ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

উপন্যাসঃ সময়ের স্পন্দন (পর্ব-১) - লিখেছেন - মৌরি হক দোলা



এবারের ঈদটা বেশ ভালোই, মেঘলা মেঘলা গেল। কেমন ঠান্ডা ঠান্ডা চারিদিক। একটু আধটু হালকা পাতলা বৃষ্টিও হয়েছে বৈকি। শৈলী তখন বাবা আর ছোটভাইকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছে। ঘোরা বলতে ওই যতদূর পারা যায় হেঁটে আসা। প্রতিবছরই ওরা ঈদে এমন ঘুরতে বের হয় বিকেলবেলা। মফস্বল শহর। তেমন দর্শনীয় কোনো স্থান নেই। মায়ের চাকরির সুবাদে ভিন শহরে থাকা হয় বিধায় ধারেকাছে তেমন কোনো আত্মীয়ও নেই যে তাদের বাসায় যাবে। তাই প্রতি ঈদেই বিকেলবেলা তিনজনের এই পথচলা। যদিও সকালবেলা শৈলী তার বান্ধবীদের সাথে এক রাউন্ড দিয়ে ফেরে, তবুও কি ঈদের দিন নতুন সাজে ঘরে বসে বোর হতে কারো ভালো লাগে?


আজকের ব্যাপারটা অবশ্য ভিন্ন। প্রতি ঈদের চেয়ে এই ঈদটা শৈলীর জীবনে একটু ভিন্নই বটে। তাই সে নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য সকালে চোখে গাঢ় করে কাজল দিয়েছিল। ঠোঁট রাঙিয়েছিল লাল রঙা স্টিকে। জীবনে প্রথমবার চোখর পাতায় শ্যাডো ছুঁইয়েছিল। নিজেকে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার মাধ্যমেও যদি একটু ভালো থাকা যায়! মা অবশ্য তেড়ে ওঠেছিলেন, আরে এতো সাজিস না! ভূতের মতো লাগবে! তুই সিম্পল থাক, তোকে সিম্পলই ভালো লাগবে। কিন্তু শৈলীকে আজ সাজের নেশায় ধরেছে। সচরাচর ও সাজে না বেশি। সিম্পলই থাকে। মাও দেন না সাজতে। কালো মেয়েরা বেশি সাজগোজ করলে নাকি ভূতের মতো লাগে। শৈলীর বিরক্ত লাগে ব্যাপারটা। গায়ের রং ফর্সা হওয়ায় সাজের অধিকারটাও কি ফর্সা মেয়েরা একাই ভোগ করবে? যারা কালো তাদের বুঝি ইচ্ছে করে না একটা মেকআপ বক্স নিজের সম্পত্তির তালিকায় রাখতে? মাঝে মাঝে একটু জাঁকজমক করে সেজে ঘুরতে বেরোতে? তবে কথা সত্যি.. শৈলীকে সিম্পলই খুব সুন্দর লাগে। ওর চোখে যেন কেমন মায়ামায়া একটা ভাব। হাসলে যেন সেই মায়াটাই সারা চোখেমুখে ছড়িয়ে পড়ে।

বাসা থেকে বেরিয়ে যখন ওরা তিনজন নদীর পারের দিকে হাঁটতে হাঁটতে এগুচ্ছে, হঠাৎ বৃষ্টি তেড়ে এল। পড়িমড়ি করে ছুটল রাস্তার পাশের দোকানের ছাউনিটায় আশ্রয় নিতে। আস্তে আস্তে কেমন মেঘ কেটে রোদ উঠছে, তবে বৃষ্টি পড়ছেই ঝরঝর। আজ কি তবে খেঁকশিয়ালের বিয়ে টোপর মাথায় দিয়ে? শৈলীর ছোটভাই পান্থ ওর বাবাকে জিজ্ঞেস করে। শৈলী আর কিছু শুনতে পারে না। চট করে ‘বিয়ে’ শব্দটাই কেবল ওর কানে বাজে। আবার অন্যমনস্ক হয়ে যায়। বুকের মধ্যে চাপ ধরে আসে। দোকানের ছাউনির সাথে লাগোয়া বাঁশটায় মাথা হেলিয়ে বসে থাকে। কিছুটা সম্বিত ফিরে আসে একটি ভ্যানগাড়ি দেখে। চারজন পরিচিত মানুষ বসে আছে গাড়িটায়। পেছনে ওর বয়সী যে মানুষটা বসা সে হঠাৎ শৈলীকে দেখে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। শৈলী ফ্যাকাশে হাসি হাসে। তোমার মিথ্যে অহংকার আর গেল না সৌরভ!




