ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

বরেন্দ্রভূম থেকে জাহাঙ্গীরনগরঃ বাংলার চিত্রকলার ইতিহাস ( ৫ম পর্ব) - লিখেছেন - সাজিদ উল হক আবির


চিত্রঃ চক্ষুদানপট ১


১|পটচিত্রধারাঃ

সারা ভারতবর্ষ জুড়ে বিভিন্ন রকম যে সকল লোকচিত্র রীতি ছিল উনিশ শতকে অবহেলা ও অবজ্ঞা পেয়ে সে সব রীতির ফিরিঙ্গী নাম হয় বাজার রীতি। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত সম্প্রদায় নতুন শিক্ষার স্বাদ পেয়ে সর্বাগ্রে যে জিনিস শেখে তা হল দেশীয় সংস্কৃতি ও রীতিনীতিকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা। সেই পরিপ্রেক্ষিতেই দেশীয় চিত্রকলা পরিণত হয় তাদের অবজ্ঞার বিষয়বস্তুতে। দেশীয় চিত্র-প্রতিমা-মূর্তি থেকে অবজ্ঞায় চোখ ফিরিয়ে নেয়াই হল তখন শিক্ষার চিহ্ন, তাকে অস্বীকার করাই হল বৈদগ্ধের পরিচয়। এইভাবে শিক্ষিত সমাজের কাছে অসম্মানিত, অবহেলিত হয়ে লোকচিত্রকরেরা উপবাসের রাস্তায় এসে দাঁড়ালেন। লোকচিত্রকলার সৌভাগ্য এই যে- লৌকিক ধর্ম-আচার-সংস্কার এত শীঘ্র মরে না। তাই পুরষদের কাছে তুমুল অবজ্ঞা পেলেও, অন্দরমহলের নারীসমাজের কাছে লোকচিত্রকরদের তৈরি দেবদেবীর পট এবং প্রতিমার প্রয়োজন তখনও কমে নি। উপরন্তু স্বামী, ভাই, দেবরদের অপমান, লাঞ্ছনা ও ব্যাভিচারের প্রতিবাদ হিসেবে অঙ্কিত এইসব ছবিতে তারা পেলেন স্বান্ত্বনা ও ব্যঙ্গের খোরাক। বিদেশী চিত্রকরদের অঙ্কন, তাদের শিক্ষার মাধ্যমে চিত্রকরদের যে জাতিটি লুপ্ত হতে বসেছিল, তারাও প্রতিহিংসার তাড়নায় যাবতীয় ইঙ্গ-বঙ্গ আচার ব্যবহারের বিরুদ্ধে নিজেদের তুলিতে আনলেন তীব্র শ্লেষ। ফলে একদিকে যেমন দেবদেবীর চিত্ররচনায় তাঁদের কড়া সতেজ, সরলরেখা হয়ে এল শিথিল, দুর্বল ও অলঙ্কারবহুল, অন্যদিকে ব্যঙ্গচিত্র অঙ্কনে এলো তাঁদের তীব্র বিদ্রুপের দক্ষতা। এবং যেহেতু চিত্র ও প্রতিমা রীতিতে তাঁদের ছিল পুরুষানুক্রম অধিকার, সেহেতু তাঁদের ছবি কোনকালেই ঠিক পোস্টার বা বিজ্ঞাপনের অসারত্বে বা ক্ষণস্থায়ীত্বে নেমে গেল না। দেশীয় পটচিত্রধারা নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রারম্ভিক এই আলোচনাটুকু করে নেয়া প্রয়োজন। 



পট কথাটির উৎপত্তি হয় 'পট্ট' শব্দটি থেকে, যার অর্থ কাপড়। পটচিত্র কাপড়ের ফালির ওপর আঁকা হয়। আগে তা হত কাপড়ের উপর খড়িমাটির জমি তৈরি করে, পরে জমির বদলে কাগজ সেঁটে। আকৃতির বিবেচনায় পট হয় দুই রকমেরঃ ১। আয়তাকার চৌকশ পট ও ২। দু' হাত চওড়া ও বারো থেকে পঁচিশ হাত লম্বা জড়ানো পট। কাঠের এই দণ্ডে গোটানো এই জড়ানো পটই প্রাচীনকাল থেকে 'যমপট' নামে সাধারণভাবে পরিচিত হয়ে আসছে। পটচিত্রে এই জড়ানো পটের গুরুত্ব এই কারণে বেশী যে- পটুয়ারা এইরকম পট দেখিয়ে গান গেয়ে একই সঙ্গে 'লোকশিক্ষক' ও 'লোকরঞ্জকের' ভূমিকা পালন করে এসেছেন। পটুয়ারা সে বিচারে কেবল চিত্রকর ছিলেন না, একই সঙ্গে তারা ছিলেন কবি-গীতিকার এবং সুরকারও। ধর্মবোধ ও নৈতিকতায় তারা যে কতখানি সমৃদ্ধ ছিলেন তা কেবল তাঁদের ছবিতে নয়, গানেও সংরক্ষিত আছে। এক হিসেবে নিম্নবর্গের মানুষের নৈতিক শিক্ষাদানের দায়িত্ব যেন এরাই পালন করে গেছেন রামায়ণ-মহাভারত, পুরান, মঙ্গলকাব্য ও চৈতন্যজীবন অবলম্বনে অঙ্কিত পট প্রদর্শন করে। এইসকল পটের সঙ্গেই তারা দেখাতেন যমপট, যাতে মৃত্যুর পর যমরাজের বিচারে পাপীর জুটত নরকবাসের যন্ত্রণা আর পুণ্যবানের স্বর্গবাসের সুখ। এইভাবে সকলকে সৎপথে থাকার শিক্ষা দিতেন পটুয়ারা। অথচ এই পটুয়ারা ছিলেন জাতিবর্ণে বিভক্ত ব্রাহ্মণ্য- হিন্দুসমাজে অপাংক্তেয়। তাঁদের স্থান ছিল শূদ্রদের মধ্যে। শাস্ত্রেও দেখা যায় চিত্রকর্ম রয়েছে শূদ্রদের পেশার তালিকায়। 



পটচিত্রকরেরা বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন নামে পরিচিত ছিলেন। উত্তর পশ্চিম বাঁকুড়া ও পুরুলিয়ায় 'পটিদার' , বীরভূম ও মেদিনীপুরের কোন কোন অঞ্চলে 'চিত্রকর' এবং দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলায় 'পটুয়া' নামের চল বেশী। ভৌগলিক অবস্থান ভেদে পটুয়াদের সামাজিক মর্যাদার তারতম্য পরিলক্ষিত হত, তবে সব পটুয়াই ছিল দরিদ্র আর অবহেলিত। যে পটুয়াসমাজ শিক্ষিত এবং অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল হিন্দুদের ঘনিষ্ঠভাবে মিশে পরিশীলিত হয়ে ওঠার সুযোগ পেয়েছে, তাঁদের মধ্যেই স্ব পেশাগত অমর্যাদার কারণে ক্ষোভের মাত্রা দেখা গেছে বেশী। এই সামাজিক অবিচারের কারণেই সমতল বাংলার বহু পটুয়া হিন্দু সমাজের প্রান্তবাসী হয়ে থাকার চেয়ে মুসলমান ধর্ম আশ্রয় করা শ্রেয় মনে করেছেন। তাতে করে অন্তত তৎকালীন হিন্দুসমাজের অপশাসন থেকে অনেকখানি রেহাই পেয়েছেন। সাধারণভাবে এই পটুয়ারা নিজেদের মুসলমান বললেও দেখা যেত যে এরা মুসলমান পীর ও গাজির পটের সঙ্গে হিন্দু দেবদেবী ও পৌরাণিক কাহিনীর পটও প্রদর্শন করে বেড়াতেন। এদের জীবনধারণ নির্ভর করতো হিন্দু মুসলমান- উভয় সম্প্রদায়ের আনুকূল্যের ওপর। তাই এরা ছিলেন সর্বদাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পক্ষে। এমনকি হিন্দুধর্মের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যেও তারা চাইতেন মিলন। 



অবস্থান ও পরিবেশ অনুযায়ী পটের বিষয় ও শৈলীতেও বিভিন্নতা ঘটেছে। বিষয় বিচারে বাংলার পটচিত্রকে মোট চারভাগে ভাগ করা যেতে পারে- এক, সাঁওতাল উপজাতির জন্মকথা ও তাদের মধ্যে প্রচলিত 'চক্ষুদান পট' ; দুই, 'যমপট' ; তিন, 'গাজিপট' এবং চার, হিন্দু পুরাণ, রামায়ণ-মহাভারত, মঙ্গলকাব্য, কৃষ্ণলীলা ও চৈতন্যলীলা পট।


প্রথম ভাগের পটের প্রচলন পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ার উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে। সাঁওতালপ্রধান এই অঞ্চলের প্রধান শিল্পীরা প্রধানত সাঁওতাল উপকথা অনুযায়ী তাঁদের জন্মকথা চিত্রিত করতেন। এই উপকথা 'কো রিয়াক কথা' নামে পরিচিত। এই উপকথা তারা উপর থেকে নীচে পাঁচটি ধাপে অঙ্কন করতেন- প্রথমত, জলে নিমজ্জিত পৃথিবীর আকাশে উড়ছে হংস ও হংসী, কোথাও তাঁদের বসার মত এতটুকু জায়গা নেই; দ্বিতীয়ত, একটি কেঁচো সেই থই থই জলের মধ্যে মাটির সামান্য একটা ভিতের মতন তুলেছে; তৃতীয়ত, হংস-হংসী সেখানে বসেছে- দুটি ডিম পেড়েছে; চতুর্থত, ডিম থেকে জন্ম নিয়েছে দুটি সন্তান- একটি পুরুষ ও একটি নারী; পঞ্চমত, এই প্রথম পুরুষ ও নারীর মিলনে জন্ম নিল প্রথম সাঁওতাল। সাঁ


সাঁওতালদের মধ্যে আরেক ধরনের পটের প্রচলন দেখা যেত- তার নাম চক্ষুদান পট। যারা এর চর্চা করতো, তাঁদের জাদুপটুয়া বলে ডাকা হত। এই চক্ষুদান পটের বিষয়বস্তু এরকম যে- যখনই কোন সাঁওতাল গৃহে কোন পুরুষ-নারী অথবা কোন শিশু মারা যেত, তখনি এই জাদুপটুয়ারা সেই মৃতের একটি কাল্পনিক ছবি এঁকে হাজির হতেন শোকসন্তপ্ত সাঁওতাল পরিবারে। রঙ রেখায় ছবিটি সম্পূর্ণ করলেও ছবিটির চক্ষুতারকার স্থলটি খালি রাখা হত। সেই চক্ষুতারকাবিহীন ছবি মৃত সাঁওতালের পরিবারকে দেখিয়ে উক্ত পটুয়া বলতেন যে চক্ষুতারকাবিহীন অবস্থায় পরলোকে ঘুরে ঘুরে মৃতের বিদেহী আত্মা কষ্ট পাচ্ছে। মৃতের পরিবার টাকা পয়সা ও অন্যান্য জিনিসপত্র দিলে পরে উক্ত পটুয়া চক্ষু এঁকে মৃতের 'চক্ষুদান পট' সম্পূর্ণ করতেন। ছবির এই ম্যাজিকেল বৈশিষ্ট্যের জন্যেই উক্ত পটুয়াকে জাদুপটুয়া বলা হত।


দ্বিতীয় শ্রেণীর পট- 'যমপট', চক্ষুদান পটের মানসিকতাতেই আঁকা। এটি সমতল বাংলার হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যেই প্রচারিত হয়ে এসেছে। এতে যম বা যমরাজ কর্তৃক দণ্ডিত ব্যক্তির নরকযন্ত্রণা এবং পুরস্কৃত ব্যক্তির স্বর্গসুখ ভোগের দৃশ্যাবলী আঁকা হয়েছে। নরকে প্রেরিত পাপীর নরকযন্ত্রণার দৃশ্যগুলি ভয়ানক ও বীভৎস, অপরদিকে স্বর্গে রমণীদের সাথে কামকেলীতে নিয়ত পুণ্যবানের দৃশ্যগুলি আকর্ষণীয়। কিন্তু উভয়ক্ষেত্রেই রচনাশৈলী অমার্জিত। যমপটের গুরুত্ব অবশ্য শিল্পকর্ম হিসেবে নয়, নীতিশিক্ষার বাহক হিসেবে। 



চিত্রঃ গাজিপট 

তৃতীয় শ্রেণীর পটগুলি হল মুসলমানি পট। পূর্ব ও দক্ষিণ বাংলায় চলিত মুসলিম ধর্মযোদ্ধা গাজি ও মহাত্মা পিরদের বীরত্ব ও অলৌকিক কার্যকলাপ বর্ণিত হয়েছে এই শ্রেণীর পটে। তাই এগুলি সাধারণত 'গাজিপট' নামেই পরিচিত। এই গাজিপটের মধ্যেও রয়েছে লৌকিক ব্যাঘ্রদেবতা, বনবিবি প্রমুখের ছবি। অঙ্কনরীতিতে গাজিরপট বিশেষ দক্ষতার পরিচয় বহন করে না। কালুগাজির পট পূর্ববঙ্গের কুমিল্লা, ফরিদপুর ও বরিশাল জেলায় বিশেষভাবে জনপ্রিয় ছিল। ময়মনসিং জেলাতেও পটচিত্রের যথেষ্ট চল ছিল। 


বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য এবং শৈল্পিক নৈপুণ্যে সবথেকে আকর্ষণীয় হল চতুর্থভাগের পটগুলি। হিন্দুপুরাণ, রামায়ণ-মহাভারত, মঙ্গলকাব্য এবং চৈতন্যজীবন নিয়ে অঙ্কিত এই সকল পট পশ্চিমবঙ্গের সবগুলি জেলাতেই আঁকা হয়েছে। একদিকে দারুণ জনপ্রিয়তা, অন্যদিকে রচনাশৈলীর বিচার- উভয়দিকেই এই ধরনের পটগুলি ছিল অন্যান্য সকল পটের থেকে শ্রেষ্ঠ। 


পটচিত্রকলার করণকৌশল আলোচনায় বীরভূমের পটকে বিবেচনায় আনা যাক। এই অঞ্চলের পটুয়ারা পটের বিষয়বস্তু অনুযায়ী ফিগার কল্পনা করে নিয়ে প্রথমে হালকা লাল রঙ দিয়ে মূর্তির আউটলাইন এঁকে নিতেন। পরে এই লাল রঙের সাহায্যেই ফিগারের হাত, আঙ্গুল, চোখ, মুখ বের করে আনতেন পটুয়ারা। আউটলাইনের ভেতরে ফিগারের অন্যান্য অংশে এবার প্রয়োজনীয় বিশেষ বিশেষ রঙ দিয়ে ভরাট করার পালা। এরপর কালো রঙ দিয়ে চুল ও চক্ষুদান। সবশেষে সাদা ও বা হরিতাল রঙ দিয়ে ফোঁটার কাজ সারা। ব্যবহৃত রঙগুলি সবই বনজ বা খনিজ। যেমন সিঁদুরের লাল, বাজারের ময়ুরীকন্ঠী গুড়ো নীল, হরিতালের হলুদ, খড়িমাটির সঙ্গে অল্প নীল মিশিয়ে সাদা, ভুসোকালি ইত্যাদি। গৌরবর্ণের বেলায় অবশ্য পিউরির সাহায্যে রঙ তৈরির কথাও জানা যায়। তবে সবসময় সর্বত্র যে একই সূত্র থেকে রঙগুলি তৈরি করা হয় এমন নয়। একাধিক রঙ মিশিয়ে কীভাবে নানা মিশ্রবর্ণ তৈরি করতে হয় তার শিক্ষা পটুয়ারা কিছু স্থানীয় এবং লৌকিক ছড়া মুখস্ত করার মাধ্যমেই শিখে নিতেন। সাধারণত তাঁদের তুলি হত বাঁশকাঠির সাথে ছাগলের লোম সুতো দিয়ে বেঁধে নিয়ে। কাপড়ের লম্বা ফালির উপর সাধারণ কাগজ আঠা দিয়ে সেঁটে পটুয়া ছবির ভূমি তৈরি করে নেন। 




চিত্রঃ গাজিপট


পটচিত্রের ঐতিহ্য যতই প্রাচীন হোক, সবথেকে পুরাতন যে পট এখনও সংরক্ষিত আছে, তার বয়স একশো বছরের বেশি নয়। ক্ষণস্থায়ী আধারে তৈরি বলে এবং পটচিত্রের বিশেষ মর্যাদা না থাকায় প্রাচীনতর পটগুলি নষ্ট হয়ে গেছে। বাংলার পটগুলির নিদর্শন তবু ভাগ্যক্রমে নানান ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সংগ্রহশালায় দেখতে পাওয়া যায়। প্রাতিষ্ঠানিক সংগ্রহশালার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় আশুতোষ সংগ্রহশালা এবং গুরুসদয় মিউজিয়ামের কথা।


