ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

আলেকজান্ডার ও রুকসানা: এক অমর প্রেমকাহিনী - লিখেছেন - হরিপদ মাইতি

 


দিগ্বিজয়ী গ্রিক বীর আলেকজান্ডারের নাম সবার জানা। তিনি সংক্ষিপ্ত জীবনে যুদ্ধবিগ্রহে ব্যস্ত থেকেছেন। পাশ্চাত্য দেশ গ্রিসে ম্যাসিডনের রাজা ছিলেন আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট, তার পিতা দ্বিতীয় ফিলিপ। তাঁর মাত্র তের বছরের রাজত্বকাল (৩৩৬- ৩২৩খ্রি.) রোমহর্ষক ও দিগ্বিজয়ের ধারাবাহিক যুদ্ধে বিধৃত। এর এক পর্বে প্রাচ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দরী রুক্সানার প্রেমে পড়েছিলেন, তাঁকে দিয়েছিলেন (৩২৭ খ্রি.পূ.) প্রথমা সহধর্মিনীর মর্যাদা। সেই প্রেম কাহিনী ইতিহাস- খ্যাত। জীবনের শেষ চার বছর রুক্সানা ছিলেন তাঁর নিত্যসঙ্গিনী। দিগ্বিজয় করে তিনি পৌঁছতে চেয়েছিলেন পৃথিবীর পূর্ব প্রান্তে। ক্রমাগত তা সম্পন্ন করে সবশেষে ভারতে এসে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন স্বদেশে। পথে ব্যাবিলনে তাঁর অকাল মৃত্যু হয়।      


প্রথমে সমগ্র গ্রিসে আধিপত্য বিস্তার করে তিনি পারসিক সাম্রাজ্যের তুরস্ক জয় করেছিলেন। এই পর্বে ৩৩৩ খ্রীস্টপূর্বাব্দে বিখ্যাত ইসাস যুদ্ধে তিনি পারস্য সম্রাট দারিয়ুসের বিশাল সামরিক বাহিনীকে পরাজিত করলে দারিয়ুস পালিয়ে যান। এর পর তাঁর দিগ্বিজয় দক্ষিণে মোড় নিয়ে ৩৩২-৩৩১ খ্রি.পূর্বাব্দে গাজা, তারপর মিশর জয় করে পারসিক সাম্রাজ্যে ফিরে আসে। এই সময় সম্রাট দারিয়ুস সন্ধি করতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। ৩৩১ খ্রি.পূর্বাব্দে গগামেলা প্রান্তরে পারসিক বাহিনী আবারও পরাজিত হলে দারিয়ুস পালিয়ে যান একবাটনায় (ইরানে)। কিন্তু দারিয়ুসের পত্নী ও কন্যারা বন্দী হন। দারিয়ুসকে অনুসরণ করতে গিয়ে তিনি ইরাকের ব্যাবিলন ও হামাদানা দখল করেন। সেসময় তিনি ইরানের সুসা, পার্সেপোলিস দখল করেছিলেন। এ সময়ে পারস্য সাম্রাজ্যের বিপুল রাজভান্ডারগুলি আলেকজান্ডারের হস্তগত হয়েছিল। তাছাড়া তিনি দারিয়ুসের কন্যাদের সুসা নগরীতে মর্যাদার সঙ্গে রেখে এসেছিলেন।


ইরান ছেড়ে আরো পূর্বে আফগানিস্তানে দারিয়ুসের অধীনস্থ ক্ষত্রপ রাজ্য ব্যাকত্রিয়া অধিকার করতে অবশেষে পৌঁছান তিনি। এই প্রদেশটি হিন্দুকুশের উত্তরে আমুদরিয়া নদীর দক্ষিণে অবস্থিত। তার পাশেই প্রতিবেশী ক্ষত্রপ রাজ্য ছিল সোগডিয়ানা।

৩৩০- ৩২৭ খ্রি. পূর্বাব্দে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট, হিন্দুকুশের উত্তরে ব্যাকত্রিয়া ও সোগডিয়ানায় অভিযান চালিয়েছিলেন। এখানেই তিনি রুক্সানার প্রথম দেখায় প্রেমে পড়েন।  


