ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

ভ্যাম্পায়ার ও ড্র‍াকুলা - লিখেছেন - হরিপদ মাইতি


ভ্যাম্পায়ার ও ‍ড্র‍াকুলা নিয়ে হরর-ফিল্ম হয়েছে ও হচ্ছে, রয়েছে শিউরে ওঠার মতো গল্প-উপন্যাস, ভয়ের অদ্ভুত অদ্ভুত সব ধারণা ও বিশ্বাস। কিন্তু এই ভ্যাম্পায়ার কিংবা ড্র‍াকুলার ধারণা কী এবং এলো কোথা থেকে?





একটু অনুসন্ধান করলে বুঝা যায় এর উৎস বহু প্রাচীন, তবে বিকশিত হওয়ার কাল ইউরোপের ইতিহাসের মধ্যযুগ, যা 'অন্ধকারময় যুগ' হিসাবে চিহ্নিত হয়ে রয়েছে। এই যুগটা ছিল অদৃষ্টবাদ, যাদুবিদ্যা, ভৌতিক কান্ড ইত্যাদির মতো অবৈজ্ঞানিক ধারণা বেড়ে ওঠার উপযুক্ত বা উর্বরক্ষেত্র বিশেষ। ঠিক এই সময়েই মাথা চাড়া দিয়েছিল রক্তপায়ী প্রেতাত্মার এক প্রাচীন ও ভয়ঙ্কর ধারনার সুপ্ত বীজ। তা ঘটেছিল পূর্ব ইউরোপে, বিশেষ করে বালকান অঞ্চলে স্লাভদের মধ্যে। ওরা বিশ্বাস করত রাতে কবরের কফিন থেকে পাপী ও দুষ্ট ব্যক্তির মৃত দেহ জীবন্ত হয়ে বেরিয়ে আসে রক্ত পানের আশায়, শিকার করে নিদ্রিত মানুষকে। ঠোঁটের দুপাশ থেকে বেরিয়ে আসা বিকটদর্শন ধারালো দাঁতে জীবন্ত মানুষের গলা ফুটো করে রক্তের তৃষ্ণা মিটিয়ে, আবার ফিরে যায় কফিনে।  




কফিনে সে মৃত দেহ কখন পচে যায় না, ধ্বংস হয় না। মৃতদেহকে লোহার শিক দিয়ে এফোঁড়-ওফোঁড় করলেই নাকি একমাত্র ধ্বংস করা যেত। রক্তপায়ী প্রেতাত্মার দ্বারা মানুষ ক্রমাগত রক্তশূন্য হয়ে মরে যাওয়ার পর রূপান্তরিত হয়ে যায় আরেক রক্তপায়ী প্রেতাত্মায়। এ ধরনের রক্তপায়ী প্রেতাত্মাকে স্লাভগোষ্ঠীভুক্ত রুশ কথায় বলা হত 'Upyr', যা থেকে পরবর্তীকালে এসেছে ইংরেজিতে 'Vampire' (ভ্যাম্পায়ার) কথাটি। অর্থাৎ ভ্যাম্পায়ার কথাটির প্রথম জন্ম হয় স্লাভ বিশ্বাসজাত এক ধরনের 'রক্তপিপাসু প্রেতাত্মা'কে বুঝাতে।  

প্রাচীনকাল থেকে মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার ক্রান্তীয় অঞ্চলের অধিবাসী তথা মায়া-আজটেক-ইনকাদের কাছে সুপরিচিত ছিল সত্যিকারের রক্তপায়ী এক ধরনের জীব। প্রাণীজগতে উড্ডয়নক্ষম একমাত্র স্তন্যপায়ী বাদুড়ের এক জাত "রক্তপায়ী বাদুড়"। আমাদের দেশের ফলাহারী পরিচিত বড় বড় বাদুড়ের মতোই ওরা অন্ধকারের জীব, অন্ধকারেই ওরা সক্রিয় নিশাচর প্রাণী। তবে ওদের পছন্দ পরিত্যক্ত নির্জন স্থান, দুর্গম গুহাকন্দরের ফাটল বা গর্ত। দিবালোকে জড়ের মতো নিষ্ক্রিয় ও আত্মগোপন করে থাকে, রাতে বেরিয়ে পড়ে আহারের সন্ধানে। একমাত্র খাদ্য- খাদ্য না বলে, পানীয় বলা উচিৎ, তা হল রক্ত। রক্ত হজম করার মত ওদের পাকস্থলী তৈরি। গবাদিপশু, ঘোড়া-খচ্চর, এমন কী মানুষের দেহে ধারালো দাঁত বসিয়ে এমন সৌখিনভাবে ছোট্ট ক্ষত বা ফুটো করে দেয় যে অধিকাংশ শিকার কিছুই বুঝতে পারে না। চুইয়ে আসা রক্তধারা, জিভ দিয়ে পান করে এরা।  
 


