ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

মেদিয়া - লিখেছেন - নাজমূ শাহাদাৎ সিদ্দিকী


ধর্মীয় কারণে ছয়টা দিন ছুটি পেয়েছি। আমার জন্যে এটা সাধারণ বেচে থাকার যুদ্ধে সাময়িক যুদ্ধ বিরতি মাত্র।


স্বাভাবিক একটা মধ্যবয়স্ক ফ্যামিলি ম্যানের জন্যে এটা অনেক। হয়তো পরিবারকে নিয়ে উৎসবের কেনাকাটা, সাড়ম্বরে ভুরিভোজ, বেড়াতে যাওয়া ইত্যাদি সামাজিক আচারের যথেচ্ছ উপযোগিতা সাধনের পর ক্লান্ত পরিশ্রান্ত দেহে আবার স্বাভাবিক কর্মযজ্ঞে ফিরতে উদ্যত হবে আমার সহকর্মীদের জীবন। আজ থেকে পনেরো বছর আগের জীবনটাকে টেনে এতো দূর আনলে হয়তো আমিও এর ব্যতিক্রম হতাম না। অন্তত আমার বাবাকে আমি এমনটাই করতে দেখেছি যতদিন একসাথে ছিলাম। বাবার অনেক গুলো টাকা অপচয় করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা নামক বিলাসবহুল চেতনার গ্লানি টানতে টানতে যখন টেনেটুনে কোনমতে একটা ডিগ্রী জোটালাম তখনও বাবা চুপ ছিলো। কিন্তু আত্মীয়স্বজন স্বভাবতই ছিলোনা। তারপর অনেক চেষ্টা তদবীর চালিয়ে একটা হাজার পনেরো মাইনের চাকরি জোটালাম। বছর যায়, বছর আসে, বাবার রিটায়ারমেন্ট হয়, সংসারের খরচ চক্রবৃদ্ধির হারে বাড়তেই থাকে। হাজার হোক সদ্য মধ্যম আয়ের দেশে পা রাখা ফুলে ফেঁপে ওঠা জিডিপির দেশে ছাপোষা মানুষের টিকে থাকাটা একটা বিলাসিতাই হয়ে দাঁড়ায় বটে। দুর্মূল্যের বাজারে টিকে থাকতে ডারউইনের প্রাকৃতিক নির্বাচন তত্ব মেনে চলতে হয়। দেশ থেকে কেটে পরেও ছাপোষা মানুষগুলোর কিছুই হয় না জেনেছিলাম অনেক আগেই। দিনকে দিন বাবা মুখ খুলতে বাধ্য হলেন, যেমন করে খাদ্যহীন ক্ষুব্ধ শিশু ক্ষুধায় গ্রাস বড় করে চিৎকার করতে বাধ্য হয়। তারপর কাপুরুষের মতো ঘর ছাড়লাম আমি।


হাজার পনেরো মাইনের চাকরিটা টিকিয়ে রাখতেও মাঝে মাঝে বেগ পেতে হতো। নতুন চাকরি খোঁজার ইচ্ছেটাও হারিয়ে ফেললাম ধীরে ধীরে। পরিবারের কোন খোঁজখবর নিই না। কেমন আছে কোথায় আছে নাকি সব মরে পরে আছে ওটুকু আগ্রহ ও অযাচিত মনে হয়। হয়তো কথা শোনানো আত্মীয় স্বজনের থেকে ধার দেনা করে চলছে কোন ভাবে। এতে আমার কিছু এসে যায়না। হাজার পনেরো টাকা থেকে এখন মাইনে পঁচিশে পৌঁছেছে। মেসবাড়িতে খেয়ে পরে মাস শেষে হাজার দশেক থাকে। ওগুলো ভদ্র সমাজের গোপন ব্যয়ের খাতে আমি উড়াই দেদারসে। সঞ্চয়ের বাতিক নাই, সৌখিনতার বালাই নাই, সংসার ধর্মের বাতুলতা নাই, বেশিদিন বেঁচে থাকার ইচ্ছাও নাই। আমার কাছে বিয়েশাদি করে বাচ্চা পয়দা করা নিত্যকার মতো ঘেন্না ধরানো একটা পাশবিক কর্মযজ্ঞ ছাড়া আর কিছু না। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতেই চিরকুমার এক স্যারকে বলতে শুনেছিলাম, “Procreate and proliferation is the least humane thing to do but still consideblack as a profane ritual in every religion”। এতো আয়োজন করে যে জৈবিক চাহিদা মেটাতে সব ধর্ম উৎসাহিত করে আবার সেই সঙ্গম এর পর আবার প্রভুর কৃপার জন্যে পবিত্র হতে হয়। ব্যাপারটা একদম পরষ্পর বিরোধী মনে হয় আমার কাছে। স্রেফ জৈবিকতা মেটাতে আমার মতো একটা অর্থহীন জীবনের পুনরাবৃত্তায়নে সচেষ্ট হওয়া রীতিমতো পাপ ঠেকে আমার কাছে। সদা বর্ধমান এন্ট্রপির তোয়াক্কা না করে আমরা অকোষীয় জীবের মতো নিত্য বেড়ে চলেছি, যেন পৃথিবীটা আমাদের একার। এসব ভাবতেও ভালো লাগেনা।


এই ছয়টা দিন পানিতে ভেসে থাকবো সিদ্ধান্ত নিলাম। মানে নৌকায় থাকবো। জীবন বড় অদ্ভুত। সেদিন ইচ্ছে করছিলো ছাদ থেকে ঝাঁপ দিবো। হয়তো সব চুকেবুকে যেতো। কিন্তু কেন জানি এই জীবনটার প্রতি অসম্ভব টান কাজ করে। ওই পূর্বপুরুষের মজ্জাগত আদিম টানেই জীবনের দাড় টানছি লক্ষ্যহীন গন্তব্যে। অফিস থেকে ফিরে ব্যাগে দুটা লুঙ্গি আর দুটা টিশার্ট নিয়ে বেরুতে যাবো এমন সময় মেসের রুমমেট বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলেটা তাচ্ছিল্যের সুরেই বললো,

“আংকেল কি ট্যুরে জান নাকি?” ও জানে আমার ঘর বাড়ি বলতে কিছু নেই।

আমি বললাম, “হ্যাঁ, কোন সমস্যা আছে নি?”

ও বললো, “না সমস্যা থাকবো ক্যান? কবে আইবেন বুয়াত্তে কইয়া যাইয়েন? আমি ঈদের ছুটি কাটাইয়া আইতে আইতে আরো দুই সপ্তাহ। কালকে সকালেই বাইত যামু।“

“আমি আইয়া পড়মু দুই তিন দিনের ভিত্রে। তুমি কুমিল্লার টিকেট পাইসো?” যদিও শেষের প্রশ্ন নিতান্তই অনিচ্ছায় করলাম।

“জি আংকেল পাইসি। জাইবেন কই?“

“সুনামগঞ্জ।“ কথাটা বলেই আর দেরি করলাম না।


            ধূমপানের প্রয়োজনীয় উপকরণ সব সংগ্রহের জন্যে প্রথমেই গেলাম বেড়িবাধের বস্তিতে। তারপর তাড়াহুড়া করে গেলাম শ্যামলী। একটা হোটেলে টমেটো দিয়ে রাঁধা সিলভার কার্প মাছের টুকরো দিয়ে ভাত খাচ্ছি। হোটেল বয় পিন্টু বেশ খাতির করে খাওয়ায় এলেই। এমন না যে আমি বেশি টিপস দেই। একবার কেন যেন মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়েছিলাম ওর বাবা মারা যাবার সংবাদ পেয়ে কান্না করা অবস্থায়। হয়তো আমার টাক পড়া চেহারা দেখে ওর বাবার ছায়া খুঁজে পায়।

 পিন্টু বললো “ছাড়, আজকে মাসকালাইর ডাল আছে। দেই?”