ব্যাকত্রিয়া ও সোগডিয়ানা রাজ্য অভিযানে বাস্তবে তিনি প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হন। ব্যাকত্রিয়ার ক্ষত্রপ ছিলেন বেসাস। সেখানে তখন একবাটনা থেকে আরো পূর্বে ব্যাকত্রিয়ায় এসে আশ্রয় নিয়েছেন সম্রাট দারিয়ুস। কিন্তু বেসাস ও দারিয়ুসের মধ্যে পারস্পরিক মতভেদ হলে দারিয়ুসকে বেসাস হত্যা করেন। তখন আলেকজান্ডার নিজেকে সমগ্র পারসিক সাম্রাজ্যে-র 'সাহেনশা' হিসাবে ঘোষনা করেন।  এরপর ক্ষত্রপ বেসাসকে (৩২৯ খ্রি.পূ.) আলেকজান্ডার পরাজিত ও হত্যা করলে ব্যাকত্রিয়া তাঁর করায়ত্ত হয়ে যায়।    


আলেকজান্ডার এবারে সোগডিয়ানের দিকে নজর দেন। তখন জীবিত ছিলেন বেসাসের এক সহচর ও অভিজাত ব্যক্তি অক্সিয়ার্টেস। সেখানে অক্সিয়ার্টেস বিদ্রোহী হয়ে উঠেছেন। তিনি সোগডিয়ানার অভিজাতবর্গের একাংশের সঙ্গে আলেকজান্ডারের বিরোধিতায় নেমে পড়েন। তাঁরা আত্মীয়-পরিজন, সোগডোয়ানবাসী ও পর্যাপ্ত সশস্ত্র সেনা, কয়েক বছরের রসদ নিয়ে সোগডিয়ানার খাড়া, উঁচু পাহাড়ের শিখরে দুর্গম্য দুর্গে আশ্রয় নেন। (ব্যাকত্রিয়ার উত্তরে) সোগডিয়ানায় কেন্দ্রীভূত বিদ্রোহ দমনে আলেকজান্ডার সদলবলে ৩২৭ খ্রি. পূর্বাব্দের বসন্ত কালে সেখানে উপস্থিত হন।      



সোগডিয়ানা রকেই বিদ্রোহীদের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে। সে সময় গোটা পাহাড় সাদা তুষারে মোড়া। অতি খাড়া পাহাড়ের সুউচ্চ শিখরে দুর্গকে ঘিরে সহস্র সহস্র সোগডিয়ান সেনার হেলমেটে সূর্যালোক ঠিকরে পড়ছে। তুষার আবৃত খাড়া পাহাড়ের চূড়ায় সুরক্ষিত দুর্গে বসে ক্ষণে ক্ষণে তাদের ধনুক থেকে তীরের বর্ষণ নেমে আসছে। এরকম দুঃসাহসী একগুঁয়ে জাতির সম্মুখীন কখনো হননি আলেকজান্ডার। পাহাড়ের চূড়ায় ওঠা দুঃসাধ্য দেখে এক সময় আলেকজান্ডার সোগডিয়ানদের আত্মসমর্পন করতে বললেন।

তারা হুঙ্কার ছেড়ে বলল, সোগডিয়ান দুর্গ জয় করবে এমন বীর পুরুষ এখনো জন্মায় নি পৃথিবীতে, তোমাদের কারো যদি পাখির ডানা গজিয়ে থাকে তবে উড়ে এসো।


