ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

চৈতী হাওয়া (পর্ব ৯) - লিখেছেন - আবীর হাসাম সায়েম



নবনীর ঘুম ভেঙেছে কিন্তু বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করছে না। রাতে ঘুম যেমন জরুরি, ঘুম ভাঙার পর বিছানায় কিছুক্ষণ শুয়ে থাকাও জরুরি। কোনো স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক বইয়ে কেনো এই কথাটা লেখা থাকে না তা নবনী বুঝতে পারে না। রাফা কে বললে সে কি এই কথাটা তার বইয়ে লিখবে? হ্যাঁ,লিখবে। নবনী জানে, রাফা তার কোনো কথা ফেলে না। নবনী বিছানা ছেড়ে উঠল।

সবাই ডাইনিং টেবিলে বসে নাস্তা খাচ্ছে। নবনীদের বাড়ির এই ব্যাপারটাও রাফার বেশ ভালোলাগে। সকলের সকাল আর রাতে এক সাথে খাওয়া, খেতে খেতে নানা কিছু নিয়ে আলাপ- আলোচনা করা। নবনী রাফাকে জিজ্ঞেস করল,
"রাফা আজকে তোর কোনো কাজ আছে?"
" একটু তো আছে কিন্তু কেনো বলতো?"
"না, একটু বের হতাম। "
 "আচ্ছা, বিকালে বের হলে কি হবে?"
 " হ্যাঁ,হবে।"
 "আচ্ছা আমি তাহলে আমার কাজ শেষ করে ঠিক ৪:৩০ এর দিকে তোর বাসায় এসে পড়বো।"
"আচ্ছা।"

 নবনী আজ ওষুধ খায় নি। কেমন এক বোটকা গন্ধ ঔষুধের। দাঁত মাজলেও গন্ধ যায় না। প্রতিদিন নবনীকে ঔষধ খাইয়ে দিতেন রাবেয়া খাতুন। আজ রাবেয়া খাতুনেরও শরীরটা খারাপ। সারাদিনই বিছানায় শুয়ে ছিলেন। একটু আগে নবনীর রুমে এসে ঔষধটা বের করে দিয়ে গেছেন।
 "ঔষধটা খেয়ে নিস নবনী।"
 "আচ্ছা খেয়ে নিব।তোমার কি শরীরটা খারাপ মা?"
 "অনেক মাথা ব্যাথা হচ্ছে।"
" ডিস্পেরিন খেয়ে নাও।"
"২ টা খেয়েছি কমছে না। অনেক ঘুমে ধরছে নবনী, আমি যাই। তুই ওষুধগুলো খেয়ে নিস।"
 "আচ্ছা মা।"

 ঘড়িতে বাজে ৪:১৫। নবনী শাড়ি পড়েছে। খুব কম মানুষ আছে এই পৃথিবীতে যাদের শাড়ি পরলে মানায়। কিন্তু ওইসব মানুষের মধ্যে বেশিভাগই নিজে শাড়ি পরতে পারে না। নবনীও তাই। রাবেয়া খাতুন ছোট বেলা থেকেই নবনীকে শাড়ি পড়িয়ে দেন। নবনী রাবেয়া খাতুনের রুমে গিয়েছিলো। রাবেয়া খাতুন গভীর ঘুমে মগ্ন। তার সামনে যদি এখন হার্ড রক কোনো গান ফুম ভলিউমে ছাড়া হয় তাহলেও সে উঠবে না। নবনী কোনো উপায় না পেয়ে তিশার রুমে গেলো। তিশা খুব ভালো শাড়ি পরাতে পারে। চুল ছোট করার পর তিশার মুখে ছেলে ছেলে ভাব এসে পড়েছে। কি বিচ্ছিরি ব্যাপার! একটু দাঁড়ি-গোঁফ গজালে তাকে পুরোই ছেলে মনে হবে। নবনী বলল, "তিশা আমাকে শাড়ি পরিয়ে দিবি একটু?" "একটু কেনো? বেশিই দিবো। তুমি যাও আমি আসছি।"
আমি আসছি বলে তিশা আধঘন্টা লাগিয়ে দিলো। তিশার শাড়ি পরানো খুব সুন্দর হলেও সে নিজে শাড়ি পরতে পারে না। কি এক আশ্চর্য ব্যাপার- মেয়েটা সারা জীবন অন্যকে শাড়ি পরাবে কিন্তু তাকে শাড়ি পরিয়ে দেবে কে?

 রাফা প্রচন্ড জ্যামে আটকা পড়েছে। তার ফোনের চার্জ শেষ। নবনীকে একটা ফোন দিয়ে জানিয়ে দেয়া গেলে ভালো হতো। নবনী সহজে রাগ করে না। কিন্তু একবার রাগ করলে তাকে মানানো বেশ কঠিন। রাফা ভাবছে রিক্সার থেকে নেমে এক দৌড় দিলে কেমন হয়। হয়তো তাড়াতাড়ি নবনীর বাড়িতে পৌছানো যাবে। নবনীর মনটা খারাপ। না না অনেক বেশি খারাপ। যখন নবনীর মন খুব খারাপ হয়, সে পায়ের নখ কাটা শুরু করে। কয়েকবার তো কাটতে কাটতে রক্ত বেরিয়ে যায়। নবনী নেইলকাটার নিয়েছে, পায়ের নখ কাটবে। মাত্র বুড়ো আঙুলের নখ কেটেছে, সেই সময় সদর দরজায় ঠকঠক। নবনী দরজা খুলতে গেলো না। রাফার উপর তার খুব রাগ হচ্ছে।

 তিশা দরজা খুলে দেখে লতিফ সাহেব। লতিফ সাহেবকে বেশ খুশি দেখাচ্ছে। তিশা বলল, "আরে বাবা তুমি? এতো তাড়াতাড়ি? " "আরে একটা খুশির খবর আছে। তোর মা কোথায়?" "মায়ের শরীরটা খারাপ। সে ঘুমুচ্ছে।" "আরে খুশির খবরটা শুনলে তোর মা'র অসুখ দৌড়ে পালাবে।" লতিফ সাহেব হন্তদন্ত শোবার রুমে ঢুকে গেলেন। নবনীর মনটা আরো খারাপ হয়ে গেলো। সে জোরে জোরে নখ কাটতে লাগল। একটা পায়ের নখ ইতিমধ্যে গোরা থেকে উঠিয়ে ফেলেছে। রক্তে বিছানার চাদর ভিজে গেছে।


আবীর হাসাম সায়েম
ইন্টারে পড়ছেন। এই করুণ বস্তুবাদিতার ব্যস্ত শহরে জীবন পড়ার এক চেষ্টা চালাচ্ছেন।