ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

ভূমিতে তারার মেলাঃভাধু দ্বীপ - লিখেছেন - আনাস রোহান

একাদশ-দ্বাদশ শ্রেনীতে "জাদুঘরে কেন যাব" নামক প্রবন্ধের একটি লাইন এখন আমার খুব মনে পড়ছে। যে জাদুঘরে রাখা হবে চমকপ্রদ সকল জিনিস যা মানুষের কৌতূহল উদ্রেক করে। সাধারন জিনিস যা প্রত্যহ দেখা যায় মানুষ তাতে আকৃষ্ট হয় না। গরুর চার পা দেখে সবাই অভ্যস্থ কিন্তু মানুষ তখনই অত্যন্ত আগ্রহের সাথে দেখতে যাবে যখন শুনবে কোনো গরুর পা তিনটি। যদিও এসব কথা আজকের পোস্টের সাথে কোনো সম্পর্ক নেই তাও একারনে বলা যে আমরা সবসময়ই বিস্ময়কর, যা সচরাচর হয় না তা দেখে আনন্দ পাই,তা দেখতে ভালোবাসি,তার বর্ননা শুনতেও পছন্দ করি।



আমাদের ভ্রমনের তালিকায় সবসময়ই প্রথম দিকে থাকে কোনো সমুদ্র সৈকত। আর সৈকত বলতে আমরা বুঝি বালি আর বালি আর তার কিনারায় সমুদ্রের পানির স্পর্শ। কিন্তু পৃথিবীতে এমন কিছু সমুদ্রসৈকত রয়েছে যার মধ্যে বালি আর পানি ছাড়াও মানুষকে বিস্মিত করার উপকরন থাকে।এমনই একটি সমুদ্রসৈকত হল "তারার সমুদ্র"।



হ্যা,নামের সার্থকতা রক্ষা করেই সমুদ্রসৈকতটির পানির মধ্যে দেখা যায় তারকারাজির মত নীল বর্নের আলোর ঝলকানি। যা এটিকে রাতের তারাভরা আকাশের মতই করে তোলে। মালদ্বীপের রাজধানী মালে হতে ১৪০ কিঃমি উত্তরে ভারত মহাসাগরে অবস্থিত ভাধু দ্বীপে এই সমুদ্রসৈকত বিদ্যমান।ভাধু দ্বীপটির দৈর্ঘ্য প্রায় ১৪৫০ মিটার এবং প্রস্থ প্রায় ৪০০ মিটার। এবং এ দ্বীপটির মধ্যে প্রায় ৪০০ এর মত মানুষও বাস করে।


জোনাকি পোকা


দ্বীপটির মধ্যে এই উজ্জল নীল আলোর উৎস হলো সামুদ্রিক প্ল্যাংকটনের বায়োলুমিনিসেন্স। বায়োলুমিনিসেন্স হলো একটি প্রক্রিয়া যেখানে লুসিফেরিন নামক প্রোটিন লুসিফারেজ এনজাইমের উপস্থিতিতে অক্সিজেনের সাথে বিক্রিয়া করে আলো উৎপন্ন করে।আমরা সাধারনত বায়োলুমিনিসেন্স এর উদাহরন দেখতে পাই জোনাকি পোকার মধ্যে। জোনাকি পোকা ছাড়াও অনেক শৈবাল এটি দেখাতে পারে। দ্বীপটির তটসংলগ্ন পানির মধ্যে ডাইনোফ্লেজালেট্স নামক এক ধরনের শৈবাল থাকে। এই শৈবালগুলো এককোষী এবং এরা বায়োলুমিনিসেন্স দেখাতে পারে।



ডাইনোফ্লেজাইটস


তবে শৈবাল আছে বলেই যে আলো উৎপন্ন হবে তা কিন্তু নয়। বেশ কিছু শর্ত পূরন হলেই তারার সমুদ্রের কিনারায় নীলাভ আলো দেখা যায়। যদি পানিতে প্রতি লিটারে প্রায় ১ লক্ষ ডাইনোফ্লেজালেটস থাকে এবং দিনের বেলা সূর্যের প্রখর আলো থাকে তাহলে শৈবাল গুলোর মধ্যকার বিক্রিয়া ভালোভাবে হয় এবং আলো পাওয়া যায়। মনে করা হয় যে শৈবালগুলো এই আলোকে একটি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহার করে।যাতে শিকারি প্রানীরা আলো দেখে ভয় পায় এবং শিকার না করে।


বায়োলুমিনিসেন্স এর বিক্রিয়াটি ঘটে শৈবাল এর দেহের লুসিফেরিন নামক একটি পিগমেন্টে। পানির আলোড়নে বৈদ্যুতিক তাড়না সৃষ্টি হয় যা শৈবালের প্রোটন পরিপূর্ণ  কক্ষে প্রোটন -আয়ন চ্যানেলগুলো খুলে দেয় যা সিন্টিলিওনে মুক্ত হয়। সিন্টিলিওনেলুসিফেরিন পিগমেন্ট থাকে। অক্সিজেনের উপস্থিতি বেশি হলে শৈবালটির লুসিফেরিন পিগমেন্টে লুসিফারেজ এনজাইমের উপস্থিতিতে বিক্রিয়া ঘটে।এতে অক্সিলুসিফেরিন এবং আলো উৎপন্ন হয়।



লুসিফেরিন + অক্সিজেন

-------------->অক্সিলুসিফেরিন + শক্তিরুপে আলো


এ বিক্রিয়ায় প্রভাবক হিসেবে কাজ করে লুসিফারেজ এনজাইম।বিক্রিয়াটি তাপ উৎপাদী।বিক্রিয়া শেষে অতিরিক্ত শক্তি আলোরুপে নির্গত হয়।পানির মধ্যে নীল এবং সবুজ আলো ভালো বুঝা যায় এজন্য এ আলো গুলোই শৈবালের দেহ থেকে নির্গত হয়।এটিই হচ্ছে বায়োলুমিনিসেন্স এর সাধারন ঘটন।


তো আমরা জানলাম কিভাবে ভাধু দ্বীপে তারার মেলা দেখা যায়।প্রকৃতির এক অপরুপ সৌন্দর্যের উদাহরন এ দ্বীপ।যদিও পুয়ের্তে রিকো এবং বেশ কিছু স্প্যানিশ দ্বীপেও বায়োলুমিনিসেন্স এর কারনে  পানির মধ্যে আলো দেখা যায় তবুও মালদ্বীপের অধীনস্থ এই দ্বীপটি আদর্শ পরিবেশ প্রদান করে শৈবালদের।প্রায় ধ্রুব তাপমাত্রা,শৈবালের আধিক্য, এসব বায়োলুমিনিসেন্স প্রক্রিয়াটিকে সহজ করে তোলে ভাধু দ্বীপে সহজ করে তোলে।


তাই কোনো সময় যদি মাটিতে তারার মেলা দেখতে হয় তাহলে চলে যান ভাধু দ্বীপে,আর দেখতে দেখতে চিন্তা করুন কত রহস্যময় আমাদের পরিবেশ,শুধুমাত্র খুঁজে নেয়ার অপেক্ষা।


লেখাটি পড়ার জন্য ধন্যবাদ



লেখকঃ আনাস রোহান

ইতিহাসনাম.কম এর তিনজন সহ-প্রতিষ্ঠাতার একজন।বিক্ষিপ্ত মনের অধিকারী।