ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

Destruction of Experience এর আলোকে প্রোডাক্টিভিটি প্রসঙ্গে - লিখেছেন - রিয়াসাত মোর্শেদ খান




(১)

ক. কোনো একটি Skill অর্জন করতে আপনাকে ঠিক কতোখানি সময় ব্যয় করতে হবে?
খ. আপনি যদি কোনো প্রতিযোগীতামূলক পরীক্ষায় ভালো করতে চান তাহলে ঠিক কি routine মেনে চলতে হবে?
গ. সবশেষ, গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- Productivity জিনিসটা আসলে কেমন? তা দেখতে কেমন? এবং কিভাবে Productivity অর্জন করা যায়?

এসব প্রশ্নগুলো মোটামুটি আমার বয়সী মানুষ বা আমার চেয়ে প্লাস-মাইনাস ১০ বছরের মানুষ সবারই ব্যাপক আরাধ্যের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজকে থেকে তিন বছর আগেও আপনি বাজারে Self-Help জাতীয় বই খুব একটা দেখতে পেতেন না। কিংবা সেসবের কাটতিও তেমন ভালো ছিলো না। আশা করি আন্দাজ করছেন কোন লাইনে আমি কথা ধরেছি। তবে যা ভাবছেন তা না।




কাটতি ভালো না থাকার কারণ যে শুধুমাত্র যে বই এবং বইয়ের কন্টেন্ট তা না। যে দোকান থেকে সারাদিনের অফিস শেষে টাকা বাঁচানোর জন্যে পেপার পড়তে যান সেখানে জনৈক শিব খেরার “তুমিও পারবে” আপনাকে পারানোর জন্য যথেষ্ট stimulation দিতে পারে না। কারণ শিব খেরা জীবনে খুব বেশি কিছু পেরেছেন বলে জানা যায় না; তাছড়া তিনি এখনকার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্যে তার জীবনের চমকপ্রদতা তুলে ধরতে পারেন না। বিপরীতে এখনকার সেলফ-হেল্প বইয়ের লেখকেরা সামাজিক যোগযোগের ঝলমলে জগতের রোশনাইয়ের যোগানদাতা। তাদের social capital((শব্দটা খুব পাওয়ারফুল। অন্য কিছু শব্দের অভাবেই এ শব্দটা ব্যবহার করলাম তাতে যেনো অন্তত নিজের teen-age রাগ বোঝা না যায়) আপনাকে chronic প্রণোদনা দেয়। তাদের আপাত অর্থনৈতিক সচ্ছলতাও আপনাকে Chronic প্রণোদনা দেয়। সাথে আছে উপযুক্ত গ্রাফিকস, যেটা আপনাকে পর্যাপ্ত চোখের আরাম দিয়ে আপনার প্রণোদনার উৎসমূলকে জারি রাখে। আপনার আপাত ব্যর্থ জীবন minimalist গ্রাফিকসে আপনার অবচেতনকে শান্তি দেয়।




Social Capital শব্দের চরিত্রায়ন একটু দরকার এই পর্যায়ে। আমি এই বছরই প্রথমবারের মতো ঢাকা লিট ফেস্টে যাই। Safety Valve মেকানিজমে Mr Q সাবঅল্টার্ন নিয়ে প্যাঁচাল পাড়েন কিন্তু সাবঅল্টার্নকে সেখানে দেখতে পাই নি একরত্তি। পুরো লিট ফেস্টে আমি Urbanite Elite ছাড়া কয়জন যে বোদ্ধা দেখেছি- সেটা তর্কসাপেক্ষ। দেখুন, মানুষ হই-হুল্লোড় করবে, এস্থেটিকসের চাহিদা বাড়লে সেটা আদতে ভালোই, বা ক্রমাগত অংশগ্রহণে তথাকথিত appreciation তৈরি হবে-ইত্যাদি আর্গুমেন্ট আমি জানি এবং সেসবের defender হিসেবেও আমি আছি। কিন্তু আপনি যদি ঢাকা লিট ফেস্টে অংশগ্রহণকারী মানুষের ডেমোগ্রাফি বিশ্লেষণ করেন এই সহজ সত্য আপনি এড়াতে পারেন না। আপনি তাদের ফাইনান্সিয়াল স্টেইটমেন্ট নিয়ে বসেন, তাদের কর্মক্ষেত্র নিয়ে বসেন- এই অনিবার্য bubble আপনি না দেখে পারবেন না।