বেশ অনেক দূর অবধি গিয়েছিল শৈলী, পান্থ আর ওদের বাবা। বাবা মানুষটা কেমন যেন একটু সহজ-সরল, মিশ্র প্রকৃতির। কখনো দিলদরাজ হয়ে সবার সাথে গল্প জুড়ে দেন। তখন যেন খই ফোটে তার মুখে। আবার কখনো কখনো এতটা রূঢ় যে তার সামনে যেতেই ভয় হয় শৈলীদের। এই যেমন আজ দুপুরেই… শৈলী আর পান্থ ঘুরতে বেরোবে বলে তৈরি হচ্ছে, আর ওদের বাবা অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে শুয়েছিলেন। তার কথা, আজ ঈদের দিন, সবাই বেরোবে। রাস্তায় ভীষণ ভিড় হবে। আর এই ভিড়ের মধ্যে সে কিছুতেই যাবে না। শৈলী আর পান্থও নাছোড়বান্দা। তারা এমন এক দিনে ঘরে বসে বিকেলটা মাটি করতে রাজি নয়। তাই নিজেদের সাহস না থাকলেও বাবাকে কাবু করার মোক্ষম হাতিয়ার মাকে ব্যবহার করে তারা। আসমা অনেকক্ষণ যাবত বুঝিয়ে শুনিয়ে তারপর রাজি করায় ওদের বাবাকে।


আর এখন? বড় রাস্তার দু’পাশে সারি সারি সবুজ গাছের ছায়ায় দুই সন্তানকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে রাজ্যের গল্প জুড়ে দিয়েছেন। এদিকটায় তেমন ভিড় নেই। অনেকক্ষণ পরপর দুটো একটা করে বাস গাড়ি চলে। মাঝেমাঝে ভ্যানগাড়ি মেলায় যায় একদল যাত্রী নিয়ে। আর এই মোটামুটি ফাঁকা, সবুজে ঘেরা রাস্তাতেই গল্পের ফাঁকে ফাঁকে গলা ছেড়ে গান গেয়ে ওঠেন জাহিদ রহমান, মানে শৈলী-পান্থর বাবা। হঠাৎ এমন গান শুনে রাস্তায় যে দু-একজন লোক চলাফেরা করে তারা তাকিয়ে দেখে। শৈলী আর পান্থ বিব্রত হয়। মুচকি মুচকি হেসে বাবাকে খোঁচায় গান বন্ধ করার জন্য। আর তখনই যেন জাহিদ রহমানের কন্ঠ সপ্তমে চড়ে।


হঠাৎ পান্থ বলে, বাবা, আর হাঁটতে পারছি না। একটা ভ্যান নাও।
- কেনো? তোরা না হাঁটতে বেরোলি? এখন আবার ভ্যানে উঠতে চাচ্ছিস কেন? জানিস, আজ ঈদের দিন, ভাড়া কত…

শৈলী কথা শেষ করতে দেয় না। কথা শেষ হওয়ার আগেই বলে উঠে, না, বাবা। অনেক হেঁটেছি। এখন একটা ভ্যান নাও। মেলা দিয়ে ঘুরে বাসায় ফিরি। আমার শরীরটাও ভালো লাগছে না।


