ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

হিমুগল্প - লিখেছেন - রেজাউল হাসান ফাহিম




প্রথম অংশঃ-
.
ভাল্লুক নামে পৃথিবীতে এক অদ্ভুত কিসিমের প্রাণী এসেছে। এরা একা একা ঘুরে বেড়ায়, খায় আর বছরের নির্দিষ্ট একটা সময় ভাতঘুম দেয় ঠিক আমার মতো। আমার ধারণা পশুদের মধ্যে মানুষের মতো ভাগাভাগি থাকলে ভাল্লুক হতো পশু সমাজের হিমু, তখন তাদের গায়ের লোম হতো হলুদ। আমার ব্যপারটা অবশ্য একটু আলাদা, আমার ভাতঘুম দেয়ার নির্দিষ্ট কোন সময় লাগে না। এই হঠাৎ রুমে এসে ঘুমিয়ে পড়লাম, এক ঘুমে ৭-১০ দিন কাবার; মাঝখানে শুধু খাওয়া আর ইস্তেঞ্জার বিজ্ঞাপন বিরতি। খাবার হাশেম ভাইয়ের দোকান থেকে পাঠিয়ে দেয়া হয়, যে নিয়ে আসে তার নাম সেলিম মিয়া, বয়স-৭। আমার শীতনিদ্রার আজ চার দিন চলছে, হঠাৎ স্বপ্নে দেখলাম আমার রুমে দুইটা ভাল্লুক বসে আছে, একটা ছোট কিন্তু ভয়ংকর আর আরেকটা বড় কিন্তু বলদ টাইপ। ভয়ংকর ভাল্লুকটা মেঝেতে বসে ধায়ালো দাঁত দিয়ে আমার পাঞ্জাবীর এক কোণা ধরে টানছে আর বলদ ভাল্লুকটা চেয়ারে বসে আছে; তার গায়ে হলুদ পাঞ্জাবী, খুব সম্ভবত এটা হিমু ভাল্লুক। আমার মনে হলো ছোট ভাল্লুকটা অনেক দিন খেতে না পেয়ে খাবারের স্বাদ ভুলে গেছে, আমার হলুদ পাঞ্জাবীই যেন তার কাছে একখণ্ড ঝলসানো রুটি। কিন্তু রুটিটা জেলখানার তাই সে টানছে কিছু ছিঁড়তে পারছে না, আহারে বেচারা!! এই ভাল্লুকের কামড়াকামড়ি আর কাহাতাক সহ্য করা যায়? অগত্যা আমাকে চোখ খুলতে হলো। চোখ খুলে দেখি আমার মেঝেতে বসা চারপায়ের এক ভয়ংকর কুকুর, নাম-জার্মান শেফার্ড, তার মুখে আমার পাঞ্জাবীর কোণা আর বিছানার পাশের চেয়ারে বসা বাদল তার গায়েও হলুদ পাঞ্জাবী। "হিমু ভাই সেই কখন থেকে বসে আছি কিন্তু তোমার তো উঠার নামগন্ধই নেই! বাসক পাতাও কখন থেকে তোমাকে জাগানোর চেষ্টা করছে, এদিকে তোমার হুঁশই নেই।” আমি বললাম, “কি পাতা?" “আমার নতুন কুকুর হিমু ভাই, নাম বাসক পাতা।"

কয়েকমাস আগের কথা- বাদল আমাকে বললো, "এই পৃথিবীতে থেকে আর লাভ নাই হিমু ভাই, মানুষ ভালোবাসতে ভুলে গেছে, চারিদিকে শুধু ধোঁকা আর ধোঁকা। আমি বললাম, মানুষ ভুলে গেলেও কুকুরেরা ভুলেনি, তুই তো বেকার আছিস কয়েক জাতের বিদেশী কুকুর পোষা শুরু কর তারপর ব্রিডিং। কাঁটাবনে যে দোকানগুলো আছে তাতে সাপ্লাই দে, ইমপোর্ট কর, লোকালভাবেও বিক্রি শুরু কর। নিজস্ব একটা ঠিকানা বানা তোর, কিছু ইনকামও হলো আর চারপাশে ঘিরে থাকলো কুকুরের ভালোবাসা।" আমি বেশীরভাগ সময় এই কথাগুলো ফাজলামি করে বলি কিন্তু এই গাধাটা সব সিরিয়াসলি নিয়ে নেয়, বাসক পাতা আমার সেদিনের মজার ফল কিনা কে জানে!!