আমি দিতে বলতেই এনে দিলো মাছ ভাত আর মাসকালাইর ডাল খেয়ে যেন আমি দুলছি ভাতের নেশায়।বাসের টিকিট কেটে একটা আয়েশ করে একটা সিগারেট খেলাম। বাসে উঠেই ঘুমিয়ে পড়েছি। ঘুম ভাঙলো পিছনের এক যাত্রীর চিৎকারে। চালককে উদ্দেশ্য করে বলছে “ওই মাঙ্গির পোলা কি চালাস গাড়ি? পিছে কি মাইনষে বইসে না কুত্তা বইসে? ট্যাহা কম দিসিনিরে? কইলজা গুরদা দো থ্যাকনার চোডে একলগে কইরা লাইতাসস। আতুঝুড়িডি বাইরাই জাইজ্ঞাইতসে।“ আঞ্চলিক টানে বুঝলাম বেচারা কুমিল্লার। আজ পনেরো বছর বাড়ি যাই না। অথচ এলাকার লোক দিয়ে শহর ভর্তি। জানতে পারলেই মুখ বাচিয়ে চলি। পাছে আমাকে চেনে। এখন হয়তো আর চিনবেও না আত্মীয় স্বজন দেখলে। ছাইপাঁশ খেয়ে বয়সের ভারে ন্যুব্জ, চোখের নিচে কালো দাগ, হাই পাওয়ার এর চশমা, মাথায় টাক, কালো ঠোটের গোঁজামিলের এই চেহারা আমি আমার নিজের পুরান ফটোর সাথেই মেলাতে পারিনা। ওরা মেলাবে কি?


            সুনামগঞ্জে পৌছালাম সকাল ১০ টার দিকে। ছাতক পেরুলে পথের দু ধারে খালি পানি আর পানি। এমন আধ ডুবন্ত রাস্তা ধরে অনেক বছর আগে বাবার সাথে এসেছিলাম এখানে। এখন বয়স, চাহিদা, প্রেক্ষাপট, সমাজের মাপকাঠিতে আমার চরিত্র সবই ভিন্ন। ভীমরতি উঠে গণিকালয়ে যাতায়াত সমাজের অগ্রহণযোগ্য এখনো। দুজনের চাহিদা মেটানো দায়িত্বের গন্ডিহীন পশুত্বের ছিটেফোঁটা ফেলে আসার এই আসাযাওয়া আমার কাছে স্বাভাবিক। যাক সেসব কথা। একটা মোটরসাইকেলে চরে যেতে হবে টেকেরঘাট। দরদাম করে উঠে পড়লাম। ঈদের আগে তেমন যাত্রী নেই বললেই চলে। টেকেরঘাট পৌঁছাতে বারিক্কাটিলার কাছে একটা নদী পেরোতে হয়। জাদুকাটা নদী। ভারতের পাহাড়ী ঢল নামায় প্রচন্ড স্রোতের বিপরীতে খেয়া পারাপার হতে মাঝির বেশ বেগ পেতে হয়।


            সন্ধ্যা প্রায় হয় হয় করছে। দূর পাহাড়ে টিমটিম বাতি জ্বলছে। মোটরসাইকেলের চালক আমাকে বললো, ওটা একটা মাজার। মাজারের পাশেই ভারতীয় সীমান্ত চৌকি। যতদূর জানতাম ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হয়েছিলো তাহলে ভারতের সীমান্তে না হয়ে তো বাংলাদেশের ভাগেই মাজার পড়ার কথা। আমার আগ্রহ বুঝেই লোকটা বলতে শুরু করলো, “আপনে শুনলে ত আরো বিশ্বাস যাইতেন না, মাজারটা বাংলাদেশির। তাও আবার এক বিডিআর(সাবেক সীমান্তরক্ষী) হাবিলদার এর।“ আমি তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম গল্পটা আমি শুনবো। তার আগে পেটে দানাপানি দিতে হবে। সেই গত রাতে খেয়েছি। চালক বেশ মায়া বোধ করলো মনে হয়।