একযোগে ঠাট্টার হাসি হেসে সোগডিয়ানরা চলে যায় দুর্গের অভ্যন্তরে, তখন সন্ধ্যা আসন্ন প্রায়। রাতের অন্ধকার নেমে এল। অক্সিয়ার্টেস আপন মনে ভাবে তাঁর স্বদেশের কথা --- সমরখন্দ, বোখারা, বলখ, আমুদরিয়া (অক্সাস) ও সিরদরিয়ার তীরে তাঁর জাতিগোষ্ঠী প্রতিবেশীর কথা। শৈশব, কৈশোর, যৌবনের স্বপ্নময় দিনগুলির কথা। ভিন দেশী বীর অভিযানের পথে সবকিছু তছনছ করে, নামকরা যোদ্ধাদের পরাজিত করে এখন এসেছে সোগডোনিয়া রাজ্যে। নিজ অঞ্চল ব্যাকট্রিয়া থেকে তিনি এখন এই দুর্গে আশ্রিত।


এদিকে পাশ্চাত্যের গ্রিক বীর ভাবছেন, তিনি অনায়াসে কত রাজ্য আক্রমণ অধিকার করে ঝড়ের গতিতে এগিয়ে এসেছেন। কিন্তু এই প্রতিরোধে আজ তিনি বিপর্যস্ত। তাঁর চরিত্রে নতি স্বীকারের কোন ভূমিকা নেই। তিনি গ্রিক সেনাবাহিনীকে (হেলেনিক লিগ) আহ্বান করে জানালেন, তোমাদের মধ্যে পর্বতারোহনে পটু বাছাই করা সেনারা এগিয়ে এসো, পাহাড়-শীর্ষের দুর্গে পৌঁছতে পারলে মূল্যবান উপহার তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। তিনশো সেনা এগিয়ে এলো।

শক্ত দড়ি ও লোহার আঁকশি নিয়ে সন্ধ্যা নামা পর্যন্ত অপেক্ষা করলো সৈন্যরা। তারা জ্বলজ্বল করছে আকাশে, সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, এমন সময় সেনারা পাহাড় বেয়ে অভিযানে নেমে পড়ল। পাহাড়ের গায়ে জমা বরফের গভীরে ডুবে ও পাহাড় পিছলে ত্রিশ জন সেনা মারা গেল। অবশিষ্ট সবাই ভোর বেলায় দুর্গে পৌঁছে যায়। গ্রিক শিবিরে তখন হর্ষে ফেটে পড়ছে। হতভম্ব অক্সিয়ার্টেস ও তাঁর দলবলকে দেখিয়ে দেওয়া হল পাখা গজানো গ্রিক যোদ্ধাদের, প্রয়োজন হলে যারা উড়তে পারে। কিছুক্ষনের মধ্যেই গোটা দুর্গ গ্রিকবাহিনী হাতে চলে যায়।    



অধিকৃত সোগডিয়ানার দুর্গে ভ্রমন করছেন তরুণ গ্রিক বীর আলেকজান্ডার। উপস্থিত হলেন অক্সিয়ার্টেসের আঙ্গিনায়, এক মেয়ে দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে। সে ব্যাকট্রিয়ার সম্ভ্রান্ত অক্সিয়াটেসের কন্যা রুক্সানা! তার উড়ন্ত একরাশ কেশদামে সূর্যালোকে স্বর্ণপ্রভার ঝিলমিল করছে, সুন্দর আঁখিতে জ্বলজ্বলে তারকার ঝিলিক; যেন সৌন্দর্যের প্রতিমা দেবী স্বয়ং অ্যাফ্রোদিতি তাঁর সামনে আবির্ভূত।

এ কী অপরূপ সৌন্দর্যের প্রতিমা! বহু দেশের সুন্দরী দেখে অভ্যস্ত থাকলেও, কেন জানি এই সোগডিয়ান রূপসীকে দেখে আলেকজান্ডারের চোখ আটকে গেল। 'রুক্সানা' মানে আকাশের "উজ্জ্বল ছোট্ট তারা"। ঠিক যেন সে রকম তারা হয়েই বীরের চোখে ভেসে রইলো রূপসী রুক্সানা। প্রথম দেখাতেই রুক্সানার প্রেমে পড়লেন গ্রিক বীর আলেকজান্ডার।    

       


