ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

বরেন্দ্রভূম থেকে জাহাঙ্গীরনগরঃ বাংলার চিত্রকলার ইতিহাস (৪র্থ পর্ব) - লিখেছেন - সাজিদ উল হক আবির

চিত্র ১ঃ চাঁদনী চক ও মুন্নি বেগমের মসজিদ, মুর্শিদাবাদ; মুর্শিদাবাদি ঘরানায় আঁকা জলরং এর ছবি (১৭৯০-১৮০০)।


১। কোম্পানি শৈলীঃ মুর্শিদাবাদ পর্ব  
বাংলার জমিতে প্রথমবারের মত কোম্পানি-শৈলীর ছবি দেখা যায় মুর্শিদাবাদে। মুর্শিদাবাদের পাঁচ কিলোমিটার দূরে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাণিজ্য কুঠি ছিল আগে থেকেই, কিন্তু ১৭৬৩ সাল হতে ইংরেজদের পরিচয় কেবল বণিক হিসেবেই রইল না, যুদ্ধে বঙ্গীয় নবাবদের পরাজিত করে মুর্শিদাবাদে পুরো রাজনৈতিক অধিকার কায়েম করে বসলো তারা। ফলে নবাব এবং তার পারিষদবর্গের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ক্ষমতা খর্ব হয়ে পড়লে তাদের পক্ষে আর স্থানীয় চিত্রশিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা করা সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। চিত্রকরেরাও জীবন রক্ষার উদ্দেশ্যে দ্বারস্থ হন তাদের নতুন প্রভু ইংরেজ আমাত্যের কাছে। নতুন ক্ষমতার বলে বলীয়ান ইংরেজরা নিজেদের প্রভুত্বের বিস্তৃতি ছড়িয়ে দিতে বিশেষভাবে সচেষ্ট থাকায় তাদের পৃষ্ঠপোষকতা লাভেও বিশেষ অসুবিধা হয় না মুর্শিদাবাদের চিত্রকরদের। তারা নিয়োজিত হন ইচ্ছেমত চিত্রাঙ্কনের কাজে। ইংরেজদের জন্যে প্রাথমিকভাবে যে ছবিগুলি এঁকেছিলেন মুর্শিদাবাদের শিল্পীরা তা মুঘল মিনিয়েচার ফর্মেই সৃষ্ট। বিষয়বস্তু হিসেবে এইসকল ছবিতে ফুটে ওঠে মুঘল বাদশাহ, বাংলা-অযোধ্যার নওয়াব এবং অন্যান্য অভিজাত শাসকের প্রতিকৃতি।
ইংরেজশাসিত ভারতীয় ভূখণ্ডে প্রথমবারের মত দেশজ ও ইউরোপীয় শৈলীর মিশ্রণ দেখা যায় দক্ষিণের মাদ্রাজের তানজোরে। সেখান থেকেই সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ে এই মিশ্ররীতির ছবি। মুর্শিদাবাদে এই রীতির আগমন ঘটে অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে। ফলে মুর্শিদাবাদের শিল্পীরাও ঝুঁকে পড়েন পাশ্চাত্য রীতিতে। তারা ঘন জলরঙের (gouache) বদলে ব্যবহার করা শুরু করেন স্বচ্ছ জলরঙ (water color)। মনুষ্যরূপ ও তার পোশাক-আশাকে দেখা গেল রেখাজনিত ছায়াপাত। সমস্ত ছবির চারপাশে দেখা গেল কালো রঙের বর্ডার। ছবি, বিশেষত নিসর্গচিত্রগুলি আঙ্গিকে মুঘল মিনিয়েচার থেকে বড় হয়ে উঠলো। শুধু রূপসৃষ্টির জায়গাটিতে তারা নিজস্ব পরম্পরার প্রতি অনুগত রইলেন।  

 