জলাতঙ্ক রোগের বাহক এইসব বাদুড়েরা তেমন বড় নয়। আমাদের দেশের কীটপতঙ্গভূক ছোট বাদুড় বা চামচিকের মতো বা তার চেয়ে সামান্য বড়। অন্যান্য বাদুড়ের থেকে এদের স্বাতন্ত্র চলার বৈশিষ্ট্যে। ভয় পেলে অন্য বাদুড়ের মত ঘুরে ঘুরে উড়ে না, কাঠবেড়ালীর মত গুহার দেওয়াল বেয়ে চোখের পলকে আত্মগোপন করে কোন গর্তে বা ফাটলে। ডানার সামনের বাহু ও পেছনের পায়ে ভর দিয়ে চতুষ্পদ প্রাণীর মত কিছুটা টলমলিয়ে, কিন্তু দ্রুত হাঁটতে পারে। নির্জন স্থানে মাঝে মাঝে এমন বিকট চিৎকার করে যে, সাহসী মানুষও ভীতি-বিহ্বল হয়ে পড়ে। এ হেন খুদে ভীতিপ্রদ স্তন্যপায়ী, কিন্তু পক্ষী সম, উড্ডয়নক্ষম রক্তপায়ী নিশাচরদের ঘিরে যে কল্পনার ঠাস বুনোনে গাঁথা নানা কাহিনী-কিংবদন্তি জন্ম দেবে, তা সহজেই অনুমেয়।

মধ্য আমেরিকার মায়া সভ্যতার মানুষ রক্তপায়ী বাদুড়কে দেখত ভয়মিশ্রিত সম্ভ্রমের চোখে, একে নিয়ে গড়ে উঠেছিল দেবকাহিনী। মায়াদের পুরাণে " অন্ধকারময় জগত " তথা পাতালপুরীর দেবতা ওই বাদুড় তথা বাদুড়-দেবতা "ক্যামাজোটস"। তাই বাদুড় অধ্যুষিত মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার অন্ধকারময় গুহা ও নির্জন স্থানগুলি ছিল মায়া, আজটেক, ইনকাদের কাছে পবিত্র।

রক্তপায়ী প্রেতাত্মা ধারণার পৃষ্ঠপোষক মধ্যযুগের ইউরোপ জানত না মায়া-ইনকাদের কথা ও রক্তপায়ী বাদুড়ের অস্তিত্বের কথা। পঞ্চদশ শতাব্দীর যবনিকা থেকে সমুদ্র বানিজ্যের অনুসন্ধান করতে গিয়ে ইউরোপের মানুষ আবিষ্কার করেছিল উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার "নতুন পৃথিবী"। আর তখনই জানতে পেরেছিল সত্যিকারের রক্তপায়ী বাদুড়ের কথা। প্রথমত আদিবাসীদের মুখে শোনা, তাই সংস্কার ও কল্পনায় পল্লবিত সত্য-মিথ্যার বাঁধনে তৈরি কাহিনী কিংবদন্তীসম। তা থেকে প্রাথমিকভাবে ইউরোপীয়দের মনে গড়ে ওঠে ভয় মিশ্রিত ধারণা। ঘুরে ফিরে রক্তপায়ী প্রেতাত্মার উদ্ভাস ও আতঙ্ক। যার ফলে অষ্টাদশ শতকে নতুন পৃথিবীর রক্তপায়ী বাদুড়ের নামের সঙ্গে জড়িয়ে
পড়েছিল ভ্যাম্পায়ার নামটি। সম্ভবত এরকম সময়েই রক্তপায়ী প্রেতাত্মার বাদুড়-রূপ কল্পিত হয়।  



