ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

বরেন্দ্রভূম থেকে জাহাঙ্গীরনগরঃ বাংলার চিত্রকলার ইতিহাস (৩য় পর্ব) - লিখেছেন - সাজিদ উল হক আবির

১. বিষ্ণুপুরের পাটাচিত্রঃ


চিত্রঃ দশাবতার তাস


তৎকালীন বিষ্ণুপুর, তথা বর্তমানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া ছিল সারা সপ্তদশ শতক জুড়ে বৈষ্ণব ধর্ম্যাশ্রিত সাহিত্য-সঙ্গীত-মন্দির-স্থাপত্য ও চিত্রকলার কেন্দ্রবিন্দু। ষোড়শ শতকের শেষ দিকের একটি ঘটনা তৎকালীন বাংলার শিল্প সাহিত্যের চর্চার কেন্দ্রে বিষ্ণুপুরকে নিয়ে আসে।


ঘটনাটি এরকম যে- বৃন্দাবন থেকে শ্রীজীব গোস্বামীর কাছ থেকে শাস্ত্র সম্বন্ধীয় জ্ঞান এবং গোপাল ভট্টের কাছ থেকে দীক্ষা নিয়ে সঙ্গীসাথী সহ বাংলায় ফিরছিলেন শ্রীনিবাস আচার্য। দুর্গম জঙ্গল পেরিয়ে গাড়ি যখন বনবিষ্ণুপুরে পৌঁছায় তখনি তারা দস্যুদল দ্বারা আক্রান্ত হন। তাদের সাথে ছিল এক গাড়ি শাস্ত্রগ্রন্থ কেবল। দস্যুরা সেই বৈষ্ণবগ্রন্থাদিকেই ধনসম্পদ মনে করে লুঠ করে নেয়। লুণ্ঠিত গ্রন্থ উদ্ধারের আশায় তখন আচার্য গিয়ে হাজির হন বনবিষ্ণুপুরের মল্লরাজা বীর হাম্বিরের রাজসভায়। হাম্বির তার সাথে কথা বলে, তার ধর্মদর্শনে আকৃষ্ট ও ভাবান্তরিত হয়ে সপরিবারে শ্রীনিবাস আচার্যের কাছে দীক্ষা নেন। এই দীক্ষায় একই সাথে পুরো বিষ্ণুপুরের এবং বিষ্ণুপুর হয়ে পুরো বাংলার সাংস্কৃতিক জীবনে রূপান্তর দেখা যায়। হাম্বির এবং তার পরবর্তী বংশধরেরা বৈষ্ণব শিল্প সাহিত্যের চর্চা অব্যাহত এবং ছড়িয়ে দেবার কাজে নিয়োজিত হন।

বিষ্ণুপুরের চিত্রকলাতে তাই বাংলার নিজস্ব রুচি ও রূপবোধের সুস্পষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। বিষ্ণুপুর রূপকলার শ্রেষ্ঠ যে নিদর্শন প্রকৃতি ও মানুষের হাত থেকে রক্ষা পেয়ে কোনক্রমে আমাদের হাতে এসে পৌঁছেছে তা হল বিষ্ণুপুরের পাটাচিত্র। চিত্রিত এই পাটা বা কাঠের ফলকগুলি ব্যবহৃত হত পুঁথির ওপরে ও নীচে, ফলক হিসেবে। আর পাটায় অঙ্কিত চিত্রের বিষয়বস্তুও পাল রাজাদের আমলের মতই- সমকালীন ধর্মীয় বিশ্বাস।