গুরুসদয় ছিলেন প্রাথমিক পটচিত্র সংগ্রহকারীদের একজন, এবং একজন শিল্প সমালোচক। তিনিই প্রথম ইংরেজিতে একটি নিবন্ধ লিখে বাংলার পটচিত্রের শিল্পগুণ সম্পর্কে শিক্ষিত সমাজকে অবহিত করেন। একজন পরিশীলিত চিত্ররসিক হিসেবে তিনি লিখলেন– “এই পটচিত্রকলার আগাগোড়া নির্ভর করছে ভারতীয় শিল্পের দুই প্রধান বর্ণমালা– শুদ্ধরেখার শক্তিশালী প্রয়োগ ও উজ্জ্বল বর্ণের সমতল বা দ্বিমাত্রিক ব্যবহারের উপর। অবিশ্বাস্য মনে হলেও এই শৈলীর প্রাচীন ও দক্ষ শিল্পীরা দেখা যায় আদিম শিল্পের শ্রেষ্ঠ গুণগুলিকে মেলাতে সক্ষম হয়েছেন।”



গুরুসদয় ছিলেন পটচিত্রের প্রথম একনিষ্ঠ প্রচারক। তাই তার লেখায় পটচিত্র শৈলী সম্ভবত কিছু অতিরঞ্জিত গুণে ভূষিত হয়েছে। এ কথা বিস্মৃত হওয়া ঠিক হবে না যে পটশিল্পীরা কেবল নান্দনিক গুণার্জনের জন্যে ছবি আঁকেন নি, তাঁদের ছবি আঁকার প্রেরণা ছিল অন্যত্র।


পটচিত্র রচনার উদ্দেশ্য তবে কী? এই প্রশ্নের উত্তর দেন নয়াগ্রামের শ্যামসুন্দর নামের এক চিত্রকর। তিনি তার পরম্পরাগত শিক্ষায় জানান, পটচিত্র আঁকার উদ্দেশ্য– জ্ঞান, শিক্ষা, আনন্দ ও পুণ্য। এই আদর্শ বাংলার পটুয়াদের যুগে যুগে অনুপ্রাণিত করেছে এবং নানা সামাজিক অবিচার সহ্য করেও তারা সেই অনুপ্রেরণায় গ্রামবাংলার জনসমষ্টিকে আত্মিকভাবে সমৃদ্ধ করে গেছেন। প্রধানত পারলৌকিক ও ধর্মীয় বিষয় নিয়ে পট রচনা করলেও পটুয়ারা বিষয় নির্বাচনে রক্ষণশীল ছিলেন না। বরং দেখা যেত যে গ্রাম থেকে শহরের পথে এসে তারা ধর্মনিরপেক্ষ বিষয়ে ছবি আঁকছেন ও গান বাঁধছেন। এইভাবেই নগরায়নের সাথে সংগতি রেখে মেদিনীপুরের পটে বৈচিত্র্য দেখা দিয়েছে; যেমন– স্বাধীনতা পট, সাহেব পট, স্টিমার পট, সিনেমা পট, পরিবার পরিকল্পনা পট ইত্যাদি। একসময় মেদিনীপুরের পটে ধরা পড়েছে উপজাতি বিদ্রোহের বীর শহীদদের ফাঁসিকাঠে ওঠার কাহিনীও। অন্যদিকে বীরভূমের পটুয়ারা ধরে রেখেছেন নিজেদের পৌরাণিক পটের মধ্যেই। তুলনায় বরং আদিবাসী পটুয়াদের বিষয় তাঁদের আঞ্চলিক উপকথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে নি, ছড়িয়ে ছিটিয়ে আর বিস্তৃত বিষয় নিয়ে তারা পট এঁকেছেন। সব মিলিয়ে এ কথা মানতেই হবে যে পরম্পরাগত বাংলার গ্রাম জনপদের সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের জগতের সবচে নির্ভরযোগ্য দলিল হল নানা স্থানে বিক্ষিপ্ত এইসব পট। কিন্তু কঠিন বাস্তব হল এই যে– আজকের পরিবর্তিত আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই লৌকিক শিল্পধারাটিকে পুনুজ্জীবিত করা আর সম্ভবপর নয়।

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ ১। বাংলার চিত্রকলা - অশোক ভট্টাচার্য ২। ভারতের চিত্রকলা (দ্বিতীয় খণ্ড) - অশোক মিত্র ৩। বাংলাপিডিয়া

লেখকঃ সাজিদ উল হক আবির

কথাসাহিত্যিক, গবেষক, ও অনুবাদক। তিনি ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগে অধ্যাপনারত।