'ন্যাচারাল হিস্ট্রি'-র রচয়িতা অষ্টাদশ শতকের বিখ্যাত ফরাসি প্রকৃতি-বিজ্ঞানী বুফঁকেও দেখা যায় নতুন পৃথিবীর রক্তপায়ী বাদুড়েকে ভ্যাম্পায়ার নামে অভিহিত করতে।
এরফলে অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ থেকে ভ্যাম্পায়ার কথাটি দুটি অর্থে ব্যবহৃত হতে থাকেঃ
১) স্লাভ বিশ্বাস-জাত রক্তপায়ী প্রেতাত্মাকে বুঝাতে এবং
২) নতুন পৃথিবীর রক্তপায়ী বাদুড়ের নাম হিসাবে।

পরবর্তীকালে খ্যাতনামা জীববিজ্ঞানী চার্লস ডারউইনের লেখায় রক্তপায়ী বাদুড়ের রক্তপানের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কথা পাওয়া গেল। রক্তপায়ী বাদুড় অর্থাৎ ভ্যাম্পায়ার- বাদুড়ের বিজ্ঞানসম্মত সবিশেষ পরিচয় জানা গেল বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগে। ত্রিনিদাদ দ্বীপ, মেস্কিকো, ব্রাজিল ইত্যাদি দেশে ঘোড়া-খচ্চরের মহামারির কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে ক্লার্ক, ডিটমারস, গ্রিনহল, অরমুখ বিজ্ঞানীর দুঃসাহসী গুহা-অভিযান ও গবেষণার ফলে বেরিয়ে আসে এই পরিচয়। জানা গেল নতুন পৃথিবীর ক্রান্তীয় অঞ্চলে ভ্যাম্পায়ার- বাদুড় বেশি দেখা যায়। বিজ্ঞানীরা এদের চিহ্নিত করলেন ডেসমোডাম ও ডিফাইল্যা প্রজাতির বাদুড় হিসাবে।
 কাজেই দ্বিতীয় অর্থে আমাদের "ভ্যাম্পায়ার" তথা রক্তপায়ী বাদুড়ের অস্তিত্ব সত্য হিসাবে প্রতিষ্ঠা পেল। আর প্রথমোক্ত অর্থে ভ্যাম্পায়ার অর্থাৎ রক্তপায়ী প্রেতাত্মার ধারণা কল্পনা ও বিশ্বাস-নির্ভর ভৌতিক অস্তিত্ব মাত্র।

দৈত্য-দানব-প্রেতাত্মা ইত্যাদি ভয়ংকর শক্তির প্রতি মানুষের ভীতি, আকর্ষণ চিরন্তন। আদিম যুগ থেকেই তার শেকড় মানুষের মজ্জায় প্রোথিত। আজও কমে নি, এ সব নিয়ে লেখা গল্প- উপন্যাস ও চলচ্চিত্রের প্রবল আকর্ষণ। এই ধারার এক নামকরা হরর উপন্যাস লিখে বিখ্যাত হয়ে গেছেন আইরিশ উপন্যাসিক ব্রাম স্টোকার।



উপন্যাসটির কেন্দ্রিয় চরিত্র এক ভ্যাম্পায়ার-প্রেতাত্মা। পটভূমি নির্বাচন এবং ঘটনা- পরম্পরায় টানটান উত্তেজনা তৈরিতে ব্রাম স্টোকারের মুন্সিয়ানা যুগান্তকারী। হরর- উপন্যাসটির পটভূমি নেওয়া হয়েছিল ভ্যাম্পায়ার ধারণার জন্মভূমি পূর্ব ইউরোপে তথা স্লাভ অধ্যুষিত রুমানিয়াকে। ভ্যাম্পায়ার চরিত্রটিকে ভীতিপ্রদ এক অনন্য মাত্রা সংযোজন করতে তিনি টেনে এনেছেন রুমানিয়ার সত্যিকারের এক ঐতিহাসিক নৃশংস চরিত্রকে, নাম- ভ্লাদ ড্র‍াকুলা। ইনি ছিলেন পঞ্চদশ শতকের রুমানিয়ার ওয়ালাচিয়া প্রদেশের শাসক; জন্মেছিলেন ট্র‍ান্সিলভ্যানিয়ার রাজপরিবারে, যে পরিবারের উপাধি ছিল ড্র‍াকুলা। ভ্লাদ ড্র‍াকুলার পিতার আমলে উপাধিটা চালু হয়, যিনি সাহস ও বীরত্বের সঙ্গে তুর্কিদের প্রতিহত করে "ড্রাগন" উপাধি নিয়েছিলেন। 'ড্রাগন'- কে রুমানিয়া ভাষায় বলা হয় ড্র‍াকুল বা ড্র‍াকুলা। পুত্র ভ্লাদ ড্যাকুলার নিষ্ঠুরতা ছিল ইতিহাস-খ্যাত, ইতিহাসের আতঙ্ক।

