ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

রেজেপ তায়্যিপ এরদোয়ান: রুটি বিক্রেতা থেকে যেভাবে মুসলিম বিশ্বের নেতা - লিখেছেন - শাকিল আহমেদ

রেজেপ তায়্যিপ এরদোয়ান। 'গ্যালাপ ইন্টারন্যাশনাল' এর ২০২০-এর জরিপ অনুযায়ী রেজেপ তায়্যিপ এরদোয়ান সবচেয়ে জনপ্রিয় মুসলিম নেতা একই সাথে তিনি সারাবিশ্বের পঞ্চম জনপ্রিয় নেতা।


মুসলিম বিশ্বের নেতা হিসেবে এরদোয়ানের উত্থানের পথটা মসৃণ ছিল না। সাংসারিক হাল ধরতে গিয়ে রাস্তায় লেবুর শরবত ও রুটি বিক্রি করতে হয়েছে। আবার এক সময় হতে চেয়েছিলেন ফুটবলারও। কিন্তু সবশেষে হয়েছেন একজন প্রেসিডেন্ট।





মুসলিম বিশ্বের নেতাতে পরিণত হয়েছেন এরদোয়ান

প্রাথমিক জীবন


ইস্তানবুলের কাছিমপাশাতে ১৯৫৪ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রেজেপ তায়্যিপ এরদোয়ান জন্মগ্রহণ করেন। এরদোয়ানের পিতা পেশায় একজন জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলেন। আরবিতে তখন ছিল 'রজব' মাস। তাই তার নাম রাখা হয় রেজেপ (তুর্কি ভাষায় 'রজব' কে 'রেজেপ' বলা হয়), দাদার নাম তায়্যিপ এফেনদির থেকে নেয়া হয় 'তায়্যিপ' আর বংশীয় উপাধি 'এরদোগান' যোগ হয়ে নাম হয় 'রেজেপ তায়্যিপ এরদোয়ান'।


১৯৭৩ সালে এরদোয়ান বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় অর্থনীতি ও ব্যবসা শিক্ষা ইন্সটিটিউটের জন্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে যা মারমারা বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি ও প্রশাসনিক অনুষদকে বিজ্ঞান অনুষদ হিসেবে পরিবর্তন করা হয়। এরদোয়ান ১৯৮১ সাল পর্যন্ত এখানে পড়ালেখা শেষ করে সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হন।


শিশুকালে এরদোয়ান



রুটি, শরবত ও লেবু বিক্রেতা


এরদোয়ানের পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব বেশি ভালো ছিল না। এর মাঝে সদস্য সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। কী আর করা যায়! ছুটির দিনগুলোতে তিনি বাজারে বেরিয়ে পড়তেন। সিমিট (তুরস্কের রাস্তায় বহুল বিক্রিত প্রসিদ্ধ রুটি) এবং লেবু শরবত বিক্রি করতেন। এখান থেকে যা মুনাফা আসত তা দিয়ে পরিবারকে সহায়তার পাশাপাশি স্কুলের বেতন পরিশোধ করতেন। ব্যক্তিগত পাঠাগারের জন্য তিনি বইও কিনতেন। ছোটবেলা থেকেই তাঁর পাঠাগারের সখ ছিল। যার ফলে কলেজ জীবনে পা রাখার আগেই তৈরি করে ফেলেন মোটামুটি বড়সড় একটি ব্যক্তিগত পাঠাগার।


ফুটবল তার সবচেয়ে বেশি প্রিয় ছিল। স্কুল জীবন থেকেই তিনি ফুটবল মাঠের সেরা খেলোয়াড় ছিলেন। মহল্লার ফুটবল টিমের খেলার মাধ্যমেই হাতেখড়ি। ১৪ বছর বয়সে কাছিমপাশা জামিয়াল্টি ক্রীড়া ক্লাবের সদস্য হিসেবে তিনি বেশ নামকরা ফুটবলারে পরিণত হন। জামিয়াল্টি থেকে ইস্তানবুলের অন্যতম প্রসিদ্ধ টিম আইইটিটির এর ফুটবল টিমে দীর্ঘদিন খেলেছেন। আইটিটিতেই উনার প্রফেশনাল ফুটবল খেলা শুরু হয়। যেটাকে তার জীবনের প্রথম চাকরিও বলা যেতে পারে। আইইটিটির কয়েকটি ম্যাচের ক্যাপ্টেন হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন। পরবর্তী সময়ে ফুটবল মাঠে তার ক্রীড়া শৈলীতে মুগ্ধ হয়ে ইস্তানবুল ফুটবল ক্লাব তাকে আমন্ত্রণ জানায়। এক পর্যায়ে তিনি জাতীয় যুব ফুটবল ক্লাবের খেলোয়াড় হিসেবে নিবন্ধিত হওয়ার সুযোগ পান। কিন্তু অভিভাবক হিসেবে পিতার স্বাক্ষর বাধ্যতামূলক হওয়ায় বিপত্তিতে পড়েন এরদোয়ান। তার বাবা আহমেদ এরদোয়ান স্পষ্টই জানিয়ে দেন যে- তিনি তাকে লেখাপড়া করে বড় করতে চান, খেলোয়াড় হিসেবে নয়।

