ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

দলছুট মেয়ে - লিখেছেন - রবিউল হক বক্সী


হাঁপিয়ে উঠলে হয়ত এরকম হয়, মানুষ জানালা খুলে দেয়। এলোমেলো ভাবে আকাশের দিকে তাকায়, সেই আকাশে মানুষ আশ্রয় খোঁজে। অবাক লাগে এটা ভেবে যে, শূণ্যতার অবলম্বনই যেন মানুষের প্রয়োজন।
আমারও তাই হয়েছিল, একটা দলছুট মেয়েকে ভালো লেগে যায়।

মেয়েটা দেখতে শ্যামলা, লিকলিকে গড়নের আর এক মাথা অবিন্যাস্ত চুল। একটা ব্যাগ কাঁধে ফেলে গাছ, পাখি, বিল্ডিং দেখতে দেখতে প্রতিদিন বারোটার দিকে সে করিম ভবন পার হয়ে ঈশা খাঁ হলের সামনের রাস্তা ধরে শেষ মোড়ে অথবা অন্য কোথাও চলে যেত।

চলা ফেরা করতো একা একা, কোন মেয়ে বা ছেলেকে ওর পাশে দেখি নি। ওর সামনে দিয়ে একটা কুকুর দৌড়ালে সে কুকুরটাকে দেখতেই থাকতো। যেন কুকুরটা ওকে ছেড়ে যাচ্ছে সে করুণ চোখে তাকিয়ে আছে।
তখন বিন্তির সাথে রিলেশনটা একঘেয়ামীতার শেষ সীমায় এসে দাঁড়িয়েছে।

দেখা হলেই বিন্তি আমাকে জিজ্ঞেস করবে, আমি স্কলারশিপের জন্য কোন চেষ্টা করছি না কেন। তারপর শুরু করত কে কে স্কলারশিপ নিয়ে কোন কোন দেশে গেছে তার ফিরিস্তি।

একদিন আমি বললাম, "স্কলারশিপ, স্কলারশিপ নিয়ে ঘ্যান, ঘ্যান করবে না তো! আমি দেশেই থাকব। ছোটখাট কোন একটা জব করব আর লেখালেখি করব।"
“লেখালেখি করব ” এ কথা শুনে সে প্রথমত তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো তারপর আমার দিকে চেয়ে থাকল কিছুক্ষণ ।
মিহি গলায় বলল, "এসব ন্যাকা ন্যাকা কথা আমাকে বলবা না। এসব কথা শোনার মত অনেক মেয়ে আছে এমনকি তারা তোমাকে মাথায় তুলে নাচতেও পারে, কিন্তু আমি না।"

পরের দিন আমি একটা পরীক্ষা করলাম।

বিন্তিকে বললাম, "তোমার হাতটা একটু দাও তো।''

- কি করবে?

- ছুঁয়ে দেখব ।

বিন্তি হাত বাড়িয়ে দিল। আমি হাতটা ধরে বুঝলাম কোন কিছুই আর অবশিষ্ট নেই। আমি যে কোন একটা মেয়ের হাত ধরে আছি কোনভাবেই তা মনে হচ্ছে না। কোন অনুভূতি নেই, কোন শিহরণ নেই! একপ্রকার শূণ্যতাজনিত কষ্ট আছে, আর আছে মায়া। এই মায়াটুকু সুতার মত দুজনকে ধরে আছে, মায়াটুকু উবে গেলে দুজন দুদিকে ছিটকে যাবো।

সে সময়টা এরকম, হয়ত আমরা দীর্ঘসময় পাশাপাশি হাঁটছি কিন্তু কোন কথা বলি না। কি কথা বলব? বুঝতে পারতাম না, শুধু হাঁটতাম। হাঁটার সময় প্রায় আমার মনে হতো, আমরা হয়ত ছেলে-মেয়ে হাঁটার কোন একটা দৃশ্যে অভিনয় করছি; আর কিছু নয়। তারপর সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে তার লাস্ট কথা হোত, আমি হলে চলে গেলাম ।

ও চলে গেলে আমি যে কষ্ট পেতাম তাও নয়। আমারও যেন এক প্রকার মুক্তি মিলতো। তারপর হলের লাইব্রেরীতে অনেক সময় ধরে বই পড়তাম। ওকে আর ফোন দিতাম না, সেও দিত না।

এসব বিরক্তিকর দিনে সেই লিকলিকে মেয়েকে এক টুকরো আকাশ মনে হলো। আমি জানালা খুলে দিলাম। ভাবতে বসলাম, মেয়েটা একা কেন?

