ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

একটি/একজন জানালা - লিখেছেন - স্রোডিঞ্জারের বিড়াল

আমি একজন পরিচ্ছন্ন নাগরিক জানালা।যতটুকু পরিচ্ছন্ন হলে জড় হয়েও "শুভ্রতা" এবং "সভ্যতা"র তফাৎ বোঝা যায়,ঠিক ততটুকুই।

"বাবা উত্তরের জানালাটায় চন্দনকাঠের কপাট দিলে হয়না?বেশ খানিকটা মফস্বলের ভাব আসবে।"
--"কিন্তু,হাল আমলের মারকারি গ্লাসে চাকচিক্যটা বেশি না?"
--"বায়রনের কবিতার "Gaudy" শব্দটা শুনেছো?আড়ম্বরপূর্ণ অথচ সৌন্দর্যহীন।"

সেই থেকে এই কণ্ঠের অধিকারী আমার সঙ্গী।আমি তার নাম জানি না,তবে দেখলে চিনি।আটপৌরে জীবন,ঝিরিঝিরি হাসি অমলতাসের মতো।গায়ে টগরের মতো গন্ধ।টগর তো?নাকি গন্ধলেবুর ঝাড়?স্মৃতিপিপীলিকারা মগজের কোষে বাসা বেঁধেছে।অবেলায় সবকিছু মনে করতে পারি না।

শুধু মনে আছে সাতসকালে স্নো পাউডারের গন্ধ আসতো,রিকশার বেলের মৃদু টুঙটাঙ,ট্রান্সমিটারের তারের উপরে দুটো চড়াই।আমার কপাট দুটো বন্ধ করে খিল এঁটে,ও  বেরিয়ে গেলে "দুপুরের আগে আর আকাশ দেখা হচ্ছে না" বলে আক্ষেপ করে তিন ব্লেডের সিলিং ফ্যানটার সাথে গল্প জুড়তাম।ফ্যানটা অবশ্য এখনো আছে,তবে প্রয়োজন ফুরিয়েছে।
তার বদলে একদিন ইনভার্টার এলো,ভেতরে কুল্যান্ট।ইনভার্টারটা রবীন্দ্রনাথ বোঝে না,আমিও ওর কনডেন্সার কিংবা কম্প্রেসরকে বুঝিনা।

সৌম সকাল পেরিয়ে যায়,কোলাহল বাড়ে।বাসে,ট্রামে,হাটবাজারে শব্দের তীব্রতা দ্বিগুণ হয়।বার্নিশ করা টেবিলে কলেজের ব্যাগটা আলগোছে রেখে ও আমার কপাট খুলে দেয়।দেবদারু চুলের গোছা বাতাসে ওড়ে,ঘামের নোনতা জল আমার গায়ে লেগে থাকে।

ভরদুপুরে শান্ত আকাশ তছনছ করে একটা চিল উড়ে যেত,উপরের কার্নিশে দুটো যুগলবন্দি পায়রা,বাম হাতের ভাজে থুতনি রাখা ষোড়শীর মনে ক্ষরণের লাল স্রোত।একদিকে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র‍্যের সংগ্রাম,অন্যদিকে আত্মবিশ্বাস বনাম আত্মসংশয়ের দ্বৈরথ,পৃথিবীকে এক ঢোকে গিলে ফেলবার বাসনা,আচমকা মানচিত্রে দ্রাঘিমা হারিয়ে ফেলার ভয়।বুকের ভেতর লাল,নীল,হলদে পাখির ডানা ঝাপটানি।নিদারুণ একা চিলটা ছোট্ট কালোবিন্দু হয়ে আসলে, "কোনো ব্যাথা নাই পৃথিবীতে" বলে ও উঠে পড়ে।সিলিং ফ্যানটার বেয়ারিংয়ে একটানা আওয়াজ হয়।