আপনাকে আমি আরো একটা উদাহরণ দিই। সম্প্রতি মেঘদলের একটা শো তে আমি যাই নিকেতনে। গিয়ে দেখলাম মূলত একটা এপার্টমেন্ট- তার ছয়তলার একটি ফ্ল্যাটে গানের আসর বসবে। মানুষে মানুষে টইটম্বুর- কিন্তু আশ্চর্য হয়ে খেয়াল করলাম এসব মানুষদের কমপক্ষে ১০ জনকে আমি চেহারায় চিনতে পারছি- তাদের পরিচয় জানি না তবে চেহারায় চিনি- এই গেলো আমার bubble. এই মানুষেরাই কিন্তু ঘুরেফিরে আমার ফেইসবুক ফীডে, তাদের পছন্দের গান আমার ইউটিউব প্লেলিস্টে-অবশ্য স্পটিফাই প্লেলিস্ট বলা উচিত বিগ ব্রাদার তাদের সাথে আমার লোকেশন মিলাচ্ছে, ফেসবুক ডে আর ইন্সটার ছবি মিলাচ্ছে আর আমার অনলাইন বাবলে তাদের পাকাপোক্ত করছে।

দুঃখিত অনর্থক প্যাঁচালের জন্য- যা বলতে চাই তাহলো আমি এবং আমরা ক্রমাগত একে অন্যকে patronize করে যাচ্ছি। প্যাট্রোনাইজ করছি গানের চয়েসে, প্যাট্রোনাইজ করছি কোন আর্ট দেখতে হবে তাতে, প্যাট্রোনাইজ করছি কোন সিনেমা ভালো সিনেমা সেটাতে, একই সাথে প্যাট্রোনাইজ করছি কোন খাবারের দোকানে আমাদের যেতে হবে।

যে সত্যটি আপনি অস্বীকার করতে পারেন না- তা হলো অন্তত দশ বছর আগের তুলনায় মানুষ অনেক বেশি Productive হতে চায়; কাজ করতে চায়। সমস্যা হলো এই প্রোডাক্টিভিটির সংজ্ঞা বানাচ্ছেন Urbanite Elite রা। সবচেয়ে বড় সমস্যার কথা হলো এরা সবাই Colonial পুঁজিতান্ত্রিক সমাজের beneficiary. আর পুরো খেলাটা চালিত হচ্ছে regenerative feedback এর মাধ্যমে। দেখুন, আপনার আমার প্রতিষ্ঠানগুলো-সেটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সেটা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, সেটা আইন ব্যবস্থা- এতোটা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে আপনি এখন এসব থেকে মুক্তি পেতে চাইলে আপনাকে ঠিকই কেবলা মুখী অর্থাৎ পশ্চিমেই তাকাতে হয়। ফলে আপনার ভাষা replaced হচ্ছে(আমার নিজের লেখাই সবচেয়ে বড় প্রমাণ), আপনার চিন্তা-কাঠামো replaced হচ্ছে- এবং সাফল্যের যে কর্পোরেট সংজ্ঞা সেটার সাথে মানুষ নিজেকে conform করে নিয়েছে। ফলশ্রুতিতে ঐ মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স জাত লোকজন হয়ে দাঁড়িয়েছে আপনার আদর্শ। তাদের দেয়া ফতোয়া হয়েছে আপনার ওহী।