বাদলকে বললাম, আরেকটু ভিতরের দিক দাঁত লাগিয়ে টানলে তো তোর বাসক পাতা আমার নিজস্ব সম্পত্তিতে শুধু বাসক রেখে পাতাটা ছিড়ে নিতো, বাল বাল বাচগায়ি! এই জিনিস তুই জোটালি কই থেকে?
বাদল বললো, সব কথা পরে হবে। সকাল থেকে না খেয়ে বসে আছি আগে কিছু খেতে হবে, চলো। অতঃপর আমাকে উঠতেই হলো। আমার এবারের শীতনিদ্রায় সমাপ্তি ঘটালো বাদল। সকালে সেলিম মিয়া পরোটা-ভাজি আর ফ্লাস্ক ভর্তি চা নিয়ে আসার কথা। মহাশয়ের আজ দেখা নেই, এ অবশ্য নতুন কিছু না মাঝেমধ্যেই এমন হয়। আমি মুখ ধুয়ে হাশেম ভাইয়ের দোকানে হাজির হলাম, সাথে বাদল। তার হাতে বেল্ট আর বেল্টে বাঁধা বাসক পাতা। আমাকে দেখে হাশেম ভাই বললো, "হিমু ভাই নিজেই চইলা আইলেন? পোলাডার আজকে অসুখ তাই কামে আহে নাই, আপনার নিজের আইতে হইলো। আমি এর লাইগা সরি আছি হিমু ভাই, মনে কিচ্ছু নিয়েন না।" বললাম মনে কিছু নেয়ার আগেই নাস্তা দেন, মন বড়ই আচানক জিনিস কখন কি নিয়ে নেয় বলা যায় না। হাশেম ভাই বাসক পাতাকে দেখিয়ে বললো, হিমু ভাই আপনার এই জিন্নামোমিনডা কি কামুড় দেয়? বললাম, এমনিতে দেয় না কিন্তু কেউ নাস্তা দেরি করে দিলে তখন কামড়ায়।" “হাহাহা,  হিমু ভাই আপনে পারেনও, বহেন দিতাছি।"

নাস্তা চলে এলো, আমি আর বাদল চুপচাপ খাচ্ছি। বাদলের ভেতর একটা চাপা উত্তেজনার গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তাই আমিই বললাম, এবার তোর বাসক পাতার কাহিনী বল। বাদল বললো,"আইডিয়া তো তোমারই হিমু ভাই কুকুরের বিজনেসের। তুমি বলার পর আব্বুকে দিয়ে বেশ কিছু ব্রিডিং ফরেন ডগ জোগার করলাম, তারপর তাদের ব্রিডিং করিয়ে কাঁটাবনে নরমাল থেকে কমদামে সাপ্লাই দেয়া শুরু করলাম। দাম কম দেখে সিলেট, চট্টগ্রামসহ বেশ কিছু বড় শহরেও সাপ্লাইয়ের অর্ডার পাচ্ছি। এখন ভাবছি নিজেই একটা দোকান দিব আর নতুন কিছু ব্রিড কালেক্ট করে একটা ফার্ম। সেই কুকুরগুলোর একটা বাচ্চাকে দারুণ ভালোলেগে যায় আমার, বাচ্চাটাও আমাকে দেখলেই দৌড়ে চলে আসে। তখন ভাবলাম একে বিক্রি না করে সাথে রেখে দিব। এই সেই বাসক পাতা। বাসক পাতা নাম রেখেছি কারণ এটা বাসকের মতোই উপকারী, সাথে থাকলে ভিতরটা ঠান্ডা করে দেয়। আমি আমার ভালোবাসা পেয়ে গেছি হিমু