ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

পর্দার আড়ালে - লিখেছেন - তাসনোভা তুশিন


আজ পহেলা ফাল্গুন। ঠিক এমনি এক ফাল্গুনের দিনে আমার মনেও বসন্তের নতুন হাওয়া উঁকি দিয়েছিলো। তা আজ থেকে ৭ বছর আগের কথা।


 


 আমি তখন একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরিরত। আমি আমার বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে। ছেলেবেলাটা আমার নিতান্তই দারিদ্রের মধ্যেই কেটেছে। আমার বাবা গরিব কৃষক ছিলেন। আর আমি পড়াশোনায় ভালো ছিলাম বলে আমার বাবা কষ্ট করে, মাঠে খেটে আমাকে মানুষের মত মানুষ করেছেন। তার কষ্ট বৃথা যায় নি অবশ্য। এখন আমি সমাজের একজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তিত্ব। বড় অঙ্কের মাইনে, বড় বাড়ি, দামি ফ্ল্যাট, স্বচ্ছল জীবন যাপন। এখন আমার বিয়ের কথা চলছে। কিন্তু আমার মনের মত মেয়েই পাচ্ছি না। একবার চাকরির সুবাদে শ্রীমঙ্গল গিয়েছিলাম। সেখানে এক মধ্যবিত্ত বিধবার বাড়িতে কাজের জন্য যেতে হয়। সেখানে আমি এক অদৃশ্য বাধনে আবদ্ধ হয়ে যাই। এই বাড়িই আমার মনকে দলিত-বিগলিত করে তোলে। বিধবার বাড়িতে এক মেয়ে ছাড়া আর কেউ নেই। আসবাবপত্র বলতে তেমন কিছু ছিলো না। তবে কি অপরূপ ছিলো বাড়িটা! অত্যন্ত সুন্দর লাগছিলো দেখতে। যেন সত্যি পটে আঁকা ছবির মত। যেন মনের সব সৌন্দর্য ঢেলে দিয়ে সাজানো হয়েছ বাড়িটা। আমার কাজ ছিলো বিধবা মহিলার সাথে। কিন্তু হঠাৎ আমার চোখ পড়ল পর্দার আড়ালে। পদ্মের ন্যয় চোখ, কপালে লাল টিপ, ওর মন কাড়ানো হাসি, বাতাসে ওড়া এলো চুল হৃদয়ে যেন কম্পন তৈরি করছিল। মুখের এক অংশ দেখা যাচ্ছে। কি অপরূপ! তখন আমি বিধবার কাছে জানতে চাইলাম যে ও কে। সে বললো ও নাকি তার মেয়ে ইপ্সিতা। তারপর আমি তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলাম। কিন্তু সে সাড়া দেয়নি। সে নাকি নিজেকে সমাজের বোঝা মনে করে!! জানতে পারলাম তার মুখের এক অংশ এসিড দগ্ধ। পাড়ার ছেলেরা অপ্রীতিকর প্রস্তাব দেওয়ার পর তা প্রত্যাখ্যন করায় তার এ অবস্থা। আইনিভবে কোনো ব্যবস্থা তারা নিতে পারে নি। শেষে আমি অনেক চেষ্টা করে অপরাধীদের শাস্তির ব্যবস্থা করেছিলাম। এতে সে কিছুটা হলেও আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছিলো। সে অবশ্য দমে যায় নি। প্রতিবন্ধী মেয়েদের নিয়ে সে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ঘর সাজানোর কাজ করে। আমি তার বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখি নি। দেখেছি মনের সৌন্দর্য। তবুও সে আমাকে বিয়ে করতে রাজি হয় নি। সে নাকি আমার জীবন নষ্ট করতে চায় না। তাই আমিও আর তেমন এগোতে পারলাম না। আমি এই বিষয়ে কারো ইচ্ছার বিরুদ্ধে যেতে চাই না।


 


এরপর প্রায় ৭ বছর পর আামি প্রজেক্টের কাজে গৌড়িপুর যাই। সেখনকার ডেকোরেশন দেখেতো আমি অবাক। এর আর্টিস্ট এর নাম জানতে চাইলে শুনলাম সেই ইপ্সিতার কথা। কি অপরুপ সাজিয়েছে! আজও আমি তার জন্য বিয়ে করি নি। সেই ভালবাসা যেন এখনও নিশ্চল হয় নি। আর তা প্রকাশও করতে পারি নি তেমনভবে। ৭ বছর পর তাকে দেখে আজ এই স্মৃতিচারণ। যেন সেই ভালবাসা ডাক দিয়ে নিয়ে যায় পর্দার আড়ালে। তার চোখ যেন আজও হাতছানি দিয়ে ডাকে আমাকে....


তাসনোভা তুশিন
হলি ক্রস কলেজের ২য় বর্ষের ছাত্রী। ভালোবাসি ছবি আকঁতে এবং নিজের সৃজনশীলতা বৃদ্ধি করতে। নতুন কিছু করতে।