ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

আত্মহত্যা - লিখেছেন - বিনিয়ামীন পিয়াস




"আত্মহত্যা না করলে হয় না?" মাথার ভেতর থেকে একটা কণ্ঠস্বর প্রশ্ন করল।


আমি কোনো উত্তর না দিয়ে ফ্যানের সাথে দড়িটা টানাতে লাগলাম। ভাবনা-চিন্তার সময় বহু আগেই পেরিয়ে গেছে। মৃত্যু ব্যতীত এখন আমার আর কোনো পথ নেই।


"তুমি মারা গেলেই কী সব ঠিক হয়ে যাবে?" আমার মস্তিষ্কে বসবাসরত "বিবেক" উত্তর না পেয়ে আবারও প্রশ্ন করে।


"দেখো, সারাজীবনে আমি কখনোই তোমার দ্বারস্থ হইনি। তোমার কোনো বুদ্ধিও কাজে লাগাইনি। তো, আজ কেন মনে হচ্ছে যে আমি তোমার কথা শুনবো?" ফ্যানের সাথে দড়িটা শক্ত করে বাঁধতে বাঁধতে নিজ মনে বললাম।


"ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে 'বেটার লেট দ্যান নেভার।' আগে হয়ত শোনোনি, আজ হতে শুরু করতে তো সমস্যা নেই! মরেই যদি যাও সে সুযোগটা তো আর পাবে না," আমাকে বাঁচানোর জন্য মরিয়া হয়ে বলল।


চেয়ারের উপর দাঁড়িয়ে গলায় দড়িটা বেঁধে নিলাম। এখন কেবল ঝাপ দেয়ার অপেক্ষা। অনেকেই বলে, যাদের সাহসের অভাব তারাই আত্মহত্যা করে। কিন্তু আমার তা মনে হয় না। নিজের জীবনকে নিজের ইচ্ছায় শেষ করে দিতে অনেক সাহসের প্রয়োজন। সবার সে সাহস নেই।

"বিবেক" এর প্রশ্নের উত্তর দেয়ার সাধ্য আমার নেই। সারাজীবনে বহুবার সে আমাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু কখনোই তাকে পাত্তা দেইনি। মিতুর সাথে যখন সম্পর্কটা শুরু হয় তখনও বলেছিল,"এই অসম ভালোবাসার কী পরিণতি হবে তমাল? বিষয়টা নিয়ে আরেকবার ভেবে দেখলে ভালো হতো না?"


কিন্তু আমি ভাবার চেষ্টা করিনি। গত মাসের প্রথম সপ্তাহে যখন মিতুর বিয়ের কার্ডটা হাতে পাই তখনও কোনো কিছু ভাবার চেষ্টা করিনি। সবাই হয়ত বলবে "আরে একটা মেয়ে চলে গেছে তো কী হয়েছে, আরো কত মেয়ে আছে। ভুলে যাও, এগিয়ে যাও।" ভুলে যাওয়াটা আসলে এত সহজ নয়, এগোনোটা তো আরো নয়! 


বিয়ের কার্ডটা হাতে পাওয়ার পর মায়ের সাথে দেখা করার খুব ইচ্ছে হয়েছিল। কিন্তু বাবা বহু আগেই সে পথ বন্ধ করে দিয়েছেন। বাবার অবশ্য তেমন কোনো দোষ নেই। নিজ ধর্ম ছেড়ে একটা ভিন্নধর্মী মেয়ের প্রেমে পড়েছি, বাবা সেটা মেনে নিতে পারেননি।


এখন অবশ্য চাইলেও আর মায়ের সাথে দেখা করা সম্ভব নয়। মিতুর বিয়ে ঠিক হওয়ার কয়দিন পর জানা যায় সে প্রেগন্যান্ট। বাংলা সিনেমা হলে এ পর্যায়ে মিতুর বাবা তার মেয়েকে আমার হাতে তুলে দিতেন, কিন্তু বাস্তব এত সহজ নয়। একটা হিন্দু ছেলের দ্বারা তার মেয়ে গর্ভবতী হয়েছে এটা মিতুর বাবা হাজী মনোয়ার সাহেব মেনে নিতে পারলেন না। 


বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, "দুঃসংবাদ বাতাসের আগে ধায়।" মিতুর প্রেগন্যান্সির খবরটাও সেরকম বাতাসের আগেই ছড়িয়ে পড়ে পুরো কলোনিতে। কিছু ছেলে ছিল যারা আগে থেকেই মিতুর সাথে আমার সম্পর্কটা ভালোভাবে মেনে নিতে পারেনি, তাদের কল্যাণে এবং ফেসবুকের সহায়তায় ব্যাপারটা পুরো দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। তবে ফেসবুকে শেয়ারের সময় মিতুর সাথে আমার সম্পর্কটা ভালোবাসার বদলে বরং ধর্ষণে পরিণত হয়ে যায়।

কিছু লোকজন থাকে যারা সারাজীবন মদজিদ-মন্দিরের ধার ধারে না। কিন্তু ধর্মীয় কোনো ইস্যু পেলে লাঠিসোঁটা হাতে এরা সোচ্চার। একটা হিন্দু ছেলের দ্বারা এক মুসলিম মেয়ে ধর্ষিত হয়েছে এমন খবরে এরকম সোচ্চার কিছু মানুষ খুব দ্রুত এগিয়ে আসে। ছেলেটার ঘরবাড়ি ভেঙে, তার বৃদ্ধ মা-বাবাকে পিটিয়ে আধমরা করে তারা মেয়েটার বিরুদ্ধে ঘটে যাওয়া অপকর্মের সুষ্ঠু বিচার করে ফেলে। তাদের লাঠির মাধ্যমে দেশে আবারও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়। 


মা সেদিন রাতেই মারা যান। বাবা মারা যেতে অবশ্য একটু বেশি সময় নিয়েছিলেন। সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, মিথ্যার বিরুদ্ধে। শেষ মুহূর্তে এসে বোধহয় যমের সাথেও লড়াইটা চালিয়ে গিয়েছিলেন। তাদের লাশ দেখতে যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি। তাদের চিতায় যখন আগুন দেয়া হয় তখন আমি আমার ভাড়া বাসা ছেড়ে এক বড় ভাইয়ের বাসায় ভীতু কুনোব্যাঙের মত ঘাপটি মেরে বসেছিলাম। 


এরপরই সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলাম। আর বাঁচব না।


পায়ের নীচে চেয়ারটা ঠকঠক করে কাঁপছে, সঠিকভাবে বললে আমার নিজের পা কাঁপছে। সারাজীবন আমি কাপুরুষই ছিলাম, মৃত্যুর আগে আরো একবার তার প্রমাণ পেলাম। 


কিছুদিন আগে মিতু এসেছিলো আমার কাছে। বড় একটা ব্যাগে তার জামা কাপড়, গয়না আর যা কিছু আছে সব নিয়ে এসেছিল। বোধহয় ব্যাগভর্তি স্বপ্নও এনেছিল সাথে। "চলো তমাল, আমরা দূরে কোথাও পালিয়ে যাই," সে চোখভর্তি আশা নিয়ে বলেছিল। আমি কোনো উত্তর দেইনি। কীভাবে পালিয়ে যেতে হবে, কোথায় থাকব সব পরিকল্পনা বলে চলছিল মিতু। আমার শুনতে ইচ্ছে হয়নি। একনাগাড়ে অনেকক্ষণ বলার পর যখন সে থামে তখন আমি বলতে শুরু করি। আমার ভেতরে বেঁচে থাকা বিবেক আমাকে বাঁধা দিয়েছিল, কিন্তু আমি থামিনি। বাবা-মায়ের হত্যাকারী বানিয়েছিলাম তাকে। আরো বিশ্রী, অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করেছিলাম সেদিন। সে কোনো উত্তর দেয়নি। শুধু তার ডাগর চোখজোড়া থেকে বড় বড় অশ্রুর ফোটা ঝরছিল। 


তারপর?