ভাই, তোমার জন্যই পেয়েছি।" বাদল অতীতেও আমার ফাজলামো শুনে অনেক পাগলামি করেছে তাই আমি অবাক না হয়ে বললাম, দোকান আর ফার্মের জন্য যে টাকা আর জমি চাই সেটা কই থেকে পাবি? বাদল বললো, "খরচা নিয়ে চিন্তা নেই ভালো সেভিংস হয়ে গেছে। আরও লাগলে লোন নেব আর জমি তুমি দিবা, তাইতো সাত সকালে তোমার কাছে এলাম।" এই সেরেছে ঢাকায় আমার নিজেরই ত থাকার জায়গা নেই। আজ এ মেস কাল ও মেস করে বেড়াই। এই পাগলকে আমি এখন জমি কই থেকে দিব! বললাম, “তুই শিওর যে জমি আমাকেই দিতে হবে? বাদল বললো, ঢাকায় একমাত্র তুমিই আমাকে জমি ম্যানেজ করে দিতে পারো আর কেউ না, তোমার কথায় বিজনেস শুরু করে আশার আলো দেখছি, তুমিই পারবে, ইউ আর দি গ্রেট হিমু ভাই। জমি ম্যানেজ হলে যোগাযোগ কইরো অথবা আমিই এসে যাব। আজকে উঠি হিমু ভাই"।
বাদল ছেলেটা আমার অন্ধভক্ত, তার ধারণা আমি একজন মহাপুরুষ। তাকে যা বলি তাই বোকার মতো অনুসরণ করে আর প্রায়ই আমাকে এরকম ঝামেলায় ফেলে। আমি অনেক চেষ্টা করেও তার এই অন্ধবিশ্বাস দূর করতে পারি নি। শেষমেশ ভাবলাম থাকুক এই বিশ্বাস, দুয়েকটা ভক্তেরও দরকার আছে। বাদলের জমির কথা ভুলে গিয়ে আমি আমার নিজস্ব জমিতে হাঁটার জন্য উঠে দাঁড়ালাম, যতদূর চোখ যায় সবই এখন আমার জমি। রাস্তাগুলো নিজের করে নিয়ে হাটতে শুরু করবো, পরনে সেই হলুদ পাঞ্জাবী। মাটির দিকে তাকালেই দেখা যাবে খালি পা।
.
দ্বিতীয়াংশঃ-
.
বাংলা অভিধানে রাঘব বোয়াল নামে একটা কথা আছে, যারা অত্যন্ত ক্ষমতাধর লোক তাদের এই বলে ডাকা হয়। আমি এখন যেই প্রাসাদ সমান বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছি তার মালিক নিশ্চয়ই এরকম কোন বোয়াল মাছ, তা নাহলে এরকম জাদুঘর সমতুল্য বাড়ি বানিয়ে তার ভিতর বাস করার চিন্তা সাল্লু কারোর মাথায় আসার কথা না। আমি সাধারণত এইরকম লোকজন এড়িয়ে চলি কিন্তু বড় খালার অমানুষিক চাপাচাপিতে ভেতরে থাকা রাঘব বোয়ালের সাথে দেখা করতে হচ্ছে, জনাব রাঘব বোয়ালের নাম ফখরুল তরফদার। আমাকে দারোয়ান গেটের সামনে দেখে কিছু না বলেই বড়সড় একটা ড্রয়িংরুম মতো জায়গায় বসিয়ে দিয়ে চলে গেলো, সম্ভবত আগে থেকেই হলুদ পাঞ্জাবী পরে কেউ আসবে তাকে বলে দেয়া ছিলো, কে জানে!!