 

ওঁর সময় ওয়ালাচিয়া প্রদেশে আইনের শাসন বলতে কিছু অবশিষ্ট ছিল না, তা ছাড়া তুর্কি আক্রমণে সবসময় ছিল সন্ত্রস্ত। ভ্লাদ সুশাসন ফেরাতে আইনভঙ্গকারীদের এবং কোন শত্রুকে হাতে পেলে তাকে শাস্তি দিতেন এক নৃশংস উপায়ে। কাঠের শূলে নিক্ষেপ করে এফোঁড় ওফোঁড় করে দেওয়া হত দোষীব্যক্তির জীবন্ত দেহ। লোকে তাই তাঁকে বলত "ভ্লাদ টেপেস"। টেপেস রুমানিয়া কথা, অর্থ ইমপেলার, যেখানে ইমপেল মানে শূলবিদ্ধ করা। সন্ত্রাস দমন, শান্তিরক্ষা ও শত্রুদমনে ওঁর একমাত্র অস্ত্র ছিল ওই নিষ্ঠুর প্রাণদন্ড। একবার তুর্কি সুলতান মেহমেদ দ্বিতীয় কর্তৃক প্রেরিত দূত ভিদিনের (বর্তমান বুলগেরিয়ার অন্তর্ভুক্ত একটি স্থান) পাশাকে শূলে চড়িয়ে হত্যা করেছিলেন।

প্রতিবেশী জার্মানভাষী স্যাকসনরা ওঁকে একবার বেশ বিপদে ফেলেছিলেন। তখন কোনও ভাবে তাদের সঙ্গে বোঝাপড়া করতে না পেরে বহু স্যাকসনকে একই পদ্ধতিতে হত্যা করে ছিলেন। তাই ইউরোপে, বিশেষ করে জার্মানভাষীদের মধ্যে ক্রমে ক্রমে ওঁর নাম ছড়িয়ে পড়েছিল এক রক্তপিপাসু দৈত্য হিসাবে। ভ্লাদ ড্র‍াকুলার এই নিষ্ঠুরতার কথা লোকমুখে ফুলে ফেঁপে ঊনবংশ শতকে পরিনত হয়ে যায় এক আতঙ্কময় কিংবদন্তিতে। কুশলি ঔপন্যাসিক ব্রাম স্টোকার তাঁর উপন্যাসকে জুতসই করতে তুলে আনলেন ওই নিষ্ঠুর ঐতিহাসিক শাসককে। তাঁর হরর-উপন্যাসে ট্রান্সিলভ্যানিয়ার কাউন্ট হিসাবে দেখালেন ড্র‍াকুলাকে, যাঁর মরণোত্তর রক্তপিপাসু প্রেতাত্মা হল উপন্যাসের ভীতিপ্রদ কেন্দ্রিয় চরিত্র। উপন্যাসটির নামও দিলেন ড্যাকুলা। প্রকাশমাত্র (১৮৯৭) তা জনপ্রিয়তার শীর্ষে চলে যায়, আজও জনপ্রিয়তা কমে নি।  



উপন্যাসটির ভয়ংকর ভ্যাম্পায়ার ড্র‍াকুলা জনমানসে এমনই রেখাপাত করে যে, পরবর্তীকালে 'ভ্যাম্পায়ার-প্রেতাত্মা'-র বিকল্প নাম হিসাবে ড্যাকুলা কথাটিও ব্যবহৃত হতে থাকে।    

 

হরিপদ মাইতি