ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

ভিন্নমাত্রিক মৃত্যু - লিখেছেন - বিনিয়ামীন পিয়াস



শুরুর শেষ:

ল্যারির মনে হচ্ছে সবকিছু শূন্যে হারিয়ে যাচ্ছে, সে বারবার ভাবতে চেষ্টা করে এটা একটা স্বপ্ন, সব ঠিক হয়ে যাবে। একটা ভারী পর্দা যেন ঢেকে দিচ্ছে তার অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ, তার অস্তিত্ব যেন মিশে যাচ্ছে শূন্যে!


১. 

প্রফেসর হেনরিক একটু পাগলা কিসিমের লোক। যখন যা করতে ইচ্ছে হয় তাই করে। উদ্ভট সব আবিষ্কার রয়েছে তার নামের সাথে। কিন্তু তবুও এই শতকের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানী হিসেবে বিজ্ঞানী মহলে তার নামটা বেশ সমাদৃত। স্ট্রিং থিওরি নিয়ে কাজ করছেন, মাল্টি ডাইমেনশনাল ইউনিভার্স নিয়ে পাবলিশ করেছেন বেশ কয়েকটা পেপার। সময়ের অন্যতম কিছু সেরা আর উদ্ভট কিছু থিওরি দিয়ে বিজ্ঞানী মহলে তুমুল পরিচিত ব্যক্তিত্ব।  

সাম্প্রতিক সময়ে তিনি ব্যস্ত আছেন মাল্টিডাইমেনশনাল থিওরি নিয়ে। এর আগেও বহুবার এ থিওরি ডেভেলপ করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন তিনি। তবে এবার তার মনে হচ্ছে তিনি সফল হবেনই!

গ্রীষ্মের এক অলস দুপুরে বাগানে বসে গান শুনছেন প্রফেসর হেনরিক, Green Days ব্যান্ডের “Boulevard of Broken Dreams.”

I walk a lonely road
on the boulevard of broken dreams.

লাইনটা প্রফেসরের মাথার ভেতরে আলোড়ন তুললো। নিজ মনে বেশ কয়েকবার গেয়ে ফেললেন লাইনটা। কিছু একটা ভেবে ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো হাসি।


২.


ল্যারি হোবার্ট অফিসে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছে, তার স্ত্রী লিয়ানা হোবার্ট দ্রুত হাতে নাস্তা তৈরি করছে। একটা স্যান্ডউইচে কামড় দিয়ে মোবাইলটা হাতে নিলো ল্যারি। International Organisation of Science for People – IOSP এর ওয়েবসাইটে বেশ চমৎকার একটি বিজ্ঞাপন দেয়া হয়েছে। একটা বেশ চমকপ্রদ থিওরির পরীক্ষামূলক প্রমাণের জন্য টেস্ট সাবজেক্ট প্রয়োজন। প্রফেসর হেনরিক এর অদ্ভুত প্রোজেক্ট এর জন্য ভলান্টিয়ার আহ্বান করে পোস্ট করা হয়েছে ওয়েবসাইটে। পুরো আর্টিকেলটা পরে বেশ অবিশ্বাস্য আর উদ্ভট মনে হলেও কি ভেবে যেন ঠিকানাটা নোট করে অফিসের জন্য বের হলো ল্যারি।

অফিসে পৌঁছেই এসিটা অন করে এক কাপ কফি হাতে নিতেই দেখা হলো ক্রিস্টিনার সাথে। রোজ সকালেই স্নান করে অফিসে আসে ক্রিস্টিনা, সোনালি চুলগুলো কাঁধের ওপর আধভেজা থাকে। নীল চোখজোড়ার সাথে চোখাচুখি হতেই কুশল বিনিময় করেই নিজের ডেস্কে ফিরে গেলো ক্রিস্টিনা। তার চলে যাওয়া পথের দিকে বহুক্ষণ তাকিয়ে রইলো ল্যারি। ল্যারির মনের গভীরে কোথাও ক্রিস্টিনার চলে যাওয়া পথের রেশ রয়ে গেলো বহুক্ষণ।

অফিস থেকে বাসায় ফেরার পথে IOSP এর অফিসের সামনে গাড়ি পার্ক করে, মূল ভবনে প্রবেশ করলো ল্যারি। মনে মনে সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলেছে সে...

৩.