বিষ্ণুপুরের পাটাচিত্রে অঙ্কিত চিত্রগুলি পাল আমলের পুঁথিচিত্রের এবং মধ্যযুগের বঙ্গীয় চিত্রকলার বৈশিষ্ট্য বহন করে। উদাহরণস্বরূপ- বিষ্ণুপুরে অঙ্কিত পাটাগুলির মধ্যে সবচে প্রাচীনতম পাটা (বিষ্ণুপুরাণ পাণ্ডুলিপির পাটা, ১৪৯৯ খ্রিষ্টাব্দে অঙ্কিত) টিকে যদি উদাহরণ হিসেবে ধরা যায়, তবে দেখা যায় যে তাতে বামন থেকে কল্কি অবতার পর্যন্ত বিষ্ণুর যে ছ'টি অবতারকে অঙ্কিত করা হয়েছে তা দ্বিমাত্রিক রীতিতে তির্যক রেখায় আঁকা, তাদের পোশাক, রেখার কৌণিকতা এবং চিবুকের জোড় থেকে মধ্যযুগীয় চিত্ররীতির স্পষ্ট ছাপ বিদ্যমান। আবার রেখা ও বর্ণের মণ্ডনগুণহীনতার বিচারে চিত্রটি পালযুগের পুঁথিচিত্রের অবক্ষয়িত রূপের বিক্ষিপ্ত পরিচয় বহন করে।


  

চিত্রঃ শ্রীকৃষ্ণের মথুরাযাত্রা


বিষ্ণুপুরের পাটার মূলত দুটি রূপ দেখতে পাওয়া যায়। এক ধরনের পাটা মূলত সরলরেখা ও নকশার পারের ভেতর নানান অলঙ্করনে চিত্রিত। এগুলিতে কোন প্রাণীর অবয়ব নেই। দ্বিতীয় ধরনের পাটায় অঙ্কিত হয়েছে বৈষ্ণবধর্মের নানান বিষয়- বিষ্ণুর দশাবতার, কৃষ্ণলীলা ও চৈতন্যজীবন। বিষয়ের গুরুত্বে আর বর্ণনার মাহত্ত্বে এই দ্বিতীয় দলের ছবিকেই এগিয়ে রাখতে হয়। গুণগত বিচারে প্রথমে উল্লেখ করতে হয় যে ছবিটি, সেটি হল -১৬৫৩ সালে আঁকা 'শ্রীকৃষ্ণের মথুরা যাত্রা'। ঘটনার ঘনঘটায় দারুণ নাটকীয় এই ছবিটিতে একাধারে চরিত্রগুলি যেমন প্রাণবন্ত, একইভাবে চিত্রপটের রূপবিন্যাসও সুসংহত। দ্বিমাত্রিক ছবি হয়েও ত্রিমাত্রিক ছবির একটি উপলব্ধি এনে দেয় ছবিটি। গাড় লাল রঙের পটভূমিতে ভিন্ন ভিন্ন রঙের মনুষ্যরূপ এবং সবুজের নানা বর্ণক্রম ছবিটিতে এনে দিয়েছে বিস্তৃতি ও গভীরতা। এরকম আরও কিছু উল্লেখযোগ্য পাটাচিত্র হল- শ্রীচৈতন্যদেবের সাথে ওড়িশার রাজা রুদ্রপ্রতাপের প্রথম পরিচয়; মল্লরাজা বীর হাম্বীরের সভায় উপস্থিত শ্রীনিবাস আচার্য; বেশকিছু রাসলীলাচিত্র; রক্তচক্ষু, অস্ত্রধারিণী, ভীষণদর্শনা কালী; ডমরু বাজিয়ে, শিঙ্গা ফুঁকে, নিজ বাহন নন্দীর পীঠে চড়ে ঘরে ফেরা মহাদেব ইত্যাদি।

পাল পুঁথিচিত্র ও মধ্যযুগের পূর্ববঙ্গের ছবির বৈশিষ্ট্য তো বিষ্ণুপুরের পাটাচিত্রে দেখা যায়ই, কোন কোন শিল্প ঐতিহাসিক এই পাটাচিত্রের অঙ্কনশৈলীতে নিকটবর্তী ওড়িশার, বিশেষ করে জগন্নাথধাম পুরীর চিত্রশৈলীর সম্ভাব্য প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছেন।

বিষ্ণুপুর পাটাচিত্রের এই নিদর্শনগুলি সংরক্ষিত আছে আশুতোষ সংগ্রহশালা, আচার্য যোগেশচন্দ্র পুরাকীর্তি ভবন, ঢাকা মিউজিয়াম এবং বিশ্বভারতীর কলাভবনে।


 

চিত্রঃ দশাবতার তাস


পুঁথির প্রচলন লুপ্ত হবার সঙ্গেসঙ্গেই পাটাচিত্রের ধারা স্বাভাবিকভাবে রুদ্ধ হয়ে আসে। তবুও, বিষ্ণুপুরের শিল্পীরা তাদের শিল্পকর্ম বহুলাংশে রক্ষা করে চলেন 'দশাবতার তাস' এঁকে এঁকে। বৃত্তাকার দশাবতার তাসের খেলা বহুকাল থেকে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রচলিত ছিল। আবুল ফজলের গ্রন্থ আইন ই আকবরী পাঠ করলে জানা যায় যে সম্রাট আকবরও এই খেলার প্রতি বিশেষভাবে আকৃষ্ট ছিলেন। চিত্রকর্ম হিসেবে বিষ্ণুপুরের তাস দুটি বৈশিষ্ট্যের জন্যে পরিচিত। এক, তার বর্ণাঢ্যতা; দুই, তার রেখাকর্মের দ্রুত সঞ্চালনজাত বলিষ্ঠ প্রবাহমানতা। তাসের একদিকে থাকতো বিষ্ণু বা তার কোন অবতার অথবা তার কোন বাহনের ছবি, অন্যপীঠ হিঙ্গুলের রক্তবর্ণে রঞ্জিত থাকতো। বিষ্ণুপুরের এই দশাবতার তাস আঁকা এখনও ক্ষীণধারায় বহমান আছে। কিন্তু পাটাচিত্রের উন্নতমানের ছবি আঁকার শিল্পী আজ আর নেই।

                                         

২. মুর্শিদাবাদ শৈলী

ভারতীয় চিত্রকলার ইতিহাসে বিশাল একটা অংশ জুড়ে আছে মুঘল চিত্রকলা। সম্রাট আকবরের পৃষ্ঠপোষকতায় যার বিকাশ, জাহাঙ্গীরের যত্নে যার চরম উন্নতি, শাহজাহানের অন্যমনস্কতায় যার অবনতি আর ঔরঙ্গজেবের অনাগ্রহে যার বিপর্যয়- সেই মুঘল চিত্রকলা পৃথিবীর মিনিয়েচার চিত্রের এক পরম সম্পদ। বাদশাহি বদান্যতা এবং হিন্দু-পারসিক শিল্পীদের মিলিত উদ্যমে এই চিত্রকলা বিষয়বস্তু নির্বাচন ও বিনির্মাণে ছিল ধর্মনিরপেক্ষ ও বাস্তবানুগ, অলংকরনে ছিল বর্ণাঢ্য ও অতি উন্নত মানের রুচিশীলতার পরিচায়ক। এই মহান শিল্পশৈলী সম্রাট ঔরঙ্গজেবের রক্ষণশীল ধর্মীয় মনোভাব এবং মিতব্যায়িতার জন্যে সম্মুখীন হয় মহা বিপর্যয়ের। এতদিনের নিশ্চিত পৃষ্ঠপোষকতা হারিয়ে অসহায় মুঘল চিত্রকরেরা ছড়িয়ে পড়ে নানা দিকে। তাদের কেউ আশ্রয় পায় উত্তর ভারতের পাহাড়ি রাজ্যগুলিতে, কেউ অযোধ্যার লখনউতে, একদল চিত্রকর এলেন বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদে। যারা দিল্লীতে থেকে গেলেন তারা সস্তাদরে নিম্নমানের ছবি বেঁচে পেটের দায়ে পরিণত হলেন বাজারে শিল্পীতে।

বাংলার মসনদে তখন নবাব মুর্শিদকুলী খাঁ (১৭০০-১৭২৭)। তিনিও সম্রাট ঔরঙ্গজেবের মতই গোঁড়া সুন্নি মুসলিম। তার কাছে শিল্প-শিল্পীর বিশেষ কদর ছিল না, তবুও কিছু কিছু মৌসুম ছিল যার উৎযাপনের নিমিত্তে দেখা যেত মুঘল সালতানাত থেকে ছুটে আসা ঐসকল শিল্পীরা কাজ পেয়ে যেতেন। তন্মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মুহররম উৎযাপন আর খাজা খিজির উৎসব। এই দিনগুলিতে বহু অর্থ ব্যয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন করতেন নবাব মুর্শিদকুলী খাঁ। ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে সকলকে আমন্ত্রন জানাতেন ভোজে। সারা মুর্শিদাবাদ শহর, এমনকি ভাগীরথী নদীর পশ্চিম পাঁড় পর্যন্ত ঝলমল করে উঠত উজ্জ্বল আলোকসজ্জায়। মুঘল সাম্রাজ্য থেকে জীবিকার আশায় ছুটে আসা এই চিত্রকরেরা নিয়োজিত হতেন আলোকসজ্জার নিমিত্তে লাগানো লন্ঠন চিত্রণে। কোরআন শরীফের উদ্ধৃতি, মসজিদ, লতাবৃক্ষ ও অন্যান্য নকশায় অঙ্কিত হত অভ্রফলকের লন্ঠনগুলি।