ঘরটা বেশ সাজানো- সোফাসেট, প্রকান্ড টিভি, গোল টেবিল আর সোফাসেটের পিছনে সেলফে সাজানো বিদেশী মদের বাহার। আমার রুম দেখা শেষ হবার আগেই ভেতরের রুম থেকে সাদা পাঞ্জাবী পরা এক লোক বের হয়ে আসলো। সুদর্শন চেহারা, কাচপাকা দাঁড়ি, সুঠাম শরীর। আমি বাড়ি দেখে মালিককে যে পেটমোটা বোয়ালের সাথে তুলনা করেছিলাম তিনি তা নন, তিনি ফিট কোনো সামুদ্রিক মাছ।

উনি এসে আমার বিপরীত সোফায় বসলেন, বসতেই এক ছোকরা এসে লাল পানির বোতল, সিগারেট আর গ্লাস দিয়ে গেলো। গ্লাসে লাল পানি ঢালতে ঢালতে উনি আমাকে বললেন, রেড ওয়াইন চলে? আমি বললাম, নাহ থাক, লাল পানি দেখে আপনাকে ভ্যাম্পায়ার মনে হচ্ছে যে এখন আমার সামনে বসে গ্লাসে করে রক্ত খাবে। আমার কথা শুনে উনার মুখের ভাবভঙ্গি পরিবর্তন হলো না। তিনি লাল পানিতে চুমুক দিতে দিতে বললেন, আপনিই তাহলে হিমু, যার আধ্যাত্মিক ক্ষমতা টমতা আছে, আপনার খালা বললো আপনি নাকি মানুষের সমস্যা সমাধান করে দিতে পারেন। আমি হাত বুকের কাছে এনে অবাক হবার মতো করে বললাম, আমি!! কি যে বলেন জনাব, আমিতো সামান্য একটা বাসক পাতা! আমাকে চিবিয়ে খেলে আপনার ভিতর ঠান্ডা হয়ে যাবে এর থেকে বেশী কিছুই নাহ। আমার রসিকতায় ভদ্রলোককে খুব একটা আনন্দিত মনে হলো না, তিনি আবার গ্লাসে মদ ঢালতে ঢালতে বললেন, আমি ব্যাক্তিগত জীবনে দুটি সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি একটা মেজর আরেকটা মাইনর, যার ব্যাপারে ডিসকাস করার জন্য আপনাকে ডাকা।
আমার প্রথম সমস্যার কথা আপনাকে বলি, আমার এ বিশাল সম্পত্তি সব আমার স্ত্রীর নামে উইল করা। একসময় আমার শ্বশুরের নামে ছিলো, তিনি মৃত্যুর আগে তার একমাত্র মেয়ে মানে আমার স্ত্রীর নামে সব লিখে দিয়ে যান। উইলের সব কাগজগুলো লকারেই থাকতো আমার স্ত্রীর মৃত্যুর পর সেগুলো আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, এখন উইল ছাড়া সব আমার নামে অফিশিয়ালি হ্যান্ডওভার করাও সম্ভব হচ্ছে নাহ, কাগজগুলো খুঁজে পাওয়া খুব দরকার। আমি বললাম, এখন আপনি চাচ্ছেন আমি কাগজগুলো বের করতে আপনাকে হেল্প করি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আমি বললাম, এতো মুশকিলে তো ভাই কপোতাক্ষ নদও মাইকেল মধুসূদনকে ফেলেনি যতটা আপনি আমাকে ফেলছেন। যাই হোক, আপনি ছাড়া বাড়িতে আর কে কে থাকে? উনি বললেন, ওই কাজের ছেলেটা আর দারোয়ান। বললাম, ব্যাস খেল খতম। ওই দুই হারামজাদাকে ডাকুন, কাজ ওরাই সেরেছে, বিচিতে ডলা দিয়ে দুটো বিচি আলগা করে কান্ধে তুলে দিচ্ছি সব সত্য কথা এক্ষুনি স্বীকার করে নিবে। উনি বললেন, না এরা কিছু করে নি, দারোয়ান অনুমতি ছাড়া কখনও বাড়ির ভেতরে আসে না। আজও আগে থেকে আপনার কথা বলে দেয়া ছিলো তাই এসেছে আর কাজের ছেলেটা একটু বেকুব রকমের, উইল কাগজ এসব বোঝার মগজ তার নাই, সে এতটাই মন ভুলা যে আমি আসার আগে তাকে হুইস্কি দিতে বলেছিলাম, সে ভুলে গিয়ে রেড ওয়াইন দিয়ে গেছে।
বললাম, ভোদাই টোদাই নিয়ে বাস করাটা জটিল সমস্যা। যাই হোক আপনার মাইনর প্রবলেমটা বলুন। তিনি আমার দিকে সরে এসে আস্তে আস্তে বললেন, আপনি ভূতপ্রেত বিশ্বাস করেন? আমি বললাম,অবশ্যই ভুতে বিশ্বাস করি, একবার আমার রুমেই তো এসে হাজির হয়েছিলো। মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভাঙতেই দেখি একটা ভূত আমার চেয়ারে বসে আছে। নাহ, ভূত বললে ভুল হবে, ওটা ছিলো কিংভূত। কারণ তার বডিটা ছিল মানুষের আর মাথাটা ইলিশ মাছের। শরীরে আলখেল্লা পরা খুব সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের বডি, আমার চোখে চোখ পরতেই বলে উঠলো,