গ্রীষ্মের তীব্র গরমের মধ্যেও বৃষ্টির আভাস ভেসে আসছে, মৃদুমন্দ ঠাণ্ডা বাতাস বইছে গোটা শহরজুড়ে। ল্যারি এবং ক্রিস্টিনা বসে আছে একটা কফিশপে। দুটো কফিকাপে আধ খাওয়া কফি ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে কিন্তু তাদের ঠোঁটের ছোঁয়া পাচ্ছেনা। কারণ এই মুহূর্তে তাদের ঠোঁটজোড়া ব্যস্ত রয়েছে ভিন্ন কাজে। কিছুক্ষণের মধ্যেই অবশ্য কফিশপের বিল পে করে বের হয়ে গেলো দুজনই। গন্তব্য ক্রিস্টিনার বাসা, আদিম সুখের টানে ছুটে যাচ্ছে দুজন। চূড়ান্ত পর্যায়ের আনন্দ লাভের খুব কাছাকাছি রয়েছে দুজন। ল্যারির বহুদিনের কাঙ্ক্ষিত বাসনা পূর্ণ হতে চলেছে আর কিছুক্ষণের মধ্যেই। ঠিক সে সময়ই তীব্র শব্দে কান ফেটে যাবার উপক্রম হলো ল্যারির। মাথার পাশে অ্যালার্ম ঘড়িটা বন্ধ করে মৃদু হাসি দিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসলো ল্যারি, পাশে তখনো অর্ধনগ্ন হয়ে শুয়ে আছে তার স্ত্রী লিয়ানা!


৪.


IOSP এর ওয়েবসাইটে এক অদ্ভুত পেপার পাবলিশ করেছে প্রফেসর হেনরিক, এই মুহূর্তে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে সেটাই পড়ছে লিয়ানা। প্রফেসর হেনরিক দাবী করেছেন তিনি এমন এক ধরণের ডিভাইস তৈরি করেছেন যার দ্বারা একজন ব্যাক্তির নিজের মস্তিষ্কের ভিতরেই ভিন্নমাত্রার এক জগতের সৃষ্টি হবে। ব্যাপারটার ব্যখ্যা তিনি এভাবে দিয়েছেন, এই ডিভাইসটি একটি উচ্চশক্তিসম্পন্ন ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি করতে সক্ষম, যা একজন মানুষের পুরো নার্ভাস সিস্টেমকে অন্য একটি ডাইমেনশনে স্থানান্তর করে ফেলে। বলা যায় একটা ভিন্ন জগতে ওই ব্যাক্তিরই একটা রেপ্লিকা সৃষ্টি হয়। ওই ভিন্ন জগতে সে তার  ইচ্ছামতো ঘটনাবলি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তবে এটা কোন স্বপ্ন নয়, প্রত্যেকটি ঘটণাই সে তার সকল ইন্দ্রিয় দিয়ে অনুভব করতে পারবে। আরও মজার ব্যাপার হচ্ছে চাইলে একাধিক ব্যক্তি একই ডাইমেনশনে এক্সিস্ট করতে পারবে। একাধিক ডাইমেনশন ইন্টারফেয়ার করতে পারবে একটি কমন স্পেসে। মানে একাধিক ব্যক্তি তাদের নিজস্ব জগত তৈরি করে একে অপরের সাথে কো-অপারেট করতে পারবে, কিংবা একটা কমন স্পেসে চাইলে ইন্টারফেয়ারও করতে পারবে ! বিষয়টা লিয়ানার কাছে বেশ ইন্টারেস্টিং লাগে। IOSP এর ওয়েবসাইটের দেয়া নাম্বারে ডায়াল করে সে...


৫.


লিয়ানা আদিম উত্তেজনার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে, তার শয্যাসঙ্গী ল্যারির কাজিন বোরিখ। বহুদিন ধরেই পরিচিত সঙ্গীর সান্নিধ্যের বাইরে ভিন্নতার স্বাদ আস্বাদন করার ইচ্ছে ছিলো লিয়ানার, আজ অবশেষে পূরণ হচ্ছে সেই সাধ। ঠিক সেই মুহুর্তে ক্রিস্টিনাকে নিয়ে ঘরে প্রবেশ করে ল্যারি, লিয়ানা ও বোরিখকে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখে বিস্ময়ে তার মুখ হা হয়ে যায়।

সারা দিনের ব্যস্ততার পর রাতের আঁধারে ল্যারি ও লিয়ানা দুজনেই হারিয়েছিলো তাদের নিজস্ব ভুবনে। নিজেদের মনের ভেতরের সুপ্ত বাসনাকে রূপ দিয়েছিলো উপভোগ্য বাস্তবতায়। কিন্তু তাদের দুজনের জগতেই তারা ব্যবহার করেছে তাদের নিজ বাসার বেডরুম। একই সময়ে তাই তাদের ভিন্ন দুই জগত ইনটারফেয়ার করেছে তাদেরই বেডরুমে! সাময়িক বিস্ময়ের ঘোর  কাটতেই লিয়ানার নগ্ন শরীরের দিকে তেড়ে আসে ল্যারি, এরপর শুরু হয় প্রবল ধ্বস্তাধস্তি । ধ্বস্তাধস্তির এক পর্যায়ে একটা ভারী সিরামিকের ফুলদানি দিয়ে ল্যারির মাথায় আঘাত করে লিয়ানা। মুহুর্তেই ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হয়ে আসে ল্যারির মাথা থেকে। পুরো শরীর অবশ হয়ে আসে ল্যারির, আঘাতের তীব্রতা তখনই বোঝা যায় যখন পুরো ফ্লোর ভেসে যায় রক্তে। ততক্ষণে স্পন্দনহীন হয়ে পরে ল্যারির দেহ!