এ ঘটনার সাথে আপনাকে নিয়ে যাবো অযথা social capital নিয়ে প্যাঁচানোর আলাপে। দেখুন, এই যে আমরা- যারা কিনা মিলিটারি-আমলা জাত দুর্নীতি থেক উদ্ভূত সামাজিক স্ট্যাটাস নিয়ে বাঁচি আমরা কিন্তু একে অপরকে নিয়ে বাবল তৈরি করে একজন আরেকজনের পিঠ চাপড়ে দিচ্ছি। এটা দেখে আমাদের আলোচনার সেই লোকটি যে কিনা সে বাবলে ঢুকতে চায় সে কিন্তু ক্রমাগত reassurance পাচ্ছে, যে, এটাই তার জীবন-প্রথা এবং এদের প্রেস্ক্রিপশনেই তার নিজের জীবন সাজাতে হবে।

এখন আমরা মূল আলোচনায় ঢুকলাম। প্রেস্ক্রিপশনটা দেখতে কেমন? আমাদের আলোচনা এই প্রেস্ক্রিপশন নিয়েই। আর এ আলোচনার সামনের পর্বে আমরা সাহায্য নিবো ওয়াল্টার বেঞ্জামিন এবং প্রখ্যাত ইতালীয় চিন্তক আগামবেন এর আর তার আইডিয়া “Destruction of Experience” এর।




(২)

প্রথম থেকেই আমরা দেখতে চাচ্ছিলাম, মিলিটারি-আমলাদের দেয়া প্রেস্ক্রিপশনের আদলটি দেখতে কেমন? আমি অন্তত বাংলাদেশের যারা আছেন(যেমন, আয়মান সাদিক, সোলায়মান সুখন, ঝংকার মাহবুব ইত্যাদি ইত্যাদি) তাদের প্রেস্ক্রিপশন শুনেছি বেশ অনেকদিন। অভিজ্ঞতা থেকে খানিকটা দায়সারাভাবে বলা যায়, তারা আমাদের বলছেন, যে,


১) জীবনের কোনো মুহূর্তই “অপচয়” করা যাবে না, সময় অনেক মূল্যবান যেহেতু রাস্তায় আপনি জ্যামে আটকা পড়লে সেসময় কোনো না কোনো বই পড়তে থাকবেন, নিদেনপক্ষে Audio-Book শুনবেন।

২) আরো আছে, আপনার জীবন ৩০ পেরুনোর আগেই আপনাকে একটি লিস্ট বানাতে হবে, যেখানে থাকতে পারে আপনি কোন কোন জায়গায় ভ্রমণ করতে চান বা প্রভৃতি!

৩) এবং স্কুল-কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে থাকতে আপনাকে কিছু নির্দিষ্ট Check-list, fulfil করতে হবে। যেমন,


ক) পর্যাপ্ত পরিমাণে “ইভেন্ট অর্গানাইজ” করতে হবে,
খ) কোনো না কোনো ক্লাবে আপনাকে জয়েন করতেই হবে।
গ) “বিজনেস কেইস” কম্পিটিশন, ডিবেট কম্পিটিশনে পার্টিসিপেট করতে হবে এবং হ্যানো-ত্যানো




আমি প্রস্তাব তুলেছিলাম আলোচনায় আমি Giorgio Agamben এর “Destruction of Experience” এর সাহায্য নিবো। সাইডনোটে বলি, বিষয়গতভাবে আগামবেনের Destruction of Experience প্রবন্ধের সাথে আমার বক্তব্যের আপাত মিল নেই, তবে তার এই প্রবন্ধ থেকে আমি উদারভাবে শব্দ ধার করেছি এবং নির্যাসটুকু নেয়ার চেষ্টা করেছি।

প্রথমেই আসুন, আপনি উপরের কাজগুলো কেনো করবেন। করবেন কারণ, আপনার জীবন অনেক মুল্যবান এবং আপনাকে এর প্রতিটি কাজে লাগিয়ে “সফল” হতে হবে।
“সফল” হওয়ার সংজ্ঞা কি?
সংজ্ঞা আপনাকে মিলিটারি-আমলা দল যা বলে দিবে তা-ই।