"কিছুতে কাহারে যেন লাগে ভয়, মনে হয়,
আজি ঝড়ো ঝড়ো মুখরো বাদল দিনে।"

কিন্তু তখন চলে ভাদ্রমাস অথচ সেই গরমে রবীন্দ্রনাথ ইলিশের মাথা লাগিয়ে এসে আমাকে বৃষ্টির শোনাচ্ছে! কি ভয়ংকর ভাবুন একবার। উনি এবার আমার কথায় একটা মানুষের পক্ষে যতটা গম্ভীরমুখ করা যায় ঠিক ততটা করে বললেন, এরকম রসিকতা করার আগে তোমার বোঝা উচিত ছিলো তুমি কার সামনে বসে কথা বলছো। নেহায়েত তোমার খালা-খালুর সাথে আমার সম্পর্ক ভালো, নাহয় আজ তুমি এসব থার্ডক্লাস রসিকতার ফল হাড়ে হাড়ে ভোগ করতে। আমি সবসময় মানুষকে ভড়কে দেয়ার সুযোগে থাকি আর সামনের মানুষটা যদি আমার উপর উত্তেজিত হয়ে থাকে তাহলে তো আর কথাই নেই, ব্যাস এখন শুধু আমার আগুনে কেরোসিন ঢেলে দিতে হবে তাহলেই খেল খতম। আমি বললাম, আরে ভাই আপনি রেগে যাচ্ছেন কেন? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যদি এরকম কান্ড ঘটান তাহলে আমার দোষ কি বলেন? আপনাকে বরং আমার এক পরিচিত লোকের সাথে ঘটে যাওয়া ভুতের কাহিনী শোনাই, "বেচারার ছোট্ট সংসার ছিলো। শুধু উনি আর উনার স্ত্রী। হঠাৎই কোন অদ্ভুত কারণে তার স্ত্রী মারা যায়, কিন্তু কিছুদিন পর হয় কি তার স্ত্রী মারা যাবার পরও তার কাছে আবার ফিরে আসে। প্রতিদিন মাঝরাতের একটা নির্দিষ্ট সময়ে তার ঘুম ভেঙে যায় আর উনি দেখতে পান বিছানার পাশে উনার মৃত স্ত্রী দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে।”
এবার জনাব ফখরুল তরফদারের মুখের গম্ভীর ভাবটা উধাও হয়ে গেলো, উনি বুঝতে পারলেন যে আমি এতক্ষণ উনাকে উনার নিজের কাহিনীই শোনাচ্ছিলাম। উনি আমার হাত ধরে ফেললেন ধরেই বললেন, হিমু ভাই আমাকে এই বিপদ থেকে উদ্ধার করেন, এমনিতেই সম্পত্তি নিয়ে এতবড় ঝামেলায় আছি তার উপর রাতে এসব কান্ড, খুব জটিল অবস্থায় আছি ভাই। আমি বললাম, "জীবন আপনাকে আপনার প্রাপ্যটা ফিরিয়ে দিচ্ছে, আপনার স্ত্রীর কোন সাধারণ মৃত্যু হয়নি। আপনি নিজেই সম্পত্তির লোভে তাকে খুন করেন তারপর সব নিজের নামে করে নিতে চান। কিন্তু উইল খুঁজে না পাওয়ার কারণে সব অফিশিয়ালি নিজের নামে করে নিতে পারছেন না, এখন এই উইল না পাওয়া গেলে আপনি ভালো করেই জানেন সম্পত্তি হাতছাড়া হতে এক মিনিটও লাগবে না। এর উপর আপনার স্ত্রী যাকে আপনি খুন করেছেন তাকে আপনি রাতে দেখতে পারছেন, একেই বলে কিসমতের মাইর, প্রকৃতির বদলা।"
উনি কাঁদো কাঁদো স্বরে বললেন, আপনি যা চান তাই দিব, শুধু বলেন এই পরিস্থিতি থেকে রেহাই পেতে গেলে আমার কি করতে হবে? আমি বললাম,"ছাই উড়িয়ে দেখতে পারেন, কবি বলেছেন, 'যেখানেই দেখিবে ছাই উড়াইয়া দেখো তাই, পাইলেও পাইতে পারো মানিক রতন।' যেখানেই ছাই পাবেন আপনি উড়াইয়া দেখুন, এছাড়া আপনার আর কিছু করার আছে বলে আমার মনে হয়না।"  উনি অবাক হয়ে বললেন," ছাঁই!!” এই লোকের সাথে কথা বলতে আমার আর ইচ্ছা হলো না, আমার কাজ ছিলো তাকে ভড়কে দেয়া আর আমি তা সফলভাবে করতে পেরেছি তাই, "আমি আসি" বলে আমি সেখান থেকে বিদায় নিয়ে আমার চিরচেনা রাস্তায় নেমে এলাম। অনেকদিন হলো রূপার সাথে কথা হয় না। ও কে একটা ফোন করা দরকার।

তৃতীয়াংশঃ-
.