প্রতিদিন মেয়েটার সাথে রাস্তায় দেখা হতে থাকল। মেয়েটা বিশেষভাবে তাকাতো না। সে আমাকে গাছ, পাখি, বিল্ডিং এর মতই দেখতো। যেন আমি একটা দৃশ্যের উপাদান, আর কিছু নয়। বিন্তির সাথে যে সম্পর্ক শেষ হয়ে গেছে তাও নয়। প্রতিদিনেই বিন্তির সাথে আমার দেখাও হতে লাগলো।

কৃষি ফ্যাকাল্টির সামনে সবুজ গালিচার মত একটা মাঠ আছে। সেই মাঠের চতুর্দিকে আমরা শুধু হাঁটতাম। কেউ কোন কথা বলতাম না।

একদিন বেশ কয়েকটা চক্কর দেয়ার পর বিন্তি আমাকে বলল, আমাদের মনে হয় ইতি টানা উচিত।

- ''আমারো তাই মনে হয়।''

- ''আর কিছু দিন এভাবে চলুক, তারপর সিদ্ধান্ত নেই?''

- ''তোমার যা ভালো মনে হয়।''

আমি লিকলিকে মেয়েটাকে ভাবনার জগতে নিয়ে এলাম। একদিন মেয়েটাকে দেখতে পেলাম ফিশারিজ ফিল্ডে। সেদিনও একা। সেদিন সাহস করে সামনে দিয়ে হেঁটে গেলাম এবং মেয়েটার চোখে তাকালাম।
পরের দিন মেয়েটার সাথে রাস্তায় দেখা হয়ে গেলো। সে দিন সে প্রথম নিজে থেকে আমার চোখে তাকিয়ে থাকলো। তার চোখে মুখ খুশিতে চকচক করে উঠল, যেন তার একাকিত্ব ঘুচে গেছে। একটা ছেলেকে সে খুঁজে পেয়েছে ।

২.

অবিশ্রান্ত বৃষ্টি ঝরছে। বিন্তি আমাকে ফোন করে বলল, লাইব্রেরীতে আসতে পারবে? আমি লাইব্রেরীতে আছি।
লাইব্রেরীর একটা কোণে বড় একটা টেবিলে বেশ কিছু বই এলোমেলো করে সে একটা নোট তৈরি করছিল। এ রকম পরিশ্রম আমি কোনদিন করি না। শেষ পর্যন্ত নোট ফটোকপির দোকানে চলে যায় এবং দু‘টাকার বিনিময়ে তা পাওয়া যায়। বিন্তিকে এ বিষয়টা কোন দিন বুঝাতে পারি নি।

সে নোট লেখা বাদ দিয়ে কলম কামড়াতে কামড়াতে বললো, ''কি সিদ্ধান্ত নিলে?''

- ''কোন বিষয়ে?''

- ''আমাকে ছেড়ে যাওয়ার বিষয়ে কি চিন্তা করলে?''

- ''ছেড়ে তো যাবোই, এর মধ্যে একটা মেয়েকেও খুঁজে পেয়েছি, মেয়েটা একা একা ঘুড়ে বেড়ায়... সন্ন্যাসী টাইপের মেয়ে।''

বিন্তি আমার কোন কথা শুনল না ।

বললো, ''ছেড়ে যাওয়া এত সহজ নয়। তোমার প্রতি মায়া পড়ে গেছে আমার, কি করেছ এ দুই দিন আমাকে বলো।''

- ''সুনীলের “পূর্ব-পশ্চিম” উপন্যাস শেষ করেছি।''

