ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

মিথ্যে ফাঁসির কাঠগড়ায় - লিখেছেন - কুশিও নবাব প্রিন্স


আমি এখন হাজতের মেঝেতে শুয়ে আছি। আমার জ্ঞান ফিরেছে কিছুক্ষণ আগে। আমার হাত পা ভীষণ ব্যাথ্যা করছে । শরীর থরথর করে কাপছে ,নিঃশ্বাস নিতেও খুব কষ্ট হচ্ছে। নিজের মাথায় হাত দেয়া মাত্রই খুব গরম অনুভব হচ্ছে। জ্বর এসেছে নাকি? আসবারই কথা । সকাল থেকে পুলিশের হাতে মার খেয়েছি খুব । হাজতের দরজা লাগিয়ে দুজন অফিসার আমাকে মেরেছে খুব । আমার হাত পা বাধা ছিলো। কোনো রকম ব্যাথা সহ্য করেছি। এত মার মেরেছে কিন্তু ব্যাথ্যাগুলো  যে কিভাবে সহ্য করেছি বুঝে উঠতে পারছি না । আমার তো মরেই যাবার কথা ছিলো ! এত মার খেয়ে আমি মরে নি কেনো?


আমার লিকলিকে পাতলা খোলা শরীরটা পুরো ব্যাথা বিষে টনটন করছে । তীব্র ব্যাথা ,কিছু জায়গায় মাংস ফুলে  লাল টকটকে রক্ত জমাট বেধে আছে । জ্ঞান ফেরা পর শুনলাম পুলিশ দারোয়ান আমার জ্ঞান ফিরতে দেখে বরফ আনতে গেছে আমার জন্য । সেই পুলিশ যে গেল আর এলো  না। কোনো দেখা পাওয়াই যাচ্ছে না । তারা এভাবেই আমাকে ফেলে রেখে ফেলে ফেলতে চায় বুঝি? 
আমাকে তারা ধরে এনেছে  শুধুশুধু নয়। কারণ রয়েছে অবশ্য। সেটা হল, আমি নাকি এক রাজনীতিবিদকে তার বাসার ভিতরে ঢুকে খুন করেছি। এমনকি ধনসম্পদ লুটপাট করেছি ।আমার সাথে নাকি কিছু সঙ্গী ছিলো। তারা পলাতক বলে জানিয়েছে পুলিশ অফিসার। তাদের নাকি খোজ চলছে । কিন্ত এটা শুনে খুশি হই নি আমি । কারণ খুনটা আমি করি নি। এটা এক মিথ্যে ষড়যন্ত্র। 
দুজন পুলিশ যখন আমাকে খুব করে মারছিলো তখন চিৎকার করে বলছিলাম ,"আমি খুন করি নি। এটা মিথ্যা ষড়যন্ত্র !"
কিন্তু তারা আমার কথা শুনেনি । বরং যত বলেছি খুন করি নি ততই মেরেছে বেশি । 
এক পর্যায় তারা বলেছে আমি যদি স্বীকার না করি যে আমিই মেরেছি তাহলে নাকি আরো অত্যাচার করবে । তারা আরো অনেক কিছু বলছিলো কিন্তু আমার তা মনে পড়ছে না । কারণ তক্ষণই আমি জ্ঞান হারিয়ে মাথা ঝুকে মাটিতে বসেছিলাম ।
তারা আমাকে ফাসি দিতে চায় । এমনকি তারা আসল খুনিকে বাচিয়ে দিবে । সত্যকে ঢেকে মিথ্যা তুলে আনবে । কোর্টে আমার ফাঁসির আদেশ হবে । তারা সবাই এটাই চায়। আমার ফাসি হবে! কিন্তু এতই সহজে ? তাহলে কি সত্যের কোনো দামই নেই? এটা কি আমাকে মেনে নিতেই হবেই আমাকে ? আমি নিশ্চয়ই মেনে নিব না । 