এক সময় ফুটবলার হতে চেয়েছিলেন এরদোয়ান



এরপর তিনি তুরস্কের অন্যতম প্রসিদ্ধ ফুটবল ক্লাব এসকেশিহির ও ফেনারবাহচে ফুটবল ক্লাব থেকে আমন্ত্রণ পেলেও বাবার অস্বীকৃতির কারণে আর খেলতে পারেননি।

মূল রাজনীতিতে এরদোয়ান 


১৯৮৯ সালে তুরস্কের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বেইয়্যুলু পৌরসভার মেয়র নির্বাচনের মাধ্যমে এরদোয়ানের সফল রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শুরু হয়। এরপর ১৯৯১ সালে তুরস্কের সাধারণ নির্বাচনে ড. নাজিমুদ্দিন এরবাকানের ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল রেফা পার্টি থেকে এরদোয়ান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৪ সালের ২৭ মার্চ তুরস্কের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এরদোয়ান রেফা পার্টি থেকে ইস্তানবুলের মেয়র পদে নির্বাচন করেন এবং জয়লাভ করেন।


এরদোয়ান দলের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার পাশাপাশি সেরা বক্তাও ছিলেন। ১৯৯৭ সালের অভ্যুত্থানের পর তিনি অনেকগুলো সমাবেশে উপস্থিত থেকে নেতা-কর্মীদের উজ্জীবিত করতে বক্তব্য রেখেছেন। ১৯৯৭ সালের ১২ ডিসেম্বর এমনি একটি সমাবেশ হয়েছিল তুরস্কের শির্ট শহরে, যেখানে এরদোয়ান আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন।

এরদোয়ান সেদিন এক ঐতিহাসিক বক্তব্য দিয়েছিলেন। সেই বক্তব্যে তুরস্কের অন্যতম ইসলামী জাগরণী কবি জিয়া গোকালপ-এর 'সৈন্যদের দোয়া' (যে কবিতা জিয়া গোকালপ ১৯১২ সালে বালকান যুদ্ধের সময় লিখেছিলেন) কবিতার কয়েকটি লাইন আবৃতি করেন-

'মিনার আমাদের বেয়নেট
গম্বুজ আমাদের শিরস্ত্রাণ
মসজিদ আমাদের ব্যারাক
মুমিনরা আমাদের সৈনিক।'

এ কবিতার কয়েকটি লাইনই যে এরদোয়ানকে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে ঠেলে দিবে, আবার এই কবিতাই যে একসময়ে তুরস্কের জাগরণী এক বাস্তবতা হবে, সেটা তখন কে জানত!

জিয়া গোকালপের এই কবিতা আবৃতির কারণে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে এরদোয়ানের নামে দিয়ারবাকের কোর্টে মামলা দায়ের করা হয়। তুরস্কের পিনারহিসার জেলখানায় ১২০ দিন অবরুদ্ধ থাকার পর ১৯৯৯ সালের ২৪ জুলাই তিনি মুক্তি লাভ করেন।


একে পার্টি গঠন


২০০১ সালের ১৪ আগস্ট তুরস্কের ৩৯ তম রাজনৈতিক দল হিসেবে আদালত ও কালকিনমা পারটিসি বা একে পার্টি (জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি) গঠিত হয়। আর এরদোয়ানকে করা হয় নবগঠিত পার্টির চেয়ারম্যান। একের পর এক একে পার্টির সাফল্য এরদোয়ানকে এনে দিয়েছে তুমুল জনপ্রিয়তা। একে পার্টি গঠনের মাত্র ১৪-১৫ মাসের মাথায় একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে।