চিত্র ২ঃ তাজিয়া মিছিল, মুর্শিদাবাদ শৈলী

মুর্শিদাবাদের গুরুত্ব কমতে শুরু করে উনিশ শতকের গোড়া থেকেই। ব্যবসা বাণিজ্যের কেন্দ্র হয়ে উঠলো কোলকাতা- ইংরেজদের নিজস্ব শহর। তারপর রেলপথের প্রবর্তন হলে ভাগীরথীর প্রধান বাণিজ্যপথের ভূমিকাও আর রইল না। কি বাণিজ্যে, কি শিল্পকলায়- মুর্শিদাবাদ ক্রমশ পরিণত হল এক ঘুমন্ত শহরে। বঙ্গীয় চিত্রকলার ইতিহাস আলোচনায় মুর্শিদাবাদের ভূমিকা ও প্রভাবের ইতি, আমাদের এখানেই টানতে হয়।

২। কোম্পানি শৈলীঃ কোলকাতা পর্ব (ইউরোপীয় চিত্রশিল্পীদের সমাগম)  

যে সব ইউরোপীয় বণিক ব্যবসা করে দ্রুত ধনী হবার লোভে প্রথম প্রথম ভারতে এসেছিল, তারা ছিল দুর্দান্ত প্রকৃতির 'অভিযাত্রী'। স্বদেশে তাদের না ছিল বিত্ত, না ছিল মর্যাদা। তাদের অনেকেই ব্যবসার সূত্রে ভারতীয়দের সংস্পর্শে এসে ভারতীয় জীবনধারা গ্রহণেও কুণ্ঠিত হয় নি। গ্রামগঞ্জে মানুষের সঙ্গে মিশে হুঁকা ধরেছে, বাইজি নৃত্য দেখেছে, এমনকি এদেশের রমণীদের গ্রহণ করেছে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে। স্বদেশের সংস্কৃতির প্রতি তাদের বিশেষ কিছু মায়া ছিল না।    

কিন্তু ব্রিটিশ পার্লামেন্ট কর্তৃক গৃহীত রেগুলেটিং অ্যাক্টের অংশ হিসেবে ১৭৭৪ খ্রিষ্টাব্দে কোলকাতা যখন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে তখন চিত্রপট পাল্টে যেতে থাকে দ্রুত। সম্ভ্রান্ত ও উচ্চশিক্ষিত ইংরেজ সন্তানদের আগমন ঘটতে থাকে এদেশে, বিভিন্ন সরকারী পদ ও দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে। ফলে কয়েকদশকের মধ্যেই কোলকাতার যে রূপান্তরটি ঘটল, তা ছিল নিতান্ত অভাবনীয়। টমাস ও উইলিয়াম ড্যানিয়েল ১৮১০ খ্রিষ্টাব্দে লন্ডন থেকে প্রকাশিত তাঁদের সচিত্র ভারত ভ্রমণ গ্রন্থে লিখলেন- "হঠাৎ সব বাঁশের ছাউনি অদৃশ্য হয়ে গেল, ইটের দেয়ালের জায়গা নিল মর্মরস্তম্ভ।"  

কোলকাতায় স্থায়ীভাবে বসবাসের মন নিয়ে স্বতন্ত্র একটি মহল্লা তৈরি করে নিল ইংরেজরা। সে মহল্লায় তারা স্বদেশের রুচি ও মেজাজে জীবনযাপনের সব ব্যবস্থাই করে নিল কয়েকবছরের মধ্যে। ইংল্যান্ডের তৎকালীন প্রচলিত নিয়মানুযায়ী "neo classical" রীতিতে তৈরি হল বিবিধ সৌধ ও প্রাসাদ। সেসময় কি প্রশাসনের কাজে, কি সদ্য প্রতিষ্ঠিত সুপ্রিম কোর্টের বিচারকার্য পরিচালনার জন্যে ইংল্যান্ড থেকে এমন কিছু লোক এসেছিলেন কলকাতায় যারা ছিলেন সত্যিকারের শিক্ষিত এবং উদারচেতা মনের মানুষ। তাঁদের ক'জনার প্রচেষ্টায় কলকাতায় এশিয়াটিক সোসাইটি, ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, হিন্দু কলেজ- ইত্যাদি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রাচ্যবিদ্যাচর্চার সূচনা হয়। তারা স্বদেশী সাংস্কৃতিক পরিবেশের ধারাটি প্রতিষ্ঠা করতে চাইলেন কলকাতায় তাঁদের নতুন বাসস্থানে। তাঁদের ড্রয়িংরুমে ফায়ারপ্লেসের পাশে ঝুলিয়ে রাখবার জন্যে প্রয়োজন হল অয়েল পেইন্টিং এর।  

কোলকাতার এই রাজনৈতিক-সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক পটপরিবর্তনের খবর ইংল্যান্ডে পৌঁছালে সেখানকার জীবন সংগ্রামে নাজেহাল অনেক শিল্পীই দ্রুততর ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় পাড়ি জমান ভারতে। পেশাদার ব্রিটিশ শিল্পীদের মধ্যে সর্বপ্রথম ভারতের ভূখণ্ডে পা রাখা ইংরেজ শিল্পী টিলি কেটল। তিনি মাদ্রাজে পৌঁছান ১৭৬৯ খ্রিষ্টাব্দে, আর কোলকাতায় পৌঁছান ১৭৭১ খ্রিষ্টাব্দে। সেই সময় থেকে নিয়ে ১৮২০ সাল পর্যন্ত প্রায় ৬০ জন ইংরেজ শিল্পী। তাঁদের মধ্যে সবাই উঁচুদরের শিল্পী ছিলেন এমন নয়, কেউ কেউ ছিলেন গুণী শিল্পী। তারা পৃষ্ঠপোষকতাও পেয়েছেন ভালো। ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার প্রথম গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংস, অযোধ্যার নবাবের মত প্রভাবশালী ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গের ছত্রছায়ায় কেউ কেউ ছবি আঁকার সুযোগ পান।

চিত্র ৩ঃ টিলি কেটলের আঁকা একটি প্রতিকৃতি চিত্র (Portrait of Major General Horton Briscoe 1741-1802)

অষ্টাদশ শতকের শেষ আর উনিশ শতকের প্রথম কয়েক দশকে যেসব ইংরেজ শিল্পী কোলকাতায় এসে কাজ করেছিলেন, তাঁদের ভাগ করা যায় তিনভাগে। তার মধ্যে প্রথমভাগে থাকবেন তেলরঙের অ্যাকাডেমিক রীতির শিল্পীরা। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পূর্বোল্লেখিত টিলি কেটল, জোফানি (ওয়ারেন হেস্টিংসের আনুকূল্য পাওয়া), ডেভিস, হিকি। তারা সকলেই প্রচলিত কেতায় ছবি এঁকে পয়সা রোজগারের আশায় এসেছিলেন এবং এদের সকলেরই সেই উদ্দেশ্য সফল হয়েছিল। এরা তৎকালীন ইংল্যান্ডে প্রচলিত ধারা অনুযায়ী প্রতিকৃতিচিত্র (portrait) এর পাশাপাশি কিছু ঐতিহাসিক (historical) ও মজলিশি (conversational) ছবিও এই কোলকাতা শহরে বসে এঁকে গেছেন।

  
চিত্র ৪ঃ জন জোফানি অংকিত 'যিশুর শেষ ভোজ'

চিত্রকর জোফানি কোলকাতায় আসার আগেই ছিলেন ইংল্যান্ডের রয়েল অ্যাকাডেমির মনোনীত সদস্য এবং প্রতিষ্ঠিত শিল্পী। কোলকাতায় তার যেসব ছবি আছে তার মধ্যে সেন্ট জন চার্চের 'যিশুর শেষ ভোজ' ও ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হলে সংরক্ষিত 'হায়দার বেগের দৌত্য' এবং 'টিপু সুলতানের পুত্রকে লর্ড কর্নওয়ালিসের জামিনরূপে গ্রহণ' ছবিগুলি বিখ্যাত। মজলিসি ছবির মধ্যে তার অঙ্কিত- 'ক্লদ মার্টিন ও তার বন্ধুরা' এক অনন্য সৃষ্টি। শিল্পী ডেভিসও ছিলেন ভারতে আসার আগেই খ্যাতিমান এবং মজলিশি ছবি অঙ্কনে সমান পারদর্শী। টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে ইংরেজদের অভিজানের এক ঐতিহাসিক চিত্র আঁকেন তিনি। সামাজিক দলিল হিসেবে মুল্যবান এমন বাংলার কিছু গ্রামীণ ছবিও আঁকেন ডেভিস। অন্যান্য শিল্পীরা কেবল প্রতিকৃতিচিত্র এঁকেই বিখ্যাত হন। কেননা মজলিশি ও ঐতিহাসিক ছবি অঙ্কনের রেওয়াজ তখন কমে আসছিল, কি ইংল্যান্ডে, কি এদেশে।    

বড় বড় ক্যানভাসে আঁকা তৈলচিত্রে দু' ধরনের সমস্যা দেখা দেয় এ সময়ে। প্রথমত, এদেশের আবহাওয়ায় এই ধরনের ছবি নষ্ট হয়ে যেত খুব দ্রুত। দ্বিতীয়ত, উচ্চপদস্থ ব্রিটিশ কর্মকর্তারা তাঁদের চাকুরীজীবন শেষে ইংল্যান্ডে ফেরত যাবার সময় এই সমস্ত ছবি স্থানান্তর করতে গিয়ে সমস্যায় তো পড়তোই, তাঁদের দেশের সরকার ছবি বিদেশ থেকে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে ধার্য করেছিল উচ্চহারের ট্যাক্স। ফলে তৈলচিত্র বেঁচে রইল কেবল বড় বড় প্রতিষ্ঠান আর দেশীয় রাজরাজড়ার প্রতিকৃতিচিত্রের চাহিদা মেটাতে।    

ইংল্যান্ড ও ইউরোপ থেকে আসা চিত্রশিল্পীদের দ্বিতীয় ভাগের যারা, তারা বিখ্যাত ছিলেন হাতির দাঁতের ফলকের ওপর প্রতিকৃতি আঁকায় দক্ষ মিনিয়েচার শিল্পী। অষ্টাদশ শতকের ইউরোপে হাতির দাঁতের ওপর জলরঙে আঁকা ছবির বিশেষ কদর দেখা দিয়েছিল। ভারতে সেই ধারাই বহন করে আনেন জন স্মার্ট (১৭৮৫-৯৫), ওজিয়াস হামফ্রি (১৭৮৫-৮৭), স্যামুয়েল এন্ড্রুজ (১৭৯১-১৮০৭) ও ডায়না হিল (১৭৮৬-১৮০৬)। তবে এদের সবার জনপ্রিয়তাকে ম্লান করে দেন যিনি, তার নাম জর্জ চিনোরি(১৮০২-২৫)। তিনি তৎকালীন বিদেশি সকল শিল্পীর চেয়ে বেশীদিন অবস্থান করেছিলেন ভারতে, বিশেষ করে কোলকাতায় এবং তার কাজের পরিমাণও ছিল প্রচুর। কোলকাতায় তিনি ছিলেন পনের বছর। সেই পনের বছরে কোলকাতায় হাতির দাঁতের ওপর মিনিয়েচার অঙ্কনে তার কোন প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না। আকারে ছোট এবং বহন করতে সুবিধা বলে কোম্পানির চাকুরীজীবী ইংরেজদের মধ্যে এ ছবির ছিল বিশেষ সমাদর। চিনোরির ব্যস্ততা এতই বৃদ্ধি পায় যে তার বাৎসরিক আয় সেই সময়েই হয় পাঁচ হাজার পাউন্ড।

চিত্র ৫ঃ মা এবং শিশু , জর্জ চিনোরি , মাধ্যম - হাতির দাঁতে জলরং, ইন্ডিয়া, ১৮০৩

ভারতে অবস্থানরত তৃতীয়ভাগের শিল্পীরা ছবি এঁকেছেন ব্রিটিশ পরম্পরায় স্বচ্ছ জলরঙে। তারা আঁকতেন দেশের এবং জনজীবনের 'picturesque' দৃশ্যাবলী আর সাধারণ মানুষের বিচিত্র বেশভূষা ও জীবনধারার ছবি। এইসব ছবি থেকে পরে অনেকেই এনগ্রেভিং অথবা লিথোপদ্ধতিতে ছাপাই ছবির অ্যালবাম বানিয়ে অর্থ ও জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এ জাতীয় ছবি এঁকে প্রথম সফল শিল্পী হলেন উইলিয়াম হজেস (১৭৮০-৮৩)।

চিত্র ৬ঃ উইলিয়াম হজেসের চোখে তাজমহল, মাধ্যম - জলরং, ১৭৮০

কোম্পানি আমলে আগত ইউরোপীয় ধারার শিল্পীদের সাথে এই প্রথম সংমিশ্রণ বাংলার চিত্রকলার। দুটি ভিন্নধাঁচের শিল্প কলার মিশ্রণ যখন হয় তার ফলাফলে উভয় কলাই হয় হৃদ্ধ। বাংলার ভূভাগে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের সাথে ছবি আঁকার জন্যে অনেক বিশাল, বিস্তৃত এবং বৈচিত্রময় বিষয়বস্তুর খোঁজ পান ইউরোপ আগত শিল্পীরা। তেমনি, টেকনিক্যাল দিক থেকে খানিকটা দুর্বলতায় ভোগা বাঙ্গালী চিত্রশিল্পীরা আরও নিখুঁত হয়ে ওঠেন ইউরোপীয় চিত্রশিল্পীদের সংস্পর্শে। চিত্রকলার খুঁটিনাটি যদি বাদ দেয়া হয় এবং বিষয়টির দিকে তাকানো হয় সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক গুরুত্বের প্রেক্ষাপটে, তবুও কোম্পানির আমলে ইউরোপিয়ান চিত্রশিল্পীদের ভারতে তথা বাংলায় আগমন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। উনিশ শতকের বাঙ্গালীর জীবনে পাশ্চাত্যশিক্ষার সংস্পর্শে যে বড় রকমের পরিবর্তন দেখা দিয়েছিল- যা বাঙ্গালী রেনেসাঁস নামে পরিচিত- তার পরিপ্রেক্ষিতে এদের শিল্পকর্ম মনোযোগ দাবী করে। কেননা উনিশ শতকের শিক্ষিত বাঙ্গালির শিল্পবোধ ও ভাবনার অনেকটাই গড়ে ওঠে পাশ্চাত্য চিত্রকলার আদর্শে। এছাড়াও কোলকাতার ইংরেজ ও বাঙ্গালী শিল্পপ্রেমিকদের উদ্যোগে গড়ে ওঠে ব্রাশ ক্লাব (brush club) যার আয়োজনে ১৮৩১ ও ১৮৩২ সনে টাউন হলে পরপর দুটি চিত্র প্রদর্শনী আয়োজিত হয়। আর বাঙ্গালীদের মধ্যে যাদের চিত্র সংগ্রহশালা ছিল উল্লেখযোগ্য, যেমন - প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, শ্রীনাথ মল্লিক, রঘুনাথ ঘোষাল, পাথুরিয়াঘাটার গোপীমোহন ঠাকুর, বর্ধমানের মহারাজা, পাইকপাড়ার মহারাজা এরা নিজেরা চিত্র অংকন তো করাতেনই, উপর্যুপরি সংগ্রহ করতেন নিলামে ইংরেজদের বিক্রি করে দেয়া বড় বড় তৈলচিত্র। পূর্বেই উল্লেখ করা হয়েছে যে এসমস্ত তৈলচিত্র পরিবহন করা এক ঝকমারি কাজ ছিল, তার ওপর বিদেশ থেকে ইংল্যান্ডে ছবি নিয়ে যেতে হলে তৎকালীন সময়ে চড়া হারে শুল্ক দেয়া লাগতো। বাংলার তৎকালীন শিক্ষিত জনসমাজের মধ্যে শিল্পবোধ সৃষ্টি করে বেঙ্গল রেনেসাঁকে ত্বরান্বিত করা, বাঙ্গালী চিত্রকরদের হৃদ্ধ করা, প্রথমবারের মত চিত্রকর্মের প্রদর্শনী আয়োজনসহ বাংলার চিত্রশিল্পকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবার আরও নানা সামাজিক পদক্ষেপ কোম্পানির আমলে ঘটে।