 হঠাৎ কানে শুনলাম কেউ একজন হাজতের দরজা খুলেছে। আমি শুধু মানুষটার পায়ের জুতো দেখতে পাচ্ছি । সেটা আমার দিকে এগিয়ে আসছে । 
তারপর কেউ একজন বল, " এই  নে বরফ। আর হ্যা স্যারের আদেশ কালই দোষ স্বীকার না করলে সেই মাইর দিবো। আর যদি স্বীকার করোস তাইলে সবারই মনের শান্তি ফিরে আইবো। কিন্তু শুধু মরা মানুষ ফিরে আইবো না । !" 
আমি চোখের পাপড়ি অল্প খুলে দেখতে চেষ্টা করলাম এই পুলিশটিকে । ইনি সেই লোকটি ,যখন দুজন অফিসার আমাকে মারছিলো তখন এই লোকটী বাহিরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো । কিন্তু তাকানোর দৃষ্টি স্বাভাবিক ছিলো না । কারণ পুলিশ দাড়য়ানটির চোখে মুখে ছিলো জ্বলন্ত আগুনের মতো রাগ! আমাকে বুঝি খেয়েই ফেলবে । যেন সে যদি অফিসার হতে পারতো সে আমাকে পিটিয়ে একদম নাস্তানাবুদ বানিয়ে মেরেই ফেলত।

বরফের বাটিটি খুব কাছেই রেখে গিয়েছে । কিন্তু উঠে গিয়ে বাটিটি স্পর্শ করার মতো শক্তি নেই। তবুও আমাকে উঠতেই হবে । আমি দেয়ালে  হাত দিয়ে দিয়ে উঠবার চেষ্টা করলাম ।  বরফ গলে ঠাণ্ডা পানি হয়ে যাচ্ছে । বরফের বাটিটা  স্পর্শ করা মাত্রই হাত ছিটকিয়ে দূরে ছড়ীয়ে নিলাম । যেন আগুনের উপর হাত রেখেছি । কিছুক্ষনের জন্য হাতের তালুটা জ্বলে পুড়ে যেতে লাগলো। কিন্তু এভাবে থেমে থাকলে চলবে না । আমাকে লড়াই করে যেতে হবে ।

হাজতে বাসার মতো কাথা কম্বল নেই । আমি মেঝেতেই কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি ঠিক বুঝতে পারি  নি। উঠে দেখি আমার সামনে এক পুরোনো থালায় কিছু সাদা ভাত আর সাথে খুব অল্পখানেক সবজি আর এক গ্লাস পানি। কিন্তু এ খাবার আমার গলা দিয়ে নামবে না । আমাকে যদি মুরগির মাংস অথবা গরুর কলিজা দিয়েও ভাত খেতে বলা হোয় আমি তা খাবো না !আমি আমার স্ত্রী এবং ছেলের সাথে বসে একসাথে রাতের খাবার  খেতে চাই। আমার ছেলে আমাকে তার সারাদিনের যতসব বোকামির কান্ড শুনাবে । সেই কথা গুলো আমার শুনতে খুব ভালোই লাগবে তখন ।

আমার নাড়াচাড়া দেখে সেই পুলিশ দারোয়ানটি আবার হন্তদন্ত হয়ে এলো। এসেই বল, " খাবার খেয়ে নে। খাবার খেয়ে একটু নাদুস নুদুস দেখানো লাগবে বড় স্যারদের সামনে । নাইলে ভাববে আমরা তোরে ইচ্ছামতো মারছি। তারপর আমগো চাকরি যাইবো। "
আমি কিছুই বলতে চাইলাম না । কিন্ত কেনো যেন মাথা ঝাকালাম । তারপর পুলিশটি বললো, " মাথা ঝাকাস কেন ?কথা কইতে পারোশ না রাজারপুত নাকি? শালা শুয়োরের বাচ্চা! " 
পুলিশটা চলে যাবার আগে ভেবেছিলো তার হাতের লাঠি দিয়ে একটা আঘাত করবে আমাকে কিন্তু তা করলো না । শুধু যাবার আগে মিন  মিন করে কিসব বলতে লাগলো। 