বিন্তি একটা ঠোঁট দিয়ে অপর ঠোঁট কামড়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, ''আমি কিছুই করি নি এ দুদিন, শুধু শুয়ে ছিলাম। আজ লাইব্রেরীতে এলাম।''

আমি বললাম, ''কাঁদার কিছু নেই, এম্নিতে বাইরে আকাশ কাঁদছে।''

- ''তুমি আরও কাছে এসে বসো, আমি একটা নোট তৈরি করব।''

ওর পাশে কিছুক্ষণ বসে থাকলাম। সে নিবিষ্ট মনে নোট তৈরি করছে।
একবার চোখ তুলে তাকিয়ে বললো, "তুমি পাশে থাকলেই আমার শক্তি, আর কিছু লাগবে না।''

- ''প্রচন্ড বৃষ্টি ঝরছে, একটু বৃষ্টি দেখে আসি?''

- ''যাও।''

আমি দোতলায় কাঁচের বিশাল দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়ালাম। সামনের বকুল বাগান বৃষ্টিতে জবুথবু। একটা জুটি বৃষ্টিতে গোসল করছে। কৃষি ফ্যাকাল্টির সামনে গালিচার মত মাঠের এখানে ওখানে পানি জমেছে। নীচে গোলাপ ফুলের গাছগুলো বাতাসে প্রচন্ড রকম দুলছে। নীচ থেকে বেয়ে ওঠা বোগেনভেলিয়া ফুলের লতায় কাঁচের দেয়ালের একটা অংশ ঢাকা পড়েছে।

বৃষ্টির শোঁ শোঁ শব্দে আমি যেন এক অন্য জগতে চলে গেলাম। যে জগতে আমি ছাড়া আমার পাশে কেউ নেই। আমার একবার সেই সন্ন্যাসী মেয়েটার কথা মনে পড়ল। বিন্তির কান্নার কথা মনে পড়ল। সেই অনুভূতির কথাও মনে পড়লো যখন আমি ওর হাত হাতের মুঠে নিই।

কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না, দেখলাম বিন্তি আমার পাশে দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছে।

- ''আজ আর নোট তৈরি করব না, তোমার সাথে বৃষ্টি দেখব।''

তারপর দীর্ঘক্ষণ নিরবে বৃষ্টি দেখতে লাগলাম।

হঠাৎ সেই দলছুট মেয়েটাকে দেখতে পেলাম দোতলায়, সামনা সামনি । মেয়েটা আমাকে দেখে একটু হাসলো। হয়তো সে তৃতীয় তলায় উঠতো কিন্তু এমন ভাব দেখাতে লাগল যে, তার দ্বিতীয় তলায় কাজ। সে এলোমেলো হাঁটতে লাগলো। বৃষ্টি দেখা বাদ দিয়ে আমিও পাশ ফিরে মেয়েটাকে দেখতে লাগলাম।

হঠাৎ বিন্তি একটা কান্ড করলো, আমার কাছে এসে বাম হাতটা দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরলো।

বললো, ''বৃষ্টির শব্দে কেমন যেন ঠান্ডা লাগছে!''

তখন মেয়েটার চোখে তাকালাম।  চক্চকে দৃষ্টিটা নিষ্প্রভ হয়ে গেছে। মেয়েটার চোখের এমন পরিবর্তনে আমার বুক কেঁপে উঠলো। দেখলাম, চোখদুটো তার বড় বিষাদময় আর এলোমেলো, যেন অনেক রাত ঘুমায়নি। তারপর বেশ দ্রুত সে নীচতলায় নেমে গেলো।

আমি বৃষ্টি ধোয়া কাঁচের জানালা দিয়ে দেখতে পেলাম মেয়েটা ছাতা মাথায় দিয়ে ভার্সিটির রেল স্টেশনের দিকে চলে গেল।    
রবিউল হক বক্সী
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ থেকে ডেয়রি সায়েন্স এ মাস্টার্স। একা হাঁটতে পছন্দ করেন। দিনাজপুর ও ময়মনসিংহ শহর দুটি প্রেমিকার মতো।