"মানুষ তো সময়ের একটা ফাংশন।তবে কী X-অক্ষ বরাবর সময়কে বসিয়ে কার্তেসীয় জ্যামিতির মত মানবজীবনের গ্রাফ প্লট করা যায়?চারটে চতুর্ভাগে দেখে নেয়া যায় জীবনের আদ্যোপান্ত?"
"কার্তেসীয় জ্যামিতি দ্বিমাত্রিক,মানুষ বহুমাত্রিক," তাকের ওপর থেকে মোটা বইটা উত্তর দেয়।
"n সংখ্যক মাত্রা" আমি বিড়বিড় করি।"2^n টা জানালা।" 

উচ্চতর মাত্রায় পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মগুলো সহজ হয়ে আসে,আর মানুষের নিয়মগুলো জট পাকিয়ে মাকড়সার জাল বোনে।ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টায়,ওর বয়স বাড়ে।পাল্লা দিয়ে মানুষ বাড়ে।মানুষ বাড়লে প্রতিযোগিতা বাড়ে।কার্নিশে ধূলোর আস্তরণ জমে।পাওয়ার স্টেশন বাড়ে,মিল,কারখানা বাড়ে।কর্পোরেট অফিস গজায়,লোকে ভাড়াবাড়ি ছেড়ে "এবার নিজ বাড়ি করব" বলে লোন নিয়ে শেষমেষ ব্যাংকের ভাড়াটে হয়ে ওঠে,কিন্তু কবিতা বাড়ে না,কমার্শিয়ালিটি বাড়ে।মানুষে মানুষে আলফা,বিটা,গামা,এপসাইলন নামধারী বৈষম্য বাড়ে।
আমার আর দুপুরে আকাশ দেখা হয়না,ও ক্লান্ত দেহটা নিয়ে সন্ধ্যের পর ঘরে ফিরে আসে,মুখে ম্রিয়মান গোধূলির ছায়া নামে।
মাঝরাত্তিরে নিস্তব্ধ,করুণ মুখে কফির পেয়ালায় ল্যাম্পপোস্টের আলো স্থির হয়ে আসে।আধখানা চাঁদ দাঁড়িয়ে থাকে নিশ্চুপ।জোনাকিরা বাতি জ্বালে নক্ষত্রের মত।উস্কোখুস্কো চুলের গোছায় উইয়ের ঢিবির মত বিষাদ গজিয়ে ওঠে।

সামাজিক সুখ নাকি অনিয়ন্ত্রিত ব্যক্তিস্বাধীনতা,কোন পথে গেছে ভালোবাসা,আবেগের নদী।প্রণয়হীন অশ্লীল সভ্যতায় রাষ্ট্র ধীরে ধীরে ডিস্টোপিয়ান ওশেনিয়া হয়।শঙ্খমালার আত্মার যত ক্ষয় হয় চোখের দৃষ্টি ততো তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে।

এখনো প্রতিদিন ভোর আসে। ধানের গুচ্ছের মত সবুজ নয়,পাথরের নিচে চাপা পড়া সবুজ ঘাসের কষ্ট নিয়ে।
এখনো রৌদ্র নিভে গেলে পাখপাখালির ডাক শুনি কিন্তু প্রান্তরের কুয়াশায় কোনো কাককে উড়ে যেতে দেখিনা।তবে ষোড়শীর মুখে,দেহে কতকগুলো রেখা দেখি।বহুক্ষণ তাকিয়ে থাকি একা।নিদ্রাহীন চোখ ধকধক জ্বলে।আমার শিয়রে বসে এক প্রৌঢ়া রমণী বলে ওঠে,

"কাজলের কালি চোখে রয়ে গেল
কলমের কালি খাতাতে
কালের কালি কালো হয়ে গেল
ইতিহাসের পাতাতে"

আশ্চর্য, এই প্রৌঢ়াকে তো আমি চিনি না।কে উনি?



 

স্রোডিঞ্জারের বিড়াল
আমি স্রোডিঞ্জারের বিড়াল হয়ে বন্দি আছি বাক্সে,পটাশিয়াম সায়ানাইডের সাথে।