আমি অনুভব করলাম কেউ একজন আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে । প্রথমে ভাবলাম আমি স্বপ্ন দেখছি। আমার স্ত্রী এভাবে মাঝে মধ্যে সকালে আমাকে এভাবে মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম থেকে উঠিয়ে তোলে অফিসে যাবার জন্য। কিন্তু আমার হুশ এসে পড়লো! আমি তো থানার হাজতে, এইতো শীতল মেঝেতে শুয়ে আছি। আশেপাশে কিসব ঝমঝম কোলাহল।
" কিরে শেষ ঘুম ঘুমাচ্ছিস নাকি? "
চোখ খুলতেই দেখলাম সেই অফিসারদের মধ্যে একজন হাটূ গেড়ে আমার সামনে বসে মাথায় হাত বোলাচ্ছে। আমি তাকে দেখা মাত্রই এক লাফে উঠে পড়লাম। আমাকে আবার মারবে না তো ! এবার মারলেও আমি মিথ্যে কথা বলতে রাজি হব না । দরকার হলে মারাই যাবো মার খেতে খেতে । 
" নে ওঠ যেতে হবে যে এক জায়গায়। তোর যে ফাসি হবে তা জানিস? "
আমি হালকা গলায় বলতে চেষ্টা করলাম, " আ-আমার ফাস-ফাসি কেনো হবে? আমি তো খু-খুন করি নি!? "
পুলিশ অফিসারটী হেসে বলল, " আমি জানি তুই খুন করিস নি। কিন্ত তোর বিরুদ্ধে যে কেস আছে। যে তুই খুনি! তোর ফাসি দেশের মানুষ চাচ্ছে। বুঝতে পারছিস না ?"
আমার গলা দিয়ে কথা বেরুতে চায় না । কাল থেকে এক গ্লাস পানিও খাই নি। পিপাসায় বুক ফেটে যাচ্ছে তবুও বললাম, " আমি খু-খুনি নই। এটা মি-মিথ্যা। !"

পুলিশ অফিসার কিছু সেক্রেটারি ডেকে এনে আমাকে হ্যাচকা টান দিয়ে আমার শার্ট পড়তে বললো। তারপর তারা আমাকে হাজত থেকে বের করে নিয়ে কোথায় জানি নিয়ে গেলো। আমি একোতা কাঠের উপর দাড়ালা।  কিছু কালো কোর্ট পড়া লোক আমায় দেখলো। তারপর তারা কিছু মিথ্যে কথা আমায় নিয়ে বললো। কিছুক্ষণ পর আমাকে আবার কোথাও নিয়ে যাচ্ছে। 
আমি দেখতে পেলাম ভবনের বারান্দায় আমার স্ত্রী এবং আমার ছেলে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। অঝোরে কান্না করছে। তারা কি আমায় নিতে এসেছে?  আমি কি তাহলে এখন বাড়ী যেতে পারব? কিন্তু কিভাবে?

আমাকে নেয়া হলো এক অন্ধকার ঘরে। এটা নিশ্চয়ই সেই ফাঁসির ঘর। জীবনে যারা ফাঁসির ঘর পর্যন্ত এসেছে এবং এই পরিবেশটা দেখেছে তারা আসলেই খুব সৌভাগ্যবান । আমি জীবনে কখনো ফাঁসির ঘর দেখি নি। আজ দেখব। ঘরের ভেতরটা অন্ধকার। আমি ধীরে ধীরে হেটে এক সিড়ির উপরে উঠে গেলাম । এক মোটা মতন লোক  বিশাল দেহ, মুখে মোটা গোফ, দেখতে কিছুটা দানবের মতো। আমার মাথার উপর তখন ফাঁসির দড়ি ঝুলছে । সেই দানব লোকটির বিশাল দেহ আর গোফওয়ালা লোকটি আমার দিকে এগিয়ে এসে ,আমার মুখে কালো মুখোশ পড়িয়ে দিলো । শেষ মুহুর্তে আমি দেখছি এক নিরীহ পুরুষ এক আবদ্ধ ঘরে আর্তনাদ করছে ,চিৎকার করছে আর বলছে " মিথ্যা সব মিথ্যা। আমি খুনি নই । আমি মরতে চাই না । আমাকে ছেড়ে দাও। আমাকে ছেড়ে দাও ।"

(সমাপ্ত)

 

কুশিও নবাব প্রিন্স
ঢাকার এক সরকারি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছি। দর্শন এবং টুকরো টুকরো গল্প উপন্যাসের প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে তুলছি।