ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

উপন্যাসঃ সময়ের স্পন্দন (পর্ব- ৩-৪) - লিখেছেন - মৌরি হক দোলা





আষাঢ়ে বৃষ্টি ঝরছে। কিছুক্ষণ পরপর মেঘের গর্জন শোনা যায়। ওই তো.. বিদ্যুৎটাও একটু চমকালো কি? শৈলী মুখে ভাত নিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। আজ বৃহস্পতিবার। এমনিতেই হাফ ক্লাস। তার উপর আকাশের অবস্থা দেখে মিনিট পঁয়ত্রিশ আগেই ছুটি হয়ে গেল। ভাগ্যিস একটু আগে ছুটি হয়েছিল। নয়তো আজ আবার বৃষ্টিতে ভিজতে হতো। এমনিতে শৈলীর বৃষ্টিতে খুব ভিজতে ইচ্ছে করে। কিন্তু ছোটবেলা খেকেই ঠান্ডার ধাত থাকায় কখনো ভিজতে পারে না। তবুও প্রায় প্রতিবছরই একবার কি দুইবার স্কুল থেকে ভিজেই ফিরতে হয়। দেখা গেল, সকালে কড়কড়ে রোদে বেরোলো, ছাতির কথা মনেও পড়েনি। কিন্তু স্কুল থেকে বেরোবার পরই ঝুম বৃষ্টি… বছরের প্রথম বা দ্বিতীয় কি তৃতীয় বর্ষণে শরীরটাকে মেলে ধরতে মন্দ লাগে না। কিন্তু জামাকাপড় ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে থাকে যে। বড় লজ্জা করে শৈলীর তখন। রাস্তার লোকগুলো কেমন কেমন করে তাকায়। বুকের সাথে লেপ্টে থাকা ভেজা ওড়নাটা আরো বিব্রত করে। সাদা পায়জামা হওয়াতে পা-টাও ফুটে উঠে বিচ্ছিরিভাবে। তাই শৈলীর এমন হুটহাট ভিজতে ইচ্ছে করে না। আজ যে বৃষ্টির আগেই ঘরে ফিরতে পেরেছে এই বাঁচোয়া।


-ভাত নেবো আরেকটু?


জানালা থেকে চোখ সরিয়ে শৈলী মায়ের দিকে তাকায়। মাথা নেড়ে ‘না’ বলে পানির গ্লাসটা নিয়ে নেয় দু’ঠোঁটের ফাঁকে।


-জানো, মা, আজ নতুন ইউএনও সাহেব তার মেয়েকে নিয়ে আমাদের স্কুলে এসেছেন। ওঁনার মেয়ে নাকি আমাদের সাথেই পড়ে।
-তাই নাকি? তোদের স্কুলেই ভর্তি করাবে? নাকি আবার গার্লস এ দেবে?
-কি জানি!
-আরে তোদের স্কুলেই দেবে দেখিস! রূপপুর মেমোরিয়াল কি আজকের স্কুল! আমরা যখন জেলা স্কুলে পড়তাম তখন থেকে এর নাম শুনেছি। এমন ঐতিহ্যবাহী স্কুল ছেড়ে কি আর অন্য স্কুলে দেবে?


জাহিদ রহমান হাতে পেপার নিয়ে পাশের রুম থেকে বেরিয়ে এলেন মা-মেয়ের কথা শুনে।


-ঠিক বলেছো, বাবা! আওয়ার স্কুল ইজ বেস্ট! আমাদের এখানেই দেবে বল?
-হুমম। মা, দেখিস, ও তোদের স্কুলে ভর্তি হলে কিন্তু ওর সাথে কম্পিটিশন করে পড়াশোনা করবি। ইউএনওর মেয়ে কিন্তু ইউএনওর মতোই হবে। তাই নিজের অবস্থানটা ধরে রাখতে হলে কিন্তু পড়াশোনায় আরো মন দিতে হবে।


শৈলী বাবার সাথে পড়াশোনার আলাপ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। রান্নাঘরে এঁটো থালাবাসন ধুতে ধুতে শুনতে পায় আসমা। একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে সে। আমার মেয়েটা ভীষণ লক্ষ্মী। কিন্তু কেন যে এ ভুলটা করল! এখন আস্তে আস্তে কাটিয়ে উঠতে পারলেই হয়। নয়তো ওর পুরো ভবিষ্যৎটা…


পহেলা বৈশাখে শৈলী যখন রূপুর সাথে বাইরে থেকে ঘুরে এসে আচমকা মেজাজ খারাপ করল, রেগে কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলল— তখনই আসমার সন্দেহ হয়েছিল। মেয়ে বড় হচ্ছে। এ সময় মেয়ের এমন হুটহাট কান্না বুকের মধ্যে তোলপাড় সৃষ্টি করবে এটাই স্বাভাবিক। মনের মধ্যে শুধু ভয় হয়, কোনো ভুল করল নাতো! আসমা সেদিন সত্যি এমন ভয়ই পেয়েছিল। আর ক্রমশ শৈলীকে বুঝিয়ে শুনিয়ে জানতে পেরেছিল, তার ভয়টাই সঠিক!