নদী পেড়িয়ে টেকেরঘাট বাজারের পাহাড়ি পথে সুসঙ্গত গতিতে চালাতে চালাতেই বললো, “ভাইসাব ভাতের কষ্ট হামরা বুঝিয়ের। আম্নেরে কতখনের ভিত্রেওই বাজারো লইয়া জাইতাসি। ইখানো আগে পাত্থর উডাইবার খল (কল) আসলো। আমরা রোজ কাজ খরতাম। জেব্লা (যখন) পাত্থর উডাইতে উডাইতে ভারতের সীমানায় গেলোগা হেইশোমো থাখি মিল বদ্ধ। আমি খিতা খরতাই কুনুতা কাম নাই ইখানো। মাস (মাছ) মাইরা খাইবার ফারি না। কতলা জমাইন্না ট্যাখা দিয়া এই হুন্ডা কিঞ্ছি। অখন পেটটা ভইরা ভাত খাইতায় ফারি।“  আমি তাকে বলতে যাবো সাবধানে চালাতে অমনি সে বলে, “ভাউ ইডাওই ট্যাখের ঘাট। আফনে খিতা নৌখাত থাকবাইন নি? আমরার নৌখা আছে। আফনে কিছু খাই লন” আমি হাঁফ ছেঁড়ে বাচলাম। নৌকা ঠিক করার ঝামেলা পোহাতে হবেনা। স্মার্টফোনের এই যুগে আমার আনস্মার্ট ফোনে তার নাম্বারটা টুকে নিলাম দেখে সে হয়তো ভাবলো ভালো পয়সা পাবে কিনা। একটু সংকোচ বোধ করছে। আমি তাকে অভয় দেয়ার জন্যে বুঝাতে চাইলাম টাকা কড়ি আছে। তাই একটু ইশারা করে ফিসফিসিয়ে বললাম, “পানিটানি থাকলে নৌকায় ব্যবস্থা করতে পারবেন?” সে রীতিমতো ধাক্কা খেলো। থাক ওসব এখন পাত্তা দেবার সময় নেই। পেট পুজা করতে হবে। পাশের এক হোটেলে বসে পড়লাম। হাওরের মহাশোল মাছ পাওয়া যাবে শুনে ত আমার আর তড় সইছিলোনা।


খেয়ে দেয়ে একটা সিগারেট ধরালাম অম্নি বাজারে একটা জটলা তৈরি হলো। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, "ভাই কি হইসে?" ও হন্তদন্ত হয়ে সেইদিকে ছুটতে ছুটতে বললো, “হাবিলদার বাবা আইনুদ্দির পা ধোঁয়া পানি আনসে হেইতানের ফুয়া (উনার ছেলে) ভারতেত্তে।“ আমার কাছে বিষয়গুলি অগোছালো লাগছে। দেখলাম সবল গড়নের কুচকুচে কালো এক লোককে ঘিরে এতো যজ্ঞ। তার থেকে সবাই পানি নিচ্ছে আর পয়সা ফেলে যাচ্ছে। অল্প পানিতে নিয়ে তাতে কলের পানি মিশালেই হলো। পানির গুনাগুণ নষ্ট হবেনা। অবস্থাদৃষ্টে যতদূর বুঝলাম এই পানির গুনাগুণ হচ্ছে, পুরুষত্ব দেয় সে। জন্ম দেয়ার অমোঘ ক্ষমতা অক্ষয় করে এই পানি। জন্ম দিয়ে চিহ্নটুকু রেখে যাবার কি অনিমেষ ইচ্ছা মানুষের তা সত্যিই অবাক করা। তাও আমার এর ব্যাপারে জানতে ইচ্ছে হলো। কারণ লোকটা বিডিআর এর হাবিলদার (সার্জেন্ট), আবার লোকটা বাংলাদেশি, কিন্তু মাজার ভারতে। আগ্রহ ক্রমেই বাড়ছে। রাত ও বাড়ছে। ওই মোটরসাইকেল চালক আমার চরিত্র বুঝে আর আসবে না সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। বাজার প্রায় খালি হতে বসেছে। আইনুদ্দির ছেলে কে দূরে এক পান দোকানে পান চিবোতে দেখলাম। আমি গিয়ে কাছে দাঁড়িয়ে একটা পান নিলাম।

আইনুদ্দির ছেলে আমাকে দেখে জানতে চাইলো, “ভাইসাব আইসুইন ঢাকাত্থাখি (ঢাকা থেকে)? নৌকা নিসুইন না? (নৌকা নেন নি?) “

আমি বললাম,”ভাই নৌকা ত পাইনি”

তিনি বললেন, “ঈদের ফরে হইলে ফাইতেন। আম্নের পরিবার নাই? পরশুই ঈদ।“ আমার নিরবতা দেখেই নিজেই বলতে শুরু করলো, “আইচ্ছা আসেন, আমার নৌকা আছে। আফনের অইভ্যাস টইভ্যাস আছেনি?” (ইশারায় বুঝালো খারাপ অভ্যাস আছে কিনা)।

আমি তার সাথে এগুতে এগুতে বললাম, “আমার কাছে শুকনো জিনিসপত্র আছে। চলবে?”