ঈদ উপলক্ষ্যেই ৩০টাকার ভাড়া ৮০টাকা দিয়ে তাদের উপজেলায় আসতে হয়। উপজেলার মেইন গেইট দিয়ে ঢুকতেই হাতের বাঁপাশে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বাসভবন। নতুন রঙ হয়েছে। এইতো দিন পনেরো আগেই তো আগের ইউএনও স্যারের ফেয়ারওয়েল হয়ে গেল। শৈলী রূপুর সাথে কোচিং থেকে ফেরার সময় দেখেছিল। ইউএনও স্যারের ছোট মেয়েটা পান্থর সাথে এক স্কুলেই পড়ত। পান্থ প্রায়ই এসে গল্প করত। ওর থেকে গল্পগুলো শুনতে শুনতে নিজের শৈশবের কথা মনে পড়ে যেত শৈলীর। ওদের সাথেও ক্লাস ওয়ানে পড়ার সময়ই উপজেলা নির্বাহী অফিসারের ছেলে পড়ত। ছেলেটা বড় দুষ্টু ছিল। ক্লাসে ওর দুষ্টুমিতে হাসির হিড়িক পড়ে যেত সবার মাঝে। আর কেন জানি শৈলীর সাথেই ভীষণ বাধতো ছেলেটার। একবার তো শৈলীকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে এমনভাবে ফেলেছিল যে শৈলী যন্ত্রণায় সাতদিন পর্যন্ত ঠিকভাবে হাঁটতেই পারেনি।


হঠাৎ কথাটা মনে পড়ায় শৈলীর হাসি পেয়ে গেল। কেন যেন মনে হল… ইশ, নতুন ইউএনও স্যারের ছেলে বা মেয়ে এবার আমাদের সাথে ভর্তি হত! আবার তৎক্ষণাৎই মনে পড়ল, বছরের সাত মাস তো চলেই গেল। জেএসসির প্রাথমিক রেজিস্ট্রেশনও হয়ে গিয়েছে। এই সময় কি আর কেউ ট্রান্সফার হয়? না ছেলেমেয়েকে নতুন কোনো স্কুলে ভর্তি করায়?


এলোমেলো ভাবতে ভাবতেই মেলার কাছে চলে এল ওরা। তিনজনই ভেতরে ঢুকল। পান্থ এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে দেখছে আর সাথে বাবাকেও দেখাচ্ছে। নাগরদোলায় উঠবে বলে বায়না করছে। শৈলীও অবশ্য সবই দেখছে। কিন্তু আদৌ কি দেখছে? আবার সেই চিন্তাটা হঠাৎ ফিরে এল। বুকের মধ্যে কেমন মোচড় দিয়ে উঠল। “সত্যি? নাকি মিথ্যা?” দম বন্ধ হয়ে আসতে লাগল শৈলীর। পৃথিবীর সমস্ত সাগর মহাসাগরের জল যেন তার চোখের কোণে এসে ঠেকল। অনেক কষ্টে সামলে নিয়ে বাবাকে বলল, বাবা, আমার খুব খারাপ লাগছে। আমি বাসায় যাচ্ছি। তোমরা এস পরে।

জাহিদ রহমান কিছুই বললেন না। শৈলী চলে গেল। মেয়ের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে সে কেবল ভাবল, আমার মেয়েটা জন্ম থেকে কেন এত কষ্ট করছে? আল্লাহ কি ওর মুখে কখনো হাসি দেবেন না??




মেলা হচ্ছে উপজেলার মাঠে। ওখান থেকে শৈলীদের বাসায় হেঁটে যেতে তিন-চার মিনিটের পথ। তাই জলদি পা চালিয়ে আরো তাড়াতাড়ি বাসায় আসতে পারল শৈলী। এসেই সটান ওয়াশরুমে ঢুকে গেল। আসমা ব্যাপারটা আঁচ করতে পারল। প্রথমে কিছু বলল না। একটা নিঃশ্বাস ফেলল কেবল। কিন্তু পাঁচ মিনিট পার হওয়া সত্ত্বেও যখন শৈলী বেরিয়ে এল না, আর ধৈর্য ধরে রাখতে পারলেন না আসমা। দরজায় টোকা দিতে লাগলেন বারবার।

-এই দরজা খোল। কি করছিস এ্তক্ষণ? দরজা খুলতে বলছি আমি।

শৈলী উত্তর দিতে পারছে না। কান্নার শব্দ ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাচ্ছে বুকের ভেতর থেকে। দু’হাতে মুখ চেপে আছে। আর হাতের উপর গড়িয়ে পড়ছে চোখের নোনাজল। শৈলীর সাড়া না পেয়ে আসমা আরো চেঁচামেচি শুরু করে দিয়েছে এতক্ষণে। শৈলী জানে, মা ভীষণ বুদ্ধিমতী। মায়ের থেকে কিচ্ছু লুকোনো সম্ভব না। মা ওর চোখ দেখে মনের কথা বলে দিতে পারে। এতক্ষণে অবশ্যই সে বুঝে নিয়েছে শৈলী এতটা সময় ওয়াশরুমে কি করছে। কিন্তু কি করবে শৈলী? কিভাবে তার মনের যন্ত্রণাকে চাপা দেবে? কিভাবে সত্যটাকে বারবার আড়াল করবে? সকাল থেকে সে বহু চেষ্টা করেছে… কিন্তু… নাহ! সে ব্যর্থ! আবারো ব্যর্থ!


হঠাৎ বাইরের দরজাটা খোলার আওয়াজ হল। বাবা আর পান্থ ফিরে এসেছে। মাগরিবের আজানও শোনা যাচ্ছে। নাহ, শৈলীকে এবার বেরোতে হবে। মায়ের সামনে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করতে হবে। মুখে পানির ছিটে দিতে দিতে শৈলী শুনল…

- শৈলীর কি হয়েছে? ওকে বকেছো?
- কই না তো!
- তাহলে? রাস্তায় কেউ কিছু বলেছে?
- নাহ! কেনো? ওর কি হয়েছে? কোথায় ও? ও তো বলল ওর শরীরটা নাকি ভালো লাগছে না। তাই আমাদের রেখেই চলে এল।
-ও… আচ্ছা, বুঝেছি!


বুঝেছি? মা তাহলে সত্যি বুঝে গেল? পারলাম না লুকোতে? এখনই তো বাবাকে কোনো এক উছিলায় বাইরে বের করে দিয়ে আমার কাছে এসে বসবে। মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে রাজ্যের কথা জিজ্ঞেস করবে। তারপর একটা সময় আবারো….


শৈলীর চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু পারছে না। শৈলীর খুব কষ্ট হয়। এ দুনিয়ায় শৈলীকে কেউ বোঝে না। আর এই ব্যাপারটাতো আরো না! কিন্তু শৈলী কি করবে? শৈলীর হাতে কি কিছু আছে? না কি কখনো ছিল? শৈলী কতবার চেষ্টা করেছে এই মায়ার জাল থেকে বেরিয়ে আসতে! যা কখনো হওয়ার নয় তা নিয়ে না ভাবতে! কই তাও তো পারেনি! সেই ঠিকই একটুখানি আঁচ পেয়েই পাগলের মতো করেছে। মাথার উপরে এখন যে সিলিং ফ্যা্নটা ঘুরছে, সেটাও ছোঁয়ার চেষ্টা করেছে। পারেনি। সাহস হয়নি। কেবল প্রাণ খুলে একা ঘরে কেঁদেছে।

সেই কান্নার ছাপ যখন চোখেমুখে জড়িয়েছিল, তা দেখে মা বুঝে গিয়েছিল ঘটনা! প্রথমেই এলোপাথারি কিছু চড় দিয়ে বুকে টেনে নিয়েছিল। বুঝিয়েছিল অনেকক্ষণ। খুব সুন্দরভবে। তাও শৈলীর চোখের পানি বাধ মানেনি। তাই দেখে আবার দু’কথা শুনিয়েছিল এবং আবারো বুঝিয়েছিল। শৈলী তখন বুঝতে চাইলেও তার মন বুঝেনি। এটা বুঝেও শৈলী কেবল মায়ের ভয়ে চুপ মেরেছিল। স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করেছিল। আজকের দিনটায় সকাল-বিকেল সেজেগুজে…. কিন্তু নাহ! শৈলীর সমস্ত শক্তি ফুরিয়ে এসেছে প্রায়। তার মন এখন আবারো মুক্তি চায়, চিৎকার করে কাঁদতে চায়। কিন্তু মায়ের ভয়ে বুকে একটা পাথর চেপে রয়। বালিশে মুখ গুজে দেয়। আসমা পাশের রুম থেকে আবছা শুনতে পায় শৈলী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে…

লেখকঃ মৌরি হক দোলা

ইতিহাসনামার একজন সাব এডিটর।স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসেন,ভালোবাসেন সে স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকতে।