ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

ভারতের জাতীয় সংগীত বিতর্ক এবং রবীন্দ্রনাথ - লিখেছেন - আসাদুজ্জামান খান জিসান



বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে কয়জন প্রখ্যাত দার্শনিক প্রথম সারিতে আছেন, তাদের মধ্যে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম অন্যতম। কবিগুরুর মেধা এবং লেখনী শক্তি যুগ যুগ ধরে লালিত হচ্ছে বাঙালি জনগোষ্ঠীর অন্তরে। প্রেম-ভালোবাসা, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের জীবনের না বলা কথাগুলো অবলীলায় প্রকাশ করে গিয়েছেন তার মহান রচনাবলীর মধ্য দিয়ে।
কবিগুরুর জন্ম-মৃত্যু স্বাধীন ভারতবর্ষে হয়নি ঠিকই, তবে স্বাধীন ভারতবর্ষে তার কদর এক বিন্দুও কমেনি।

 
তবে এই কীর্তিমানের পিছু ছাড়েনি বিতর্ক। এর মধ্যে অন্যতম ভারত এবং বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত রচনা নিয়ে। ভারতের জাতীয় সংগীতের কথাই ধরুন, অনেকের মতে ''জনগণমন'' গানটি ইংরেজদের আনুগত্য প্রকাশের জন্য লেখা হয়েছিলো। যারা এই অভিযোগ করে থাকেন তাদের কাছে আছে অকাট্য যুক্তি।



রাজা পঞ্চম জর্জ সিংহাসনে আরোহন করার পর, ১৯১১ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারত বর্ষ সফরে আসেন। দিল্লির দরবারে রাজা কে সম্মান জানানোর জন্য অন্যান্য আয়োজনের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জনগণমন গানটি মঞ্চস্থ করা হয়েছিল। শুধু তাই নয় সংবাদমাধ্যমগুলো প্রচার করেছিলো যে, বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্রাটকে স্বাগত জানিয়ে একটি গান রচনা করেছেন। অপরদিকে জনগণমন গানটির "অধিনায়ক" শব্দটি বিশেষ করে সম্রাটকে ইঙ্গিত করে বলেও বিরোধীরা মনে করেন।  

এবার আসা যাক রবীন্দ্র প্রেমীদের বক্তব্য নিয়ে। তাদের যুক্তিও কোনভাবে কম শক্ত নয়। ১৯৩৭ সালে জাতীয় সংগীত হিসেবে জনগণমন গানটির নাম প্রস্তাব করেছিলেন প্রবল ইংরেজবিরোধী সুভাষচন্দ্র বোস। নেতাজির আজাদ হিন্দ ফৌজ গঠনের ঘোষণা দেয়া হয় ১৯৪৩ সালের ৫ জুলাই এবং সেই দিনই প্রথম জাতীয় সংগীত হিসেবে জনগণমন গাওয়া হয়েছিল।  



১৯৪৪ সালের মার্চ মাসে আজাদ হিন্দ ফৌজ মৌডক যুদ্ধক্ষেত্রে জয়লাভ করার পর, ভারতের মাটিতে প্রবেশ করে জাতীয় সংগীত হিসেবে গেয়েছিলো জনগণমন গানটি।  

বিতর্কিত এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের নিজের মতামত পাওয়া যায় ১৯৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ২০ নভেম্বর বিশ্বভারতীর প্রাক্তনী পুলিনবিহারী সেনকে লেখা একটি চিঠি থেকে।

কবি লিখেছেন,

‘সে বৎসর ভারত সম্রাটের আগমনের আয়োজন চলছিলো। রাজসরকারে প্রতিষ্ঠাবান আমার কোনও বন্ধু সম্রাটের জয়গান রচনার জন্যে আমাকে বিশেষ করে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। শুনে বিস্মিত হয়েছিলুম, সেই বিস্ময়ের সঙ্গে মনে উত্তাপেরও সঞ্চার হয়েছিল। তারই প্রবল প্রতিক্রিয়ার ধাক্কায় আমি জন-গণ-মন অধিনায়ক গানে সেই ভারতভাগ্যবিধাতার জয় ঘোষণা করেছি, পতন-অভ্যুদয়-বন্ধুর পন্থায় যুগ যুগ ধাবিত যাত্রীদের যিনি চিরসারথী, যিনি জনগণের অন্তর্যামী পথপরিচায়ক, সেই যুগযুগান্তরের মানবভাগ্যরথচালক যে পঞ্চম বা ষষ্ঠ কোনো জর্জই কোনক্রমেই হতে পারেন না সে কথা রাজভক্ত বন্ধুও অনুভব করেছিলেন।’ 

কবিগুরু কার মনোরঞ্জনের জন্য এই গান রচনা করেছিলেন বা সত্যিকার অর্থে কি ছিলো তার ভাবার্থ, সেই বিবেচনা পাঠকের উপর ছেড়ে দেয়া হল।

তথ্যসূত্র:



আসাদুজ্জামান খান জিসান
ইতিহাসনামা.কম এর ৩ জন সহ-প্রতিষ্ঠাতার একজন। হাইবারনেশনে থাকা ভাল্লুকদের প্রতি অসীম ঈর্ষা রয়েছে তার।