ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

গাঙচিল সিরিজ - লিখেছেন - ইমতিয়াজ নাফি


প্রবন্ধ,ইতিহাস,পটচিত্র,বরেন্দ্রভূমি, জাহাঙ্গীরনগর, ছোটোগল্প,সাহিত্য,বিজ্ঞান,রম্য,উপন্যাস,কবিতা



১.

রাত ২:৩০। সারাদিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পর বিছানায় গা এলিয়ে দিলো শুভ্র, বালিশের পাশেই ওর সেল্ফোনের লাইটটা জ্বলে উঠল। দেখল মায়ের টেক্সট, "তোর দুলাভাই আর বড় আপা আজকে আসছে, তুই চলে আয় কাল।" শুভ্র দোটানায় পড়ে গেলো। কারণ, কাল ক্যাম্পাসের টিএসসি প্রাঙ্গনে এক বন্ধুর জন্মদিনের দাওয়াত ছিলো। এদিকে ছয় মাসের মতো হয়েছে শুভ্রর বাসায় যাওয়া হয়না। অনেক ভেবে বাসায় যাবে বলে ঠিক করলো। বেলা ১২:৩০ এ ভার্সিটির বাসেই ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলো শুভ্র। হঠাৎ এক বিকট শব্দে বাতাস ভারী হয়ে আসলো। শুভ্রর নিথর দেহ টা পড়ে রইলো রাস্তার পাশের ল্যাম্পপোস্টের কাছেই। মাথার পাশেই ওর সেলফোনটা হঠাৎ কম্পিত হলো। "কিরে কখন আসবি?"
সময়টা দুপুর ২:৩০।

২.

"গত দুমাসের বকেয়া বাড়িভাড়াসহ চলতি মাসের ভাড়া না দিলে, আমি আইনি ব্যবস্তা নিতে বাধ্য হবো।" শুনেই বুকটা কেপে উঠলো নীলিমার, "আমি এই মাসের মধ্যেই ভাড়া দিয়ে দিবো আংকেল।" রুমে ঢুকে ফ্রিজ থেকে ঠাণ্ডা পানির বোতলটা বের করলো ও। ডাইনিং টেবিলে বসে ভাবতে লাগলো কোথা থেকে জোগাড় হবে এই টাকা! বাবার হার্টের চিকিৎসা, ছোট ভাইয়ের কলেজের বেতন, মায়ের জন্য প্রাইড থেকে কিনা শাড়ি! খাওয়া শেষ করে রুমে ঢুকেই শুয়ে পড়লো নীলিমা। সেল্ফোন হাতে নিয়েই দেখলো শুভ্রর টেক্সট,"খাইসো?" রিপ্লাই দিয়ে এ বেলা আর কথা বাড়ালো না নীলিমা।

ক্যাম্পাসের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রেমজুগল শুভ্র। ওদের গান আর কবিতায় মুখর হয়ে থাকতো টিএসসি। সবই দারুণ কাটছিলো ওদের। হঠাৎ দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত হয়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালো শুভ্র। শুভ্রকে হারিয়ে নীলিমা এখন পাগল প্রায়।রোকেয়া হলের সামনে থেকে শুভ্রর কিনে দেওয়া নীল রং এর চুড়ি আর সাদা শাড়ি পড়ে এখন প্রায়ই ক্যাম্পাসে রাতের বেলা ঘুরতে দেখা যায় নীলিমাকে। মহসিন হলের ৫০১ নাম্বার রুমের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের চতুর্থ বর্ষের সদ্য প্রয়াত ছাত্র শুভ্র মোহাম্মদের রুমমেট তার ডেস্কে একটি ডায়েরি খুঁজে পায়। কাকতালীয়ভাবে ডায়েরির শেষ কবিতার নাম,"উন্মাদ"।

৩.

