ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

পর্যালোচনা: ইলেভেন মিনিটস - লিখেছেন - তৌসিফ ফারহান সুস্মিত




বইঃ ইলেভেন মিনিটস
লেখকঃ পাওলো কোয়েলো।
বাংলা অনুবাদঃ অনীশ দাস অপু।

একটি নির্দিষ্ট এগারো মিনিটের গল্প, যে এগারো মিনিটকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে জগতের জটিল সব বিষয়াবলি, যে এগারো মিনিটের জন্য পৃথিবীর আলো দেখছে সব নতুন প্রাণ, যে এগারো মিনিট-ই পৃথিবীর টিকে থাকার সবচেয়ে জটিল রহস্য, 'ইলেভেন মিনিটস' এ পাওলো কোয়েলো সেই এগারো মিনিটের গল্প বলেছেন।


ইলেভেন মিনিটস এর প্রথম লাইন,"এক দেশে ছিলো এক পতিতা, তার নাম মারিয়া।" যেন আমরা আমাদের জীবনের এক পা দিয়ে রেখেছি রুপকথার রাজ্যে, আরেক পা নরকের অতল খাদে। প্রথম লাইনের ব্যাখ্যাস্বরুপ এমন এক আখ্যান দিয়েই শুরু করেছেন পাওলো কোয়েলো। পুরো উপন্যাসে বলেছেন এক পতিতার কথা। যে শব্দটি শুনলেই আমাদের মনে জেগে উঠে ঘৃণা অথবা সহানুভূতি কিংবা কামনা। গল্পটি পরিপূর্ণভাবে মারিয়া নামের এক পতিতার যে তার নিজের পেশাকে সম্পূর্ণ জেনেবুঝে বেছে নেয়, এবং তার পেশাকে সম্মান করে জানার চেষ্টা করে সেই বিশেষ বিষয়টি, সেই বিশেষ সময়টুকুর ব্যাপারে, যার জন্য মানুষ এতো তৃষ্ণা অনুভব করে, এবং মাত্র এগারো মিনিটের কাজের জন্য তাকে তিনশো থেকে হাজার ফ্রাঁ পর্যন্ত পারিশ্রমিক দেয়।

মারিয়া, যার জন্ম ব্রাজিলের একটি ছোট্ট শহরে, যে একসময় অন্য মেয়েদের মতো করেই স্বামীর সাথে সুখী হওয়ার কথা ভাবতো, এবং একসময়ে যে উপার্জনের জন্য সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় পাড়ি জমায়, এবং সহ বিচিত্র অভিজ্ঞতার পরে পতিতা হিসেবে কাজ শুরু করে। সেই মারিয়া একসময় পরিচিত হয় বিখ্যাত আঁকিয়ে র‍্যালফ হার্ট এর সঙ্গে, যে তাকে জীবনের সুখের ব্যাপারে শেখাতে বলে, যার সাথে তার ভাব হয়, একসময় সে যাকে ভালোবেসে ফেলে।এবং ঠিক তখন মারিয়া উপলব্ধি করে সেই এগারো মিনিটের ব্যাপারে৷ যা এতোদিন তার কাছে স্রেফ দৈহিক ব্যাপার ছিলো, যার সাথে আত্মার কোনো সংযোগ ছিলোনা। এবং কেবল তখনই এই নির্দিষ্ট ব্যাপারটি শুধু এগারো মিনিটের একটি কাজ ছাড়া আর কিছুই ছিলোনা। কিন্তু যদি ব্যাপারটি কেবল দৈহিক না হয়ে তার সাথে আত্মার সম্পর্ক থাকে, তখন সেটি ভালোবাসায় রূপ নেয়, এবং ঠিক তখনই এটি স্রেফ এগারো মিনিটের চৌকাঠ পেরিয়ে যায়, ঘনীভূত হয় দেহ এবং আত্মার সম্মিলিত রূপে, যাকে ভালোবাসা বলে। যদি 'ইলেভেন মিনিটস' মূল সারমর্ম খোঁজেন তাহলে হয়তো লেখক এটিই আপনার জন্য প্রস্তুত করে রেখেছেন।

র‍্যালফ হার্ট মারিয়াকে তার জীবনবোধের ব্যাপারে বুঝতে সাহায্য করে, এবং মারিয়াও একসময় এই পেশা থেকে সরে আসে। উপন্যাসের মাঝে স্যাডিজমের ব্যাপারও খুঁজে পাবেন৷ 'ইলেভেন মিনিটস' বইটি যেহেতু একজন পতিতার বলা গল্প, সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই এতে যৌনতার প্রকাশ থাকবে। আর কোয়েলো যেটিকে বেশ খোলামেলা এবং তীব্রভাবেই উপস্থাপন করেছেন। এটি বেশ প্রচলিত যে 'ইলেভেন মিনিটস' কেবল এর নিষিদ্ধ কনটেন্ট এর জন্যই অধিক জনপ্রিয়। কিন্তু আমার যেটুকু মনে হয়েছে, এর মধ্যে বিদ্যমান যৌনতার আড়ালে যে বার্তাটুকু লেখক দিয়েছেন সেটি উপলব্ধি করতে পারলে সম্ভবত যৌনতাটুকুকে ছাপিয়ে সেটিই আপনার কাছে মুখ্য হয়ে দাঁড়াবে। উপন্যাসের সবকিছুকে ছাপিয়ে যদি শুধু একজন ব্যক্তি মারিয়ার দিকে তাকান, দেখবেন আর দশটি মেয়ের মতোই একজন মেয়েকে, যাকে আপনি বহুদিন চেনেন, যার প্রতি আপনার মায়া জন্মাবে, করুনা হবে।


পাউলো কোয়েলহো


ইলেভেন মিনিটস বইটি লেখার ইতিহাসও বেশ আকর্ষণীয়। কোয়েলো বইয়ের শুরুতে সেটি বিবৃত করেছেন। বলতে পারেন এটি একজন সত্যিকারের পতিতার গল্প। পাওলো সত্যিকারের মারিয়ার কথাও বলেছেন বইয়ের ভূমিকায়, যিনি স্বামী এবং দুই সন্তান নিয়ে এখন লুস্যানে বাস করছেন। বইটির বাংলা অনুবাদ করেছেন অনীশ দাস অপু। যারা উনার অনুবাদের সাথে পরিচিত তারা বুঝতেই পারছেন উনার অনুবাদের ঝাঁঝ কেমন! আর যৌনতার বিষয়গুলোকেও উনি মোটেও স্কিপ না করে বরং সাবলীলভাবেই উপস্থাপন করেছেন, যেটি উনার অনুবাদের একটি প্রমান বৈশিষ্ট্য। এরপরেও সম্ভব হলে মূল বইটি পড়ার চেষ্টা করবেন।

যে কথাটি বলা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বইটি সম্পূর্ণরূপে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য। যেকোনো কারনেই হোক, ল্যাটিন আমেরিকান লেখক পাওলো কোয়েলোর এই বইটিও একটি ইন্টারন্যাশনাল বেস্টসেলার।




তৌসিফ ফারহান সুস্মিত
বই পড়ার পাশাপাশি অনুভব, আলোচনা এবং তা নিয়ে চিন্তা করা বেশ পছন্দের। চিন্তাগুলোকে কেবল নিজের কাছে না রেখে পৌঁছে দিতে চাই আরো সব পড়ুয়াদের কাছে৷