তারপর এক বিকেলে সিলিং ফ্যান থেকে তার লাশ নামানো হয়। গত বৈশাখে হলুদ রঙের একটা সালোয়ার কিনে দিয়েছিলাম, সাথে লাল রঙের ওড়না। সেই ওড়নাটা গলায় বেঁধে সে মুক্তি দিয়েছিল নিজেকে। 


একে একে সবাই জীবন থেকে ছুটি নিয়ে নিচ্ছিল। কেবল আমিই ছুটি পাচ্ছিলাম না! ছোটবেলায় প্রাইমারিতে থাকতে যখন বন্ধুরা দলবেঁধে হেডমাস্টারের কাছে ছুটির আবেদন করতাম তখনও ওরা সবাই ছুটি পেলেও আমি কখনও পাইনি। কিন্তু আজ তো আর আমি সেই ছোট্টটি নেই, হেডমাস্টার ছুটি না দিলেও আজ আমার পালিয়ে যাওয়ার সাহসটুকু আছে। 


মিতুর সন্তানটা কী ছেলে নাকি মেয়ে ছিল? কেন জানিনা মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে আমার খুব জানতে ইচ্ছে করছে। ওর অবশ্য ছেলের খুব শখ ছিল। তবে আমার মনে হয়, ওর গর্ভের সন্তানটা মেয়েই ছিল। কোথায় যেন পড়েছিলাম, গর্ভে মেয়ে থাকলে মায়েদের চেহারায় এক অদ্ভুত দ্যুতি খেলা করে। মৃত্যুর আগে শেষবার যেদিন মিতু এসেছিল আমি ওর চেহারায় সেই দ্যুতি দেখেছিলাম।


পায়ের নীচের চেয়ারটা এখনও ঠকঠক করে নড়ছে। এক পা দিয়ে চেয়ারটা ফেলে দিলাম। গলায় বাঁধা দড়িটা শক্ত করে আমার কণ্ঠনালি চেপে ধরল।


আমি ঝাপসা চোখে একটা দরজা দেখতে পেলাম, আমার ঘরের দরজা নয় এটা। দরজার ওপাশে একটা সাদা পাঞ্জাবি পরে বাবা দাঁড়িয়ে আছেন, পাঁচবছর আগে দূর্গা পূজোয় তাঁকে এই পাঞ্জাবিটা কিনে দিয়েছিলাম। বাবার পাশে মা দাঁড়িয়ে, পরনে একটা টুকটুকে লাল শাড়ি। সারাজীবন একটা লাল শাড়ির জন্য আক্ষেপ করে গিয়েছেন মা, মৃত্যুর পর তাঁর সে আক্ষেপ ঘুচেছে তাহলে! তাঁদের পাশেই সেই হলুদ সালোয়ার আর লাল ওড়না পরে দাঁড়িয়ে আছি মিতু, কী আশ্চর্য, তার চোখে জল অথচ মুখে হাসি! মিতুর কোলে ফুটফুটে একটা শিশু, ছেলে নাকি মেয়ে তা ভালোভাবে দেখার চেষ্টা করলাম। কিন্তু একটা ভারী পর্দা এসে আমার চোখ ঢেকে দিল। এই মুহূর্তে আমার আফসোস হতে লাগল, আমি প্রাণপণ চেষ্টা করলাম নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে, একবারের জন্য হলেও মিতুর কোলে থাকা শিশুটার চেহারা দেখতে। কিন্তু...

 

বিনিয়ামীন পিয়াস
বিনিয়ামীন পিয়াস। পড়াশোনা করছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে। ফিজিক্সের খটমটে সূত্রগুলোকে কাব্যিক ছন্দে লেখার স্বপ্ন দেখি। একদিন হয়ত আপেক্ষিকতার সূত্রকে বিদ্রোহী কবিতার মত লিখে ফেলবো।