সুদূর গ্রিস থেকে আগত বীর আলেকজান্ডার বুঝতে পারেন, দূর প্রাচ্যের রাজ্য করলেই বশে আনা যাবে না, তাদের সঙ্গে সেতু বন্ধ রচনা করতে হবে। তিনি রুক্সানার পিতা অক্সিয়ার্টেসকে ব্যাকট্রিয়া (মূলত উজবেকিস্তানের সমরকন্দকে আশ্রয় করে অঞ্চল) সহ বর্তমানের আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে বিশাল প্রদেশের ক্ষত্রপ নিযুক্ত করলেন। তিনি সোগডিয়ানা পোষাক পরিধান করতে নিজের সেনাদলকে নির্দেশ দেন।


সেনাপ্রধান ও স্বদেশের পরিজনদের পরামর্শকে অগ্রাহ্য করে আলেকজান্ডার সোগডিয়ানার 'ছোট্ট তারা' ‍রুক্সানাকে প্রথম স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করার জন্য মনস্থির করলেন। স্থানীয় প্রথানুসারে এক টুকরো রুটি তলোয়ার দিয়ে কেটে বর ও কনেকে খাওয়ানোর মাধ্যমে বিবাহ (৩২৭খ্রি.) সুসম্পন্ন হল; সাথে বিয়ের দিনে দশ হাজার গ্রিক সৈন্য স্থানীয় কন্যাদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলেন। নিয়মানুসারে বাসর শয্যায় নতমুখে বসে-থাকা রূপসী রুক্সানাকে ফুলের মালা গলায় দিয়ে বরণ করে নিলেন পাশ্চাত্যের বীর প্রেমিক।    

     


তরুণ গ্রিক বীর শৌর্য- বীর্যে প্রতিভাধর যোদ্ধা। বিশাল সাম্রাজ্যের অধিশ্বর, আর প্রস্ফুটিত কমলের মতো, উন্মুখ সদ্য যৌবনের সৌন্দর্যে ভরপুর অনুপম প্রতিমা, স্বর্নকুন্তলা রুক্সানা। এই অনবদ্য প্রেমিক জুটি তুলনাহীন। এ হেন প্রেমিক জুটিকে নিয়ে বিখ্যাত ইতালির চিত্রশিল্পী পিয়েত্রো রোটারি অঙ্কিত (১৭৫৬খ্রি.) প্রসিদ্ধ রঙিন চিত্র 'আলেকজান্ডার ও রুকসানার বিয়ের দৃশ্য' অতি মনোজ্ঞ ও অপূর্ব।

এশিয়া- ইউরোপের খ্যাতনামা রুশিয়ান সম্রাজ্ঞী দ্বিতীয় ক্যাথরিনের (১৭৬২-১৭৯৬খ্রি.) রাজগৃহের অন্দর মহলের অলংকরণে রচিত হয়েছিল এই চিত্র। এই চিত্রে যৌবনদীপ্ত প্রেমিক জুটির এক চিত্তাকর্ষক আবেদন ফুটে উঠেছে, যা বিরল ও সুন্দর।



কিছু দিনের মধ্যে রুকসানা বুঝতে পারেন দিগ্বিজয়ে ব্যস্ত প্রেমিক পুরুষ যে প্রেম- ভালোবাসা দিয়ে তাঁকে বরণ করে এনেছিলেন তা স্তিমিত। তাঁর সর্বক্ষণের সহচর এক পাশ্চাত্য যুবক হেফাস্টিয়নের প্রতি আলেকজান্ডারে গভীর অনুরাগে রুকসানার হিংসে হত। বাস্তবে রুকসানার মধ্যে শুধু এক অপরূপ সৌন্দর্যের নারীকে দেখেননি আলেকজান্ডার, তিনি তাঁর মধ্যে দেখেছিলেন এক বীরাঙ্গনা রূপসী কন্যাকে। তাই বিজিত বিশাল সাম্রাজ্যের বংশধরের জননীর আসনে বসাতে রুকসানাকে অতলান্ত প্রেমে আপ্লুত করেছিলেন। তাঁর অন্তরে রুকসানার প্রতি প্রেমের ফল্গুধারা এখন নীরবে প্রবাহমান। দিগ্বিজয় আরো বাকী, সারা পৃথিবী জয় করতে হবে। যুদ্ধবাজ বীর দিগ্বিজয়ে এখন মন দিয়েছেন, পাড়ি জমালেন আরো পূর্বে ভারতে।


