ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

উপন্যাসঃ সময়ের স্পন্দন (পর্ব- ২) - লিখেছেন - মৌরি হক দোলা



মুনার হাতে পলা হকিন্সের “দ্য গার্ল অন দ্য ট্রেইন”। কানে ইয়ারফোন। ইয়ারফোনের তারের বাইরের রংটা মুনার জামার সাথে মিশে আছে। সাজানো গোছানো সুন্দর এই ঘরটায় মুনাকে খুবই মানিয়েছে। অবশ্য এমন ঘরে মুনাকে বা মুনার মতো মেয়েদেরকেই মানায়। ট্রান্সফার হয়ে আসার পর নিজে হাতে পুরো বাড়িটা সাজিয়েছে সুমনা। বড়মেয়ের ঘরটা সাজিয়েছে বিশেষ যত্ন নিয়ে। মেয়ে বড় হচ্ছে। মেয়ের প্রতি আলাদা যত্ন নিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে। নয়তো যদি এলোমেলো ঘরের মতো নিজেও এলোমেলো হয়ে যায়?


নিজের ঘর নিজে সাজানোর জন্য মুনা যখন জেদ করেছিল তখন সুমনা উত্তরে ঠিক এই কথাগুলোই বলেছিল। মুনার খুব হাসি পায় মায়ের এরকম বোকা বোকা কথা শুনলে। ঘরের সাথে জীবনের যোগ কোথায়? জিজ্ঞেস করেছিল মুনা। সুমনা শুধু এটাই বলেছিল— যখন মা হবি, তখন বুঝবি। তবে মুনা একেবারে ছেড়ে দেয়নি মায়ের হাতে সবটা। মায়ের সাথে সাথে থেকে তদারকি করেছে। কিন্তু সুমনার শৌখিনতা বান্ধবীমহলে প্রশংসনীয় এবং অনুকরণীয়। তাই মায়ের রুচিই অবশেষে ১০০ভাগ পছন্দ হয়েছিল মুনার।


ডান হাতে চশমা ঠিক করতে করতে মুন দৌড়ে এল।
-আপ্পি আপ্পি, তোমার কালার বক্সটা দাও না একটু।
- কি করবি?
- একটা ছবি আঁকব।
- আমার টেবিলের ওপরে দেখ। নিয়ে নে।
-আপ্পি বলো তো, আমি কার ছবি আঁকব এখন?
-কার?
-আজ যে লোকটা এসেছিল না বাবার সাথে, ওই বুড়োটার। হি..হি..হি..


-মুন!


মুন কালার বক্সটা নিয়ে দৌড়ে চলে গেল হাসতে হাসতে। মুনা হেসে ফেলে ছোটো বোনের কথা শুনে। মুনটা এত দুষ্টু হয়েছে না! সত্যি!


-কিরে হাসছিস কেন?


মুনার শুকিয়ে যাওয়া জামা নিয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল সুমনা।


-তোমার ছোট মেয়ের কথা শুনে মা.. ও নাকি চৌধুরি আংকেলের ছবি আঁকবে আজ.. হাহা..
-আমিও তো তার কথাই বলতে এলামরে। সে তো তোর বাবাকে ধরেছে তোকে তার স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য।
-তার স্কুল মানে? উনি স্কুলেও পড়ান নাকি? বাহ্, মাল্টি-ট্যালেন্টেড পাবলিক তো!
-আরে না। এই উপজেলায় যে গার্লস স্কুলটা আছে ওটার সভাপতি উনি। এখন উনি চান, তুই ওই স্কুলেই ভর্তি হ। তোর বাবাকে আজ খুব করে ধরেছে।
-নো, মা! আমি আর বাবা দুটো স্কুলেই যাব। আমার যেটা ভালো লাগবে আমি সেটাতেই পড়ব।
-কেন? আবার কষ্ট করে ঘুরতে যাবি কেন? গার্লস স্কুলে সব মেয়েরা মেয়েরা, এটাই তো ভালো হবে। আরেকটাতো শুনলাম কম্বাইন্ড।
-কাপড় গোছানো হয়ে গিয়েছে না মা? তুমি এখন যাও, আমি বই পড়ছি। বাবার সাথে আমি এ ব্যাপারে কথা বলে নেব।






