ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

সপ্তম খুনি - লিখেছেন - কুশিও নবাব প্রিন্স

প্রবন্ধ,ইতিহাস,পটচিত্র,বরেন্দ্রভূমি, জাহাঙ্গীরনগর, ছোটোগল্প,সাহিত্য,বিজ্ঞান,রম্য,উপন্যাস,কবিতা,সপ্তম খুনী,রহস্যগল্প গোয়েন্দাগল্প



আমি নিজের বাসার ড্রইংরুমের সোফায় বসে আছি। মাথার উপরে সিলিং ফ্যান ঘুরছে। আমার এক হাতে জ্বলন্ত সিগারেট এবং আরেক হাতে এক গ্লাস জুস। এখন রাত ১১ বেজে ৫৮ মিনিট। এইতো ঠিক দুই মিনিট পরই রাত ১২ টা বাজবে। আরেকটি নতুন দিনের সময় গণনা শুরু হবে। এমনকি ১২ টা বাজার সাথে সাথে একটা খুন হবে। খুনটি এই বাসাতেই হবে। যিনি খুন হবেন তিনি পাশের রুমের বেডে শুয়ে আছেন তার স্ত্রীর সাথে।

মূলত সেই লোকটি আমি নিজেই। যে শুয়ে আছে সে হচ্ছে আমার দেহ, আর আমি? আমি হলাম তার কল্পনা। আমার পরিচয় আমি নিজেই একজন মহাবড় খুনি। কিন্ত আমার ডাক নাম নেই। জীবনে এক-দুই করে মোট ছয়টি খুন করেছি। আর ছয়টি খুনই হয়েছে হঠাৎ হঠাৎ। পুলিশ আমাকে ধরবেই বা কিভাবে! আমার নামগন্ধ জানলেই তো ধরবে?

শুধু একবার এক অফিসে গিয়ে একজন অফিসার ঘুষখোরকে মেরেছিলাম। ভাগ্য এতই খারাপ যে পঞ্চম খুন করার পরই ধরা খেতে বসেছিলাম! কিন্তু না সিসি ক্যামেরায় আমার চেহারা অর্ধেকের বেশি দেখা যায় নি। আসলে সব কিছুই ছিলো পরিকল্পনা মোতাবেক। আমি আবার পরিকল্পনা ছাড়া কোনো কাজ করতে পছন্দ করি না। আর পরিকল্পনা না করলে সেই কাজে আমি আর সফল হতে পারি না। আজ সপ্তম খুনটি হবে এবং রক্তাক্ত লাশটি আমারই হবে। এটা ভেবে কোনো খারাপই লাগছে না। খারাপ লাগার কথাও নয়! জীবনে নিজের হাতে ছয়টি খুন করতেও যার হাত কাপে নি, সে নিজেকে মেরে ফেলতে পারবে না কেনো?

সিগারেটের ধোয়া খেতে খেতে পানি পিপাসা ধরে গেল। যখনই জানালার খুলে সিগারেটটি ফেলতে গিয়েছি অমনি আমার বাসার নিচের রাস্তায় পুলিশের গাড়ির টহল নেমেছে। তারা এতই বোকা যে, খুনির বাসার সামনে দিয়ে চলে গেলেও তারা আমাকে ধরতে আসে নি। এর কারন হলো এই শহরের কেউই জানে না এই বিরাট কায়দার খুনিটি থাকে কোথায়?

আমার মরে যাবার পর শুধু একটাই দুঃখ থাকবে আমার। দুঃখটা আমাকে নিয়ে নয় বরং আমার একমাত্র স্ত্রী কে নিয়ে। তারমত স্ত্রী পেয়ে আমি যেন আকাশের চাঁদ পেয়েছি। কিন্তু কিসের যেন নেশায় ধরলো আমাকে। আমি খুন করতে শুরু করলাম ,সে আমাকে এসব করতে মানা করায় আমি তাকে যা তা কত কি বকেছি ! তবুও সে আমাকে ভালোবেসে গেছে। হয়তো সে চেয়েছিলো সারাজীবনটা আমার পাশে এভাবেই থেকে যেতে। ভুল আমারই।

 কাল যখন আমার লাশের পাশে বসে সে অঝরে কান্না করবে আর বার বার বিলাপ করে আমার নাম বলবে  আমি তখন নরকে বসে তার কান্না শুনবো। ১২ বেজে যাবে এখনি । আর মাত্র ১ মিনিট বাকি।পুলিশ সংবাদ  পাওয়ার সাথে সাথে যখন আসবে আমার লাশ উদ্ধার করতে তখন আমার প্রিয় স্ত্রীকে কোনো জবাবদীহিতা করতে হবে না ।

কারণ আমি আমার বিছানার পাশের ছোট শিশুদের পড়ার টেবিলে আমার একটা চিঠি লিখে গেছি ।যেখানে আমার সব খুনের স্বীকার আমি করেছি। আর সেই ছোট টেবিলটা! সেটা আমার স্ত্রী শখ করে কিনেছিলো। আমাদের যেদিন সন্তান হবে  এবং সে বড় হবে । পড়ালেখা করে মানুষের মত মানুষ হবে । আমার সন্তান নিশ্চয়ই তার বাবার মতো খারাপ মানুষ হবে না ,বরং সে অল্প একটু ঘৃণা করতেই পারে।

এবারে উঠে দাঁড়িয়ে রুমে ঢুকবার সময় হয়েছে । আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে হেঁটে যাচ্ছি রুমটির দিকে। বিছানায় আমি ঘুমিয়ে আছি।আর পাশেই আমার স্ত্রী। তার বা হাত আমার বুকের উপর। আমার ঘুম ভেঙে যায়। এতদিন আমার স্ত্রী আটকে রাখতে পারে নি। সুতরাং আজ আমাকে শেষবারের মতো ছুটি দিলে মন্দ হয় না ।

আমি উঠে দাঁড়িয়ে পড়লাম মেঝেতে । সেই ছোট টেবিলের চিঠির ভাজের ভেতর আমার সেই রিভলবার সাথে একটি মাত্র বুলেট।
আমার কল্পনা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আমার দিকে ঠোঁট বাকিয়ে সুন্দর করে হাসছে। আমার কল্পনা এত সুন্দর করে হাসতে পারে আমি আগে তা কখনো দেখি নি। আজ বিদায় নেবার আগে দেখে যাচ্ছি।

কল্পনা আমাকে বলছে রিভলবারটি উচু করে মাথার পিছনে ঠেকাতে ।আমিও তাই করলাম। হঠাৎ একটি বিকট শব্দে আমার স্ত্রী  ঘুম থেকে লাফিয়ে আমাকে জরিয়ে ধরে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলছে ," এটা তুমি কি করলে ? "
আমি তক্ষণই  তাকে শেষবারের মতো তার মায়াবী চেহারাটা ঝাপসা দেখেতে পাই।

(সমাপ্ত)
লেখকঃ কুশিও নবাব প্রিন্স
ঢাকার এক সরকারি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছি। দর্শন এবং টুকরো টুকরো গল্প উপন্যাসের প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে তুলছি।