ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

পথশিশু - লিখেছেন - কুশিও নবাব প্রিন্স



প্রায় ভরদুপুর। রোদের তীক্ষ্ণটা একটু বেড়েছে। রোদ্রে বেশিক্ষণ থাকা যায় না। শরীরের হাত পা যেন পুড়ে যেতে চায়। এরকমই এক দিনে শাহিন সকাল থেকে রাস্তায় হাটঁছে। শুধু হাটঁছে না তার সাথে সংগ্রহও করছে। কখনো প্লাস্টিকের বোতল কখনো কাচের ভাঙাচোরা জিনিস,কাগজ ইত্যাদি। তার কাধে আছে একটা ঝোলানো ব্যাগ। ময়লায় কালছিঁটে পড়ে গেছে। সকালে যে ব্যাগটা খালি থাকে সেটা দিনের এক সময় গিয়ে ভীষণ ভারী হয়ে পড়ে।তখন বহন করতে বেশ কষ্ট হয়। এখনা আর সেটা হয় না শাহিনের। শাহিন এখন এসব কাজ করতে করতে অভস্ত্যতা হয়ে গিয়েছে। সে এখন আর আগের মতো ক্লান্ত হয় না। সে সবসময় বীরের মতো পরিশ্রম করে দিন শেষে অল্প ক'টা টাকা কামায়।
 
সে হাটঁছিলো এমন সময় তার মতোই কিছু ছেলে তাকে ইচ্ছে করে ধাক্কা দিয়ে ফুটপাতে ফেলে দিয়ে সেই ছেলে গুলো দৌড়ে পালায়। পালানোর সময় দাত খিলখিল করে হাসে। শাহিন আগের মতো সাহস করে তাদের সাথে মারপিট করে না। সে শুধু রাস্তায় শুয়ে শুয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকা সেই মানুষগুলোর দিকেই তাকায়।
এক সময় ছিলো শাহিন ব্যাপক মারপিট করত। কখনো বস্তিতে আবার কখনো এলোপাতাড়ি রাস্তার ছেলেদের সাথে কিল ঘুষি মেরে অন্যদের কাধের ঝোলানো ব্যাগ থেকে সারাদিনের সংগ্রহ চুরে করে পালানো শাহিন, আজ চুপচাপ একলা পথিক। কারণ সে মায়ের কথা শোনে।তার মা'র আদেশে সে আর মারপিট করে না। কিন্তু তার এখন আর বেচে নেই। তাতে কি শাহিন তার মায়ের কথাগুলো মনে রেখেছে। ভুলে যায় নি।
শাহিন এখনো হাটঁছে। শরীরে একটা ছেড়া ময়লা গেঞ্জি। গেঞ্জিতে একটা বিড়ালের স্টিকার লাগানো। গেঞ্জির কাপড় ছিড়েছে কোথাও কোথাও, কিন্তু স্টিকারটা খুব যত্নে আছে বলে মনে হয়। আর আছে পরনে ময়লা হাফ প্যান্ট আর খালি পা। 
সকাল পেরিয়ে দুপুর হতে চলল। সকালে কিছু খায় নি শাহিন। প্রত্যেকদিন তার কপালে তিন বেলা খাবার জোটে না। তার সংগ্রহ করতে হয়। কেউ তাকে খেতে দিলে খায়। না হলে এটা ওটা বাসি খাবার খায়। 
একটা বাস স্ট্যান্ডের সামনে থেকে শাহিন রাস্তা পার হলো। রাস্তার ওপাড়ে যেতেই দেখলো একটা চায়ের দোকান। সে একটু এগিয়ে যায় খাবারের খোজে।
“ আপনের দুকানে পাউরুটি আছে? ”
“ হ আছে। ১০ টাকা পিস।”
“ আমার কাছে ট্যাকা নাই। ফিরিতে খাইতে দিবেন। খুব ক্ষিদা পাইসে।” 
“ নাহ না! টাকা ছাড়া কিছুই পাবি না। পাউরুটি তো দূরের কথা এক ফোটা পানিও পাবি না। ”
“ এমন করেন কেন? শহরে কি ধনী মানুষই আছে? গরিব ফকিন্নি নাই?”
“ তুই যাবি এইখান থেইকা! যা কইলাম জালাইস না। ”
শাহিন দোকান থেকে মন খারাপ আর ক্ষুদা নিয়েই বেরিয়ে যায়। হয়তো তার ভাগ্যে আজ পানিও জুটবে না, সেটা সৃষ্টিকর্তা আগেই লিখে রেখেছেন। 
আমাদের ভাগ্য মাঝে মধ্যে হাতের মুঠোয় থাকলেও আমরা সেটা সহজে টের পাই না। যখন টের পাই তখন ভাগ্যটাই হারিয়ে যায়! আর ধরতে পারি না।
সময়টা ঠিক বিকেল। শাহিন হাটঁছে এখনো। হাটঁতে হাটঁতে সে এক পার্কের দেয়াল ঘেষে হাটছে। শাহিন চিনতে পেরেছে এই পার্কটি। সে আগে এখানে এসেছে। অনেক আগের এক ঘটনা, সে তখন তার বস্তির সব ছেলেদের মধ্যে সব থেকে মা'র কুটে ছেলে ছিলো শাহিন। তার কিছু বন্ধুদের নিয়ে পার্কে ঢুকতে চাইলে তাদের ঢুকতে দেয়া হয় না। তাই তারা পার্কের দেয়াল টপকিয়ে ভিতরে ঢোকে। কিছুক্ষন পর সিকিউরিটি গার্ড তাদের দেখে ফেললে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেয়। শাহিন একটু উত্তেজিত হয়েছিলো বলে তাকে কষিয়ে মেরেছিলো সেই সিকিউরিটি গার্ডটা।
হঠাৎ পার্কের ভিতর থেকে এক স্বাস্থবান দেখতে একটি ছেলে শাহিনের দিকে জুসের প্যাকেট ছুড়ে মারে। প্যাকেটটা ঠিক এসে লাগে শাহিনের কাধে ঝোলানো ব্যাগে। তারপর সেই ছেলেটা জিব্বা বের করে ভেংচি কাটে। শাহিনের বেশ রাগ হয়েছিলো। কিন্তু সে ভুপচাপ হেঁটে চলে যায়। আর রাস্তায় পড়ে থাকে সেই জুসের প্যাকেট। 
সন্ধ্যা হয়ে গেসে। শাহিন এখন বস্তিতে ফিরবে। সে শহরের রাস্তা দিয়ে হাটঁছে শুধুই হাটঁছে। সে তাকাচ্ছে আকাশের দিকে। আসলে আকাশের দিকে নয় সে তাকাচ্ছিল বিরাট বড় বিল্ডিং গুলোর দিকে। বিল্ডিং এর প্রত্যেকটা জানালায় টিপটিপ করে আলো জ্বলছে তার কাছে মনে হয় সেই ছোট্ট আলোগুলো যেন আকাশের তারা। অন্ধকার আলোয় তার চোখগুলো জ্বলজ্বল করে ওঠে।

( সমাপ্ত)
কুশিও নবাব প্রিন্স
ঢাকার এক সরকারি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছি। দর্শন এবং টুকরো টুকরো গল্প উপন্যাসের প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে তুলছি।