ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

দ্যা ক্যাম্পাস হিরো - লিখেছেন - আব্দুল্লাহ আল রায়হান




বনি ভাই! আমাদের ক্যাম্পাস হিরো। যার নাম শুনলে ত্রাসের রাজত্ব শুরু হয়। ভয়ে  হাত-পা থরথর করে কাঁপতে শুরু করে।বনি ভাই ১৮ ব্যাচে মেকানিকাল ডিপার্টমেন্টে পড়েন।

ছোটবেলা থেকেই পড়াশুনায় ছিলেন ভীষণ মনোযোগ।   
ক্যান্ডেল লাইট আর হারিকেনের আলো দিয়ে শুরু । নিজের রক্ত বেঁচে কোন ভাবে দিন চালাতে পারলেই বাঁচে তাঁর বাবা। বাবা পড়াশোনা অত বুঝে না। পেশায় তিনি একজন  রিকশাচালক। তবে তিনি এতোটুকুই জানেন তার ছেলে পড়াশোনা করলে অনেক বড় হবে। অনেক টাকা কড়ি হবে।স্যালুট পাবে।এটলিস্ট তাঁকে আর রিক্সা চালাতে হবে না।তাই তো  ভীষণ অভাব অনটন থাকা সত্ত্বেও বনির পড়াশোনা বন্ধ করে দেননি। বনি ভাই ও ভীষণ তুখোড় ছাত্র ছিলেন।চেষ্টা করতেন বাবার মাথার ঘাম পায়ে ফেলা পরিশ্রম বৃথা যেতে দিবেননা।পল্লির সহজ সরল ছেলে ছিলেন বনি ভাই। পড়াশুনোর বাইরে নতুন কোনো জগৎ তৈরি করেন নি।

তার স্বপ্ন ছিল অনেক বড় প্রকৌশলী হবেন।স্বপ্নের পথে এগোতে থাকেন। ''যেমন কাজ তেমন ফল'' ঠিকই চান্স পেয়ে যান স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাকানিক্যাল ডিপার্টমেন্ট।


একেবারে গ্রাম থেকে উঠে আসা।শহরের যান্ত্রিক জীবনেন সাথে খাপ খাওয়াতে কষ্ট হচ্ছিল।আধুনিকতার কাছে তাঁর পায়ের স্যান্ডেলটা বড্ড বেমানান দেখাচ্ছিল।তবুও যার আছে উদ্দম আর সাহসিকতা স্বপ্নের পথে চলেছিলেন আস্তে আস্তে। ধীরে ধীরে মিশতে শুরু করেন সেখানকার পরিবেশের সাথে। গড়ে উঠে বন্ধুত্ব।বন্ধুদের লাইফ স্টাইলের সাথে ম্যাচ হচ্ছিল না। টিউশনির স্বল্প টাকা আর হেল্প অরগানাইজেশান থেকে প্রাপ্ত টাকায় জীবন চলছিলো না।

বনি দা ভীষণ পরোপকারী মানুষ ছিলেন। ক্যাম্পাসের বড় নেতা সাদমান ভাইকে যখন আন্টি বাহিনী প্রায় মেরেই ফেলছিল।বনি ভাই তৎক্ষনাৎ তাঁকে রক্ষা করেন।প্রাণে বেঁচে যান সাদমান ভাই।।
কিছু দিন পর......

"কে রে তুই?নতুন নাকি?"----সাদমান ভাই।

"জ্বি ভাই"

"ধন্যবাদ তোকে।তোর সাহস আছে বটে!আমার দলে যোগ দিবি"

" না ভাই। ওসব আমি বুঝিনা।"

"চিন্তা নিস না। আমি বুঝিয়ে দেব।আজ থেকে তুই আমার অবর্তমানে নেতা"

বনি দা ভাবতেন নেতা হলে অনেক টাকা হবে।আর তাঁর টাকার খুবই দরকার।তাই সব মিলিয়ে হ্যাঁ বলে দিলেন।

জীবনে মোড় নিতে শুরু করে।অল্প কিছু দিনেই বদলাতে  শুরু করেন বনি ভাই ।পোশাক আশাক পুরোই চেন্জ। হাতে থাকে ব্র্যাসলেট।বুকে ঝুলে লকেট। যেন পুরাই চেন্জ!!!