বড় মেয়ের ঘর থেকে বেরিয়ে সুমনা দক্ষিণের টানা বারান্দাটায় এল। দোতলা বাড়ির সামনে ফাঁকা জায়গাটুকুনিতে বিশাল এক বাগান এমনিতেই রয়েছে। এখানে এসেই সুমনা ঘুরে ঘুরে দেখেছে। ফল-ফুল-সবজি সব ধরণের গাছই রয়েছে সেখানে। মালি সুন্দরভাবে পরিষ্কার করে রাখে। তাই আর সুমনাকে ও নিয়ে মাথা ঘামাতে হয় না বা সে মাথা ঘামাতে চাইলেও সে সময়টুকু পায় না। সংসার যত ছোটই হোক, এত বড় বাড়ি গোছগাছ করে রাখতে রাখতেই তার দিন ফুরোয়। তবুও কাজের ফাঁকে যেটুকু ফুসরত পায় সে সময় কাটায় এই টানা বারান্দায় তার ছোট্ট জগৎটায়।


শৌখিন সুমনা রূপপুরে এসে একটু গুছিয়ে নিয়েই কতগুলো ফুলের চারা আনিয়ে নিয়েছে। ঘরের সাথে লাগোয়া বারান্দায় কিছু রঙিন জীবন না থাকলে কেমন যেন ম্রিয়মাণ লাগে ব্যাপারটা। চোখ দু’টোও খাঁ খাঁ করে। তার চেয়ে বরং কাজের ফাঁকে গাছের চর্চায় তার সময়টা বেশ ভালোই কেটে যায়। সুমনার মনে হয় সংসারের বাইরে এটুকুই তার নিজস্ব জীবন। নিজস্ব অবকাশের জায়গা। স্বামী সরকারি কর্মকর্তা। উপজেলা প্রধান হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ায় এই মফস্বলে পুরো পরিবারসহ এসে উঠেছে। এসেই সরকারি বাড়ি আর গাড়ির সাথে ইউএনও সাহেবের স্ত্রী হিসেবে অনেকটা সম্মানও জুটেছে কপালে। কিন্তু সেটা কি নিজের পরিচয় হল? নিজের অর্জন হল? নাকি অন্যের পরিচয়ে পরিচিত হয়ে সেই মানুষটার অধীনস্ত হিসেবে কেবল স্বীকৃতিটাই মিলল?


সুমনার খুব আফসোস হয় নিজের জীবনের জন্য, নিজের ক্যারিয়ারের কথা ভেবে। খুব অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছিল মিরনের সাথে। কতই বা বয়স তখন? চৌদ্দ কি পনের! মিরনও তখন সবে কলেজের গন্ডি পেরিয়েছে। ছাত্রাবস্থাতেই দুজন সংসার শুরু করল। মধ্যবিত্ত সংসারে ঘরনি হওয়ার সাথে সাথেই সুমনা এস.এস.সি. আর এইচ.এস.সি. দিল। কিন্তু অনার্সটা আর শেষ করা হল না। প্রথম বর্ষ শেষ হওয়ার আগেই মুনা তার শরীরে নিজের অস্তিত্বের জানান দেয়। ব্যস, রইল পড়ে পড়াশোনা। পুরোপুরি নিজের সংসারে মন দিলো সুমনা। হয়তোবা অল্প বয়সের ঝোঁকেই তখন সংসারকেই পুরো পৃথিবী মনে হয়েছিল তার। কিন্তু বাস্তবে পৃথিবীটা যে আরো অনেক বড়। সুমনা যা ভেবেছিল তার চেয়েও শতশত গুণে কঠিন!


তাই তো সুমনার এখন ভীষণ আক্ষেপ হয়। খুব কষ্ট হয়। অল্প বয়সে বিয়ে হওয়া সত্ত্বেও মিরন যখন এতদূর আসতে পেরেছে, চেষ্টা করলে সেও হয়তো পারত! নাহ্, স্বামীকে হিংসে করে না সে। স্বামীর সাফল্যে বরং খুশিই হয়। তবুও মানুষ তো! কখনো না কখনো নিজের পরিচয়ে বাঁচতে খুব ইচ্ছে হয়।

লেখকঃ মৌরি হক দোলা

ইতিহাসনামার একজন সাব এডিটর।স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন,ভালোবাসেন সে স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকতে।