ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

শূন্যতার চোরাবালি - লিখেছেন - আশরাফুল আলম প্রান্ত




প্রচলিত বিশ্বাস একজন পুরুষকে কাঁদতে দেখতে চায় না। কিন্তু রাতের নির্জনে ছ'তলার ছাদে ঠিকই কাঁদে তুহিন। কখনো চিৎকারও করতে চায় নিশির অন্ধকারে। তবে, সামাজিক শিষ্টাচার জিওভাকে ভারী করে রাখে।
তুহিনের দুঃখ অনেকদিনের পুরোনো। আটাশ বছরের ছোট্ট জীবনটিতে, অব্যক্ত দুঃখের চক্র তাকে প্রতিনিয়ত শূন্যতার চোরাবালিতে ডুবিয়ে নিচ্ছে। কাউকে সে দুঃখ বোঝানো যায় না। কেউ তার বেদনার কথা শুনে হাসতে লজ্জা পায় না।
কেননা, প্রচলিত বিশ্বাস এও বলে যে, একজন পুরুষকে একজন নারী অতিরিক্ত ভালোবাসা দিয়ে দুঃখ দিতে পারে না।


আর পাঁচজনের মতোই অনলাইনে তুলতুলির সাথে পরিচয় হয় তুহিনের। ব্যাপারটা বন্ধুত্বে গড়ায়, সবশেষে মুঠোফোনে ভালোবাসা। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তুহিন আবিষ্কার করে তুলতুলি তাকে প্রচন্ড ভালোবাসে। শৈশব, কৈশোর সম্পূর্ণ নারী সঙ্গ ছাড়া লালিত পালিত হওয়ায়, প্রেমের প্রথম দোলায় গা ভাসিয়ে দেয় তুহিন। তুলতুলি মেয়েটিও মন্দ নয়। কিন্তু সেই শুরুর সমস্যাটি, তুহিনকে বন্দী করে রাখে, তুলতুলির পুতুল সুতোয়।

তুহিন তুলতুলিকে ভালোবাসে। কিন্তু ছয় মাসের মধ্যে সে আবিষ্কার করে, তুলতুলি তাকে সন্দেহ করে। চোখে চোখে রাখে। ভালোই লাগতো সেই খুনসুটি। তবে, সদ্য ভার্সিটি ভর্তি হওয়ায়, অন্য মেয়ে বন্ধুদের সাথে তুহিনের সখ্যতার অশ্লীল কল্পনাও সে করে। যদিও, বাস্তবতা এই যে,তুলতুলি ছাড়া পৃথিবীর অন্য কোনো মেয়ের সঙ্গে তুহিনের মাঝারি ধরনের আন্তরিকতার সম্পর্কও নেই। কিন্তু তুলতুলি স্রস্টাকে যেমনটি বিশ্বাস করে, তেমনি বিশ্বাস করে, সে দেখতে ভালো না বিধায়, তুহিন তাকে ছেড়ে চলে যেতে পারে। তুহিন যদি জাহান্নামেও যায়, তারপরও তুলতুলির খুদেবার্তার জবাব দুমিনিটের মাঝে দেয়া লাগে। তুহিন যেহেতু ফেরেশতা নয়, তাই একসময় গভীর বিতৃষ্ণা নিয়ে সম্পর্কটি ভেঙে দিতে চায় সে।
তুলতুলি কাঁদে। গালি দেয়। আত্নহত্যার হুমকি দেয়। তুহিন নরম মনের মানুষ, একসময় সব মিটিয়ে নেয়।
অমন অনেকবার হয়। তুলতুলি নিজের রূপহীনতার অলীক দৈন্যতায় ভোগে। যদিও তুহিন মনে করে, তুলতুলি দেখতে শুনতে ভালোই।

নিজের পূর্ণ যৌবন বিশ্ববিদ্যালয়ে, লিঙ্গ সংবেদনশীলতায় কাটায় তুহিন। মেয়ে বন্ধু বানানোর ব্যাপারটি তুলতুলি আদতে ঘৃণা করে। তুহিনের দেহ এবং আত্মার উপর তুলতুলি পৈতৃক অধিকার অনুভব করে। কখনো তীব্র বিবাদ হয়, মিটমাট হয়।
এর মধ্যে একদিন তুলতুলি সত্যি সত্যিই কয়েকটি ঘুমের বড়ি খেয়ে নেয়। সে যাত্রায় সুস্থও হয়।

তুহিন সবকিছু স্বাভাবিক করতে চায়, এদিকে তুলতুলির অবিশ্বাস দৃঢ় হয়। তুহিন শুধু তার, সে আর কাউকে ভাগ বসাতে দিবেনা। কখনো তুহিনের বন্ধুকে গোয়েন্দা নিয়োগ দেয়া, বা সহপাঠী মেয়েদের বিরক্ত করা তুলতুলির নিত্যকার দায়িত্ব। তাদের ভালোবাসা ক্যাম্পাসে চলমান হাসির নাটক যেন। তুহিন অপমানিত বোধ করে। সবার হাসিঠাট্টার ভিড়ে, তাকে নিয়ে দুঃশ্চিন্তা করে শুধু তার বাবা-মা। তুলতুলির আত্নহত্যার প্রবণতা, তাদের ভাবনায় তালগোল পাকিয়ে দেয়।

তুহিন ফেসবুক টুইটার চালানোর কথা আর কল্পনাও করে না। তুলতুলির পৃথিবীতে একাকী অস্তিত্ব নিয়ে বেঁচে থাকে সে। পাঠ্য-অপাঠ্য বইয়ের পৃষ্ঠায় একান্তে মনোনিবেশ করে। সত্যি বলতে, যৌবনের ফুল মুকুলেই ধ্বংস হয়, তাও তুহিন আপত্তি করেনা। সাত পুরুষ ভদ্রলোক হিসেবে বেঁচে থাকার ফলে, তুহিনের রক্ত বলে, হয়তো তুলতুলিই সঠিক। একটু বেশি ভালোবাসাটা হয়তো দোষের কিছু নয়।
এভাবেই অবর্ণনীয় যন্ত্রণার মধ্য দিয়েই এগিয়ে যায়, তুহিনের জীবন।





2.

তুহিন কোথাও পড়েছিলো, প্রকৃতির নিয়মেই পুরুষেরা বহুগামী প্রবণতা দেখায়। কিন্তু তুহিনের মনে হয়, তার ভীত বিবেক স্বয়ংক্রিয়ভাবে চিন্তার এই অংশটিকে বিকল করে রাখে।
তুলতুলির কারণে নিজেকে বন্ধুশূন্য মনে হয় তার। তুলতুলি প্রসঙ্গে সহপাঠীরা হাসাহাসি করে। তুহিন নিজেকে গুটিয়ে নেয়। একবার এক স্কুল পড়ুয়া মেয়েকে টিউশনি পড়ানোর বিবাদে, তুলতুলি ছাত্রীর বাসায় এসে পড়েছিলো। তুলতুলির কি মানসিক সমস্যা আছে? এই প্রশ্নের উত্তর তলিয়ে দেখেনা তুহিন। সত্যি বলতে ছেলেটি হয়তো ভেতরে ভেতরে অনেকদিন ধরেই মৃত।

এদিকে তুলতুলির মন জুগিয়ে কথা না বললে, একটু বিদ্রোহ করতে চাইলে, তুলতুলি কাঁদে, নিজেকে হত্যা করার ভয় দেখায়। ছোট্ট শিশুর মতো ক্ষমা চায় তুহিন। হয়তো তুলতুলির মৃত্যু হোক, এতটা বিষাক্ত হৃদয় তার নেই।
তুলতুলির কিন্তু অনেকগুলো ছেলেবন্ধু আছে। তবে তুহিন ব্যাখ্যা চায়না। কারণ, তুলতুলির দাবী সে দেখতে খারাপ এবং এরা শুধুই বন্ধু। তুলতুলি কখনো এদের প্রেমে পড়বেনা, বা এদের পড়তে দিবে না। কিন্তু যেহেতু তুহিন ছয় বছরের রাজপুত্র, তাই তার এসবে সমস্যা হবে।

আত্নীয় বা প্রতিবেশী, তুলতুলি সবাইকে সন্দেহ করে। নিরীহ নির্জীব বিশ্ববিদ্যালয় জীবন কেটে যায় আত্নমর্যাদাহীণ তুহিনের। তুলতুলি মনে মনে বেশ খুশি হয়।
স্কলারশিপ নিয়ে বাইরে যেতে গেলে, পায়ে ধরে তুলতুলি। তাকেও সাথে নেয়া লাগবে। নয়তো তুহিন তার সুতো ছিড়ে মুক্ত হয়ে যেতে পারে। তুহিনকে মন থেকে ভালোবাসে তুলতুলি। বাধ্য হয়ে দেশেই থাকে এবং সার্টিফিকেটের জোরে ভালো চাকরি পায় তুহিন। দুই পরিবারই জানতো। চাকরির তিন মাসের মাথায় বিয়ে হয়ে যায় তুহিন-তুলতুলির।

অনেক বন্ধু, আত্নীয় স্বজন তাদের বিয়েতে আসে। শুভেচ্ছা জানায়। তুহিনের ভালো লাগে। অনেকটা যেন, বহুদিন পর কবর থেকে বের হওয়ার পরের অনুভূতি। তুহিন ভাবে, এখন তুলতুলির ছেলেমানুষী কমবে। ক্ষনিকের বিরতিতে মৃত মানুষ ভুলে যায়, অবশিষ্ট হাড়টুকুও ক্ষয়ে যাওয়া না পর্যন্ত, মানুষ দুঃখ নিয়েই বাঁচে।

বিয়ের পর তুলতুলি আরো হিংস্র হয়। বাঘিনী যেমন শাবকের উপর নজর রাখে, তেমন অস্বস্তি নিয়ে সংসার শুরু হয় তুহিনের। তুহিনের ব্যক্তিগত বলে কিছু নেই। টিভি সিনেমার নায়িকা কিংবা সংবাদ পাঠিকার উপর তুহিনের 'বদদৃষ্টি' চিহ্নিত করে তুলতুলি। শূন্যতার গভীর বিষাদের বাইরে সংসার কিছুই উপহার দেয়না তুহিনকে।
বউয়ের সাথে কোথাও যেতে লজ্জা পায়, অফিস থেকে লেট করে ফিরতে ভয় পায়। বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে বাঁচার চেষ্টা করে তুহিন।
একদিন তুলতুলি আবিষ্কার করে, তুহিনের বইগুলো কিশোরপাঠ্য অ্যাডভেঞ্চার বই নয়। বড়দের বই। সেখানে এমন শব্দ আছে, যা পাঠ করে হয়তো তুহিন যৌন লালসা মেটায়। নিজের ব্যক্তিত্ব নিয়ে কুৎসিত মন্তব্য শুনে, ঘৃণায় কুঁকড়ে যায় তুহিন।   
স্ত্রীর সাথে ঘনিষ্ঠ হওয়ায় আগ্রহ পায় না। যদিও তুলতুলি সোয়াগের কথা বলে, ভালোবাসি বলে। কিন্তু সেসব শ্রুতিমধুর শব্দ ওজন করতে পারেনা তুহিন।  
ওর মধ্যে মৃত মানুষের শীতলতা আসে, বর্ষার রাতের মতো। তাই ছাদে গিয়ে একাকী কাঁদে। তুলতুলির অগোচরে স্মোক করে। স্ত্রীর গায়ে হাত তোলা বা প্রতিবেশীর ভাঁড় হওয়ার সংকল্প তার মনে নেই।
কিন্তু তুলতুলি যখন কাঁদে, তখন নিখুঁত ভালোবাসা থেকেই কাঁদে।                    
তুহিন প্রচন্ড বিষণ্ণতায় ভোগে আজকাল। নিজেকে প্রশ্ন করে,"আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি?"





3.

আত্নহত্যা শব্দটি শুনে আর চমকায় না তুহিন। শব্দটির আড়ালে মুক্তি লুকিয়ে থাকার সম্ভাবনা যাচাই করে দেখে। নিজের মানসিক আর শারীরিক স্বাস্থ্য দিন দিন খারাপ হচ্ছে। সেদিন নিজের উপর প্রচন্ড আক্রোশে, আয়নায় ঘুষি বসিয়ে দেয় তুহিন। হাত কেটে প্রচুর রক্তপাত হয়। হাতে সেলাই পড়তে দেখে কাঁদে তুলতুলি। অনেকদিন চুপচাপও থাকে। তুহিন প্রার্থনা করে, তুলতুলির স্বাভাবিকতার জন্য। তবে, তুলতুলির ফেরত আসতে সময় লাগে না। ফের কথার চাবুকে আহত হয় তুহিন।
মগবাজারের এক বারে সুরার গন্ধ নিতে দেখা যায় তুহিনকে। জীবনের ব্যাপারে গভীর অবিশ্বাস জন্মাচ্ছে তার। তারপর একদিন মদ্যপ অবস্থায় মারামারি করে অন্য মাতালদের সাথে। খুব ভোরে তাকে রাস্তা থেকে উদ্ধার করে শ্বশুর এবং শ্যালক।

তুলতুলি বরাবরের মতোই নিজের জন্য বিলাপ করে, মুখ ফসকে তুহিনকে ডিভোর্স দিতে চায়। 'ডিভোর্স' শব্দটা নতুন ঠেকে তুহিনের কাছে। পরিচিত জনেরা তুহিনের দুঃখ বুঝতে শুরু করেছিলো। তুলতুলিও শপথ করে, নিজেকে শোধরাবার কথা বলে। কিন্তু তুহিন অনুভূতি শূন্য হয়ে যাচ্ছে। নিয়তিকে গাঢ় আলিঙ্গন করে, সে চাকরিতে মন দেয়। সৎ পথে অর্থ সঞ্চয়ের প্রতিজ্ঞা করে।
সংসারে যেমন তুহিন মন দিতে পারেনা, তুলতুলিও তেমনি নিজেকে সামলাতে পারে না। স্ত্রীকে এড়িয়ে চলতে, মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হওয়া কাছিমের মতো নিজেকে লুকিয়ে রাখে তুহিন। কিন্তু নিয়তি যাকে পরীক্ষা করে, তাকে আমৃত্যু পরীক্ষা করে।  

কর্মসূত্রে, কর্পোরেট জগতের সাথে অনেক কিছুর সাথে ব্যালেন্স করে চলা লাগে। কয়েকজন ভদ্রমহিলা তুহিনের কলিগ। কিছু দরকারে তাদের একজন রাতের বেলা কল দেয়। দৈবের দয়ায়, সেই ফোন ধরে তুলতুলি। সমস্ত জীবনের সন্দেহ আর ক্ষোভ ঝরে পড়ে তুহিনের নিভুপ্রায় জীবন প্রদীপে। একটা কাঁচের গ্লাস তুহিনের দিকে ছুড়ে মারে তুলতুলি। স্ত্রীকে শান্ত করতে শয়তানের কৃপায়, একটি চড় মেরে বসে হতভাগ্য যুবক।
অনেকক্ষণ চুপ থেকে মধ্যরাতে তুলতুলি চিৎকার করে ঘোষণা দেয়, সে এখন আত্নহত্যা করবে।  

সুদীর্ঘ অপেক্ষার বাঁধ ভেঙে দিয়ে, ঘর থেকে বেরিয়ে আসে তুহিন। ফ্ল্যাটের বাইরে প্রতিবেশীদের উঁকি দিতে দেখে, নিজের সমগ্র জীবনের নির্লজ্জতার কথা মনে পড়ে তার। পিতামাতার সৌম্য অবয়ব চোখে ভাসে, পেছনে ছায়া মানুষের টিটকিরিগুলো আবৃত্তি করে কেউ।
ছাদের সিড়ি গুলো পেরিয়ে, এক বুক শ্বাস নেয় তুহিন। এমুহূর্তে তার মস্তিষ্কটা বন্ধ করতে হবে।
তাও ভূমিমুখী পতনের সময় একবার চাঁদকে আঁকড়ে ধরতে চায় সে। মনে পরে যায়, নিষ্পাপ শৈশবের দিনগুলো।  

ইতিকথা:

আমগাছটা, বেঁচে থাকার শেষ একটা সুযোগ দেয় তুহিনকে।
আটদিন পর চোখ খুলে, আইসিইউর কাঁচের বাইরে হেলান দিয়ে ঘুমোতে দেখে তুলতুলিকে। তুলতুলির এতো দুঃখী মুখ কখনো দেখেনি তুহিন। তুলতুলি একসময় তুহিনের দিকে চায়। ভালোবাসার সুতোয় বাঁধা পরা দুজনের চোখ ছুয়ে অশ্রু আসে, বহুল প্রতিক্ষীত বৃষ্টির মতো।


লেখকঃআশরাফুল আলম প্রান্ত
ইতিহাসনামা.কম এর তিনজন সহ-প্রতিষ্ঠাতার একজন। অতিরিক্ত স্বপ্ন দেখতে গিয়ে সময় অপচয় করা তার মুদ্রা দোষ।