এখন, এই প্রেসক্রিপশন আপনার বানানো না। ফলে এই প্রেসক্রিপশনের উপর আপনার কোনো অধিকার(authority) নেই। কাজেই এর কোনোরূপ পরিমার্জন বা পরিবর্ধন আপনার করাটা সাজে না, In fact, আপনি পারেনও না। তাতে করে যেটা হয় সেটা হলো পরিস্থিতির দাবি অনুযায়ী যখন, ধরা যাক, আপনার পরীক্ষায় CGPA বেশি তোলা উচিত এবং এজন্য যখন আপনার লেখাপড়া করা উচিত সেখানে আপনি করছেন “Volunteering” যেটার আদতে কার্যকরী “বাজারমূল্য” নেই। ফলে আপনি যখন আপনার নিম্ন একাডেমিক জ্ঞান আর সহস্র স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের(যেগুলো আপনি নৈতিক তাড়না থেকে করেন নি বরং প্রেস্ক্রিপশন মেনে করেছেন) সার্টিফিকেট নিয়ে উপস্থিত হবেন তখন বাজার আপনাকে কিনবে না। কারণ বাজার এতোটা বোকা না, যে, অদক্ষ এক কর্মীকে সে পালবে-পুষবে। এদিকে আপনি প্রেস্ক্রিপশনকে খারিজ করে দিতে পারছেন না কারণ ইতোমধ্যেই এই প্রেস্ক্রিপশন যারা দেয় তারা ক্ষমতাকাঠামোর উপরের লোক, আপনি তাদের মতো হতে চান, তারা আপনার পথের অগ্রযাত্রী- ফলে আপনি তাদের প্রেস্ক্রিপশনকেও খারিজ করতে পারেন না আবার নিজের ব্যর্থতারও হিসেব মিলাতে পারেন না। কারণ প্রেস্ক্রিপশনের জ্ঞান আপনার না- একে সংশোধন এবং প্রশ্ন করার authority আপনার নেই। এবং অস্বীকার করে ছুঁড়ে ফেলতে পারেন না কারণ এটা দিয়েছেন স্বয়ং আপনার গুরুরা তথা আপনি যাদের মতো হতে চান।

এর আরেকটি দিক আছে। দ্বিতীয় দিকটি হলো, “স্বেচ্ছাসেবামূলক” কাজ থেকে যেটুকু মানবিক মূল্যবোধ বা “সমাজকে নগ্ন চোখে দেখার experience” সেটাও আপনার আসে না। কারণ আপনার নিয়তেই তা ছিলো না। ফলে একূল-ওকূল দুকূলই গেলো।

এখন যে Experience এর কথা আমি বলছি বা যে “Experience” শব্দটার দালালি আমি করছি সেটাকে আগামবেন বলছেন, “For experience has its necessary correlation not with knowledge but with authority”.
অর্থাৎ অভিজ্ঞতা আপনার জ্ঞান বৃদ্ধির চেয়ে বেশি যেটা করে সেটা হলো আপনার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।




দেখুন, নোয়াম চমস্কি বা এইধারার সকলে একটা নির্দিষ্ট মানবসত্তায়/মানবপ্রকৃতিতে বিশ্বাস করেন। তারা মনে করেন, মানুষ নিজেকে Worthy প্রমাণ করতে চায়, কাজ করতে চায়। জিনিসটা বোঝাই যায়, যেমন ধরুন, আপনার বন্ধুমহলে যদি কোনো একটা বিশেষ কাজে আপনার পারদর্শীতা থাকে, সে কাজ যদি আপনি ছাড়া কেউই করতে না পারে –তবে এই তৃপ্তিটা মনে হয় কাজ করা বা শেখার কষ্টকে ছাড়িয়ে যায়। ফলে নিজেকে প্রমাণ করতে আপনার একটা মোটিভেশন, ধরে নিলাম, আছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে প্রেস্ক্রিপশন আসছে জনৈক কর্পোরেট নামজাদার কাছ থেকে। তার উদ্দেশ্য পরিষ্কার, আপনি ইঞ্জিনিয়ার একই সাথে স্যুট-টাই পড়ে প্রেজেন্টেশন দিলে তার একজন মার্কেটারের দরকার কম পড়ে। মাসে ৪০ হাজার ধরলে প্রতি বছরে ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা সাশ্রয়। এখানে সমস্যাটা হলো, যখন আপনি “প্রেস্ক্রিপশন” মেনে কাজ করতে যাচ্ছেন তখন সিদ্ধান্তটি আপনার স্বাধীন সিদ্ধান্ত না। এ সিদ্ধান্ত আপনার দশদিক দেখে তারপর নিজের মনে সংশ্লেষ করা না- তাতে করে সিদ্ধান্তের উপর আর আপনার কর্তৃত্ব থাকে না। কর্তৃত্ব চলে যায় ঐ হ্যাপিনেস বিক্রি করে চলা কর্পোরেট ফেরিওয়ালার কাছে। সিদ্ধান্তের আবার কর্তৃত্ব (authority) কি এই প্রশ্ন যারা করছেন তারা আসলে depoliticized আনাড়ি!




কারণ যে মুহূর্তে আপনি আর উৎপাদকের ভূমিকায় নাই, ঠিক সে মুহূর্ত থেকে আপনি তাকে প্রশ্ন করতে পারেন না। কারণ আপনি আর নিজের মালিক না, আপনার মালিক অন্য কেউ।

একটু খোলাসা করি।




ধরুন, একজন বাউল ফকির লালন চর্চা করেন, গান বেঁধে নানা মর্মকথা, বিরুদ্ধমতের রাজনীতি তৈরি করেন। ফলে তিনিই লালনের ধ্বজাধারী। তাই তো?
কিন্তু একদিন সকালে আপনি জানলেন বাংলালিংক এখন থেকে লালন উৎসবের পৃষ্ঠপোষক। তাতে যেটা হয়, বাংলালিংকের লালনের উপর authority প্রতিষ্ঠিত হয়। মনে রাখতে হবে, বাংলালিংক এখানে দান-দক্ষিণা করতে আসে নাই, তার নিজস্ব একটা এজেন্ডা আছে। সে লালনের সেই গান প্রচার করবে যে গানে তার বিক্রিবাট্টা বাড়ে। কিন্তু যে গানে কর্পোরেট পুঁজির এই লোভ-লালসাকে গালি দেয়া হয় সেটাকে সে এড়িয়ে যাবে; ক্ষেত্রবিশেষে প্রকাশ করে “Normalize” করবে যেমনটা করেছে চে’ কে। এখন লালনের উপর বাংলালিংকের authority প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে আপনি তখন লালনের “লোভ-লালসা”কে সামনে আনতে পারবেন না কারণ লালন এখন বাংলালিংকের সম্পত্তি। ওই বিরুদ্ধমতের কথা বলা লালন ফকির না। এটাই হচ্ছে সম্পর্কশাস্ত্র। এবং এরই extrapolation হচ্ছে আপনার নিজের উপর থেকে authority চলে যাওয়া। ফলে আপনি আর আপনি নাই। আপনি এখন হাতের পুতুল।

সহজ ভাষায় চিন্তা করেন। গাইড-বই নিয়ে তুমুল আপত্তির কারণ হলো আপনি তাতে করে গাণিতিক সমস্যা নিজে সমাধান করেন না বরং গাইড দেখে মুখস্থ করে উগলিয়ে আসেন।       




তাতে যেটা হয় আপনার মগজের পুষ্টি সাধন হয় না বরং আপনার চিন্তা করার ক্ষমতা নষ্ট হয়। এখন প্রোডাক্টিভিটি চিন্তা করলে কিন্তু আপনার সমাধান পরীক্ষার খাতায় লিখতে অনেক কম সময় লাগবে মুখস্থ করে গেলে। কিন্তু তাতে নষ্ট হচ্ছে আপনার চিন্তা করার ক্ষমতা, আপনার কোনো সমস্যা নিজে সমাধান করতে পারার আত্মবিশ্বাস। ফলে আপনি হয়ে পড়েন গাইডবই নির্ভর। আমাদের এই উদাহরণে, মোটিভেশনাল স্পিকার নির্ভর। কারণ আপনার সমস্যা সমাধান করতে দরকার পড়ে বহিরাগত এক প্রভাবকের যার সাথে আপনার নেই কোনো প্রত্যক্ষ যোগাযোগ। যার অভিজ্ঞতা, বেড়ে ওঠা, আর্থ-সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত- কোনোভাবেই আপনার সাথে মিলে না। ফলে মিলবে না তার দেয়া প্রেস্ক্রিপশনও (more likely আরকি!)।
এভাবে, গণহারে পরিপ্রেক্ষিতবিহীন মোটিভেশনের আবার আছে সবাইকে একই ছাঁচে ফেলে একই রকম বানিয়ে ফেলার, homogeneous বানানোর আরেক রাজনীতি। সেদিকে আর না-ই বা গেলাম।




এই যে ট্রাফিক জ্যামে বসে অডিও-বুক শুনছেন, সে ট্রাফিক জ্যাম যে মেট্রোরেলের উপজাত তার ভয়াবহতাকে পাশ কাটিয়ে গিয়ে প্রোডাক্টিভ হতে বলার অবশ্যই একটা রাজনৈতিক তর্জমা আছে। কিন্তু তার চেয়ে যেটা বেশি আছে সেটা হলো অডিও-বুক শুনতে মশগুল হওয়া আপনাকে দোয়েল চত্বর থেকে ঢাকা মেডিকেলের বহির্বিভাগের মোড় পর্যন্ত বাঁক নিতে যে একটা লোকসমাগম হয় সেটা চোখের আড়াল করা। তাতে করে আপনি নিজেকে নিয়েই ব্যস্ত থাকেন। আয়েশে চা খেতে খেতে দুজন বন্ধুর অর্থহীন আলাপকে এপ্রিশিয়েট না করে আপনি আপাত অদরকারি অথচ সবচেয়ে দরকারি সামাজিক বুননের অংশ হতে পারেন না।

চমক হাসান ভাইয়ার কাছ থেকে একটা উদাহরণ paraphrase করে ধার করি, তাহলে হয়তো আমার কথা একটু পরিষ্কার হয়। “ধরে নিলাম তোমার দুইজন বন্ধু আছে। তাদের একজনের সাথে তোমার কাজের সম্পর্ক। সে তোমাকে নোটস দেয়, তুমি তাকে নোটস দাও, একসাথে লেখাপড়া করো। আরেকদিকে এমন এক বন্ধু যাকে তোমার খুব একটা দরকারে লাগে না। এক টিফিন ছুটিতে তুমি একলা মন খারাপ করে বসে আছো। এখন তোমার সেই “অকেজো” বন্ধু টিফিন ছুটিতে তোমার মন খারাপের সময় তোমার কাঁধে হাত দিয়ে বলে, “দোস্ত কি হইসে?” সে বন্ধুকে তোমার কেজো বন্ধুর চেয়ে অনেক বেশি আপন বলে মনে হবে”। অর্থাৎ “অদরকারি” কাজ যতো সামাজিক বুনন গাঢ় হবে ততো।

যে দয়াটা আপনাকে কেউ না দেখালেও পারে সে দয়া পেয়ে আপনার মন যতো খুশি হয়, আপনি যার উপকার করেছেন তার দয়া পেয়ে হয়তো আপনি ততোটা খুশি হন না। অর্থাৎ “অদরকারি” কাজেই সামাজিক বুনন দৃঢ় হয়- এটাই আমার দাবি। “পাশের বাসার আন্টি” কেও আমার সামাজিক বুননের একটা অপরিহার্য অংশ বলে মনে হয়। তবে অবশ্যই আমার জেনারেশনের মানুষের “পাশের বাসার আন্টি” নিয়ে অভিজ্ঞতা সুখকর নয় কারণ অর্থনীতির Ceteris paribus বা অন্যান্য অবস্থা এখানে অপরিবর্তিত নেই। “পাশের বাসার আন্টি” যতোটা না দায় থেকে বা authority নিয়ে “নাক গলান” তার চেয়ে বেশি “নাক গলান” প্রতিযোগী মনোভাব থেকে। এর জন্য বাজারে প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়া ইত্যাদিকে দায়ী করতে পারি তবে সেদিকে আর না যাই।

যাই হোক, আলাপে ফিরে আসি। এখন অডিও-বুক শুনতে থাকা আপনি appreciate করতে পারেন না এই যৌথতাকে, আপনি অংশ নিতে পারেন না এই সমগ্রের উদযাপনে, আপনি বরং “অর্থহীনতা”য় মজে থাকা মানুষদের অপদার্থ মনে করেন-কাজেই সমাজ ব্যক্তিকেন্দ্রিক না হয়ে সমাজ-কেন্দ্রিক হবেটাই বা কেনো! কারণ আপনি এসব মানুষদের থেকে নিজেকে আলাদা করতে চান, তাদের vilify করেন, তাদের ন্যুনতম “অনুভব”ও করেন না। ফলে “দূরত্ব বাড়ে যোগাযোগ নিভে যায়”!




এই যে ক্রমাগত নিজের উন্নতি করতে চাওয়ার প্রবণতার আরেকটি মাত্রা হলো এই যে, এটি “অন্য” তৈরি করে মাত্রাছাড়াভাবে। ধরুন বাসে অডিও-বুক শুনছেন জ্যামের কারণে- মনে রাখতে হবে আপনি মনোনিবেশ করছেন নিজেকে তৈরিতে, বসে আছেন বাসের তীব্র গরমে, এক ফেরিওয়ালা উঠলো যার দরদী আহবান আপনার বই শোনার কাজকে হালকা হলেও বিরক্তিকর করছে। এই যে ক্রমাগত কাজ করে যাওয়ার এবং করতে চাওয়ার সর্বক্ষণ সময়ে এ কাজে disruption ঘটানোর লোকও বেড়ে যায় সাধারণ balance of probability বিচার করলে। ফলে যে লোক আপনাকে বিরক্ত করছে তাকে আপনার মনে হয় “অযাচিত”, “অহেতুক” যে আপনাকে “প্রোডাক্টিভ” হতে দিচ্ছে না। ফলে এই “অন্য” তৈরি হয় জ্যামিতিক হারে! ফলে অহেতুক বিতৃষ্ণা এবং সংশ্লিষ্ট অনাসৃষ্টি আপনাকে আর ছাড়তে পারে না। ফলে আবার সমাজ ব্যক্তিকেন্দ্রিক না হয়ে হবেটা আসলে কি! আর কি আশা করেন এ ইঁদুরদৌড় থেকে?

এবার আসেন, আমাদের এই আলাপে যাদের গালমন্দ করছি তাদের লেন্স দিয়ে একটু সালিশ-বিচার করি। এই যে ক্রমাগত প্রোডাক্টিভ থাকার যে দাবি, এ দাবি মানসিক স্বাস্থ্যের পক্ষে হানিকর। সারাক্ষণ যদি এই চাপের মধ্যে থাকেন তাহলে যেটা ঘটবে সেটার জন্য “Fatigue Stress” ছাড়া আর কোনো শব্দ খুঁজে পাচ্ছি না। অর্থাৎ সারাক্ষণ কিছু না কিছু উৎপাদন করে যাওয়ার যে তাগাদা সেটা একেবারেই অমূলক। কেনো অমূলক?




কারণ মানুষ আর যন্ত্রের বিভেদ হলো এই যে, মেশিন লার্নিং করে যন্ত্রকে আপনি রবীন্দ্রনাথের কবিতা লিখাতে গেলে তার জন্য, ধরি, ১০০০ টা রবীন্দ্রনাথের কবিতার ইনপুটের দরকার পড়বে। মানুষের ক্ষেত্রে সাধারণ রীতি এই যে, হয়তো একটা বেদনাবিধুর বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যেয় বসে সে আরো উন্নত সাহিত্য রচনা করতে পারবে। মানুষ Unpredictable-এটাই তার বড় শক্তি। একারণেই সে স্বপ্ন দেখার সাহস পায়, “অসম্ভব” কল্পনা করতে পারে। কিন্তু যন্ত্র বড় প্রেডিক্টেবল।
আপনি জানেন, কতোটুকু গমে কতোটুকু আটা আসবে। ফলে যন্ত্র নিয়ে আপনার উচ্চাশা থাকে না। এখন এটুকু ব্যাপার মাথায় রাখলে খেয়াল করে দেখুন, যে বিদ্যা বা যে জ্ঞানকে আপনি “অপ্রয়োজনীয়” মনে করছেন সেটা আর ১ বছর পরে অদরকারি না-ও হতে পারে। ফলে আপনি হয়তো তক্ষুণি কিছুই produce করতে পারলেন না কিন্তু সুদে-আসলে হয়তো produce করে দিলেন ১ বছর পর। এখন এই ১ বছরের ধৈর্য আপনাকে ধারণ করতে হবে। কিন্তু সারাক্ষণ প্রোডাক্টিভ থাকা মানুষ হাঁসফাঁস করতে থাকে তার আউটপুট নিয়ে। ফলে ভুগতে থাকে হীনমন্ম্যতায় এবং বিষাদে এবং কমে যায় অতি-আরাধ্য “Productivity”!

কাজেই যে আপনাকে দিয়ে হয়তো এক বছর পরে অসাধারণ কিছু হতো সে আপনি না পারলেন সেটা করতে, না পারলেন এখনকার সময় আফসোস না করে ভালোভাবে বেঁচে কিছু শিখতে/জানতে। আবারও একূল-ওকূল-দুকূল চলে যাওয়া ফ্রেমওয়ার্ক দিয়ে আপনাকে ব্যাখ্যা করা হলো!

তাছাড়া আরেকভাবে ভাবলে এই সবসময় কিছু না কিছু করতে হবে যেটা presuppose করে নেয় সেটা হলো আপনার অনেক ঘাটতি যেটা আপনাকে পূরণ করতে হবে। এটা তৈরি করে sense of not being worthy, sense of underachievement- ফলে তৈরি হয় আত্মবিশ্বাসের অভাব, তা থেকে স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যর্থতা। এবং ঠিক এই কারণে, ঠিক এই কারণেই আপনার উপর অন্যের খবরদারি করা সহজ হয়- সে খবরদারি আসে এরকম কর্পোরেট প্রেস্ক্রিপশন ধরিয়ে দেয়ার মাধ্যমে- কর্পোরেট প্রতিভূ বলে আপনি যথেষ্ট নন। ফলে আপনার আত্মবিশ্বাস কম দেখে সে প্রেস্ক্রিপশন আপনি বিশ্বাস করেন ফলে অবতারণা ঘটে আরেকটি “দারিদ্র্যের দুষ্ট চক্রের”।

কাজেই আমার প্রস্তাবনা হলো এই যে, আপনার চেতনার রঙে পান্না হোক সবুজ, চুনি উঠুক রাঙা হয়ে, আপনি চোখ মেললেই যেনো পুব-পশ্চিম আলোকিত হয়-তার আগে নয়!

উদারভাবে সাহায্য নিয়েছিঃ
১। Infancy and History: An essay on the Destruction of Experience by Giorgio Agamben(প্রথম অধ্যায়)
২। বলিউড তারকারা জীবিত নয়, মৃত- অরূপ রাহী
৩। Noam Chomsky: What We Really Want: https://www.youtube.com/watch?v=3CFwSQiTu3I&t=1s

লেখক: রিয়াসাত মোর্শেদ
পড়ছেন নৌযন্ত্রকৌশলে।শহুরে সন্ধ্যায় বন্দরে রুমাল নেড়ে জাহাজ তাড়ানোর দায়িত্ব নেয়ার পাশাপাশি ইতিউতি খুঁজে ফিরছেন