প্রকৃতঅর্থে মুর্শিদাবাদ কলমের বিকাশ ঘটে সম্রাট মুর্শিদকুলী খাঁর পরে, আলীবর্দি খাঁ ১৭৪০ সালে বাংলার মসনদে আসীন হলে। আলীবর্দি খাঁ তার রাজত্বকালের প্রথম দশ বছর কাটান  মারাঠা বর্গীদের সাথে যুদ্ধ করে করে বাংলা - বিহার - উড়িষ্যার তখতে নিজের দখল সুসংহত করার করণকৌশলে। তার শাসনের শেষ সাত বছর - ১৭৫০ থেকে নিয়ে ১৭৫৭ সাল ছিল মুর্শিদাবাদ কলমের সবচে ফলপ্রসূ সময়।

আলীবর্দি খাঁ ছিলেন যোদ্ধা, সুশাসক এবং সৎচরিত্রবান একজন ব্যক্তি। বাংলার এক নিদারুণ অবক্ষয়ের সময়েও তিনি ইতিহাসে ছাপ রেখে গেছেন গভীর ভাবে। তার ছিল না নাচেগানে আগ্রহ, কোন হেরেমও পোষণ করতেন না তিনি, তবে চিত্রকলার প্রতি তার আগ্রহ ছিল গভীর। কেননা শিল্পীদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার পরিমাপ করা যায় সহজেই, স্বয়ং আলীবর্দি খাঁ কে উপজীব্য করে অঙ্কিত মুর্শিদাবাদ কলামের কিছু অনন্য চিত্রকলায়।


চিত্রঃ নবাব আলীবর্দি খাঁ শিকারে মগ্ন


প্রথম ছবিটি ১৭৫০ খ্রিষ্টাব্দে আঁকা। এখানে দেখা যাচ্ছে- ঘোড়ায় চড়ে নবাব আলীবর্দি খাঁ নদীর খাঁড়িতে প্রাণভয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া এক হরিণের শিকারে মগ্ন। নবাবের বলিষ্ঠ দেহ, রুচিসম্মত পোশাক, ঘোড়ার তেজোদৃপ্ত ভঙ্গী - সব মিলিয়ে ছবিটি নবাবের শৌর্য- সামরথের পরিচায়ক। দুরন্তে বিস্তৃত নদী, ধূসর বেলাভুমি এবং দিগন্ত জোড়া আকাশ ছবিতে সংযোজন করে প্রয়োজনীয় গাম্ভীর্যের।


চিত্রঃ নবাব আলীবর্দি খাঁর দরবার


আরেকটি ছবিতে বিধৃত হয়েছে সম্রাট আলীবর্দি খাঁর সুনিয়মতান্ত্রিক জীবন। সূর্যোদয়ের দু' ঘণ্টা আগে উঠে প্রাতঃকৃত্য ও প্রার্থনা সেরে, কফি পান করে দরবারে বসতেন তিনি। সেই দরবার চলতো দুই ঘণ্টা ধরে। তারপর তিনি বিশ্রামে যেতেন। বিশ্রামের সময় তার সঙ্গী হতেন স্বজন ও বিশিষ্ট বন্ধুদের কেউ কেউ। এমনি একটা ছবি, ঐতিহাসিক গোলাম হোসেনের বর্ণনায় উঠে আসে, যেখানে নবাবকে আমরা দেখতে পাই প্রাচীর বিশিষ্ট খোলাছাদে জাজিমের অপর আসীন হয়ে বসা অবস্থায়; পেছনে দুই পরিচারক; পাশে দুই ভ্রাতুষ্পুত্র এবং সম্মুখে আরেক ভ্রাতুষ্পুত্র সহ দৌহিত্র সিরাজদ্দউলা। জ্যামিতিক শৃঙ্খলার ভিত্তিতে অঙ্কিত এই ছবি নবাবের জীবনধারার ও সমুন্নত রুচির পরিচয় দেয়। ছবিটিও আঙ্গিকে এবং রুপায়নে মুর্শিদাবাদ কলামের সুসংযত বলিষ্ঠ চরিত্রটি সবিশেষে ফুটিয়ে তুলেছে।


  

চিত্রঃ রাগমালা সিরিজ (রাগ দীপক)


আলীবর্দি খাঁর শেষ দিকে দরবারে বিশেষভাবে প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন তার দৌহিত্র বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দউলা। তিনি ছিলেন দাদুর প্রশ্রয়ে লালিত বিলাসী যুবক। তার স্বভাবও ছিল একই রূপ কমনীয় ও লাস্যপ্রিয়। আলীবর্দি খাঁ নাচগান পছন্দ করতেন না, ছিলেন একপত্নীক পুরুষ। স্বভাবে ঠিক তার বিপরীত মেরুতেই বাস করতেন সিরাজদ্দৌলা। ফলশ্রুতিতে তার দরবারের আঁকিয়েরা যে বিষয়বস্তু চয়নেও পাবেন বিশেষ ছাড়- সে ছিল সহজে অনুমেয়। বলা চলে, সিরাজদ্দউলার স্বভাব-মর্জির ফলে মুর্শিদাবাদের মসনদে যে বিপর্যয়ই আসুক না কেন, তার শৈলীতে দেখা গেল বৈচিত্র ও সজীবতা। নবাব সিরাজদ্দউলার আমলে অঙ্কিত হল মুর্শিদাবাদ শৈলীর অপরূপতম সিরিজ চিত্রকর্ম- রাগমালা। ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একেকটি রাগের চরিত্রের অপর ভিত্তি করে চিত্রকরেরা আঁকলেন একটির পর একটি ছবি। তার কোন কোনটিতে স্বয়ং নবাব সিরাজদ্দউলাই আবির্ভূত হলেন নায়কের চরিত্রে। সিরাজ, বাস্তবিকই এত সুন্দর ছিলেন যে তার নিন্দুক ঐতিহাসিকেরাও তা স্বীকার না করে পারে নি।

 চিত্রঃ রাগমালা সিরিজ


রাগমালা সিরিজের ছবিগুলির রুপবিন্যাসে যেমন দেখা দিল নতুন উদ্ভাবন, রূপ নির্মিতিতেও ফুটে উঠলো মুর্শিদাবাদ শৈলীর নিজস্বতা। জ্যামিতিক বিন্যাসকে নানাভাবে ভেঙ্গেচুরে, এমনকি বর্জন করে শিল্পীরা চিত্রপটে আনলেন স্বতঃস্ফূর্ততা। বিষয় চয়নে কি অপরূপ বৈচিত্রের আলেখ্য তারা ফুটিয়ে তুলেছেন তাদের চিত্রপটে, তা ছবিগুলির দিকে এক নজর তাকালেই পরিস্ফুট হয়।  বেশীরভাগ ছবিতেই নায়ক-নায়িকা দরবারী মহলে বিদ্যমান, তবে কিছু ছবি আছে যাতে আবহমান বাংলার জীবনধারা বিধৃত হয়েছে। সেই সকল ছবিতে নারী চরিত্রগুলির মুখ মণ্ডলের গড়ন, নিটোল চোখ, পরিধেয় বস্ত্র ও ওড়না আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় রাজস্থানী চিত্রকলার জয়পুর শৈলীর কথা। একইভাবে মুর্শিদাবাদ কলামের শিল্পীরা কিছু কিছু ছবি এঁকেছেন হিন্দু আমাত্য ও জমিদারদের জন্যেও।


 

চিত্রঃ মিরজাফর, সাথে পুত্র মিরন


নবাব সিরাজদ্দউলার পতন হলেও মুর্শিদাবাদ শৈলীর ধারা ক্ষীণভাবে অব্যাহত থাকে। পরবর্তী নবাব, ইংরেজ শাসকদের ক্রীড়নক মিরজাফরের তার পুত্র মিরনের সাথে একটি ছবি লন্ডনের ভিক্টোরিয়া অ্যান্ড আলবার্ট মিউজিয়ামে রয়েছে। ছবিটিতে সাক্ষর লখনউএর খ্যাতিমান শিল্পী পুরাননাথ, ওরফে হুনহারের। এখান থেকে বোঝা যায় - মুর্শিদাবাদে লখনউ কলামের শিল্পীদেরও আনাগোনা ছিল।

মিরকাসিম নবাব হলে তিনিও চিত্রকলার প্রতি দাক্ষিণ্য দেখাতে কার্পণ্য করেন নি। লন্ডনের উক্ত মিউজিয়ামে মিরকাসিমের আমলে অঙ্কিত ছবিও পাওয়া যায়। যার মধ্যে একটিতে মিরকাসিম নিজেই প্রধান উপজীব্য। গঙ্গাতীরের প্রাসাদচত্বরে চাঁদোয়ার নীচে এক হিন্দু অমাত্যের সাথে বাক্যালাপরত মিরকাসিমের ছবি আমরা দেখতে পাই।


চিত্রঃ দরবারে মিরকাসেম


মিরকাসিমের আমলের মুর্শিদাবাদ শৈলীর চিত্রকলায় দুটো বড় ঘটনা ঘটে। প্রথমত- লখনউ থেকে অনেক শিল্পীর আনাগোনা ঘটে তখন মুর্শিদাবাদে, ফলে খুব স্বাভাবিকভাবেই মুর্শিদাবাদ শৈলীতে লখনউ কলামের একটা ছাপ পড়ে। লখনউতে তখন নবাবি শাসনের পতনকাল। লখনউ কলামের শিল্পীদের ছবিতেও তাই ভাবাবেগের আতিশাজ্য আর সূর্যাস্তকালের আকাশের রক্তিম ছটা দেখা যেত ঘুরে ফিরে বার বার। দ্বিতীয়ত - এই সময় থেকেই মুর্শিদাবাদের শিল্পীরা সূক্ষ্ম তুলির হালকা খয়রি বা ছাইরঙের ফুটকি দিয়ে মুখের আদল নিটোল করে তোলা শুরু করেন। তার আগে মুর্শিদাবাদ শৈলীর শিল্পীরা মুঘল পদ্ধতিতে ঘন জলরঙে ছবি এঁকে গেছেন।

মিরকাসিম ইংরেজদের হাতে পরাজিত হলে ইংরেজরা পুনরায় তাদের ক্রীড়নক মিরজাফরকে মুর্শিদাবাদের মসনদে বসায়। একদিকে নবাবি মসনদ হারায় তার মর্যাদা, অন্যদিকে মুর্শিদাবাদ কলামের ঘটে রম অবনতি। কিছুটা বাজারদর থাকার কারণে শিল্পীরা বেঁচে থাকার চেষ্টা করেন নবাব-বাদশাহদের আলেখ্য। এগারশ ছিয়াত্তরের (ইংরেজি ১৭৬৯) এর মম্বন্তরের ধাক্কায় সেই ক্ষীয়মাণ ধারাটিও অবলুপ্ত হয়। দুর্ভিক্ষে প্রাণ হারালেন অনেক শিল্পী, অনেকে হলেন দেশান্তরী। তাদের মধ্যে শেষ পর্যন্ত যারা ইংরেজদের বদান্যতায় কোনক্রমে জীবনরক্ষায় সক্ষম হলেন, তাদের হাতে সূচিত হল মুঘল ও পাশ্চাত্যরীতির স্ংমিশ্রণে নতুন এক শৈলী, যার নাম দেয়া হয়েছে কোম্পানি স্কুল। এটা আমাদের পরবর্তী পর্বের আলোচ্য বিষয়


লেখকঃ সাজিদ উল হক আবির

কথাসাহিত্যিক, গবেষক, ও অনুবাদক। তিনি ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগে অধ্যাপনারত।