ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

আমাদের সময় - লিখেছেন - কুশিও নবাব প্রিন্স




এইতো কিছুক্ষণ আগেই সন্ধ্যে হলো। আমি এখনো বাসায় ফিরি নি। কাদামাখা রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে বাসায় ফিরছি। হাঁটছি আমি দ্রুত। কারণ বাসায় পৌঁছাতে আজ দেরি হয়েছে। কাল আবার স্কুলে পরীক্ষা। সারাবছর পড়েছি। কিন্তু আমি পরীক্ষার আগের দিন পড়ি না। কারণ জানি তা পড়েও লাভ হবে না। পরীক্ষার হল এ গিয়ে সব জিরো! 


বৃষ্টির দিন। রাস্তার পানি কাদায় নিজের হাত পা'ও কাদায় মাখামাখি অবস্থা। এই স্যাঁতস্যাতে ভাব নিয়েই বাসায় ঢুকতে হবে। কিছুই করার নেই।
কলিং বেল চাপ দিলাম। কলিং বেলের সুইচে কাদা লেগে গেলো খানিকটা। সেটা মুছতে গিয়ে আরো খানিকটা কাদা লেগে গেল সুইচে। এমন সময় মা এসে দরজা খুলে দিলো। ভাগ্যিস, মুছবার সময় দেখতে পায় নি। তাতে কি, অনেক ওজনের এক ধরনের বকাঝকা খেতেই হলো আমাকে।

সবাই খানিকটা বেপরোয়া আর অস্থির! এইতো আজ বিকেলে এক বন্ধুকে সাথে নিয়ে একটু একটু করে হেটে গেলাম পাশের এলাকায়। বসলাম ছোট চায়ের দোকানে। বৃষ্টির দিনের চা যে অন্যদিনের মতো লাগবে তা কিন্তু নয়। আজ একটু অসাধারণই লাগছে। কিছুক্ষণ পর চা খাওয়া শেষ হলো। আমি খালি বেঞ্চে বসে পা দোলাচ্ছি। এমন সময় এই এলাকার ছেলেপেলের দল রাস্তার শেষ কিনারায় দাড়িয়ে আছে।

ওদের আমি চিনি। তিনজনের মধ্যে দুজন আমার স্কুলেই পড়ে একই ক্লাসে। কিন্তু তাদের সাথে আমার তেমন বন্ধুত্ব সম্পর্ক নেই। তাদের পুরো জীবনটাই আলাদা! তাদের দেখলেই মনে হয় তারাই এই পৃথিবীর মহা সুখি মানুষ। আর আমাদের বেলায় লংকা আর পেয়াজ! 
রাস্তার শেষ মাথায় স্কুলের এক ম্যাডাম আছেন। সমাজ-বিজ্ঞানের শিক্ষিকা, খুব কড়া। প্রাইভেট পড়তে না এলে যেমন বকেন তেমন মারেন ও। স্যাররা মারধর করলে একটা আলাদা স্বাদ থাকে। কিন্তু ম্যাডামের হাতে বকুনি আর বেতের লাঠিতে মার খাওয়া যেন হাস্যকর ব্যাপার।

এখনি সেই বাসা থেকে কিছু মেয়েরা বের হবে।এদের আমি চিনি। সাধারণ ভাবেই চিনি। এরা আমাদের স্কুলেরই অন্য শাখার। কিন্তু আমাকে কেউ চেনে না। এতে করে ভালো হয়েছে এক প্রকার স্বাধীনতা আছে। রাস্তা ঘাটে কখন কি করছি কেউ হুট করে দেখে সহজে চিনে ফেলবে না। 
মেয়েদের দল বের হয়েছে। এক দল মৌমাছির ঝাক। ছেলে গুলো তাদের মতো করে ঘুছিয়ে সুন্দর করে দাড়িয়ে আছে। কি সব বলছে তাদের দিকে মুখ করে তাকিয়ে। তাদের কথা শুনে সবাই যেন লজ্জায় দৌড়ে পালায়। 
রাতের খাবার খেয়ে নিজের ঘরে এলাম। আমার হিরে তাকানোই যায় না। একবার খুব কষ্ট করে গোছালে হঠাৎ সব ধুমড়ে মুছড়ে শেষ হয়ে যায়। তারপর আবার গোছাতে হয়। কাল প্রথম পরিক্ষার বিষয় হলো গণিত। আমি সর্বদাই এই বিষয়ে কাচা। নির্ঘাত নকল করে পাশ নিশ্চিন্ত আমি। যদি স্যার ম্যাডাম গার্ড না দেন তবে! 

সারা সন্ধ্যে পড়া হয় নি। আছে শুধুই একটাই কাজ। মোবাইল ফোনে ঘুরাঘুরি করা। এটা করা ওটা করা এসব কাজ যেন শেষ হয়েও হয় শেষ। যত ভিতরে যাই, ফোনের তত ভিতরে ঢুকে যাই। 
রাতে কেনো জানি আমার ঘুম পায় না। কিন্তু দিনে যখন ঘুম পায় তখন যেই খানেই বসে থাকি সেখানেই ঝিমুতে থাকি সারাক্ষণ। আর রাতে ঘুমালেই স্বপ্ন দেখি। নানান ধরনের স্বপ্ন। স্বপ্নের মধ্যেও যে এত মজা পাবার এক প্রকার স্বাদ আছে তা সবাই টের পাবে কিনা জানি না। কিন্তু আমি পাই। 

কালকে রাতে ঘুমাতে একটু দেরি হয়েছিলো। তখনই স্বপ্নে দেখলাম আমি ঘুড়ি উড়াচ্ছি। উড়াতে উড়াতে অনেক আকাশের মাঝে হারিয়ে যাচ্ছে কিন্তু এমন সময় আরেকটি ঘুড়ি ঝামেলা পাকাচ্ছিল। আমিও দিলাম অন্যের ঘুড়িটা কেটে। তখনই চোখ পড়লো ঠিক দূরের পাসের বাসার ছাদে। এক মেয়ে আমার ঘুড়ি উড়ানো দেখে মুগ্ধ হয়ে হাসছে। তালিও দিচ্ছে। তার খুশি দেখে আমিও খুশি। তার চাইতেও বেশি খুশি হয়েছি তার চেহারা দেখে। এত সুন্দর চেহারা কারোরই হতে পারে না! যখনই সে আমার দিকে তাকাবে এমন সময় স্বপ্ন গেলো ভেঙে। 

আমার রুমে লাইট অফ। শুয়ে পড়েছি। চোখ বন্ধ করি নি। টের পাচ্ছি মা হেটে এখন আসবেন আমার রুমে। সত্যিই তাই হলো। 
“ কাল না তোর পরীক্ষা। সারাদিন তো বাহিরে বন্ধুমহল্লায় পড়ে ছিলি। এসে বইটা খুলে দেখেছিস?  পরীক্ষায় এবারও কি ফেল করবি?”
আমি আর কিছু বললাম না। মায়ের বকুনি শুনেই ঘুম এসে গেলো। আজকের স্বপ্নে ওই মেয়েটাকে না দেখতে পেলে ভালোই হবে। যদিও অবাস্তব কিছু। কিন্তু জীবনের প্রথম প্রেমটা যে কিভাবে ঘুড়ির সুতো কাটার মতো কেটে গেলো বুঝতেই পারি নি। তারপর আবার প্রেমে পড়লে নাকি লিখতে হয় কবিতা। আমিও লিখলাম। সেগুলো কদিন আগে পড়তে গিয়ে হাসতে হাসতে পেট ফেটে যাচ্ছিলো! যেমন লাইন আবার তেমন বানান। আট লাইনের কবিতায় বানান ভুল চারটি। আর কবিতার লাইন? পড়াই যায় না। তাই ছিড়ে  ফেলে দিয়েছি।
আজ স্বপ্নে  দেখব হয়তো আমি পরিক্ষা দিচ্ছি। ঠিক রুমের মাঝখানের সাড়ির মধ্যখানের টেবিলে। প্রশ্ন হাতে পেয়ে হাত পা নাড়া দিয়ে উঠলো।তারপর পরিক্ষার পর সেই ছেলেগুলো কে মারব কিনা ভাবছি? মারাধর করাটা কি ঠিক হবে? সব কিছু সমাধান মারধরে হয় না। সুতরাং না মারধর করাই ভালো। সব খারাপ কাজের একটা ফলাফল থাকে।

আবারো হঠাৎ মায়ের বকুনি।“ কিরে সকাল তো হলো পরিক্ষা দিতে যাবি না? নাকি না গিয়েই ফেল করে বসে থাকবি? ”
“ না মা আমি স্বপ্নে দেখেছি। এবারের পরিক্ষায় আমি সর্বোচ্চ নাম্বার পাবো! তুমি দেখে নিও এটা সত্য হবেই।" 
মা হাসতে হাসতে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো। মা'য়ের এই হাসি দেখে আমার পেট হাসিতে খিল ধরে যাচ্ছে। 
( সমাপ্ত) 
কুশিও নবাব প্রিন্স
ঢাকার এক সরকারি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছি। দর্শন এবং টুকরো টুকরো গল্প উপন্যাসের প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে তুলছি।