ম্যাসিডনে জন্মেছিলেন আলেকজান্ডার, মা অলিম্পিয়াস। অলিম্পিয়াস কখনই স্বীকার করতেন না, বহু স্ত্রীর অধিকারী ফিলিপ আলেকজান্ডারে প্রকৃত পিতা। বছরের পর বছর ছেলেকে বুঝিয়েছেন আলেকজান্ডার অলিম্পাসের দেবরাজ জিউসের বরপুত্র। তাঁরই করুণায় পেয়েছেন তিনি পুত্রকে। দার্শনিক অ্যারিস্টলের ছাত্র, পৌরাণিক চিন্তা-ভাবনায় বিশ্বাসী মা'র আদরে আলেকজান্ডার বেড়ে উঠেছিলেন আলাদাভাবে। প্রিয় লেখক হোমারের কবিতা পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে পড়তেন। অ্যারিস্টলের মানচিত্র স্বপ্ন দেখাত বিশ্বজয়ের। শৈশবের সেই মনোবাসনা থেকে যে বিশ্বজয়ের শুরু, তা এখনো বাকি। সে অভিযানে তাঁর পাশে এখন পত্নী রুকসানা।  


৩২৬ খ্রি. পূর্বাব্দে আলেকজান্ডার ভারতে এলে তক্ষশিলার রাজা অম্ভি বিনাযুদ্ধে আত্মসমর্পণ করেন। ছোট ছোট অনেক রাজ্য জয় করে ঝিলাম ও চন্দ্রভাগা (চিনাব) নদীর মধ্যবর্তী স্বাধীন পুরু রাজার সম্মুখীন হন। সেখানে এক ভারতীয় জাতির সাহস, দুর্ধর্ষ হস্তি বাহিনী ও সেখাকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে বিস্মিত আলেকজান্ডার ঝিলাম নদীর তীরে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, "কি বিচিত্র এই দেশ সেলুকাস।"

সেনাপতি সেলুকাস উত্তর দিয়েছিলেন, "সত্যই বিচিত্র এই দেশ আলেকজান্ডার মি লর্ড।"  


৩২৬ খ্রি. পূর্বাব্দে ঝিলাম (হিদাসপিস) যুদ্ধে তুমুল লড়াই করে স্বদেশপ্রেমী পুরু বন্দী হলে তাঁর বীরত্ব ব্যাঞ্জক কথায় মুগ্ধ আলেকজান্ডার পুরুকে রাজ্য ফেরৎ দেন। এরপর আলেকজান্ডার ভারতের সবচেয়ে শক্তিধর মগধের ধননন্দেকে আক্রমন করার মনস্থ করেন। বহুদিন ধরে যুদ্ধে ক্লান্ত গ্রিক সেনারা ধননন্দের বিশাল সেনা ও দুর্ধর্ষ হস্তিবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধে উৎসাহিত নয়, দেশে ফিরে যেতে মরিয়া। নিরুপায় আলেকজান্ডার স্বদেশ অভিমুখে ফিরতে শুরু করেন।