এরদোয়ানের উপর রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচন করতে পারেননি। সেই জন্য প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ ছিলনা। পরবর্তীতে এরদোয়ানের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়। অবশেষে ১৪ই মার্চ, ২০০৩ সালে তুরস্কের ২৫ তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে রেজেপ তায়্যিপ এরদোয়ার শপথ গ্রহণ করেন। এরপর থেকে বর্তমান পর্যন্ত এরদোয়ান বহাল তবিয়তে ক্ষমতায় আছে।

গুলেন মুভমেন্ট


২০১১-১২ সালে গুলেন মুভমেন্ট বিরাট এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় এরদোয়ান সরকারের সামনে। তবে তারা বাহিরের চেয়ে ভেতরের লোকই বেশি। সরকারের ভেতরে থাকা আমলা, বিচারক, আইনজীবী কিংবা ব্যবসায়ী অথবা মিডিয়া কর্মী। ২০১২ সাল থেকে সরকারের বিরোধী হিসেবে সরকারের ভেতরে থাকা লোকদের সরকারকে নিয়ন্ত্রণের যে চেষ্টা হয়েছে তাকে তাত্ত্বিকগণ নাম দিয়েছেন 'প্যারালাল স্টেট'। এরদোয়ান নিজেও এই শব্দ ব্যবহার করেছেন। ইসলামের নাম নিয়ে চলা এই সংগঠন সরকারকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে, যা গুলেন মুভমেন্ট নামে পরিচিত।

ফেতুল্লাহ গুলেন প্রথমত একজন ধর্ম প্রচারক ছিলেন। তিনি বিভিন্ন শহর এবং গ্রামে ওয়াজ করে বেড়াতেন। এমনকি একসময় তুরস্কের ধর্ম মন্ত্রণালয় কাজ করতেন।

গুলেন মুভমেন্ট মূলত ছিল শিক্ষা আন্দোলন। পরবর্তীতে তারা ছাত্রদের মোটিভেট শুরু করে এবং নিজেদের দলে ভেড়াতে শুরু করে। একসময় সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলে তার নিজেদের লোক ঢুকায়। যখনই যথেষ্ট পরিমাণ লোক ঢুকানো হয়ে যায় এবং তাদের আধিপত্য বেড়ে যায় তখন তারা সরকারকে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে।


কোথায় যদি কাজ না হয় তাহলে একসময় তারা নিজেরাই ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য যেকোনো পন্থা অবলম্বন করতে পারে।

১৫ই জুলাইয়ের অভ্যুত্থান


ফেতুল্লাহ গুলেনের নেতৃত্বেই ১৫ই জুলাই ২০১৬ এর সামরিক অভ্যুত্থান সংগঠিত হয়। কিন্তু সেই অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়। সেদিনের অভ্যুত্থান আপামর জনতা রুখে দিয়েছিল। মোবাইল ফোনের অ্যাপসের মাধ্যমে সেদিন এরদোয়ান জনগণের প্রতি এক ঐতিহাসিক আহবান জানান। যার সারকথা ছিল এমন-

"আজকের অভ্যুত্থান সামরিক বাহিনীর একটি অংশের বিদ্রোহ। আমি মনে করি, জনগণ এই ষড়যন্ত্রের উত্তম জবাব দিবে। জনগণের টাকায় কেনা ট্যাঙ্ক, যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার নিয়ে জনগণের ওপর হামলার খেসারত তাদের দিতে হবে। আমি প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিব। শক্তভাবে ময়দানে দাঁড়াব। সন্ত্রাসীদের হাতে দেশ ছেড়ে দেব না। আমি জনগণকে আহবান করছি। সবাইকে ময়দানে আসতে আদেশ দিচ্ছি। গুটিকতক বিদ্রোহীরা যা নিয়ে আসুক না কেন, আমরা শক্তভাবে জবাব দেব। জনগণের চেয়ে বড় শক্তি আমি আজ পর্যন্ত দেখিনি।"

এরদোয়ানের সেই ডাকে তুর্কি জনতা সাঁড়া দিয়েছিল। সেদিনের সেই সামরিক অভ্যুত্থান এরদোয়ান দক্ষতার সাথে নস্যাৎ করে দেন। তাতে ক্ষমতার ওপর এরদোয়ানের অবস্থান আরো শক্ত হয়েছে।


মুসলিম বিশ্বে এরদোয়ানের প্রভাব


সেক্যুলার সরকারে সময় তুরস্ক মধ্যপ্রাচ্য সহ মুসলিম দেশগুলোকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে। একই সাথে পাশ্চাত্যের দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে। তুরগুত ওযেল ক্ষমতায় আসার পর এ নীতির কিছুটা পরিবর্তন হলেও সেটা যথেষ্ট ছিল না।

২০০২ সালের পর এরদোয়ান বিভিন্ন মুসলিম দেশে সফর করেন। এ সময় ইরাক, ইরান, উপসাগরীয় দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করেন।

১৯৭৯ সালে ইরানে ইসলামী বিপ্লবের পর তুরস্কের সেক্যুলারিস্টরা ইরানকে বেশ ভয়ই পেত। কারণ, তুরস্কের ইসলামিস্টরা এ ধরণের একটি বিপ্লব করে ফেলে কিনা। এজন্য তুরস্কের সেক্যুলার সরকারগুলো ইরানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন করেনি। কিন্তু এরদোয়ান ইরানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের ব্যাপারে মনোযোগ দেয়। বর্তমানে ইরানে সিরিয়া ইস্যুর সমাধানসহ বেশ কয়েকটি ব্যাপারে তুরস্কের বিশ্বস্ত অংশীদার। মধ্যপ্রাচ্য ছাড়াও মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সাথে তুরস্ক যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ভালো সম্পর্কে বজায় রেখেছে। পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া কিংবা মালয়েশিয়ার কথা যদি বলি তাহলে দেখব, এই তিনটি দেশ এখন তুরস্কের অন্যতম বিশ্বস্ত বন্ধু এবং অংশীদার।

বর্তমানে সিরিয়ার সাথে তুরস্কের সম্পর্ক ভালো নয়। সিরিয়ার ভূখণ্ড আগ্রাসনের কারণে এরদোয়ান বেশ সমালোচিত হন। এই কারণে সিরিয়ার সাথে তুরস্কের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকে। বিশেষ করে কুর্দি ইস্যুতে একাধিকবার তুরস্ক সিরিয়ার সাথে সংঘাতে জড়ায়।


ইজরাইলের সাথে সম্পর্ক


১৯৪৯ সালে ইজরাইলকে মুসলিম দেশ হিসেবে তুরস্ক সর্বপ্রথম স্বীকৃতি প্রদান করে। কিন্তু সেই সময় সেক্যুলার সরকার ক্ষমতায় ছিল। বর্তমানে এরদোয়ান সরকার ক্ষমতায় আসার পর কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকলেও ইজরাইলের সাথে তুরস্কের সামগ্রিক সম্পর্ক খুব বেশি ভালো নয়। এক্ষেত্রে তুরস্ক কিছুটা ডিফেন্সিভ পররাষ্ট্রনীতি লালন করে।


এরদোয়ান বিশ্ব অর্থনীতিক ফোরামের এক প্যানেল আলোচনায় ইজরাইলকে খুনি হিসেবে আখ্যা দেন এবং ঐতিহাসিক 'ওয়ান মিনিট' ঘটনার জন্ম দেন। এতে করে ইজরাইলের সাথে তুরস্কের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকে। তারপর ২০১০ সালে মাভি মারমারা ঘটনা ঘটে।

ঐতিহাসিক 'ওয়ান মিনিট'


২০০৯ সালের ওয়ার্ল্ড ইকোনোমিক ফোরাম সামিট-এর প্যানেল আলোচনা। প্যানেল মেয়র এরদোয়ানকে বক্তব্য দেয়ার জন্য মাত্র ১২ মিনিট সময় দেন। যেখানে ইজরাইলের প্রেসিডেন্ট সিমন প্যারেজ ২৫ মিনিট কথা বলেন। সিমন প্যারেজের বক্তব্য শেষ হওয়ার পর এরদোয়ান মডারেটরের কাছে এক মিনিট সময় চান, কিন্তু মডারেটর সময় না দিয়েই প্যানেল শেষ করতে যাচ্ছিলেন। ঠিক সেই সময় এরদোয়ান রাগত স্বরে বলতে থাকেন, 'ওয়ান মিনিট, অনেক হয়েছে, ওয়ান মিনিট, প্লিজ ওয়ান মিনিট।

অবশেষে এরদোয়ান তার বক্তব্য এভাবে শুরু করেন-
"মাননীয় প্যারেজ, আপনি আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড়। আপনার কণ্ঠস্বর খুবই উঁচু, অনেক জোরে কথা বলেন। আমার মনে হয় এ ধরণের উঁচু কণ্ঠ বের করার জন্য একটি অপরাধী মুখের প্রয়োজন হয়। এটা মনে রাখবেন, আমার কণ্ঠ কখনোই এত উঁচু হবে না।

মানুষ হত্যার কথা বললে বলতে হয়, আপনার খুব ভালোই মানুষ হত্যা করতে পারেন। আপনারা শিশুদেরকে কিভাবে গুলি করে হত্যা করেন, তা আমি খুব ভাল করেই জানি। আপনার দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছে এমন দুজনের গুরুত্বপূর্ণ কথা আমার নিকট রয়েছে। মানুষ মারার জন্য ফিলিস্তিনে যাওয়ার সময় ট্যাংকের উপরে উঠে তাদের নাকি অন্যরকম এক আনন্দ লাগে। এমন কথা বলা প্রধানমন্ত্রীও আপনাদের রয়েছে। আমাকে এখন হত্যার সংখ্যার কমের) কথা বলেছেন? আমি ওদের নামও (প্রধানমন্ত্রীদের) দিতে পারব। এখানে অনেকেই আছে যারা হয়তো তাদের নাম জানতে চায়।

আবার এখানে, সেই জুলুম দেখে হাততালি দেওয়ারও লোক আছে। আমি তাদের প্রতি নিন্দা জানাচ্ছি। এই শিশু হত্যা এবং মানব হত্যার পক্ষে দাঁড়িয়ে হাততালি দেওয়া এক ধরনের মানবিক অপরাধ। এর বাস্তবতা আমরা অস্বীকার করতে পারিনা। এখানে দেখুন, আপনার কথা থেকে আমি অনেক নোট নিয়েছি। কিন্তু সময় স্বল্পতার কারণে এই নোট থেকে সব কথার জবাব দেওয়ার সুযোগ নেই।
এর মধ্যে শুধু দুটি কথা বলতে চাই। এসময় মডারেটর তাকে থামাতে চাইলে এরদোয়ান রাগত স্বরে তার কাঁধে হাত রেখে বলেন, 'এক্সকিউজ মি, আমার কথার মাঝখানে কথা বলবেন না।' এরপর আবার শুরু করলেন-

"তাওরাতের ষষ্ঠ পরিচ্ছেদে বলা হয়েছে, মানুষ হত্যা করা যাবে না। কিন্তু এখানে ইসরাইলে হত্যা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, দেখুন এখানে একটি খুবই ইন্টারেস্টিং ব্যাপার আছে। গিলাত আতসামুনি (একজন ইহুদি) বলেন, ইসরাইলের বর্বরতা জুলুমের আরেক রূপ। এর সাথে ইসরাইলের সেনাবাহিনীতে সৈন্য হিসেবে কাজ করা অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রফেসর আবুল কালাম...

মডারেটর আবারও থামাতে চাইলে তিনি বলেন, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। কিন্তু ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এটাই আমার শেষ প্রোগ্রাম আর। আর আসব না। আমাকে কথা বলার সুযোগ দেননি। সিমন প্যারেজ ২৫ মিনিট কথা বলেছে আর আমাকে দেওয়া হয়েছে মাত্র ১২ মিনিট।"

এরপর এরদোয়ান প্যানেল ত্যাগ করে উঠে চলে আসেন। 'ওয়ান মিনিট'-এর সেই ঐতিহাসিক ঘটনা সত্যিই বিপ্লবী ঘটনা। যেটা ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী মানুষের পক্ষে এক বড় আওয়াজ।

একদিকে এরদোয়ানের যেমন জনপ্রিয়তা রয়েছে অন্নদিকে রয়েছে সমালোচনা। তার বিরোধীরা তাকে কঠোর ভিন্নমত দমনকারী নামে আখ্যায়িত করেন। তারা দাবী করেন এরদোয়ান দেশের সংবাদমাধ্যম ও বিচারবিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করছে।

কুর্দি ইস্যুতে এরদোয়ান বিশ্বব্যাপী ব্যাপক সমালোচিত। সিরিয়া ভূখণ্ডে কুর্দি বিরোধী অভিযান তুরস্কের অনধিকারচর্চা বলে ধারণা করেন অনেক বিশ্লেষক। সব মিলিয়ে এরদোয়ান যেমনি আলোচিত তেমনি সমালোচিত। কিন্তুু একথা অস্বীকাার করা যায় না যে, মুসলিম বিশ্বের জন্য এরদোয়ান যা করেছেন অন্য কোন রাজনৈতিক নেতার ক্ষেত্রে সেটা দেখা যায়নি।
শাকিল আহমেদ
লেখালেখি আমার পেশা নয় তবে নেশা। জ্ঞানার্জনের তীব্র পিপাসা থেকেই লেখনীর সূচনা।