ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

অন্তরালের দুঃখগাঁথা: মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ - লিখেছেন - বাবুল আশরাফ




১৯৪৭ পূর্ব ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ছিলেন সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা। বিশাল তাঁর ব্যক্তিত্ব। মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপর একচ্ছত্র প্রভাব তাঁর।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পরই পাকিস্তানের জাতির জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যু হয়। ফলে, রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা রাখার এবং রাজনীতিতে পরীক্ষিত হওয়ার সময় তিনি পাননি। তবে এখনও তিনি নিজ দেশে পরম শ্রদ্ধেয় ও জনপ্রিয়তম ব্যক্তিত্ব।

পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা, পকিস্তানের জাতির পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মেয়ে দিনা ওয়াদিয়া।
১৯১৯ সালের ১৫ আগস্টের প্রথম প্রহরে লন্ডনে জন্ম তাঁর। জিন্নাহর দ্বিতীয় স্ত্রী পার্সিয়ান বংশোদ্ভুত রতনবাই ওরফে মরিয়ম জিন্নাহর একমাত্র সন্তান দিনা। দিনা নয় বছর বয়সে মাতৃহীন হন। দিনা বড় হয়েছেন তার নানীর কাছে।
 


জিন্নাহর পিতামহ ছিলেন প্রেমজিভাই মেঘজিভাই ঠক্কর, গুজরাটি, নিরামিষভোজী কট্টর হিন্দু।
প্রেমজিভাইয়ের ছিল মাছের ব্যবসা। আত্মীয়-পড়শী সবাই এই ছোটজাতের ব্যবসার জন্য তাঁকে একঘরে করে দেয়। নিরামিষভোজী উচ্চবর্ণের হিন্দু, মাছের ব্যবসা করবে এটা কেউই মেনে নিতে পারেনি। তাঁর ধোপা-নাপিত ইত্যাদি বন্ধ হয়ে গেলো, সমাজে চলাচল বন্ধ হয়ে গেলো। বাধ্য হয়ে মাছের ব্যবসা ছেড়ে দিলেন। কিন্তু সমাজে প্রায় অচ্ছুৎ-অবমানিত হয়েই থাকতে হলো তাঁকে। ক্ষোভে-দুঃখে তিনি চার ছেলেকে নিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন।

মোহাম্মদ আলী জিন্নার একমাত্র সন্তান, একমাত্র উত্তরাধিকারী, লন্ডনে জন্ম, তাঁর ভারতের প্রতি কোন টান থাকারই কথা নয়। কিন্তু তিনি পাকিস্তানে যাননি। থেকে গিয়েছিলেন বোম্বেতেই। জিন্নাহ মেনে নেননি নেভিল ওয়াদিয়া নামের পার্সি যুবকের সঙ্গে দিনার বিয়ে, বিয়েতে উপস্থিত থাকেননি, ড্রাইভার আবদুল হাইকে দিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছেন ফুলের তোড়া।

আবার বিয়ের পাঁচ বছরের মাথায় ১৯৪৩ এ স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবার পরও বাবার সঙ্গে থাকেননি দিনা আর নামের সাথে ব্যবহার করেছেন স্বামীরই নামের অংশ- 'ওয়াদিয়া'। 'দিনা জিন্নাহ' নামে ফিরে যাননি- পিতার প্রতি ক্ষুব্ধ অভিমান তাঁর ততোদিনেও ফুরায়নি।

ছেলে নাসলি কে নিয়ে তিনি একা, অর্থনৈতিকভাবেও বেশ বিপর্যস্ত। পাকিস্তানে যাওয়া মাত্র পদ-পদবি , অঢেল ক্ষমতা, অর্থ-বিত্ত সবই তাঁর আয়ত্তে আসবে। কিন্তু তিনি বম্বে ছেড়ে তিনি এক পাও নড়েননি।

অল্পবয়সে মাতৃহারা এই কন্যাটিই ছিল জিন্নার সব। তিনি শেষ চেষ্টা করেন মেয়েকে পাকিস্তানে আনার জন্য। নতুন দেশ, সম্মান, প্রতিপত্তি সব কিছু প্রাপ্তির আশ্বাস দেন। কিন্তু মেয়ে রাজী হয়নি। বাবার প্রতি অভিমান তাঁর ফুরায়নি। যদিও মুখে বলেছেন,

"তুমি কি পারবে-
বম্বে থেকে আমার মায়ের
কবর পাকিস্তানে নিয়ে যেতে?
বম্বে আমার শহর, আমার শহরের নাম বম্বে।" 

বাবার সঙ্গে এই তাঁর শেষ কথা।

ভগ্ন হৃদয়ে বিদায় দেন পিতাকে। প্রবল ক্ষমতাধর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহও ফিরে যান ভগ্ন হৃদয়েই।
দেশ ভাগাভাগির পর দিনা ওয়াদিয়া আর দেখতে যাননি কেমন হল তাঁর বাবার স্বপ্নের পাকিস্তান। তবে তিনি গিয়েছিলেন তার পরের বছর ১৯৪৮ সালে বাবাকে শেষবিদায় জানাতে, শেষকৃত্যে। পিতার বিপুল সম্পত্তির কণামাত্র দাবি না করেই ফিরে এসেছিলেন বোম্বেতে।
   



১৯৪৬ এ দেখা হয়েছিল দু’বছরের নাতি নাসলির সাথে দেখা হয়েছিল তাঁর দাদু জিন্নাহর। নিজের মাথার একটা ছাই রঙের টুপি (সারা উপমহাদেশে 'জিন্নাহ ক্যাপ' নামে খ্যাত টুপি) পরিয়ে দিয়েছিলেন নাতির মাথায়। জিন্নাহ তাঁর ডায়রিতে লিখেছিলেন, এটি তাঁর জীবনের খুব স্পেশাল একটা দিন।

তিন বছরের একমাত্র সন্তান নেসলি ওয়াদিয়াকে নিয়ে বোম্বের মাটি কামড়ে অনমনীয় জিদ আর অধ্যবসায় সম্বল করে ব্যবসায় প্রতিষ্ঠা পেলেন দিনা ওয়াদিয়া। এখনো ভারতের ধনীদের তালিকায় প্রথম দশে আছে, মোহাম্মদ আলী জিন্নার একমাত্র ওয়ারিশ নেসলি ওয়াদিয়ার নাম।


বম্বে ডাইং এর মালিক তাঁরা। তাঁদের আরো অনেক ব্যবসা আছে। নেসলির দুই ছেলে জাহাঙ্গীর ওয়াদিয়া আর নেস ওয়াদিয়া । কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের অন্যতম মালিক নেস ওয়াদিয়া, কিছুদিন আগে প্রীতিজিনতাকে নিয়ে ঝামেলায় জড়িয়ে সংবাদ মাধ্যমে শিরোনাম হয়েছেন বারবার।

 মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কন্যা, দিনা ওয়াদিয়া ২রা নভেম্বর ২০১৭ তারিখে, ৯৮ বছর বয়সে নিউইয়র্কে মারা যান।

'লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান' আওয়াজ তোলা 'কায়েদে আজম' উপাধিপ্রাপ্ত তুখোড় রাজনীতিবিদ, পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা, পাকিস্তানের প্রথম 'বড়লাট', জাতির জনক মোহম্মদ আলি জিন্নাহর কেউ নেই পাকিস্তানে।



বাবুল আশরাফ
জন্ম: ১১সেপ্টেম্বর ১৯৫৯। হামিরদী-ভাঙ্গা-ফরিদপুর। অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ, রিজিয়া বেগম মহিলা কলেজ, শিবচর, মাদারীপুর।