৩২৫ খ্রি. পূর্বাব্দে বেলুচিস্তান হয়ে ৩২৪ খ্রি. পূর্বাব্দে ইরানের সুসা নগরীতে উপস্থিত হন। পারসিক সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে তিনি আকৃষ্ট ছিলেন। পারসিক মানুষ ও সংস্কৃতির সাথে একাত্ম হতে আলেকজান্ডার নিহত পারসিক সম্রাট দারিয়ুসের এক কন্যা স্ট্যাটাইরাকে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী এবং খুড়তুতো-কন্যা প্যারিস্যাটিসকে তৃতীয় স্ত্রী হিসাবে বিয়ে করেন। শুধু তাই নয়, দারিয়ুসের অপর কন্যা ড্রাইপেটিসের সাথে তাঁর একান্ত বন্ধু, কমান্ডার তরুণ হেফাস্টিয়নের বিবাহ সম্পন্ন হয়। এছাড়া হেলেনিক বহু সেনা (১০,০০০) পারসিক নারীর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। ইতিহাসে এই পর্ব 'সুসা-বিবাহ' নামে পরিচিত। পারসিক বহু সেনা ও সরকারী কর্মীকে নিজের সেনাবাহিনী ও প্রশাসনে নিযুক্ত করেছিলেন। এরকম ভাবে পারসিক সংস্কৃতি ও পারসিকদের তিনি একান্ত আপন করে নিয়েছিলেন। এতে হেলেনিক ও প্রাচ্য সংস্কৃতি-শিল্পের অভূতপূর্ব মিশ্রণ ঘটেছিল, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। সম্রাটের পার্সি বেশভূষা, সখ্যতায় অভীভূত সেখানকার জনগন তাঁকে এক মহান সম্রাটের আসনে বসিয়েছিলেন।  


আলেকজান্ডার সুসা থেকে ইরানের একবাটনায় আসেন। সেখানে হঠাৎ হেফাস্টিয়নের মৃত্যু (৩২৪ খ্রি.পূ.) হয়। প্রাণের বন্ধুর আকস্মিক বিয়োগে আলেকজান্ডার শোকে উন্মাদ- প্রায় হয়ে গিয়েছিলেন। হেফাশ্চাইনের মৃত্যুর জন্য সন্দেহের তীর তাঁর পত্নী রুকসানার দিকে বর্তায়। তিনি রুকসানাকে বলেন, আর কখনো আমাকে স্পর্শ করবে না। এতে রুকসানা মানসিকভাবে অত্যন্ত আহত হয়েছিলেন হেফাস্টিয়নের মৃত্যুর শোক কাটিয়ে আলেকজান্ডার আরব আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। কিন্তু সে সুযোগ আর হয়ে উঠে নি।

     


৩২৩ খ্রি. পূর্বাব্দে বর্তমান ইরাকের ব্যাবিলনে (বর্তমান বাগদাদের ৯৪ কিমি দক্ষিন- পশ্চিমে) অসুস্থ হয়ে পড়েন। দ্বিতীয় নেবুচাদনেজারের রাজপ্রাসাদে আলেকজান্ডারকে দূরারোগ্য জ্বরে পেয়ে বসে। তাঁর অবস্থা এমনই বিপজ্জনক হয়ে উঠে যে, কোনো বৈদ্যের ঔষধ কাজ করছে না। তাঁর পীড়া এতই তীব্র হয় যে, আত্মহত্যার জন্য প্রায়শ অনুগত ভৃত্যদের তরবারি চাইতেন। সে সময় সব অভিমান ভুলে প্রথমা মহিষী রুকসানা তাঁর শয্যার পাশে থাকতেন নিত্য সঙিনী হিসেবে। সযত্নে সেবা-পরিচর্যা করতেন।

সান্ত্বনা দিতেন, আত্মহত্যাকে মনে স্থান দিতে নেই ; ভেঙে পড়ো না, সুস্থ হয়ে যাবে। কিন্তু নিয়তিকে রোধ করা সাধ্যাতীত। একদিন রুকসানার কোলেই মাথা রেখে তাঁর মৃত্যু হলো (৩২৩ খ্রি.পূ.)। রুকসানার নয়নে অশ্রুধারা অঝোরে বয়ে যাচ্ছে, অশ্রুভেজা নয়নে প্রিয়তমাকে শেষ চুম্বন এঁকে দিয়ে প্রিয়তম বীরপুরুষের দিকে চেয়ে থাকেন নির্নিমেষ দৃষ্টিতে। আত্মার চিরশান্তি কামনা করেন। রুকসানার গর্ভে তখন মহান বীর আলেকজান্ডারের বহু প্রার্থিত স্বপ্নের সন্তান।    