ল্যারির মনে হচ্ছে সবকিছু শূন্যে হারিয়ে যাচ্ছে, সে বারবার ভাবতে চেষ্টা করে এটা একটা স্বপ্ন, সব ঠিক হয়ে যাবে। একটা ভারী পর্দা যেন ঢেকে দিচ্ছে তার অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ, তার অস্তিত্ব যেন মিশে যাচ্ছে শূন্যে!

৬.

ভোরের আলো চোখে পড়তেই ধড়ফড় করে ঘুম ভাঙে লিয়ানার। পাশে এখনও ঘুমোচ্ছে ল্যারি, শ্বাস নিচ্ছে স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই। কিছুটা হাফ ছেড়ে বাঁচে লিয়ানা। ধাক্কা দিয়ে ল্যারিকে জাগানোর চেষ্টা করে, কিন্তু কিছুতেই ঘুম ভাঙছে না ল্যারির। আরো বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টা করেও ল্যারিকে জাগাতে না পেরে শেষমেশ দিশেহারা বোধ করে লিয়ানা। হাসপাতালে ফোন দিবে কিনা ভেবে ইতস্তত করে শেষমেশ IOSP তে ফোন দিয়ে সব খুলে বলে লিয়ানা।

৭.

আরো ১ বছর পর...

এক হসপিটালের আইসিইউতে স্পেশাল ট্রিটমেন্ট এ রাখা আছে ল্যারির বডি, রাখা আছে না বলে সংরক্ষিত আছে বলাই ভালো! তাকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে কৃত্তিম শ্বাস-প্রশ্বাস ও খাবার দিয়ে। সে বেঁচে আছে কোন প্রকার নার্ভাস সিস্টেম ছাড়াই। ১ বছর আগে ভিন্ন এক ডাইমেনশনে লিয়ানার হাতের আঘাতে তার মৃত্যু হয়! কিন্তু সেটা ছিলো ভিন্ন এক ডাইমেনশনে। মূলত সেই আঘাতে সেই অচেনা ডাইমেনশনে তার অস্তিত্ত্বের পাশাপাশি ট্র‍্যাপড হয়ে যায় তার নার্ভাস সিস্টেমও, কিন্তু তবুও তার হৃদযন্ত্র রয়ে যায় সচল! সকল প্রকার অনুভূতি ব্যতীত এক জড়বস্তুর ন্যায় ল্যারি বেঁচে আছে এখনও! কে জানে আরো কতবছর অস্তিত্বের বোঝা হয়ে বেঁচে থাকবে ল্যারি!

৮.

লিয়ানা বসে আছে জনমানবশূন্য এক সাগরতীরে, ল্যারির কাধে মাথা রেখে। সমুদ্রের বহমান ঢেউগুলোর দিকে অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে আছে সে। ১ বছর পেরিয়ে গেছে, কিন্তু তীব্র অপরাধবোধের দহনে সে পুড়ছে যেন অনন্তকাল ধরে। ল্যারির উদাম বুকে মাথা রেখে বিড়বিড় করে বলে চললো, I am sorry, Larry. I am sorry for everything. কিন্তু ল্যারি যেন হারিয়ে গিয়েছে মহাশূন্যের অন্তিম নিস্তব্ধতায়, তার চোখজুড়ে কেবলই শূন্যতা!

অ্যালার্মের তীব্র শব্দে ঘুম ভেঙে যায় লিয়ানার, বিছানা থেকে উঠতে উঠতে সে বলে চলে, I am sorry, Larry. Sorry for everything I did to you.



[ লেখাটির সকল চরিত্র এবং প্রদত্ত থিওরি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। বাস্তবের সাথে এর কোন মিল তো নেইই, ফিজিক্সের কোন হাইপোথিসিসের সাথেও এর কোন মিল নেই। ]  
বিনিয়ামীন পিয়াস
বিনিয়ামীন পিয়াস। পড়াশোনা করছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে। ফিজিক্সের খটমটে সূত্রগুলোকে কাব্যিক ছন্দে লেখার স্বপ্ন দেখি। একদিন হয়ত আপেক্ষিকতার সূত্রকে বিদ্রোহী কবিতার মত লিখে ফেলবো।