"মাত্র দু'নাম্বারের জন্য তুমি ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড হলা", ফ্রম নীলিমা। শুভ্রর শরীর কাপছে, হাত থেকে সেল্ফোনটা পড়ে গেলো। ক্লাস ফাইভে পড়া ওর কৌতুহলী ছাত্রের চোখ তখন মোবাইল স্ক্রিনে। "স্যার আপনি সেকেন্ড হইছেন, তাহলে আমাকে সবসময় কেনো ফার্স্ট হওয়ার জন্য তাড়া দেন!" পরদিন সকাল বেলা। শুভ্রর রুমের দরজা বন্ধ। দুপুর আড়াইটা বেজে গেছে, ও দরজা খুলছে না। শুভ্রর মা ওর বন্ধুদের খবর দিয়ে বাসায় নিয়ে আসলো। "দেখো তো বাবা শুভ্রটা কি পাগলামি করতেসে!" "আন্টি আপনি কোনো চিন্তা করবেন না, আমরা আছি তো।" অনেক চেষ্টা তেও শুভ্র দরজা খুললো না। সিদ্ধান্ত হলো দরজা ভাঙার। সিলিং এর সাথে ঝুলছে শুভ্র, চোখ দুটো যেন শেষ কথাগুলো কাউকে বলতে চাইছে।

বাসায় ফেরার পর কাজের বুয়া বলল, "ছোট ভাইজানের সাথে একটা মেয়ে দেখা করতে আইছিলো।" মিসেস চৌধুরীর (শুভ্রর মা) বুঝতে বাকি রইলো না মেয়েটা নীলিমা। পরদিন আবার সকালে গুলশান এভিনিউর ৩-বি নাম্বার ফ্ল্যাটের কলিং বেল বেজে উঠলো। "কি জন্য এসেছ তুমি?" "আন্টি প্লিজ আমাকে একবার শুভ্রর রুমে যেতে দেন!" "শুভ্র এখন আর নেই, ওর রুম তালাদেয়া" "আমি সব জানি আন্টি, শুধু একবার!" "আচ্ছা,তবে বেশি সময়ের জন্য না!" ড্রইংরুম পার হলেই শুভ্রর রুম, দরজা খুলতেই দেয়ালে চোখ আটকে গেলো নীলিমার! সেখানে নীল কালিতে লেখা,"একা বেঁচে থাকতে শেখো, প্রিয়!"

৪.

বিচ্ছেদ চায় নীলিমা! আজ শুভ্রর দেয়া দুবছরের সব উপহার ফেরত দিতে এসেছে ও। জলন্ত সিগারেট ঠোঁটে ধরা শুভ্র তখনো কিছু বলছেনা। শুধু মনে মনে ভাবছে এই সময়টা যদি মিথ্যে হতো তাহলে মন্দ হতো না! একে একে সব উপহার ফেরত দেয়ার পর শুভ্র নিজেই ওর ছবিটা সিগারেট দিয়ে জালিয়ে দিলো, তবুও কিছু বলছেনা ও! নীলিমা তখন চলে গিয়েছে বহুদূর, এবার সত্যিই কেঁদে ফেললো ও। একি হ্যান্ডব্যাগ থেকে শুভ্রর দেয়া নীল রুমাল্টা ফেরত দেয়া হয়নি নীলিমার! শুভ্রর মনে হলো কার্জনের বারান্দা থেকে দুটো কাক কা কা শব্দে উড়ে গেলো! সেলফোনটা বের করে আর্টসেলের দুঃখ বিলাস গানে মন দিলো এবার! "যৌতুক দে নাহলে তোকে খাব!" দু'বছর পরই নীলিমার বিয়ে হয়ে গেলো কোনো এক বড় ব্যবসায়ীর সাথে।

এদিকে শুভ্র এখন সরকারি চাকরিজীবী। ফুটফুটে ডল পুতুলের মত একটা মেয়ে আছে ওর। সবই ঠিকঠাক, শুধু ওয়ালেটে থাকা নীলিমার সাদা-কালো প্রিন্টেড ছবিটা গ্যাস-ওভেনে ছাই করলো শুভ্র! পাশের রুম থেকে ভেসে আসছে ভায়োলিনের সুর। বাহ! শুভ্রর মেয়েটা দারুণ ভায়োলিন বাজায় তো। অনেকদিন পরের কথা, ভার্সিটি পড়ুয়া রাতুল ক্লাস শেষে ছুটে গেলো নীলক্ষেতের মোস্তফা চাচার দোকানে। পুরোনো বই দেখে দামটা সাধ্যের মধ্যেই! বইয়ের নাম ছায়ালীন, প্রতিবারের মতো এবারও প্রচ্ছদে ধ্রুব এষের নাম।
বইটির উৎসর্গ পাতায় লেখা,"প্রাক্তন!"

লেখকঃ ইমতিয়াজ নাফি
পায়ে পায়ে হারাবার পথ খুঁজে মরি।