বিশাল সাম্রাজ্যের অধীশ্বর হওয়ার জন্য আলেকজান্ডারের সেনাপতি, বন্ধু ও পরিবারের সদস্যদের তথা 'ডায়াডিক' বা উত্তরাধিকারীর মধ্যে ষড়যন্ত্র, হত্যা শুরু হয়ে যায়। পত্নী রুকসানা, আলেকজান্ডারের অপর দুই স্ত্রীকে (স্ট্যাটাইরা ও প্যারিস্যাটি) হত্যা করতে দ্বিধা করলেন না। রুকসানার সন্তান জন্ম হয়েছিল ৩২৩ খ্রি. পূর্বাব্দের আগস্টে, নাম চতুর্থ আলেকজান্ডার। আলেকজান্ডারের মা অলিম্পিয়াসের তত্ত্বাবধানে রুকসানা ও শিশু- পুত্র ম্যাসিডনে থাকতেন।

আলেকজান্ডারের এক ম্যাসিডনিয়ান জেনারেলের পুত্র ক্যাস্যান্ডার ম্যাসিডন অধিকার করে (৩১৬ খ্রি.পূ.) শাসন করতে শুরু করেন। নিজেকে নিশ্চিন্ত রাখতে সাম্রাজ্যের সরাসরি একমাত্র উত্তরাধিকারী চতুর্থ আলেকজান্ডার ও রুকসানাকে অ্যাম্পিফোলিসে নজরবন্দী করে রাখেন।


তীব্র ডায়াটিক- সংঘর্ষের (৩১১ খ্রি.পূ.) পর কাগজে-কলমে এক শান্তি চুক্তি সম্পাদিত হয়, যেখানে উল্লেখ থাকে বয়োঃপ্রাপ্ত হলে চতুর্থ আলেকজান্ডার হবে সাম্রাজ্যের অধীশ্বর। এতে প্রমাদ গুনলেন ক্যাস্যান্ডার, যার পরিনামে নজর বন্দী-থাকা রুকসানা ও পুত্র চতুর্থ আলেকজান্ডারকে হত্যা (৩১০ খ্রি.পূ.) করা হয়।


রুকসানা; আকাশের ছোট্ট উজ্জ্বল তারা, খসে পড়লো। আগেই আলেকজান্ডার গত হয়েছিলেন; পরে মা অলিম্পিয়াস, প্রাণের বন্ধু হেফাস্টিয়ন, পত্নী প্রাচ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দরী রুকসানাও অস্তমিত। সেই সঙ্গে বহু আকাঙ্ক্ষিত পুত্র, একমাত্র বংশধর, জ্বলে থাকা শেষ প্রদীপ এক নিমেষে নিভে গেল। ইতিহাসের এক মহান অধ্যায়ের যবনিকা ঘটল।


আলেকজান্ডারের বিশাল সাম্রাজ্য বিভক্ত হয়ে যায় তাঁর মুখ্য সেনাপতিদের মধ্যে। এক সেনাপতি নিলেন ম্যাসিডনিয়া রাজ্য, প্রাচ্য দেশের সিরিয়া থেকে ব্যাকত্রিয়া প্রদেশ সেনাপতি সেলুকাসের ভাগ্যে পড়ল, তাঁর বংশধরেরা সেলুসিড রাজবংশ বলে ইতিহাস-খ্যাত। মিশর দেশ ও তার আশেপাশের অঞ্চল পেলেন সেনাপতি টলেমি।


ইতিহাসের ধারা আপন গতিতে চলতে থাকে, সে কখনো থামে না। স্মৃতি থেকে যায় হেলেনিস্টিক সভ্যতা-সংস্কৃতি ও তার আশ্চর্য, চোখ-ধাঁধানো শিল্প-স্থাপত্য-ভাস্কর্য, প্রতিষ্ঠিত পীঠস্থান আজও আলেকজান্ডারের স্মৃতি ধরে রেখেছে; "আলেকজান্ডার-রুকসানার প্রেম" এসবকিছুর মাঝেই ইতিহাসের পাতায় জেগে আছে এবং থাকবে।      

হরিপদ মাইতি