৩। কোম্পানি শৈলীঃ কোলকাতার শিল্পীরা

চিত্র ৭ঃ মুঘল পরম্পরার পাটনা কলামের কম্পানি শিল্পী জয়নুদ্দিনের অঙ্কনে মিসেস ইম্পের পশুপাখিশালার একটি সারস

ইংরেজ যেসকল বিখ্যাত চিত্রশিল্পীরা কোম্পানির শাসনামলে কোলকাতা শহরে দর্পের সাথে ছবি এঁকে বেড়াচ্ছেন, খ্যাতি কুড়োচ্ছেন, দু হাতে অর্থ উপার্জন করছেন, তাঁদের দিয়ে ফরমায়েসি ছবি আঁকানো ছিল মুশকিল। ব্যস্ত ছিলেন তারা। ছোটখাটো কাজ তারা করতেন না। এছাড়া শৌখিন যেসকল ইংরেজ শিল্পী ছবি আঁকতেন তাঁদের ছবিগুলি সীমাবদ্ধ থাকতো তাঁদের পরিবার আর বন্ধুবান্ধবের মধ্যেই। অথচ তখন কী ইংল্যান্ড কী ভারতবর্ষীয় ইংরেজ - সকলের মধ্যেই এ দেশ নিয়ে কৌতূহল ছিল প্রচুর। ফলে প্রয়োজন পড়লো দেশীয় শিল্পীদের দিয়ে নিজের ইচ্ছা ও রুচি অনুযায়ী ছবি করিয়ে নেয়ার। আর দেশীয় নবাব এবং অভিজাত শ্রেণীর পৃষ্ঠপোষকতা হারিয়ে দেশীয় চিত্রকরেরাও হন্যে হয়ে ফিরছিলেন রুজিরোজগারের আশায়- 'নতুন নবাব'দের পেছনে। কোলকাতা শহর এই দুই শ্রেণীর মানুষদের মিলিয়ে দেয় একে অপরের পরিপূরক হিসেবে।    

এই প্রসঙ্গে সর্বপ্রথম যার নাম আসে, তিনি কোলকাতার সদ্যপ্রতিষ্ঠিত সুপ্রিম কোর্টের প্রথম বিচারপতি স্যার এলিজা ইম্পের পত্নী, মিসেস ইম্প। স্যার ইম্প কোলকাতায় আসেন ১৭৭৪ সালে। গভর্নর ওয়ারেন হেস্টিংসের অন্যান্য পারিসদের মত তিনিও আগ্রহের সাথে পরিচিত হবার চেষ্টা করেন ভারতবর্ষের সাথে। তিনি সংগ্রহ করতে শুরু করেন এদেশের পুঁথি ও তার চিত্র। তার স্ত্রীর বিশেষ আগ্রহ ছিল এদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নিয়ে আসা বিভিন্ন রূপ ও বর্ণের পশুপাখিতে। তার পশুপাখির সংগ্রহশালার বিবিধ প্রামাণ্য চিত্র অঙ্কনের কাজে শ্রীমতী ইম্প নিয়োজিত করেন তিনজন দেশীয় চিত্রশিল্পী - জয়নুদ্দিন, ভবানী দাস এবং রাম দাসকে। তারা কোলকাতা আসেন পাটনা থেকে। বোঝা যায়, তারা মুঘল পরম্পরার পাটনা কলমের শিল্পী। তাঁদের তিনজনের আঁকা পশুপাখি সিরিজের ছবিগুলিই সংরক্ষিত আছে অক্সফোর্ডের অ্যাসমোলিয়ান মিউজিয়ামে। এই তিনজনের মধ্যে শিল্পী হিসেবে শ্রেষ্ঠ ছিলেন জয়নুদ্দিন, নিঃসন্দেহে। তার ছবিগুলিতে মুঘল দরবারের মহান প্রকৃতি পর্যবেক্ষক শিল্পী ওস্তাদ মনসুর এবং ব্রিটিশ ধারার প্রকৃতিবিজ্ঞানী শিল্পীদের এক আশ্চর্য সমন্বয় ঘটেছিল। ইংল্যান্ডে তৈরি হোয়াইটম্যান কাগজে জলরঙে ১৭৭৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি যেসকল পশুপাখির ছবি আঁকেন তার মধ্যে কিছু কাজ জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিকোন থেকে গুরুত্বপূর্ণ, আবার কিছু ছবি নান্দনিক গুণেই নয়নাভিরাম।    