চাঁদাবাজি, র্যাগ সহ নানা কুকর্মে জড়ান।তাকে দিয়ে বড় বড় কাজ হ্যান্ডেল করানো হয়।তার  ভয়ে অ্যান্টি দল তো পুরো অস্থির। তিনি আর বনি নেই।এখন রক বনি।সবাই দেখলেই তাকে সালাম দেয়।তার কথা মত চলে।যে ছেলেকে নিয়ে ক্যাম্পাসের সবাই গর্ব করতো  তার কারনেই ক্যাম্পাসে এখন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি  হয়, সংঘর্ষ বাধে।

তার বিরুদ্ধে থানায় মামলা হয়।চাঁদাবাজি,ইভটিজিং,,এমনকি খুনের মামলা পর্যন্ত!!! নিজেকে রক্ষা করতে অজান্তেই খুন করে ফেলেন! তবে বড় ভাইদের প্রভাব বেশি বিধায় কোনো লাভ হয়না।আস্তে আস্তে এলোমেলো জীবনে অব্যস্ত হয়ে পড়েন।

নিউমার্কেট থেকে ফিরছিলেন।এমন সময় ফোনে রিং হয়.. ...

----"বাজান,কেমন আছ।অনেক দিন হলো তোমারে  দেখি না,বাড়িতে আইবা?"

----" না বাবা।আমার এখন অনেক কাজ।বাকি।পরের মাসে আসবো"

-----"সে তো তুমি গত তিন মাস  ধইরে কইতাসো"
হ্যালো বাজান,হ্যালো।কিসের শব্দ শুনা যায় হ্যালো...."

পরের দিন সকালে  হাসপাতালে বনি ভাই এর চোখ খুলে।জানা যায়, তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় হাসপাতালে আনা হয়।অবস্হা ক্রিটিক্যাল ছিলো।প্রানে বেচে যান বনি ভাই। 
তবে এটা নতুন ঘটনা নয়।এর আগে ৫/৬ বার আক্রমনের স্বীকার। 

-----"কিরে বাজান। কাল রাতে কথা বলিস নি যে?"

-----"না আব্বা তেমন কিছু না"
-----"কিছু না হলেই ভালো। আমরা আরো চিন্তায় পড়ে গেছিলাম।তা বাজান তোমার পড়াশুনো শেষ হবে তবে?চারকি বারকি কইরবা কবে?"

-----"এইতো বাবা আর বেশি দিন নেই। দোয়া করো বাবা"

বাড়িতে সবার বনি থেকে' রক বনি 'হবার গল্প অজানা।কেউ কিচ্ছু জানে না। জানে শুধু বনি গ্রামের জন্য কিছু একটা করবে।পরিবারের হাল ধরবে।

রাত দুইটা কি পনে দুইটা, খুব জোরে কান্নার আওয়াজ আসছিল।হোস্টেল তত্ত্বাবধায়ক মাহফুজ কাকার কানে আসে।ঘুরতে ঘুরতে ২০১ নম্বর রুমে আন্দাজ করে ঢুকে। দেখেন খাট থেকে নিচে উঁবু হয়ে বসে কাঁদছে নেতা বনি।

----"কিরে বনি কাঁদছিস কেন?"

----"কিছু না-মামা",চোখের জল মুছতে মুছতে বলল বনি।

 ----"আমার সাথে শেয়ার কর। আমি না তোর মাহফুজ মামা!"

----"আমি তো গ্রাম থেকে উঠে আসা একটা ছেলে। আমিতো সব জায়গায় স্কলারশিপ পাইছি।গ্রাম থেকে আসছি স্বপ্ন পূরণ করতে।বাবা মায়ের ঘামের মূল্য দিতে,তাদের দুঃখগুলো ভুলিয়ে দিতে।আমার বাবা মা এর করুণ মুখখানি আমার চোখের উপর ভেসে উঠলে আমার কষ্ট হয়।তারা তো আমারে নিয়া স্বপ্ন দেখে,আশা নিয়া বসে আছে।কিন্তু আমার জীবনে বেঁচে থাকা তো এখন অনিশ্চিত। যেকোনো সময় আমি খুন হতে পারি"------ খুব জোরে কান্না করতে করতে বনি ভাই বললো।

" কাঁদিস না সব ঠিক হয়ে যাবে।তুই এসব ছেড়ে দে,তাইলেই তো হয়।"

"কীভাবে হয়। আমি তো ছেড়ে দিয়ে আবার আগের মত বাঁচতে চাই।কিন্তু তাহলে তো ওরা আরো সহজে আমাকে শেষ করে দিবে। না পারছি রাখতে না পারছি ছাড়তে।আমি তো এমন জীবন চাইনি।চেয়েছি বাবা মাকে নিয়ে একটু ভালো ভাবে বাঁচতে"---গগনবিদারী চিৎকার করতে করতে বললো।

" ধৈর্য ধর, বনি। ধৈর্য ধর।"

এরপর"If I Can Restart My Life Again!" বলতে বলতে  বনি ভাই তাড়াতাড়ি ঘুমাতে চলে গেলেন। কারন সকালে ক্যাম্পাসে অনেক কাজ করা বাকি।

আব্দুল্লাহ আল রায়হান
আমি সরকারি বিজ্ঞান কলেজের একাদশ শ্রেণীর একজন স্টুডেন্ট। দেশ ও জাতিকে নিয়ে ভাবতে ভালোবাসি।