আকাশে আজ ফকফকে জোৎস্না, সিদ্ধার্তের ঘর ছাড়ার দিন আকাশে যেরকম জোৎস্না ছিলো আজও ঠিক সেরকম জোৎস্না। আমি কাকরাইল রোড হয়ে আমার সেই বিখ্যাত হাঁটা হাঁটতে হাঁটতে রমনা পার করে এখন শাহবাগের দিকে যাচ্ছি। এরকম রাতে আমি সাধারণত একাই হাঁটি কিন্তু আজ আমার সাথে বাদল আছে। সে তার ফার্মের জমির খোঁজ নিতে এসেছিলো। আমি তাকে বলেছি, "আরে ব্যাটা পুরো পৃথিবীটাই তো একখণ্ড জমি, তুই আলাদা করে কোন জমি না নিয়ে পুরো পৃথিবীটাই নিয়ে নে।" এই শুনে সে মাথা নিচু করে চুপচাপ আমার সাথে হাঁটতে বেরিয়ে পরেছে, শাহবাগ পেরিয়ে নীলক্ষেতের দিকে রওনা হবো এমন সময় পিছন থেকে ডাক পরলো, "হিমু ভাই? হিমু ভাই?" আমি পিছনে তাকাতেই দেখি ফখরুল সাহেব চায়ের কাপ হাতে নিয়ে দৌড়াতে দৌড়াতে আমাদের দিকে আসছেন, আমার সামনে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, আপনিতো ভাই আচ্ছা কঠিন মানুষ, খুঁজতে খুঁজতে জীবন শেষ। তাও আপনার কোন হদিস নেই। আপনার খালার থেকে মেসের ঠিকানা নিয়ে সেখানে গিয়ে দেখি আপনি সেই মেসও ছেড়ে দিছেন, এতদিনের সাধনায় আপনাকে পাইলাম, আসেন একসাথে চা খাই।
বাদল আর আমি উনার পিছন পিছন গিয়ে একটা চায়ের ভ্যানের সামনে এসে দাড়ালাম, চা এসে গেলে উনি নিজেই মুখ খুললেন, আপনিতো ভাই আচ্ছা খেল দেখালেন। আপনি এভাবে খেল দেখাবেন আমিতো প্রথমে ভাবতেই পারি নি। আপনার কথা শুনে ধরেই নিয়েছিলাম আপনি একটা ত্যাঁদড়, আমাকে মাফ করে দেন ভাই। উনার মুখে এরকম অদ্ভুত কিসিমের কথা শুনে আমি টাসকি খেয়ে গেলাম, আজব! আমি আবার কি খেল দেখালাম রে ভাই! উনি আমাকে কোন কথা না বলতে দিয়ে নিজেই শুরু করলেন, সেদিন আপনি ছাইয়ের কথা বলে চলে যাওয়ার পর মেজাজ অত্যন্ত খারাপ হয়ে যায়, আপনার খালাকে একটা বিহিত করার জন্য ফোন দিলে উনি আমাকে বললেন ধৈর্য ধরতে। এও বললেন উনি আপনার সাথে কথা বলে আবার আমার কাছে পাঠাচ্ছেন, আপনি নাকি কোন না কোন সমাধান দিবেনই।
তারপর আপনার খালার কথা শুনে আমি কিছুদিন আপনার সেই ছাইয়ের কথা ভাবলাম, তারপর হঠাৎই মনে এলো আমার শ্বশুরের বন্ধ হয়ে যাওয়া কোম্পানির পুরনো একটা গ্যারেজ আছে যেখানে মানুষের আসা যাওয়া হয় না অনেক বছর, কিছু পুরনো নষ্ট গাড়ি ছাড়া আর কিছুই নেই সেখানে। বলতে লজ্জা লাগছে হিমু ভাই আমার স্ত্রীকে খুন যেদিন করি সেদিন রাতে সন্দেহ হয় এমন যত জিনিস ছিলো তা আমি ঐ গ্যারেজে নিয়ে পুড়িয়ে দেই, যাতে এগুলোর কোন চিহ্ন কখনো কারো চোখে না পড়ে। সেই পুড়িয়ে দেয়া জিনিসের ছাই আর আপনার বলা ছাইয়ের কথা