গড়িয়ে।
তবে আমার টুকরো টাকা তুমি নেও এবার ,
একটা নূপুর বকুলকে স্বপ্ন আছে দেবার।
ইঁদুর ভাই,শুনতে কি পাও?
তবে টুকরো টাকা নিয়ে নতুন টাকা আমায় ফিরিয়ে দাও।    


 

শোভন আহমেদ
ঠিকানা: শিবচর, মাদারীপুর।