সে সম্মত হলো। ঘাটে গিয়ে নৌকায় উঠে বুঝলাম ইনিই মাঝি। আমি তার নাম জিজ্ঞেস করলাম। সে জানালো জয়েনুদ্দি। পরিবারে ক’জন জানতে চাইলাম।

তাঁর উত্তর, “দুই স্ত্রী আর সন্তান সহ পরিবারে চইদ্দ (১৪) জন। বিশাল পরিবার। একজনের ঘরে ৭ জন বাকি ৪ জন আরেক ঘরের। আপ্নেরে সব কমু। চলেন বিলের মইদ্ধে যাই। মেঘ আসবে। এই মেঘে বাতাস কম থাকে। আর নৌকা দুলে। আরাম পাইবেন।“

আমি বললাম, “ঠিক আছে চলেন।“

বলতে না বলতেই মেঘালয়ের বিখ্যাত বৃষ্টি শুরু হলো। এতক্ষণ গুমোট ছিলো চারপাশ। দুনিয়া ভেঙে বৃষ্টি নামছে। অথচ আকাশে কোন গর্জন নেই। বিদ্যুৎ চমকের দমক নেই। নৌকার ছইয়ের ভেতর থেকে ভারতের সীমান্তের কমলা আলো দেখা যাচ্ছে। নৌকাটা মৃদু দুলছে। ছইয়ের বৃষ্টির ঝুম শব্দ, পানির ছলাত ছলাত ধ্বনি একটা অদ্ভুত মাদকতা তৈরি করছে। মাঝি আর আমি শুধু নৌকায়। একটা কাঁথা গায়ে জড়িয়ে সিগারেট ধরালাম। মাঝি ধরালো গাঁজা। আমি কিছু বললাম না। তাঁর গল্প শুনতে আমি প্রস্তুত।

তাঁর গল্প সে তাঁর আঞ্চলিক ভাষা আর সচেষ্ট প্রমিত বাংলায় চালাতে লাগলো। আমি আমার ভাষায় তাঁর জবানি তুলে ধরলাম।


            “আমার বাবা আইনুদ্দি ছিলেন বিডিআর এর জওয়ান। তাঁর বাড়ি ব্রাহ্মনবাড়িয়ার নবীনগর। পানির দেশ। এই পানির দেশের হাল হকিকত তো বুঝেনই, নদীর জোয়ার ভাটায় চর ভাঙার মতো করে জীবন একপাড়ে ভেঙে আরেকপাড়ে গড়ে। বাবা বন্যায় সব হারায়ে ঢাকা শহর গিয়ে ঘুরঘুর করছে। অষ্টম শ্রেনী পর্যন্ত পড়াশোনা করতে পেরেছিলেন। আমার শরীর দেখে ত বুঝতেই পারছেন আমার গড়নের ধাঁচ। আমার বাবা আমার চেয়ে আরো সৌষ্ঠব ছিলো। তাই সহজেই ঢুকে গেলেন বিডিআর এ জওয়ান পদে।

 নিয়তির কি পরিণতি, বাবার পোস্টিং হলো এই পানির দেশ সুনামগঞ্জেই। বিডিআর এর তাহিরপুর চৌকিতে। নিয়মিত টহলের সময় একদিন হাওরে ঝড় উঠলো। বাবা যে নৌকায় তা বাতাসে উল্টে গেল। একই নৌকায় থাকা আরেক জওয়ান ঝড়ের তোড়ে কোথায় গেলো কে জানে। বাবা পানির দেশের মানুষ। বাবা সাতরে গিয়ে উঠলেন হাওরের এক বাড়িতে। বাড়িটা ছিলো অই এলাকার বনেদী বাড়ি- জুম্মন তালুকদার এর। বাবার পোষাক দেখে বাবাকে ব্যাপক তোষামোদ করা হলো। জুম্মন তালুকদারের কোন ছেলে ছিলো না। বিশাল সম্পত্তির কোন উত্তরাধিকার নেই। জুম্মন তালুকদার এর স্ত্রী সেদিন পোয়াতি ছিল। বাবা দেউড়ী ঘরে ঘুমাচ্ছেন, এমন সময় মহিলার উঠলো প্রসব বেদনা। এই ঝড়ের রাতে হাওরের মাঝে তালুকদার সাহেবের ডাক্তার ডাকানো সম্ভব ছিলোনা। তাই বাড়ির ধাই দিয়েই কাজ চালাতে হলো। ফুটফুটে এক ছেলে জন্ম নিলো সাজিয়া বিবির ঘর আলো কর।  তালুকদার সাহেব নিশ্চিন্ত হতে পারছেন না। এর আগে তাঁর তিন তিনটা ছেলে হয়ে জন্মের ১ ঘন্টার মধ্যে মারা গেছে। সেদিন কি যে হল! ছেলেটা বাচলো। সকালে আকাশ পরিষ্কার করে রোদ উঠেছে। তালুকদারের খুশি আর ধরে না। কেউ একজন বললো এই নয়া কুটুম বাড়িতে সৌভাগ্য নিয়ে এসেছে। তালুকদার সাহেব বাবাকে ১ সপ্তাহ রেখে দিলেন খুশিতে। বিডিআর ধরে নিলো আইনুদ্দি মারা গেছে। বাবার আচার ব্যাবহার দেখে তালুকদার সাহেব বাবার আত্মীয় স্বজন নিয়ে জানতে চাইলেন। যখন জানলেন ইহজগতে তাঁর কেউ নেই তখন তালুকদার সাহেব বাবাকে প্রস্তাব দিয়ে বসেন, “বাবা আপনে আমার বড় মেয়েকে একবার দেখেন। আপনার উপরে জোর নাই। যদি পছন্দ হয় তাইলে আমি আপনাকে আমার মেয়ের জামাই বানাইতে চাই।“ বাবা তালুকদার এর মেয়েকে দেখবেন কি, না দেখেই বললেন তিনি রাজি। ধুমধামে বিয়ে হলো। বুঝতেই পারছেন আমার নানার বাড়ি নয় কুঁড়ি কান্দার ছয় কুঁড়ি বিলে (টাঙ্গুয়ার হাওরে)। সেদিনের সেই সদ্যোজাত  শিশুটি আমার মামা। আমার সেই মামা ১৫ বছর বেঁচেছিলো। তাও তিনি মারা গেলেন বাবা নিখোঁজ হবার পর। এতে করে বাবার কেরামতি মানুষের মনে আরো পোক্ত হয়েছিলো।

 বাবা তাঁর কর্মস্থলে রিপোর্ট করতে গেলে সবাই অবাক। মাঝ হাওরের এই ঝড়ে যে বেঁচে আসে, সে কোন সাধারণ মানুষ না। সবাই এমন ধারণা থেকে বাবার কাছ থেকে পানি ছুঁইয়ে নিয়ে যেতো। সীমান্তের ওইপাড়েও তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়লো। সবাই সন্তান প্রত্যাশা করলেই বাবাকে নিয়ে যায়। আঁতুড় ঘরের কাছে একসপ্তাহ বাবা থাকলেই কোন সন্তান মরেছে এমন নজির নাই। তবে চাকরি করে এই পেশা চালানো অসম্ভব ছিলো। তাও তাঁর সাথের জওয়ানরা কোন না কোন ভাবে তাকে যাবার বন্দোবস্ত করে দিতো। এমনই একদিন খবর আসলো মীরনগর যেতে হবে। মীরনগর জাদুকাটা নদীর পাড়ের গ্রাম। মীরনগরের শরাফত পাটোয়ারীর স্ত্রী সন্তান প্রসব বেদনায় কাতরাচ্ছে। পানি খসেছে কিন্তু প্রসব হচ্ছেনা। তাড়াহুড়া করে বাবা গেলেন। সন্তান প্রসব হলো। ধন্যি ধন্যি পড়ে গেলো।

বাবা একলা ফিরছেন গভীর রাতে। জাদুকাটা নদী পেরোচ্ছেন। ঝড়ের তোড়ে নৌকার ভারসাম্য ছুটে বাবা ভারতের চৌকিতে ঢুকে পড়লেন। পাহাড়ে আশ্রয় নিলেন। ঝড় থেমে গেলে বাবা যখন ফিরছেন, এক ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী দূর থেকে গুলি ছুড়লো। পরে জেনেছি সে ছিলো পাঞ্জাবের। নতুন পোস্টিং হওয়ায়  সে বাবার ব্যাপারে কিছুই জানতো না। যখন লাশ চৌকিতে নেয়া হলো, পুরো ভারতীয় বাহিনী ত ভয়ে অস্থির। কারণ এটা স্পর্শকাতর ব্যাপার। দাঙ্গা লেগে যাবে। তারা বাবার লাশ গুম করে ফেললো।

বাবা নিখোঁজ হবার পরেও তাঁর সহকর্মীরা ভাবতো বাবা ফেরত আসবে। আর এদিকে বাবাকে পলাতক বলে বিডিআর ইতোমধ্যে সমন জারি করে ফেলেছে। আমার বয়স তখন ১৪ কি ১৫। বাড়িতে আমাদের কান্নাকাটি। কেউ জানেনা বাবা কোথায়। তিন মাস পর একদিন আমি ফজরের ওয়াক্তে খোয়াব দেখলাম বাবাকে পুঁতে রাখা হয়েছে ভারতের সীমান্ত ফাঁড়ির ওখানে। আশ্চর্য বিষয় হলো এই স্বপ্ন আমার মা ও দেখলো। তাহিরপুরে ব্যারাকে গিয়ে আমি আর মা সব খুলে বললাম। কিছুই ফায়দা হলোনা। আমরা কাঁদি এ নিয়ে প্রতিদিন। অভাবে আর ক্ষুধায় কান্না আরো বাড়ে।

এর মধ্যে একদিন খবর আসলো বাবার লাশ পাওয়া গেছে। যেখানে আমরা স্বপ্ন দেখেছি সেখানে। ভারতীয় সেই পাঞ্জাবি বিএসএফ জওয়ান আর তাঁর কমান্ডিং অফিসার স্বপ্নে দেখেছে এই লাশ লুকিয়ে রাখা যাবেনা। তাঁরা ঘুমাতে পারছিলোনা পাপবোধে। এ বিষয়টা তারপর ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত পতাকা বৈঠকে তোলা হয় এবং ক্ষমা প্রার্থনা করা হয়। এই আধ্যাত্বিকতার প্রতি সম্মান জানাতে ভারতের পক্ষ থেকে প্রস্তাব করা হয় সেখানেই বাবার মাজার প্রতিষ্ঠা করা হবে। আর আমাকে আর মা কে ভারতের নাগরিকত্ব দেয়া হয়। বাবাকে ‘পলাতক’ করে করা সমন বাতিল করে বাবাকে কাগজে কলমে সরকার আবার নিয়োগ দেয়। বাবাকে বছর বছর পদোন্নতি দিতে থাকে। শেষে বাবা হাবিলদার হিসেবে দলিল দস্তাবেজে অবসর নেয়। বাবার ভয় এতোটাই চড়াও হয়েছে ভারতীয় বাহিনীর মাঝে যে তারা এই এলাকায় আর গুলি চালিয়েছে কেউ বলতে পারবে না। এখানে সীমান্ত বাজার আছে। বাবার ওরসে বছরে তিন দিন সীমান্ত খোলা থাকে বাংলাদেশের মানুষের জন্যে। পাসপোর্ট ভিসা ছাড়াই  এখানকার মানুষ ওপারে যায়। এই ক'দিন সব ব্যবসাই চলে।“


            গল্প শুনে আমার চোখ ছানাবড়া। তখনো টিপটিপ বৃষ্টি হচ্ছে। ক’টা সিগারেট জ্বলেছে হিসেব করতে প্যাকেট হাতড়ে দেখি মার্লবরোর পুরো প্যাকেটে মাত্র ৫টা শলাকা আছে। জয়নুদ্দির কন্ঠ জড়িয়ে যাচ্ছে। অত্যধিক গাঁজা সেবনের ফল হয়তো। সব কিছু মানলাম কিন্তু আধ্যাত্বিকতার ব্যাপারটা আমার কাছে গোঁজামিল মনে হয়। জন্মের মতো নোংরা প্রক্রিয়াকে এরা কতোটা মহিমান্বিত করেছে। আমি এসবে বিশ্বাস করিনা। এদেশের মানুষ জন্মদেয়ার ক্ষমতা নিয়ে ভয় পায় আর এখানকার জনসংখ্যার ঘনত্ব বিশ্বে সর্বাধিক। আমি খুঁত ধরার জন্যে আরো প্রশ্ন করি। আমার বিশ্বাস এখন সে সত্যি বলবে।

বললাম, “ভাই আপনার ভারতের নাগরিকত্ব আছে, বাংলাদেশে নৌকা চালান কেনো? আর এই নৌকা চালায়ে ১১ সন্তান পালেন কিভাবে?”

জয়েনুদ্দিন জানালো, “ভারতে ব্যাবসা আছে আমার। টিপ্রায় (ত্রিপুরায় । মেঘালয়ে নাই। সম্পদ থাকলে ফোয়া-পুরি সম্মান করেনা। বাংলাদেশেও বাড়ি করসি মমিসিং (ময়মনসিংহ)। ইখানো কেউ জানে না।“

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “আপনি কি আসলেই বিশ্বাস করেন আপনার আধ্যাত্বিক ক্ষমতা আছে সন্তান জন্ম দেবার?”

জয়েনুদ্দিন বললো, “ নারে ভাউ (ভাই), বাচ্চা কি আর এম্নে এম্নে বিয়ায়? বেশির ভাগ কেইস আটকুইড়া (বন্ধ্যা পুরুষ)। আমার গতরে জুত জতদিন আসে, ততদিন চিন্তা নাই। যেকোন বাড়িত গেলে আমারে সম্মান দেয়। আমি মাইয়ারে ঝাড়ফুঁক দেওনের কথা কইয়া ঘরে লইয়া যাই। কেউ কুছতা কয়না। আমার হাত মাইয়ার শইলে পড়লে, মাইয়ার শইল গরম দিয়া লায়। আমি কিছু করা লাগেনা। আফসে কাপড় খইসা পড়ে। একবার এক ব্যাডার মরা বাচ্চা হইসলো, হেইবার আমার বউয়ের ও বাচ্চা হইসে। আল্লার কি কুদরত। একই দিনে। আমি তাকদা (তাড়াতাড়ি) আমার বউয়ের বাচ্চা বদলায় দিসি। আমার মরা বাচ্চা হইসে কইয়া চালাই দিসি।“

ভাবছিলাম গ্রীক দেবী মেদিয়ার কথা। মেদিয়া স্বামীর সাথে গোস্বা করে নিজের বাচ্চা নিজে মেরে ফেলেছিলো। এখানে গল্পের প্যাটার্ন ভিন্ন।

জানতে চাই, “তাহলে স্বপ্নটা?”

“খোয়াব দেখসি রে ভাউ। মিছা না।“

মনে হলো গাঁজা খেলে এমন আধ্যাত্বিক স্বপ্ন এমনিতে দেখা যায়। আর পাঞ্জাবী সেই সৈনিক হয়তো আপন পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতেই এই স্বপ্ন দেখেছে। জগতের প্রতিটা ক্ষেত্রে থাকে ভারসাম্য। হক-বাতিল, সাদা-কালো, আলো-আঁধার এর সহাবস্থান আর একটাকে আরেকটা গ্রাস করার দ্বন্দেই হয়তো পৃথিবী ঘূর্ণায়মান। আদমকে সৃজন করে শয়তানকে লেলিয়ে দেবার মতো বিড়ম্বনাই ঈশ্বরকে ব্যতিব্যস্ত রাখে।


জয়েনুদ্দিন বেঘোরে ঘুমুচ্ছে। হাওরের টলটলা পানিতে ভাসতে শুরু করেছে বৃষ্টি ধোয়া শরতের নীলাকাশ। দুচারটা বক উড়ে গেলো। কি চমৎকার দৃশ্য। বেঁচে থাকার সংগ্রামে ন্যায় অন্যায়ের মূল্যায়ন শিকেয় তোলা থাক। এই সৌন্দর্যে অসুন্দরকে ডেকে আনা নিষ্প্রয়োজনীয়।



**গল্পটি সম্পূর্ণই কাল্পনিক। তবে গল্পে উল্লেখিত স্থান সমূহের বাস্তব উপস্থিতি আছে মীরনগর ব্যাতিরেকে।  



+নাজমূ শাহাদাৎ সিদ্দিকী

প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত আছেন একটা টেলিযোগাযোগ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানে পাশাপাশি  স্নাতকোত্তর পড়ছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্য প্রযুক্তি বিষয়ে। চালিয়ে নিচ্ছেন জীবনকে কোনভাবে চালিয়ে নিতে হয় বলে আর গোগ্রাসে পঞ্চইন্দ্রিয় দিয়ে গিলে চলেছেন গল্প আর খাবার।    


ফেসবুক আইডি:আইডি লিংক