মিলাতেই মনে পরলো সব জায়গায় খোঁজা হলেও গ্যারেজটাতে উইলের খোঁজ করা হয়নি। তারপর গ্যারেজে গিয়ে খুঁজতেই দেখি একটা পুরোনো গাড়ির লকারে আমার সব কাগজ রাখা, সম্পত্তির লোভে এতটাই অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম যে আমার স্ত্রী যাতে মৃত্যুর আগে কখনো সম্পত্তির অন্য কোন ভাগিদার না বানাতে পারে তাই কাগজগুলো নিজেই ওই জায়গায় লুকিয়ে রেখেছিলাম, যা আমার আর মনেই ছিলো না। আপনি যে ছাইয়ের কথা এভাবে ঘুরিয়ে বলে খেল দেখাবেন আমি তা বুঝতেই পারিনি প্রথমে।"

এই মেরেছে! আমি সেদিন নেহাত উনাকে ভড়কে দেয়ার জন্য কথাগুলো বলেছিলাম। ব্যাপারটা এতদূর গড়িয়ে যাবে তা কল্পনাও করি নি। বাধ্য হয়ে বললাম,সম্পত্তি তো সব পেয়েই গেলেন, তা লাল পানি ছেড়ে টংয়ের চা কেনো? উনি বললেন,আমার দ্বারা এমনিতেই অনেক পাপ হয়ে গিয়েছে ভাই। আর নাহ, সবকিছু বেচে দেয়ার কথা ভাবছি। দু-একটা কোম্পানি রেখে বাকী যা আছে সব বিক্রি করে দিব। তারপর সেই টাকা রাখবো ব্যাংকে, ব্যাংকের প্রতিমাসের লাভ আর ওই কোম্পানির টাকা দিয়ে ফস্টার হোম খুলবো, যেখানে থাকবে পথশিশুরা। ব্যাংক আর কোম্পানির টাকা দিয়ে তাদের থাকা খাওয়া ভালোই চলে যাবে, বাড়িটাও বিক্রি করে দিচ্ছি, আমি ওদের সাথেই থাকবো। টাকার লোভে কোন সন্তান হবার আগেই স্ত্রীকে খুন করেছি। এরাই এখন হবে আমার সন্তান। সেই টাকার লোভ আমার আর নাই। প্রতিদিন পায়ে হেঁটে হেঁটে পথশিশুদের খোঁজ করি, এখন পর্যন্ত ৬৬ জন পেয়ে গেছি, আরও পাব ইনশাআল্লাহ। আপনি না থাকলে এসব কিছুই হতো না, আপনার কোন হেল্প লাগলে একটাবার বলে দেখবেন, লাগে প্রাণটাও দিয়ে দিব। আমি বললাম, কিছু জমির ব্যাবস্থা করে দিতে পারবেন? উনি বললেন,অবশ্যই ফস্টার হোম বানানোর জন্য উত্তরায় বেশ কিছু জমি কিনে ফেলেছি সেখান থেকেই আপনার যতটুকু লাগবে নিয়ে নিন। আমি বললাম, আমার লাগবে না এর লাগবে, কথা বলুন। এ হচ্ছে আমার শিষ্য বাদল। বাদল এতসময় হা করে উনার কথা শুনছিলো। আমার কথায় তার চমক ভাঙলো। আমি তাদের দুজনকে সেট করে দিয়ে সেখান থেকে বেরিয়ে পরলাম।

আমি একটু এগুতেই ফখরুল ভাই আবার পিছন থেকে ডাকলো, হিমু ভাই যে ৬৬ জনের কথা বলেছিলাম তাদের নিয়ে আগামী রবিবার মেঘনা নদীতে ঘুরতে যাচ্ছি, বড় একটা ট্রলার ভাড়া করা হয়েছে। আপনিও আসুন না। আমি কোনমতে আচ্ছা বলে সরে আসলাম। আকাশে শরীর পুড়ে যাবার মতো চাঁদের আলো, জীবনানন্দ হয়তো এরকম আলো দেখেই লিখেছিলেন, "যখম ডুবেছে পঞ্চমীর চাঁদ, মরিবার হলো তার সাধ।"

