ইতিহাসনামায় আপনাকে স্বাগতম

ছোটোগল্পঃটুটুলের বাবা - লিখেছেন - নাফিজ ইমতিয়াজ


বেসরকারি বীমা কোম্পানির করণিক টুটুলের বাবা।
বড় মেয়ে হওয়ার পর কিছু মানুষ তার নাম পরিবর্তন করে ডাকা শুরু করল। কিন্তু, টুটুল হওয়ার পর থেকে রাতারাতি তার নাম পরে গেল “টুটুলের বাবা”। এমনকি ঢাকার যে ভাড়া বাসায় থাকেন সেখানকার বাড়িওলার খাতায়ও তার নাম টুটুলের বাবা। নাম বিভ্রান্তির ব্যাখ্যায় না গিয়ে মূল গল্পে আসি।

তার জীবনের সবচেয়ে বড় হতাশা হলো যে সে, বেসরকারি বীমা কোম্পানির করণিক। সে মোটা অঙ্কের পেনশন পাবে না।
৩০ বছর বয়স পার হওয়ার পর প্রত্যেকটা দিনই এই “বেসরকারি” শব্দটা তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। তাই ছেলের প্রতি কড়া নির্দেশ তার, যত যাই হোক সরকারি চাকরী একটা পেতেই হবে।  
টুটুল এবার এস.এস.সি. দিয়েছে, ভাল রেজাল্ট করেছে। খাসা এক সরকারি কলেজেও চান্স পেয়ে গেছে। একমাত্র ছেলে সরকারি কলেজে চান্স পাওয়ার খবরটায় সবচেয়ে খুশি হয়তো টুটুলের বাবাই হয়েছেন।
অফিসের কলিগদের সাথে একটা উদ্ভট তর্কেও জড়িয়েছেন, “কেন বেসরকারি কিংবা খ্রিষ্টান মিশনারি কলেজ গুলো থেকে সরকারি কলেজ ভাল!”।
তর্কে সব যুক্তি দিয়েও একটা যুক্তি তিনি দেন না। সেই যুক্তিটাই তার আসল প্রশান্তির কারণ। আর যাই হোক, মাসে মাসে হাজারের কাছে টাকা গুনতে হবে না।
সত্যি বলতে, ইদানিং অর্থের অভাব তাকে জেঁকে ধরেছে। বড় মেয়েটাকে বিয়ে দিয়ে যে শান্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন তা বেশী দিন স্থায়ী হয়নি। ও এখন টুটুলদের সাথেই থাকে। বাড়তি বোঝা কাঁধে পড়ে আরো নড়বড়ে হয়ে গেছেন তিনি। ছেলের সরকারি কলেজের ভর্তির টাকা চুকাতেও হাসি মুখে হিমশিম খেয়েছেন তিনি। কিন্তু এত এত বই ......

টুটুল ওর বাবার সাথে কথা বলে না তিন মাস।
কেন বলে না?
টুটুল নিজেও বুঝে উঠে না। বলা চলে না বলতে বলতে একটা অভ্যাস হয়ে গেছে, লজ্জার আস্তরণ পড়েছে। সেই আস্তরণ কাটিয়ে উঠতে একটা ধাক্কা প্রয়োজন, জোর ধাক্কা। ছেলের ‘বাবা’ ডাক অনেকদিন শোনেন না টুটুলের বাবা।

মাঝে মাঝে ছেলের সাথে নিজ থেকে কথা বলতে ইচ্ছা করে তার। কিন্তু সেও সঙ্কোচ কাটিয়ে উঠতে পারছেন না। কি অন্যায়ের জন্য যে থাপ্পড়টা দিয়েছিলেন টুটুলকে কিছুতেই মনে করতে পারলেন না তিনি। এসব ভেবে ভেবে শেষ ফাইলটা বন্ধ করলেন অবশেষে।
চোখ  ধরে এসেছে তার, ওয়াশরুমে গিয়ে মুখ-চোখ ধুয়ে নিয়ে বের হলেন বাসার উদ্দেশ্যে।
লোনের আবেদনটা পারমিট হলে হয়তো ছেলের বই গুলো কিনে দিতে পারবেন। বড় মেয়ে সেলাই মেশিন চাচ্ছে অনেক দিন ধরে, একা ঘরে বসে তার সময় কাটে না। সেটাও হয়তো কিনে দিতে পারবেন।
আসলেই দিন শেষে প্রত্যেক মানুষের কাছেই একটা না একটা আশা থাকে। সেই আশা নিয়েই পরের দিনের দিকে এগিয়ে যায় মানুষগুলো।

বড় রাস্তার এপাড়ে দাড়িয়ে একবার ওভারব্রিজ ওঠার কথা ভাবলেন তিনি। তবে হাঁটু আর কোমর ঘোর আপত্তি জানাচ্ছে।
দোতলার বাসায় উঠতেও কোমর-হাঁটু ব্যথা করে, কিন্তু ওভারব্রিজে উঠতে তার চেয়ে কয়েক গুন বেশী ব্যথা হয়। আর এইটুকই তো পথ, নিচ থেকেই পার হওয়া যায়।
একটা বাস দাঁড়ানো ছিল, সেই বাসটি পেড়িয়ে একটু সামনে যেতেই দ্রুত আসা আরেকটি বাস ধাক্কা দিল তাকে, জোর ধাক্কা...  

 হাসপাতালে জ্ঞান ফিরল একবার টুটুলের বাবার। মৃদু আওয়াজ পাচ্ছিলেন টুটুলের,"বাবা-বাবা-বাবা"। পরদিন কাগজের শেষ পাতার ২য় কলামের নিচে এল,"রাজধানীতে বেসরকারি বীমা কোম্পানির করণিক সিদ্দিকুর রহমান (৫২) বাসের ধাক্কায় নিহত"।

অবশেষে তার প্রতিবেশীরা তার নাম জানতে পারলেন। পরিবার বেশ কিছু টাকাও পেল সরকার এবং বীমা কোম্পানি হতে। কিন্তু, তাতে কি টুটুলের বই আর বড় বোনের সেলাই মেশিং কেনা হবে ??
উত্তরটি জানতে পারার আগেই কোথাও একটা হারিয়ে গেলেন, টুটুলের বাবা..।  


+লেখক: নাফিজ ইমতিয়াজ  
একাধারে সামাজিক ও আধুনিক উম্মাদ। কিন্তু বয়ে চলায় বিশ্বাসী।
 লেখকের ফেসবুক: https://www.facebook.com/mohammadnafizimtiaz