ব্রিটিশ এসকল পৃষ্ঠপোষকদের কেউ কেউ আবার দেশীয় চিত্রশিল্পীদের নিজ উদ্যোগে শিক্ষিত করেছেন ইউরোপীয় রীতিতে ছবি আঁকায়। কারণটা জানতে হলে আমাদের তাকাতে হবে একটু পেছনে।    

ইংরেজ শিল্পীরা অষ্টাদশ শতকের শেষে কোলকাতায় চিত্রশৈলীর যে আদর্শ বয়ে আনেন, তা ভারতে পা রাখা ইউরোপের প্রথম শিল্পী টিলি কেটলের ভারতাগমনের এক বছর আগে, ১৭৬৮ সালে ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় জর্জের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠিত রয়্যাল অ্যাকাডেমিতে ঠিক হয়। তৎকালীন ইংল্যান্ডের সবচেয়ে খ্যাতিমান ও প্রভাবশালী শিল্পী জোশুয়া রেনলডস রয়্যাল অ্যাকাডেমি ইংল্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে নিয়োগ পেয়ে স্পষ্ট ভাষায় উচ্চারণ করেন- ইতালির রেনেসার মহান শিল্পীদের আদর্শের কথা মাথায় রেখেই ছবি আঁকতে হবে ইংরেজ তরুণ শিল্পীদের। তার আগে এরকম জোরের সাথে এ কথা কেউই বলে নি। রেনলডসই প্রথম সচেষ্ট হন ব্রিটিশ চিত্রকলাকে তার মধ্যযুগীয় এবং প্রাদেশিক সংকীর্ণচেতা মানসিকতা থেকে মুক্ত করে ইউরোপের চিত্রান্দোলনের মূলধারার সাথে সংযুক্ত করতে। টিলি, জোফানি, ডেভিস প্রভৃতি শিল্পীরা যারা কোম্পানির আমলে কোলকাতায় আগত প্রথম ধারার শিল্পী, তারা সকলেই কোন না কোন ভাবে সংযুক্ত ছিলেন রয়্যাল অ্যাকাডেমির সাথে। শুধু তাই নয়, তৎকালীন ইংরেজদের মনেও শিল্পকর্মের আদর্শভিত্তিক যে ভিত্তি প্রোথিত হয়েছিল, তা ইতালির রেনেসাঁ কেন্দ্রিক। একারনেই ভারতীয় উপমহাদেশের পরম্পরাভিত্তিক চিত্রশিল্প তাঁদের সন্তুষ্ট করতে পারে নি, উপযুক্ত ছবি বলতে তারা রেনেসাঁর আদর্শের ছবি ই বুঝতেন।    

দেশীয় চিত্রকরেরা যে কেবল মানুষজন, পুরাকীর্তি, নিসর্গ ইত্যাদি সম্পর্কে কৌতূহল মেটানোর জন্যেই ইংরেজদের কর্তৃক নিযুক্ত হতেন, তা কিন্তু নয়। এইসব শিল্পীদের অনেকেই ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হয়ে বিশেষ বিশেষ ব্যবহারিক নকশা ও ছবি এঁকে পারদর্শিতা অর্জন করেন। দেশীয় শিল্পীদের প্রমাণ, পরিপ্রেক্ষিত ও ছায়াতপের ব্যাবহারের ক্ষেত্রে অজ্ঞতার কথা ইংরেজ চিত্রবেত্তারা যেমন বারবার উল্লেখ করেছেন, তেমনি তারা প্রতিচিত্রনের কাজে দেশীয় শিল্পীদের নিখুঁত শৈলীর প্রশংসা করেছেন মুক্তকণ্ঠে।  

বিবিধ বোটানিক্যাল গার্ডেন এবং পশুশালা চিত্রণের কাজের পাশাপাশি তাঁদের নিযুক্ত হতে দেখা যায় ভারতের প্রাচীন এবং মধ্যযুগীয় স্থাপত্যের ছবি ও নকশা আঁকার কাজে। এমনকি চিকিৎসা শাস্ত্রের প্রয়োজনীয় ছবিও কোম্পানি শিল্পীরা আঁকতেন। এইসব নানাধরনের ছবি আঁকার প্রয়োজনে আর ব্রিটিশ রীতিতে আঁকা ছবি দেখে দেখে কোম্পানির শিল্পীরা তাঁদের ছবি আঁকার বহুদিনের পুরনো পরম্পরা বদলে ফেলেন। ছবি আকারে বড় হল, হাতে তৈরি বোর্ডের বদলে ছবি আঁকা হতে থাকলো বিলিতি সাদা কাগজে।    

অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগ থেকে নিয়ে উনিশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত সময়কালে স্পষ্টতই দেখা যায়, কোম্পানি নিযুক্ত বাংলার চিত্রশিল্পীরা তিন ধরনের ছবি আঁকতেন। প্রথমদিকে তারা মুঘলরীতির মুর্শিদাবাদ ও পাটনা কলমের ধারাতেই ছবি আঁকতেন, যদিও বিষয়বস্তুর কারণে তার মধ্যে কিছুটা স্বাতন্ত্র দেখা গিয়েছিল। দ্বিতীয় পর্যায়ে এসে, কোম্পানি দ্বারা বিভিন্ন ব্যবহারিক কাজে নিয়োজিত হবার পর তাঁদের কাজে দ্রুত ব্রিটিশ করণকৌশল ও পাশ্চাত্য চিত্রকলার বাস্তবানুগতার ছাপ পড়তে থাকলো। এইসব কাজ, বলে নেয়া ভালো যে, এমনই তথ্যনিষ্ঠ যে এগুলিকে কলাশিল্পের পর্যায়ভুক্ত না করে বলা চলে চিত্রিত নথি। তৃতীয় পর্যায়ে, উনিশ শতকের ত্রিশ থেকে ষাটের দশকের মধ্যে কোলকাতার কোম্পানি শৈলীর শিল্পীরা বিশেষ মনযোগী হন নানান পেশার মানুষদের ছবি দিয়ে সেট তৈরি করে ইংরেজ ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করতে। এইসব কিছু কিছু সেট এখনও রক্ষিত আছে লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরীতে এবং আরও কিছু সংগ্রহশালায়। এই সময়ের চিত্রকরদের ছবিতে ভিক্টোরিয়ান আমলের ইংরেজি চিত্রকলার ছাপ দেখা যায়। ফলে অ্যাকাডেমির বাস্তবতার সাথে যুক্ত হয় বর্ণাঢ্যতা। আগেকার একঘেয়ে ছাই আর খয়েরি রঙের বদলে দেখা যায় উজ্জ্বলতর নীল, বেগুনি, হলদে আর গোলাপির ব্যবহার।    

কোম্পানির শিল্পীদের ছবির চাহিদা কোলকাতায় উনিশ শতকের ষাটের দশক পর্যন্ত ছিল বলে জানিয়েছেন চিত্র ঐতিহাসিক মিলড্রেড আর্চার। তারপর ফটোগ্রাফির প্রচলন ও প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের ছবির কদর কমতে থাকে।                                                                                       

লেখকঃ সাজিদ উল হক আবির

কথাসাহিত্যিক, গবেষক, ও অনুবাদক। তিনি ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ইংরেজি বিভাগে অধ্যাপনারত।