রুপাকে ফোন করবো করবো করে আর করা হয়ে উঠছে না, অবশেষে আজ করলাম। ফোন রিসিভ করলো রুপার বাবা, উনি ‘হ্যালো কে?’ বলতেই আমি বললাম, আমি বাসক পাতা গুড়ো করে বা চিবিয়ে খেলেই ভিতর শান্তি,  ব্যাস ওপাশে চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেলো। এখন রুপা ওর বাবাকে ভিতরের রুমে পাঠিয়ে দিয়ে এসে ফোন ধরবে।
"হ্যালো হিমু,তোমাকে কতবার বলছি বাবার সাথে ফাজলামো করবা না, উনি এখন তোমার নাম শুনলেই ক্ষেপে যান। বাসার দারোয়ানকে বলে দিয়েছেন বাসায় আসলে তোমাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিতে।" আমি বললাম, "আমিতো সত্যই বলেছি যে, আমি বাসক পাতা খেলেই ভিতর শান্তি।" রুপা বললো, "তুমি বাসক পাতা?" আমি বললাম, "অবশ্যই।" রুপা বললো, "বাসক পাতা তো চাইলেই পাওয়া যায়, তাহলে তোমাকে আমি পাচ্ছি না কেনো?"
এই মেয়েটা মাঝেমধ্যেই আমাকে এমন মায়ার বিপদে ফেলে দেয় কিন্তু হিমুরা কখনো কোন মায়ার বশবর্তী হয় না। তাই কথা কাটাতে বললাম,"আগামী রবিবার ফ্রি আছো? মেঘনা নদীতে ঘুরতে যেতাম।" রুপা কিছু না বুঝেই বলে উঠলো, যাব কিন্তু একটা শর্ত আছে। আমি বললাম, কি?
রুপা বললো, তোমার এসে আমাকে বাসা থেকে নিয়ে যেতে হবে। আমি বললাম, "মন দিয়ে শোন একটা বেগুনি শাড়ি পরবে, কপালে মাঝারি লাল টিপ, চুল মাঝথেকে সিথি দিয়ে দুইপাশে বেণী করে বাধবে, ঠিক সকাল ৯টায় গাড়ি চলে যাবে, তৈরী থেকো।" রুপা বললো,তুমি আমাকে ভালো করে চিনো হিমু, তুমি না নিতে আসলে আমি যাবনা। আমি আর কিছু না বলে ফোন কেটে দিলাম, আমি জানি রুপা আসবে। নারী চরিত্র বড়ই অদ্ভুত।।
.
শেষাংশঃ-
.
আমরা সবাই মেঘনার পাড়ে চলে এসেছি, বাদল আর ফখরুল ভাই বাচ্চাগুলোকে সামলাচ্ছে। সেদিনের পর তাদের এত ভালো বন্ধুত্ব হয়ে যাবে ভাবিনি। তারা একজন আরেকজনকে তুমি করে বলছে। একটু পর রুপার গাড়ি চলে এলো, গাড়ি থেকে নেমেই রুপা আমার দিকে একরাশ রাগ নিয়ে কটমট করে তাকালো, আমি যেমন বলেছিলাম ঠিক সেই সাজে এসেছে। ফখরুল ভাই কিছুক্ষণ রুপার দিকে তাকিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না শুরু করলো। রুপাকে অবিকল উনার মৃত স্ত্রীর মত দেখতে লাগছে।
"হিমু ভাই আমার বউকে এই নিজ হাতে মারছি, আমার ক্ষমা নাই হিমু ভাই, আমার ক্ষমা নাই"    


উৎসর্গ- শ্রদ্ধেয় হুমায়ুন আহমেদ স্যার
রেজাউল হাসান ফাহিম
ভেটেরিনারি পড়াতে আবদ্ধ। একজন চন্দ্রাহত পুরুষ, যে আকাশের বুকে চাঁদের আলো দেখলেই কালাহারির মত অভিব্যক্তি নিয়ে তাকিয়ে থাকে। যে জোৎস্না ভালোবাসে, যে জোৎস্নায় গৃহত্যাগী হওয়া যায়।