ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

রম্য গল্প: বিয়ে বিভ্রাট - লিখেছেন - বিনিয়ামীন পিয়াস



আমার বিয়েটা ঠিক হয়েই গেলো।

 

এসেছিলাম অবশ্য পাত্রী দেখতে, কিন্তু এবার মনে হচ্ছে বিয়ে করেই বাড়ি ছাড়তে হবে। আমার পিতৃ এবং মাতৃ উভয় বংশের মধ্যেই কাকতালীয় ভাবে একটা মিল রয়েছে, সেটা হচ্ছে যেকোনো কাজেই তাদের খুব তাড়াহুড়ো। আমার নানা এবং বাবা উভয়েই নাকি পাত্রী দেখতে গিয়েই বউ নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলেন। শুনেছি বড় মামার জন্ম নাকি সম্ভাব্য তারিখের একমাস আগেই হয়েছিলো। আর বেচারি ফুপু পরীক্ষার সময় তাড়াহুড়ো করে যেতে গিয়ে নাকি অ্যডমিট কার্ড বাসায় ফেলে গেছিলেন, সেবারে আর তার মেট্রিক পাশ করা হয়নি। এরকম আরো অনেক গল্প আছে, সবই যে আমি চাক্ষুস প্রত্যক্ষ করেছি এরকম না। এসব গল্পের কারণে আমাদের পরিবারের এলাকায় অন্যরকম নাম ডাক আছে। বেশিরভাগ গল্পই আমি লোকমুখে শুনেছি। আমার পরিবারের এইসব উদ্ভট আচরণের ভুক্তভোগী হচ্ছি আমি আর ছোটমামা। আমার ছোটমামা একটু অদ্ভুত ধরনের মানুষ। বয়সে আমার থেকে বছর পাঁচেকের বড় হবেন। আধুনিক যুগে যদিও এটা বেমানান মনে হয় তবে আগের যুগে এগুলো কোনো ব্যাপারই ছিলো না।  প্রায় সমবয়সী হওয়ায় মামার সাথে আমার সম্পর্ক বন্ধুর মতই। আমার আর ছোটমামার মধ্যে অনেক বৈশিষ্ট্যের মিল ছিলো তাই পরিবারের সবাই আমদের মানিক-জোড় বলত। আমাদের এসব উদ্ভট আচরণ একটুও ভালো লাগতো না। দুই মামা-ভাগ্নে মিলে তাই প্রায়ই প্ল্যান করতাম কিভাবে এই বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।


 

তো আজ সন্ধ্যায় আমরা সবাই বাড়ি থেকে বের হই ছোটমামার জন্য পাত্রী দেখতে। পাত্রীর বাড়িতে পৌঁছানোর পর যথাসময়ে পাত্রী এলো, আমাদের পরিবারের সবাই কথাও বললো। শুধু আমি আর ছোটমামাই চুপচাপ ছিলাম। এর মধ্যে একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেলো। পাত্রীপক্ষের নাকি আমাকে পছন্দ হয়েছে, তাই তারা ছোটমামা নয় আমার সাথেই বিয়ে দিতে আগ্রহী। তাদের কথা শুনে তো আমার মুখ হা হয়ে গেলো, আমি চোখ বড় বড় করে মা আর বড়মামার দিকে তাকালাম তাদের প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য। তাঁদের দেখে মনে হলো যেন কিছুই হয়নি। তাঁরা বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই এই সিদ্ধান্ত মেনে নিলেন আর আমার মাথার উপর যেন বাজ পড়লো। আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম ছোটমামার দিকে আর ছোটমামা ঘরের সিলিংয়ের দিকে। আমার পরিবারের লোকজনের মতিগতি আমার কাছে ভালো ঠেকলো না, মনে হচ্ছে তাঁরা আমাকে বিয়ে করিয়েই এখান থেকে নিয়ে যাবেন। আমি ছোটমামার হাত ধরে একপ্রকার জোর করেই সেখান থেকে বের হয়ে ছাদে গেলাম। প্রায় কাঁদো কাঁদো কন্ঠে মামাকে বললাম,

“মামা,তাড়াতাড়ি কোন বুদ্ধি বের করো নাহলে আমি কিন্তু এই ছাদ থেকে লাফ দেবো বলে দিচ্ছি”

“আরে থাম, একটু ভাবতে তো দে।“, যদিও শান্ত ভঙ্গিতে উত্তর দিলেন মামা, তবে কন্ঠে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।

“রাখো তোমার ভাবাভাবি। যা করার দ্রুত করো নাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে।“

“না না, তোর এই মামা বেঁচে থাকতে তোর কিচ্ছু চিন্তা করতে হবে না।“

“হ্যাঁ, তা হবে কেন, শুধু মামাকে বাকি রেখে বিয়েটাই করতে হবে।“, ভেংচি কাটলাম আমি।

এবার মনে হয় মামা আসলেই ভাবনায় পরে গেলেন। ৫ বছরের বড় মামা অবিবাহিত থাকতেই ভাগ্নের বিয়ে, না এ যে বড় লজ্জার কথা!

মামা অনেকক্ষণ চিন্তা ভাবনা করলেন,তারপর হঠাতই বলে উঠলেন, ”ইউরেকা, পেয়ে গেছি।”

 

“কী পেয়ে গেছো?”, কৌতুহল নিয়ে জানতে চাইলাম আমি।

 

“সমাধান পেয়ে গেছি। তুই এখানে থাক, আমি ভাইজানের সাথে কথা বলে শিওর হয়ে আসি বিয়েটা আজই হচ্ছে কিনা।"

 

“মানে কী, তুমি কী বিয়ে ভাঙার প্ল্যান করছো নাকি বিয়ে করানোর প্ল্যান করছো?”

 

“সেটা তোর মোটা মাথায় ঢুকবেনা। তুই এখানে থাক, যা করার আমিই করবো।", এই বলেই মামা সেখান থেকে চলে গেলেন। সেই যে গেলেন ফেরার আর নাম নেই, এদিকে অন্ধকারে মশার কামড় খেতে খেতে আমার শরীরের রক্ত অর্ধেক শেষ।

 

মিনিট বিশেক পরে আমি নিচে গেলাম। গিয়ে দেখি বিয়ের তোরজোড় চলছে। মাকে জিজ্ঞেস করলাম ছোটমামা কোথায়। মা জানালেন সে নাকি কাজী আনতে গিয়েছে। কাজী নাকি খুব নামকরা হুজুর। ছোটমামার বেশ পরিচিত। দু-চার এলাকায় খুব নামডাক আছে তাঁর। সাথে নাকি জ্বীন আছে। হাত দেখেই ভাগ্য বলে দিতে পারে সেই জ্বীন। ছোটমামা নেই শুনে এমনিতেই মেজাজ খারাপ হয়ে গিয়েছিল তার উপর মায়ের এই ফালতু গল্প আর সহ্য হচ্ছিল না। তাই তখনকার মত সেখান থেকে বিদেয় হলাম।

 

খানিকবাদেই কাজী নিয়ে ছোটমামা এসে পড়লেন। আমি তাকে ইশারায় জিজ্ঞেস করলাম হচ্ছেটা কী? মামা দেখেও যেন না দেখার ভান করলেন। বিয়ের কাজ শুরু করার জন্য আমাকে কাজী সাহেবের সামনে বসানো হলো। এর মধ্যে মেয়ের বাবা বললেন, ”হুজুর ছেলের হাতটা একটু দেখুন তো, বিবাহ পরবর্তী জীবন কেমন কাটবে।"

 

হুজুর দীর্ঘসময় বসে আমার হাত উল্টেপাল্টে দেখে কপাল কুঁচকে চোখ নাচিয়ে বললেন,”ছেলের ভবিষ্যৎ বেশ ভালো। বেশ ভালো চাকরী, সুন্দরী বউ সবই আছে।" এইটুকু শুনে ঘরের সবার মুখেই হাসি ফুটে উঠলো। আবার শুরু করলেন হুজুর, " কিন্তু এই মেয়ের সাথে ছেলের বিয়ে হলে সাত দিনের মাথায় মেয়ের বাবার মৃত্যু হবে।"

এই কথা শোনার পর সবার মুখ থেকে যেন রক্ত সরে গেল। পরিবেশটা একদম থমথমে হয়ে গেল। মরার উপর খারার ঘা মেরে হুজুর আরো বললেন, "জ্বীন মারফত আরো জানতে পেরেছি, এই আসরে থেকে কন্যাকে অবিবাহিত উঠিয়ে নিলে গোটা পরিবারের উপর ভয়ানক বিপদ নেমে আসবে। ভয়াবহ বিপদ!"

 

এই কথা শোনার পর পুরো ঘরভর্তি লোক মৃদু আর্তনাদ করে উঠলো। প্রত্যেকের চেহারায় শঙ্কার ছায়া। মেয়ের বাবা শঙ্কিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “তাহলে এখন উপায় কী, হুজুর?”

 

হুজুর একটা পান মুখে নিয়ে আয়েশী ভঙ্গিতে বসে বললেন, ”উপায় একটা আছে। জ্বীন মারফত সব খবর আমি পেয়ে গেছি। এই ঘরে আরেকজন অবিবাহিত ছেলে আছে যার ভাগ্যরেখার সাথে মেয়ের ভাগ্যরেখার হুবহু মিল আছে। সেই ছেলের সাথে বিয়ে দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।“

তখন প্রায় সবাই একসাথে বলে উঠলো,”কে সেই ছেলে?”

হুজুর ছোটমামার দিকে ইশারা করলেন। ছোটমামা প্রায় সঙ্গে সঙ্গে না বলে দিলেন। তাঁর জন্য মেয়ে দেখতে এসে ভাগ্নের সাথে বিয়ে দেয়ার ব্যাপারটায় তিনি নাকি অনেক অপমানিত বোধ করেছেন তাই এই বিয়ে করা তাঁর পক্ষে সম্ভব না।

 

সবাই তখন এক হুলস্থুল কান্ড বাধিয়ে ফেললো। মেয়ের আর মেয়ের বাবার জীবন রক্ষার জন্য সবাই ছোটমামাকে এই বিয়েটা করতে অনুরোধ করতে লাগলো। মেয়ের বাবা তো পারলে ছোটমামার পায়েই পড়ে যান!

 

এবারে আমি মামার চালটা স্পষ্ট বুঝতে পারলাম। মনে মনে মামার বুদ্ধির প্রশংসা না করে পারলাম না। হুজুরকে দিয়ে কিভাবে এত বড় মিথ্যেটা বলালো সেটাই কেবল আমার মাথায় আসলো না। আর মামার অভিনয় দেখে তো আমি হাসি চেপে রাখতে পারছিলাম না। শেষমেশ সবার জোরাজুরিতে ছোটমামা বিয়েটা করেই ফেললেন।

 

 

ফেরার পথে:

 

”কী ভাগ্নে, কিরকম দেখালাম। সাপও মরলো অথচ লাঠিও ভাংলো না।“, হাসি মুখে বললেন মামা।

“আসলেই মামা তুমি জিনিয়াস।“, আমিও উত্তর দিলাম হাসতে হাসতেই।

“শুনেছি, তোর মামীর নাকি দূর সম্পর্কের এক ভাগ্নি আছে বেশ সুন্দরিই। তা দেখবো নাকি তোর হিল্লেটাও হয় কিনা।“

“আগে তো কদিন ট্রেলার দেখতে দাও, তারপর নাহয় ফুল মুভিই দেখবো।“

এবারে মামা আর আমি দুজনেই হেসে উঠলা
বিনিয়ামীন পিয়াস
বিনিয়ামীন পিয়াস। পড়াশোনা করছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগে। ফিজিক্সের খটমটে সূত্রগুলোকে কাব্যিক ছন্দে লেখার স্বপ্ন দেখি। একদিন হয়ত আপেক্ষিকতার সূত্রকে বিদ্রোহী কবিতার মত লিখে ফেলবো।