সেও প্রায় চার মাস হতে চলল এ ঘটনার। এ ঘটনার পরে শৈলীকে অনেকবার বুঝিয়েছিল আসমা। বন্ধুর মতো ব্যবহার করেছিল। কিন্তু আসমা যে পুরোপুরি ব্যর্থ তা সে বুঝতে পেরেছিল ঈদের দিন চারেক আগে, যেদিন তমাল ফোন দিয়ে আসমাকে ওর বিয়ের খবরটা দিয়েছিল।


তমাল শৈলীর গৃহশিক্ষক হিসেবে ভালো হলেও ওকে কখনো জামাই ভাবার রুচি হয়নি আসমার। শৈলীর দাদাদের পরিবার আর তমালদের পরিবারের আকাশ-পাতাল পার্থক্য। তমাল-শৈলীর সম্পর্কটাও ভালোবাসায় গড়ানোর মতো নয়। এমনকি তমালের হাবভাবেও কখনো খারাপ কিছু দেখেনি আসমা। কিন্তু শৈলী যে মাঝখান থেকে কেন এমন করল!


মেয়েটা যখন লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদে আসমা টের পায়। আসমারও বুক ফেটে যায় মেয়ের কষ্ট দেখে। যাকে ছোট থেকে এত কষ্ট করে বড় করেছে, যাকে নিয়ে এত স্বপ্ন তার চোখের পানি কি সহ্য করা যায়?





রূপপুর মেমোরিয়াল স্কুলের বয়স ১০৬ ছুঁই ছুঁই। এইতো বছর পাঁচেক আগেই বেশ জাঁকজমকের সাথে শতবর্ষ পূর্তি উদযাপিত হলো। দেশের নামকরা গায়ক, নৃত্যশিল্পী আনা হয়েছিল অনুষ্ঠানের জন্য। স্কুলের ভোকেশনাল গ্রুপের শিক্ষক লতিফ স্যার মঞ্চে অভিনয় করেন, একটি স্থানীয় নাট্যদলের সাথে যুক্তও রয়েছেন সরাসরি। সেই নাট্যদলটিই মাসব্যাপী অনুষ্ঠানে বিভিন্ন নাটক অভিনয় করল। সেই শতবর্ষের উৎসবের পর স্কুলটার ঔজ্জল্য অনেক বেড়ে গিয়েছে। পুরোনো একতলা-দোতলা দালানগুলো ভেঙে আধুনিক কায়দার দালান তৈরি করা হচ্ছে। উত্তর দিকের তিনতলা দালানটা দুই বছরের কাজ শেষে এই মাস দুয়েক আগেই মাথা উঁচু করে দাঁড়ালো। ওই দালানের তিনতলার এক রুমেই ঈদের ছুটি শেষে বৃহস্পতিবার শৈলীদের প্রথমবারের মতো ক্লাস হয়েছিল। সেদিন অষ্টম আর দশম শ্রেণির এক্সট্রা ক্লাস সকালে হয়নি। আজ শুরু হয়েছে। তাই সকাল সকাল মেঘে ঢাকা আকাশ মাথায় নিয়ে সবাই চলে এসেছে স্কুলে। গতরাতে প্রচুর বৃষ্টি হওয়ায় মাঠ ভিজে একাকার। তাই নতুন দালান পর্যন্ত আসতে ছাত্র-শিক্ষক সকলকেই বেশ কসরত করতে হল।


