ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

ছোট গল্পঃ আজও দাঁড়িয়ে আছি - লিখেছেন - কুশিও নবাব প্রিন্স




মাথাটা ভীষণ ব্যাথা করছে। এই নিয়ে তিন কাপ চা বানিয়ে খেয়েছি। তবুও মাথা ব্যাথ্যা কিছুতেই কমছে না।কেনো জানি মনে হচ্ছে এই, চা পানি খেয়ে এই তীব্র ব্যাথা কাটবে না। কিন্তু কিছু করার নেই। চায়ের শেষে সিগারেট জ্বালিয়ে ধরে বেশ কিছুক্ষণ যাবত বসে আছি। চেয়ারে হেলান দিয়েছি। চোখ বন্ধ। বাম হাতে সিগারেট ধরে রেখেছি কিন্তু একবার ও সেটার স্বাদ নেই নি । নিতে ইচ্ছে করছে না । আর ডান হাতে আমার প্রিয় রংতুলিটা। একটু আগেই এই তীব্র মাথা ব্যাথা নিয়েই মহুয়ার ছবিটা একে শেষ করলাম । ছবিটা আসলেই খুব সুন্দর হয়েছে। সুন্দর হবারই কথা কারণ সে দেখতেও খুবই সুন্দর।


মহুয়া সম্পর্কে আমার প্রেমিকা। এত দিন আমার প্রেমিকা ছিলো ঠিকই কিন্তু আজ থেকে সে আমার তেমন কাছের কেউ না। আজ তার বিয়ে। এখন মনে হয় বিয়ের সব আজ মাত্রই শুরু হয়েছে । তার বিয়েটা খুব উদযাপনের মাধ্যমেই হচ্ছে। শুনেছি ছেলের চরিত্র বেশ ভালো। ছেলের পরিবার খুব ধনী! এমনকি সেই ছেলেটা নিজেও বেশ ধনী হবে হয়তো। আমার সেটাই মনে হয়। 

মহুয়ার ইচ্ছা ছিলো আমি যেন তার আকা ছবিটা তার জন্মদিনের দিন এটা  উপহার হিসেবে দিয়ে তাকে খুশি করি। কিন্তু সেটা আর করা হবে না। জন্মদিনটা ছিলো তার গায়ের হলুদের দিন । খুব অদ্ভুত ব্যাপার! আমিও ভেবেছিলাম তার জন্মদিনের দিনই তাকে উপহার দিব ছবিটা সহ কিন্তু আমারই দোষের কারণে ছবির পুরোপুরি অংশ শেষ করতে পারি নি । তার ইচ্ছা ছিলো আমি যেন তার গায়ে হলুদে গিয়ে তার সাথে দেখা করি। আমি প্রথমে রাজি হই নি । কিন্তু সে এত জোর করবে ভাবতেই পারি নি। আমার প্রেমিকার বিয়ে হয়ে যাচ্ছে! কিন্তু আমার কষ্ট লাগে নি। লেগেছে কিন্তু সেটা কেমন? তা বলতে পারব না।
মানুষের জীবনে কিছু জিনিস মেনে নিতেই হয়। কারণ ভাগ্যে যা লেখা আছে, তার উপরে আর কিছু নাই!তাই আমারও এটাই করতে হলো।

গায়ের হলুদের দিন আমি নীল পাঞ্জাবি পড়েই বেরিয়েছিলাম । আমি জানি হতো গায়ের হলুদের অনুষ্ঠানে এই নীল রঙের পুরোনো পাঞ্জাবি মানাবে না । সবাই থাকবে হলুদের মাঝে আর আমি নীল ! 
দিনটা অন্যদিনের মতোই ভালো ছিল। রাস্তার ফুটপাতে না হেঁটে মেইন রাস্তার কোণা ঘেষে হাটছি। দুইবার দজন রিকশাওয়ালার বকা খেয়ছি । বেচারা বার বার বেল চেপেছে আর রাগভঙ্গি চেহারে নিয়ে আমার দিকে তাকিয়েছে। আমি কিন্তু কিছুই বলি নি তাকে। 

সিগারেটটা শুধুই নষ্ট হলো। বেচারা সিগারেটট থেকে স্বাদ নিতেও পারলাম না । এমনিতেই পুড়ে ছাই হয়ে গেলো। হঠাৎ খুব চেচামেচির শব্দ! প্রথমে চমকে উঠেছিলাম কিন্তু চমকে উঠবার দরকার নেই। কারণ এটা মহুয়ার বিয়ের অনুষ্ঠান থেকে এই শব্দ আসছে। তার বাসাটা আসলে আমার এই ছোট ভাঙ্গাচোড়া বাসা থেকে কিছুটা দূরের বিশাল বড় একয়াট দালান আছে সেটাই মহুয়ার বাসা। পুরো বাসা জুড়ে নানান লাইট দিয়ে সাজানো। একটু পর মনে হয় বিয়ের সব কাজ শেষ হয়ে সবাই বাড়ী ফিরবে । 

জানালার পাশ থেকে ফিরে, এলাম ছবিটার কাছে । এত সুন্দর ছবি একেছি আমার জীবনে আমার বিশ্বাস হচ্ছে না । এক মায়াবিনীর ছবি। নাম তার মহুয়া! সম্পর্কে সে আমার কিছুই হয় না? সত্যিই কিছু হয় না? 
ছবিটা ক্যানাস থেকে খুলে নিয়ে চশমা চোখে লাগিয়ে চলে গেলাম দরজার কাছে । দরজা খুলে  সিড়ি দিয়ে হেঁটে ছাদে যাচ্ছি। একটু পর বিয়ের সেই রোমাঞ্চকর আতশবাজিটা আকাশে দেখব! ঠান্ডা শীতল বাতাসে বুকের ভেতরটা ছ্যাঁত করে উঠল! মন চাচ্ছে এক্ষনি দৌড়ে যাই মহুয়ার বিয়েতে। তার হাত ধরে সবার সামনে থেকে ধরে নিয়ে আসি আমার রংতুলির ক্যানভাসে। আমি সারাদিন তার ছবি আঁকব কিন্তু ক্লান্ত হবো না। আর ক্লান্ত হলে সে কাধে হাত দিয়ে বলবে, ‘সুন্দর হয়েছে এবার আসো উজন মিলে গল্প করি। নানান গল্প। গল্পের কোনো শেষ আছে নাকি ? ’

ছাদের কার্নিশের একটা টবের পাশে দাঁড়িয়ে আছি। স্পষ্ট সেই বিয়ের বাড়িটা দেখতে পাচ্ছি। বিয়ের অনুষ্ঠানের মানুষগুলোর আনন্দে পুরো এলাকা জুড়ে ঝমঝম করছে । সবাই প্রস্তুত হচ্ছে আতশবাজি ফাটানোর জন্য। আর আমি? 
আমি অনুভব করছি আমি ভাসছি বাতাসে। আমার চোখে এখন শুধু রঙিণ আকাশ। অল্প অল্প করে আতশবাজিটা আকাশে উঠছে! সাথে সাথে রঙিণ আলো ছড়িয়ে পড়লো আমি ততক্ষণে গরম উষ্ণ পানির মতো ঘন এক জিনিসে আমার পুরো শরীর ভিজে যাচ্ছে আর আমার হাতে থাকা মহুয়ার মায়াবীনি মুখের আঁকা ছবিটাও। 
আমার মনে হলো মানুষ হঠাৎ আচমকা চেঁচামেচি করছে। কেউ চিৎকার করছে! এক লোক কাকে যেন বলছে,‘ হ্যালো হ্যালো। এম্বুলেন্স! বনানী ব্লক বি ১২/৭ নম্বর বিল্ডিং এর সামনে এক ছেলে আত্মহত্যা করেছে।’


(সমাপ্ত)
কুশিও নবাব প্রিন্স
ঢাকার এক সরকারি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছি। দর্শন এবং টুকরো টুকরো গল্প উপন্যাসের প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে তুলছি।