ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ: একটি রক্তাক্ত ইতিহাসের কারণ - লিখেছেন - আহনাফ শাহরিয়ার




বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ। পৃথিবী ধ্বংসস্তূপ। কারণ, মানব ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ মাত্রই সমাপ্ত। বিশ্বমায়ের বুক খণ্ডবিখণ্ড করে এবং তার সন্তানদের হাহাকারের মধ্য দিয়ে ১৯৪৫ সালে শেষ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।

     
এ যুদ্ধে প্রায় ৫ কোটি থেকে সাড়ে ৮ কোটি মানুষ মৃত্যুবরণ করে। যা বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক এবং কিছু দেশের জনসংখ্যার চেয়েও অধিক। বিশ্বের ৬১ টি দেশ এ যুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত ছিল। প্রায় ১০ কোটিরও বেশি সামরিক সেনা এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধ শেষে একমাত্র ইউরোপেই ৪০ মিলিয়নেরও অধিক লোক শরণার্থী ছিল।
             
কী ছিল এই যুদ্ধের কারণ? কেন এ যুদ্ধটি সংঘটিত হলো?

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণ গুলো নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক হয়েছে এবং হচ্ছে। এ যুদ্ধের কারণ গুলো এতটাই বিস্তৃত ও বিচিত্র যে, তার সবগুলো কারণ এখনো নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব না। তাই কিছু গুরুত্বপূর্ণ কারণ সম্পর্কে জানা যাক।  



(১) জার্মানির উগ্র জাতীয়তাবাদ


জার্মানির  উগ্র জাতীয়তাবাদ মোটামুটি ১৯২৪ সালের দিকে অর্থনৈতিক মন্দার কারণে সৃষ্টি হয়।প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী জার্মানিতে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট ছিল নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত। এসময়ই হিটলার তার নাৎসি পার্টির উদ্ভব ঘটান। জার্মানির রাজনীতিতে উগ্র জাতীয়তাবাদের একচ্ছত্র একটি কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয় একনায়ক এডলফ হিটলারের হাত ধরে। ১৯৩২ সালের নির্বাচনে ৬০৮ টি আসনের মধ্যে ২০৮ টি আসন লাভ করে হিটলারের নাৎসি পার্টি। এতে তারা একক বৃহত্তম দলে পরিণত হয় এবং ১৯৩৩ সালের ৩০ জানুয়ারি জার্মানির প্রেসিডেন্ট পল ভন হিন্ডেনবার্গ, হিটলারকে চ্যান্সেলর পদ দেন।পরবর্তীতে তৎকালীন প্রেসিডেন্টের ব্যর্থতায় জার্মানিতে জরুরি অবস্থা জারি,কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ সহ একটি অরাজকতার পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।    






১৯৩৪ সালের ২রা আগস্ট,প্রেসিডেন্টে হিন্ডেনবার্গের মৃত্যুতে হিটলার চ্যান্সেলর ও প্রেসিডেন্ট দুটো পদই দখল করে নেন এবং নিজেকে "ফিউরার" হিসেবে ঘোষণা দেন। ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পর হিটলার একনায়কতন্ত্রের ও ফ্যাসিবাদের আশ্রয়ে  "জার্মানরা যে শ্রেষ্ঠ জাতি" এরূপ একটি ধারণা প্রতিষ্ঠা এবং ১ম বিশ্বযুদ্ধের হারানো সম্মান ফিরে পেতে উগ্র জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটান। প্রাথমিকভাবে উগ্র জাতীয়তাবাদের কারণেই পরবর্তীতে ১৯৩৯ সালের ১লা সেপ্টেম্বর পোল্যান্ড আক্রমণ হয়।    
 




 

(২) শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর সাম্রাজ্যবাদী নীতি 

১ম বিশ্বযুদ্ধের পর বিজয়ী দেশগুলো-ব্রিটেন, ফ্রান্স,যুক্তরাষ্ট্র  সাম্রাজ্যবাদ নীতি অর্থাৎ উপনিবেশ নীতি চালু করে বিভিন্ন দেশকে নিজেদের অধীনে আনতে শুরু করে। ফলে অক্ষশক্তির দেশগুলো-জার্মানি, ইতালি ,জাপানও এই ঔপনিবেশিক নীতি গ্রহণ করে পাল্টা বিভিন্ন দেশে উপনিবেশ স্থাপন শুরু করে। এতে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি উপনিবেশ স্থাপনের ফলে সাংঘর্ষিক বিরোধের সৃষ্টি হয়।
এছাড়াও ১ম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির উপনিবেশগুলো পশ্চিম ইউরোপিয়ানরা ভাগাভাগি করে নিয়েছিল। তাই জার্মানিও উগ্র জাতীয়তাবাদের অর্থাৎ ফ্যাসিবাদের মাধ্যমে হারানো উপনিবেশ ফিরে পেতে সচেষ্ট হয়েছিল।যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সরাসরি প্রভাব ফেলেছিল।    



(৩) ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক সংকট

১ম বিশ্বযুদ্ধের পর ক্রমাগত অনেকগুলো সাংঘর্ষিক রাজনীতিক ঘটনার ফলাফল হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। যেমন-১৯৩০ সালে জাপান চীনের মাঞ্চুরিয়া দখল করে নেয়। ১৯৩৭ সালে তারা চূড়ান্তভাবে চীন আক্রমণ করে। তাদের মূল লক্ষ্য ছিল সমগ্র চীন দখল।জাপানের অকস্মাৎ আক্রমণের জন্য চীনের মিত্রদেশগুলো ক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে থাকে।  




এছাড়াও ১৯৩৬ সালে জার্মানি "ভার্সাই চুক্তি" অমান্য করে রাইন অঞ্চল এ সামরিক প্রস্তুতি নেয়া শুরু করে।আবার ১৯৩৫ সালে ইথিওপিয়া ও ১৯৩৬ সালে আলবেনিয়া আক্রমণ করে দখলে নেয়। ফলে বিনা কারনে একের পর এক দেশ দখলে শক্তিশালী দেশগুলো ক্ষুব্ধ ও চিন্তিত হয়ে উঠতে শুরু করে।    



(৪) ফ্যাসিস্ট শক্তির উত্থান

'ফ্যাসিজম' বা 'ফ্যাসিবাদ' কথাটি এসেছে ল্যাটিন ভাষা থেকে। "ফ্যাসি" অর্থ ঐক্য, দল বা শক্তি। ফ্যাসিবাদ সমাজতন্ত্র, সাম্যবাদ, ডানপন্থী রক্ষনশীল ও গণতন্ত্রের বিরোধী। ফ্যাসিবাদে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অন্য দেশ ও সংস্কৃতিকে অশ্রদ্ধা করা হয় এবং নিজ জাতি এবং সংস্কৃতিকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে ধরা হয়। ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী জনগণের সামনে সোনালী অতীতের গল্প হাজির করে এবং জাতিকে সেই সোনালী অতীতের মতো উজ্জ্বল ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখায়।
ফ্যাসিবাদের জন্ম ইতালিতে। এর জনক ধরা হয়, বেনিতো আমিল্কারে আন্দ্রেয়া মুসোলিনিকে। ১৯২২ সালে মুসোলিনির ক্ষমতা দখল ও ১৯৩৪ সালে হিটলারের ক্ষমতা দখলে ফ্যাসিস্ট শক্তি বৃহৎ আকার ধারণ করে।এতে ইউরোপের দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়েছিল।    


(৫)ফ্যাসিস্ট তোষণনীতি 


জার্মানি ও ইতালিতে ফ্যাসিবাদ ও একনায়কতন্ত্র শক্ত অবস্থানে চলে গেলে এডলফ হিটলার ও বেনিতো মুসোলিনি একই সাথে বিভিন্ন দেশের সাথে চুক্তি করতে লাগলেন, ফ্যাসিবাদের ধারণা ইউরোপে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য। যা সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলো- যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেনের উপনিবেশ নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়।  



 
(৬) একনায়কতন্ত্র ও গণতন্ত্রের আদর্শগত দ্বন্দ্ব

১ম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মিত্রশক্তির যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স ইত্যাদি রাষ্ট্রগুলো গণতন্ত্রের দিকে ঝুঁকতে থাকে। অন্যদিকে, অক্ষশক্তির জার্মানি, ইতালি একনায়কতন্ত্রে বিশ্বাসী ছিল। ফলে অক্ষশক্তির দেশগুলো তাদের উপনিবেশ গড়তে থাকে একনায়কতন্ত্রের ভিত্তিতে এবং মিত্রশক্তির দেশগুলোর উপনিবেশ গুলো পরিচালিত হতো গণতন্ত্রের ভিত্তিতে। এতে দুই পক্ষের উপনিবেশ গুলোর মধ্যে ব্যাপক আদর্শগত দ্বন্দ্বের দেখা দেয় এবং পাল্টাপাল্টি কয়েক বছর পর্যন্ত স্নায়ুযুদ্ধের মতো ঘটনা ঘটতে থাকে।



(৭) স্পেনের গৃহযুদ্ধ

 ১৯৩৬ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে স্পেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ছিল চরম উত্তপ্ত এবং দেশটিতে গৃহযুদ্ধ চলমান ছিল।ফলে অভ্যন্তরীণ অরাজকতায় পশ্চিম ইউরোপের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো এর অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করা শুরু করে। কারণ, এসময় তৎকালীন় শক্তিশালী দেশগুলো লক্ষ্য ছিল- উত্তপ্ত অভ্যন্তরীণ অবস্থাকে কাজে লাগিয়ে স্পেনে উপনিবেশ স্থাপন। অক্ষশক্তি ও মিত্র শক্তি উভয়পক্ষই জড়িয়ে পড়ে স্পেন দখলের চেষ্টায়। এ গৃহযুদ্ধে প্রায় ৩ লক্ষ থেকে ৫ লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়।  



(৮) ফ্যাসিস্ট শক্তিগুলোর আগ্রাসন

১৯৩৯ সালের ২২ মে জার্মানি ও ইতালি একটি জোট গঠন করে। যা "প্যাক্ট অফ স্টিল" নামে পরিচিত। ইতিমধ্যেই ইতালি আবিসিনিয়া,আলবেনিয়া ও ইথিওপিয়া  দখল করে নিয়েছিল। জাপান ১৯৩০ থেকে ক্রমাগত চীন আক্রমণের মাধ্যমে চীনকে কোনঠাসা করে রেখেছিল। অন্যদিকে ১৯৩৮ সালের ১লা মার্চ থেকে ১৪ মার্চের মধ্যে হিটলার অস্ট্রিয়া দখল সম্পন্ন করেন।
আবার ১৯৩৯ সালের মার্চ মাসে জার্মানি চেকোস্লোভাকিয়া দখল করে এবং ২০ মার্চ লিথুয়ানিয়াকে আল্টিমেটাম দেয়।এই তিনটি দেশ বাদে হাঙ্গেরির আবির্ভাব ঘটে ১৯৩৯ সালের ১৮ মার্চ ইউক্রেন দখলের মাধ্যমে।    



(৯) কমিউটার্ন বিরোধী ঐক্য ও অক্ষশক্তির সৃষ্টি 


 জার্মানি, ইতালি, জাপান এই তিনটি রাষ্ট্র ১৯৪০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে সামরিক জোট গঠন করে। যার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে অক্ষশক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়।
পরবর্তীতে কমিউনিজমের বিরোধী রাষ্ট্রগুলোকে অক্ষশক্তি অন্তর্ভুক্ত করা হয়।১৯৪০ সালের ২০ শে নভেম্বর হাঙ্গেরি, ২৩ নভেম্বর রোমানিয়া, ২৪ নভেম্বর স্লোভাকিয়া ও ১লা মার্চ বুলগেরিয়া অক্ষশক্তিতে যোগ দেয়।



(১০) মস্কো-বার্লিন অনাক্রমণ চুক্তি 


আজন্ম শত্রু কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়ন ও নাৎসি জার্মানির মধ্যে কোন চুক্তি হতে পারে, তা মিত্রশক্তির দেশগুলো কখনো আশা করেনি। অথচ ১৯৩৯ সালের ২৩ আগস্ট জার্মান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভন রিভেনট্রপ ও রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভিয়েসলাভ মলোতভ রুশ-জার্মান অনাক্রমণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।    




এই চুক্তিটি তৎকালীন বিশ্ব-রাজনীতির মোর ঘুরিয়ে দিয়েছিল। এতে জার্মানির পথ পরিষ্কার হয়ে যায়।কারণ, জার্মানির পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী পোল্যান্ড আক্রমণে একমাত্র বাধা হতে পারতো সোভিয়েত ইউনিয়ন।তাই যা হওয়ার তাই হলো। ১৯৩৯ সালের ১লা সেপ্টেম্বর জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করে এবং ৩রা সেপ্টম্বর মিত্রশক্তি এ অন্যায় আক্রমণের প্রতিবাদ জানিয়ে জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। শুরু হয়ে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। একটি রক্তাক্ত ইতিহাসের শুরু।  

এছাড়াও লীগ অফ নেশনস এর ব্যর্থতা, ভার্সাই চুক্তির ব্যর্থতা ইত্যাদি বিষয়গুলোও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম কারণ।    

লেখক:আহনাফ শাহরিয়ার

আমি আহনাফ শাহরিয়ার, পড়ছি খিলগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। নিভৃতচারী সাধারণ এবং বিশেষত্বহীন একজন মানুষ হিসেবে জীবনে কাজ করে যেতে চাই সবসময়।