সবাই তিনতলার নিচে হেডস্যারের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আসলে এক্সট্রা ক্লাস নতুন দালান না পুরোনো দালানে হবে এটাই এখনো সাফি মামা জানে না। তাই চাবি থাকা সত্ত্বেও সে কোনো রুমের দরজা খুলে দিতে পারছে না। শুধু ক্লাস টেনের রুমগুলো খুলে দিয়ে এসেছে। বিপাকে পড়েছে এইটকে নিয়ে। “এই ক্লাসটা বড় ভাজা্ইল্যা। এগো কোনো ঠিকঠিকানা নাই। পুরান বিল্ডিং ভাঙার পরে রোজার মইধ্যে এগো অ্যাক্সটা ক্লাস একেক একেক দিন একেক রুমে হইছে। আমি সকাল সকাল ঘুমের তন উইড্যা আইয়া খুলছি ৭নম্বর রুম, সবাই যাইয়া বইসে। পরে হেডস্যারে আইয়া আবার আমারে দিয়া ১৭নম্বর রুম খুলাইছে। হের তন স্যারে আউক, পরে দরজা খুলমানে। থাক দাঁড়াইয়া তোরা এইহানে। বিষ্টি দেখ পোলাহান।” সাফি মামা বিড়বিড় করে বলে। টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে আবার। ছাতি মাথায় হেডস্যারকে দেখা যাচ্ছে, প্যান্ট হাঁটু অবধি গোঁজা। পেছনে আরো কয়েকজন শিক্ষক। এরা সবাই সকালে অতিরিক্ত ক্লাস করায় জেএসসি আর এসএসসি পরীক্ষার্থীদের! সাফি মামা ফিক করে হেসে ফেলে। ঝাড়ুদার জুলহাস নানা আচমকা ফিরে চায়। এতক্ষণ সাফিমামার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল সে। সাফির বিড়বিড়ানি তার কানে গিয়েছে। কিছু বলেনি। কিন্তু এখন ওর এই আচমকা হাসি ওর মনে কৌতুহল তৈরি করে। “কি মিঞা? হাসো ক্যান?” সাফি উত্তর দেয় না। হাসিমুখে কোমরে হাত দিয়ে স্যারদের দিকে তাকিয়ে থাকে। “এইসব পাগল-ছাগল যে কই থিকা আসে!” বিরক্তিতে পড়ে জুলহাস নানা, কপাল ঘুঁচিয়ে রাখে।


হেডস্যার এসে সাফিকে ৮ নম্বর খুলতে বলাতে সাফি সবাইকে নিয়ে ওদিকেই পা বাড়ায়। আর সবার মতো শৈলীও পিছু নেয় মামার। হঠাৎ গাড়ির আওয়াজে পেছনে ফিরে। লাল রঙের টয়েটো গাড়ি শৈলীকে নিশ্চিত করে ও তাহলে এই স্কুলেই পড়বে! শৈলী ভাবনায় ডুবে যায় তৎক্ষণাৎ। “কেমন হবে মেয়েটা? ওর সাথে বন্ধুত্ব করবে? বড়লোকের মেয়ে, আবার দেমাক দেখাবে নাতো! ইশ্ দেমাক দেখালে শৈলীর বয়েই যায়! শৈলী কারো দেমাকের ধার ধারে না। ওর সাথে কথা বলতে এলে বলবে। নয়তো…” এইসব ভাবতে ভাবতেই ওরা ৮নম্বর রুমে এসে ঢুকে। প্রথম ঘন্টাটা বাজিয়ে দেয় সাফি মামা ঘড়ির কাঁটায় কাঁটায়। শৈলীর কেন যেন মনে হচ্ছে এই ঘন্টাটা ওর জীবনের, নতুন এক অধ্যায় শুরু হওয়ার ইঙ্গিত।






হানিফ স্যার বাংলা বইয়ের প্রতিটি লাইন ধরে ধরে পড়ান। প্রতিটি শব্দগুচ্ছই মনে হয় পারলে ব্যাখ্যা করেন। শৈলীর ভীষণ ভালো লাগে স্যারের পড়ানোর ধরণ। ক্লাসে মন দিয়ে পড়লে বাসায় গিয়ে কেবল একবার দেখলেই চলে। তাই ও সবসময় খুব মন দিয়ে স্যারের কথা শোনে। কিন্তু আজ পারছে না। পেছন থেকে একবার শ্রেয়া ডাকে তো একবার প্রিয়া খোঁচায়। সারিকাই হয়তোবা আবার কান টেনে নেয় ওর মুখের কাছে। শৈলীর ভীষণ বিরক্ত লাগছে। কিন্তু ও কিছু বলতেও পারছে না। ওরা যদি মাইন্ড করে! তাই পড়া রেখে ঔ ফিসফিস করে উত্তর দিয়ে যাচ্ছে ওদের প্রশ্নের। মেয়েটার নাম কিরে? কোন স্কুলে ছিল? কবে এসেছে রূপপুরে? আগের স্কুলে ওর রোল কত ছিল জিজ্ঞেস করতো! আরে তোর পাশেই বসা তো! আস্তে করে একটু জিজ্ঞেস কর না!


হঠাৎ দ্বিতীয় ঘন্টা বাজায় হাঁফ ছেড়ে বাঁচে শৈলী। প্রদীপ স্যারের ইংরেজী ক্লাস এখন। কেউ আর ওকে জ্বালাতে পারবে না। মনে মনে সাফি মামাকে থ্যাংক ইউ দেয়। তখনই সাফি মামা ওর চোখের সামনে এসে হাজির হয়। দরজায় উঁকি মেরে সবার উদ্দেশ্যে বলে, “আফনেরা ব্যাগ নিয়া তিনতলায় আফনেগো ক্লাসে যান। ওইহানেই বাকি ক্লাস হইব আইজ থিকা।”
মৌরি হক দোলা
ইতিহাসনামার একজন সাব এডিটর।স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন,ভালোবাসেন সে স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকতে।